ঢাকার গুলশান লেকের পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আধুনিক এক আবাসিক হোটেল ‘লেকউড রেসিডেন্সি’। আমাদের পরিচিত অন্য বিলাসবহুল হোটেলগুলো থেকে এটি একটু আলাদা। হোটেলটির নান্দনিক এক্সটেরিয়র ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন স্থাপনাটিকে করে তুলেছে অনন্য, যাকে বলা যেতে পারে বুটিক হোটেল। লেকউড রেসিডেন্সের স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী ইরশাদ হোসাইন। স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির প্রভাষক লতিফা সুলতানা।
বুটিক হোটেলের শুরুটা ১৯৮০ সালে প্যারিস, লন্ডন, নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোতে। ধীরে ধীরে এর প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। বুটিক হোটেলগুলো ফাইভ স্টার অথবা থ্রি স্টার হোটেলগুলোর মতো এতটা বড় এবং বিলাসবহুল না হলেও একটি শহরে বেড়াতে বা কাজে আসা অতিথিদের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করে। স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা এই হোটেলগুলোকে আরও একটু আভিজাত্য ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশে রূপ দিয়েছেন। এই ধরনের বাসস্থানের সুবিধা, নান্দনিকতা, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত স্তরের মাধ্যমে স্বতন্ত্রতা লাভ করে, যা বড় হোটেলগুলোতে পাওয়া যায় না।
লেকউড রেসিডেন্সির ম্যানেজিং ডিরেকটার রিহান হোসাইনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের চাওয়াটা ছিল ডিজাইন থাকবে মিনিমালিজমের মধ্যে কিন্তু আধুনিক সব সুবিধাই পাবেন ক্লায়েন্ট। স্মার্ট ও স্লিম ফার্নিচার ব্যবহার করায় কম স্পেসে অনেক সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। স্থপতি লতিফা সুলতানার দিকনির্দেশনায় সবকিছু সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন হয়েছে।
ঢাকার বাইরে থেকে আগত অতিথিদের জন্য ভিন্ন ঘরানার একটি হোটেল লেকভিউ রেসিডেন্স। এই বুটিক হোটেলটিতে পাবেন একই সঙ্গে হোমলি ফিলিং ও আধুনিকতার ছোঁয়া। লেকের পাশ দিয়ে হোটেলটিতে ঢুকলেই প্রশস্ত লবি। আর ১০ তলার ওপরে রুফটপ রেস্টুরেন্ট। ২৪ ঘণ্টা খাবার সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে পাবেন নয়নাভিরাম লেকের দৃশ্য। এই রেস্টুরেন্টের দুটি অংশ। একটি এয়ার কন্ডিশনড অন্যটি ওপেন টেরাস। আপনি চাইলেই ওপেন টেরাসে লেকের ঠান্ডা বাতাসে বসে নাশতা সারতে পারবেন। রোদের তীব্রতা এড়াতে টেনসাইল স্ট্রাকচার ব্যবহার করেছেন স্থপতি। এই টেনসাইলের ফলে ভিন্ন ও বৈচিত্র্যপূর্ণ আবহ তৈরি হয়েছে। একসঙ্গে প্রায় ১০০ জন বসার ব্যবস্থা রয়েছে এই রেস্টুরেন্টে। এরই সঙ্গে রয়েছে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন রান্নাঘর। যেখানে রয়েছে বাঙালি, চায়নিজ ও ইন্ডিয়ান খাবার রান্নার সুব্যবস্থা।
স্থপতি লতিফা সুলতানা বুটিক হোটেলের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এর ইন্টেরিয়ার ডিজাইন করেছেন খুব সাধারণভাবে এবং দেশি উপকরণ ব্যবহার করে। প্রতি ফ্লোরের লবি বা কমন স্পেস এমনভাবে ডিজাইন করা, যাতে প্রবেশ করলেই মনে হবে আপনি প্রকৃতির কাছাকাছি চলে এসেছেন। জানালা দিয়ে লেক আর সবুজ গাছ ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তি এনে দেবে। লেকের ধারের সব জানালাগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে দৃষ্টিতে কোনো বাধা না পড়ে। জানালার পাশে দাঁড়ালে শরীর ও মন পাবে অনাবিল প্রশান্তি। ফিক্সড গ্লাসের এই জানালাগুলোর ভেতর দিকে নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে কেরোসিন কাঠের ছিমছাম ডিজাইনের রেলিং।
১০ তলার এই হোটেলের ২য় থেকে ৯ম তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় একটি সিঙ্গেল, চারটি টুইন বেড এবং একটি ডাবল বেডবিশিষ্ট রুমের ব্যবস্থা। ১০ম তলায় রয়েছে একটি সুইট। সর্বমোট ৫১টি রুম রয়েছে লেকউড রেসিডেন্সে। প্রতি তলার দুটি রুম থেকে লেকের সম্পূর্ণ ভিউ পাওয়া যাবে, সেই সঙ্গে সিঙ্গেল বেডরুম থেকে লেকের কিছু অংশ দেখা যাবে। সব রুমেই অতিথিদের জন্য এলইডি টেলিভিশন ও রেফ্রিজারেটরের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সঙ্গে ড্রেসিং ও কেবিনেট তো রয়েছেই।
লাইটিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি রুমেই ওয়ার্ম লাইট ও হোয়াইট লাইটের ব্যবস্থা রেখেছেন স্থপতি লতিফা। এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ক্ষেত্রে সব রুমে পৃথক স্পিøট এসি ও সিলিং ফ্যান রয়েছে। অতিথিদের সুবিধা ও প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁরা ব্যবহার করতে পারবেন। ইনডোর কালার হিসেবে নিউট্রাল কালার অফহোয়াইট বেছে নিয়েছেন। এন্ট্রান্স এবং প্রতি তলার লবিতে আয়নার ব্যবহার জায়গাগুলো বড় দেখাতে সাহায্য করেছে।
খুব সাধারণ কিন্তু নিখুঁতভাবে ডিজাইন এবং সমাধান করার প্রচেষ্টায় অনেকটাই সফল হয়েছেন লতিফা সুলতানা। ছোট ছোট ডিটেইলিং খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ইলেকট্রিক্যাল পয়েন্ট টয়লেটের অবস্থান এবং সার্ভিস এরিয়ার বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ নজর দিয়েছেন তিনি। সার্ভিস এরিয়াতে আলাদা সিঁড়ি ও লিফটের ব্যবস্থাও রয়েছে। আর লেকউড রেসিডেন্সির প্রধান আকর্ষণ গুলশান লেক। এই লেকের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তিনি, যাতে অতিথিরা লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।
প্রায় ২০০০ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে অবস্থিত, লেকউড রেসিডেন্সি হোটেলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এটি ব্যস্ত শহর এবং সে শহরের প্রাণকেন্দ্র গুলশানে নিজের স্বতন্ত্রতা প্রকাশ করেছে। সেপ্টেম্বর ২০১৭ চালু হওয়া এই হোটেলটির সুযোগ-সুবিধা, পরিবেশ এবং লেক উপভোগ করার ব্যবস্থা থাকায় কম সময়ে হয়ে উঠেছে বেশ জনপ্রিয়।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।