রেওয়ার্ড-শেফার্ড হাউস

প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যশৈলীর জন্য স্থপতি ফ্র‍্যাংক লয়েড রাইটের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। তিনি শিখিয়েছেন, স্থাপনা প্রকৃতি ও পরিবেশের শত্রু নয়, বরং স্থাপত্যশৈলীর মাধ্যমে তাদের অপূর্ব যোগসূত্র সাধন করা সম্ভব। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘ফলিং ওয়াটার’ এবং অপরিচিত উদাহরণ ‘টিরানা’ (Tirrana)। অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের ভাষায় এর অর্থ ‘স্রোতস্বিনী’, আর টিরানা আমেরিকার কানেকটিকাটে অবস্থিত তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ১৯৫৫ সালে নকশা করা রেসিডেন্স, নরটন নদীর ধারে, ‘রেওয়ার্ড-শেফার্ড হাউস’।

স্থপতি ফ্র‍্যাংক লয়েড রাইটের অনন্য এই স্থাপত্যের নানা দিক তুলে ধরছেন স্থপতি নাহরীন আহমেদ

টিরানা নকশা করার সময় ফ্র‍্যাংক লয়েড রাইট তাঁর অন্যতম পছন্দের কৌশল ‘Embrace and Release’ অবলম্বন করেছেন। বাড়িটির প্রবেশপথে ছাদটা নেমে দেয়ালগুলোর কাছে এমনভাবে এসেছে যেন মনে হয় অতিথিকে জড়িয়ে ধরতেই এগিয়ে আসা। ফয়ার থেকে প্রবেশ বৈঠকখানায়, যেখানে ছাদ উঠে গেছে বেশ ওপরে, দেয়ালগুলোও সরে গিয়ে বিস্তৃত জায়গা খালি করে দিয়েছে। মেহগনি কাঠের ফ্রেমের মধ্যে কাচের জানালা দিয়ে প্রকৃতিকে দেখলে মনে হয়, যেন বিল্ডিংটা কথা বলছে, ‘এখানে বসো, খানিক গল্প করো, বিস্তীর্ণ বৃক্ষরাজির মাঝে দিগন্তকে অনুভব করো।’

সৌরচক্রকে ঘিরে প্রকৃতিতে আলো-ছায়ার যে খেলা, সে খেলাকে স্থাপত্যতে ধারণ করার প্রবণতা লয়েডের বেশ কিছু স্থাপনায় লক্ষণীয়। টিরানাও তার মধ্যে একটি। পূর্বমুখী বাড়িটি যেন সূর্যের পথের সঙ্গে প্রতিচ্ছেদ করে আকাঙ্ক্ষিত আলোকে অন্দরে স্বাগত জানাচ্ছে, বন্দী করেছেন সূর্যের তাপকে। এভাবেই শীতপ্রধান আবহাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে বাসযোগ্য করেছেন বাড়িটির অন্দর।

স্থাপনার আলোকোজ্জ্বল অভ্যন্তর। ছবি: ডোয়েল

কংক্রিট ব্লকের মতো ভারী ও শক্ত স্ট্রাকচারের সঙ্গে রাইট ব্যবহার করেছেন উজ্জ্বল রঙের মেহগনি কাঠের ফ্রেম। বাড়ির দরজা, জানালা, শেলফ ও আসবাবে মেহগনি কাঠের ব্যবহার ও চকচকে বার্নিশ কেবলই উষ্ণতার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যা কানেকটিকাটের মতো শীতপ্রধান অঞ্চলে মানসিকভাবে আরামদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করবে। স্থপতি কংক্রিটের মতো রাশভারী ম্যাটেরিয়ালকে না ঢেকে বরং পরপর ব্লক বসিয়ে নকশা করেছেন বাড়িটির, যাতে ব্যবহারকারী অনুভব করতে পারে প্রতিটি ব্লক কীভাবে তৈরি এবং কীভাবে একটা একটা করে অসংখ্য ছোট ব্লক তার আশ্রয় তৈরি করেছে।

দেয়ালের দিকে তাকালে আরও একটি মজার ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হলো প্রতিটি ব্লকের লাইনে শুধু অনুভূমিক দাগগুলোই চোখে পড়ে। কারণ লয়েড ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিটি কংক্রিট ব্লকের জয়েন্টে অনুভূমিক খাঁজ নকশা করেছেন গাঢ়ভাবে, আর অনুলম্ব খাঁজ হালকা করে দিয়েছেন, যেমনভাবে টিরানার অনুভূমিক দিগন্ত, বনের গাছগুলো উলম্বরেখাগুলো থেকে বেশি লক্ষণীয়, আর মাটির সঙ্গে অনুভূমিক রেখার যোগসূত্রও অনেক বেশি, তাই এই বাড়ির নকশায় স্থপতির এই সামান্য সিদ্ধান্ত স্থাপনাকে নিয়ে গেছে উচ্চতর মাত্রায়।

বাড়ির মেঝেতে লাল রং ব্যবহার করা হয়েছে, যা ফ্র‍্যাংক লয়েড রাইট প্রায়ই ব্যবহার করতেন তাঁর বিভিন্ন স্থাপত্যে। এর একটি দার্শনিক মূল্যও আছে। কংক্রিট দেয়ালের সঙ্গে মিশে গেছে কাঠের বইয়ের তাক, সোফায় বসলে যেন নুয়ে এসেছে ছাদ, আর তার পাশেই ফায়ারপ্লেস। যেন আধুনিক গুহামানবের দিনশেষে আয়েশ করার জন্য আদর্শ জায়গা। লয়েডের স্থাপত্যচর্চা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা, মানুষেরা প্রকৃতির বাইরে নই। বরং আজকের স্থাপনাগুলো যেন মানুষের আধুনিক গুহা।

লাল রঙের মেঝের সাথে নুয়ে আসা ছাদ। ছবি: ফ্র্যাংক লয়েড রাইট

মানুষ স্বভাবতই সংকীর্ণ স্থান থেকে প্রশস্ত জায়গার দিকে ধাবিত হয়। টিরানার শোবার ঘরগুলো লয়েড বসার ঘরের সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন খুব সরু কিছু গলি দিয়ে। তাতে স্থপতির উদ্দেশ্য পরিষ্কার, তিনি চাচ্ছেন নিজের ঘর থেকে বের হয়ে এসে বসার ঘরে বাড়ির মানুষ একে অন্যের সঙ্গে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাক।

টিরানার শোবার ঘরগুলো লয়েড করেছেন ছোট ও সংক্ষিপ্ত। একটি বা দুটি জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে গাছের রঙিন পাতা এবং আসছে আলো। ব্যক্তিগত ঘরে কেবল ওই ফাংশনগুলোরই জায়গা করা হয়েছে, যেগুলো একান্তসম্পন্ন। একটি বিছানা, টুকটাক ছোট কাজ বা পড়াশোনার জন্য টেবিল-চেয়ার ও স্টোরেজ। বাড়ির মাস্টার বেডরুমের সঙ্গে আছে একটি ছোট পর্যবেক্ষণাগার, যেখানে আলোকদূষণবিহীন আকাশে বিরাজমান অসংখ্য তারা পরিলক্ষণ করতেন বাড়িটির মালিক জন রেওয়ার্ড।

টিরানায় পাওয়া যাবে গাগেনহেইম মিউজিয়ামের ভূত! ফ্র‍্যাংক লয়েড রাইট তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রজেক্ট গাগেনহেইম মিউজিয়াম নকশার করার মধ্যবর্তী সময়ে টিরানা প্রজেক্টটি হাতে পেয়েছিলেন। নিউইয়র্ক শহরের কোলাহল থেকে মুক্তি আর মাথার জট ছাড়াতেই কানেকটিকাটে বনের ভেতর সাইট দেখতে চলে এসেছিলেন রাইট। গাগেনহেইম মিউজিয়াম সমসাময়িক হওয়ায়, টিরানার গ্রিনহাউসে ব্যবহার করা হয়েছে মিউজিয়ামের জন্য নির্দিষ্ট গ্রিডে কাটা কাচের টুকরা, যেগুলো অতিরিক্ত হয়েছিল বলে গাগেনহেইমে ব্যবহার করা হয়নি।

স্থাপনার ছিমছাম অন্দর। ছবি: পিন্টারেস্ট

রেওয়ার্ড শেফার্ড হাউস এমন একটি স্থাপনা, যাকে আপাদমস্তক বিভিন্ন মাত্রায় পর্যালোচনা করা সম্ভব, এবং যতই একে বিশ্লেষণ করা হোক, মনে হয় রাইট কি কেবল একজন স্থপতিই ছিলেন? তিনি একজন দার্শনিকও বটে, যিনি তাঁর স্থাপনার প্রতিটি ডিটেইলে রেখে গেছেন তাঁর দর্শন, যা আজও স্থাপত্যচর্চায় ও অনুভবে অনুরণন সৃষ্টি করে চলেছে।

প্রকাশকাল: বন্ধন ১৬৬ তম সংখ্যা, জুন ২০২৪

স্থপতি নাহরীন আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top