বর্ষার আকাশ। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি, কখনো-বা রৌদ্দুর। ক্ষণিকের বৃষ্টিতে সবুজ প্রকৃতি হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক ধরে এগিয়ে চলেছি। সুউচ্চ গাছের ফাঁক গলে মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি দেখতে দেখতে পৌঁছাই নির্ধারিত গন্তব্য নাভারন বাজারে। যশোর জেলার শার্শা উপজেলার ছোট্ট এ শহরের একজন সফল ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান। শহরের রেল বাজারের মেসার্স রোকেয়া ট্রেডার্সের কর্ণধার তিনি। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যার সফল মুখ তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. ওয়ালিদুর রহমানের সহযোগিতায় জানব তাঁরই সাফল্যগাথা।
ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের জন্ম ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, যশোর জেলার শার্শা উপজেলার রাজার ডুমুরিয়া গ্রামে। পিতা আলহাজ খলিলুর রহমান ও মা রোকেয়া খাতুন। চার ভাই পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। ১৯৮৯ সালে বুরুজ বাগান উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯১ সালে নাভারন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর একই কলেজ থেকে বিএ সম্পন্ন করেন। ১৯৯১ জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়িক জীবনে। শুরু সিমেন্ট ও সার ব্যবসা দিয়ে। পর্যায়ক্রমে তাঁর ব্যবসাসম্ভারে যুক্ত হয় স্টিল বা রড।
শিক্ষাজীবন থেকেই মিজানুর রহমান জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়। ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছেলেবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল ব্যবসার। ব্যবসার শুরু দাদার আমলে। বাবাও ছিলেন ব্যবসায়ী। নাভারন বাজারেই ছিল ধান, পাট ও ভুসিমালের নিজস্ব আড়ত। ফলে ব্যবসায়িক পরিবার হিসেবে এলাকায় ছিল যথেষ্ট সুনাম। তবে নিজ ব্যবসা উন্নয়নে পরিবারের পরিচিতির ওপর নির্ভর না করে অবলম্বন করেন সম্পূর্ণ নিজস্ব মেধা ও কৌশল। ন্যায্য দামে গুণগতমানের পণ্য বিক্রি, সততা, নিষ্ঠা, প্রতিশ্রুতি বজায় রাখা এবং পরিশ্রম দিয়ে একজন সফল ব্যবসায়ীর কাতারে প্রতিষ্ঠিত করেন নিজেকে। আকিজ সিমেন্টের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি জড়িয়ে এ ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রির সঙ্গে। প্রতিনিয়ত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পণ্য বিক্রির সুবাদে দ্রুতই পেয়ে যান কোম্পানিটির পরিবেশক স্বত্ব। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির নাভারন টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ ডিলার। এ ছাড়া একেএস স্টিলেরও স্থানীয় পরিবেশক। এই অর্জনের পেছনে তাঁর ছোট ভাই শরিফুজ্জামান মাহাতাবেরও রয়েছে অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদান। মেজো ভাইয়ের ছেলে মুস্তাফিজুর রহমান খোকনও ব্যবসায়িক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রি আর কোম্পানি প্রদত্ত বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, ডিজিটাল ক্যামেরা, মোবাইল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অফারও রয়েছে কোম্পানির তরফ থেকে।
খুচরা ব্যবসায়ী থেকে পরিবেশক পর্যায়ে ব্যবসা শুরুর পর ব্যবসায়িক উন্নয়নে নতুন করে ভাবতে থাকেন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। কারণ, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসার মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বিপুল পরিমাণ পণ্য, প্রচুর অর্থলগ্নি, বহুমুখী লেনদেন ও পর্যাপ্ত জনবল নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করতে হয় একজন পরিবেশককে। বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে পরিবেশক হিসেবে তাঁকেও ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হতে হয় তাঁকে। যদিও আগে থেকেই অত্র এলাকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক, এ জন্য খুচরা পর্যায়ে ব্যবসা সম্প্রসারণে তাঁকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। তা সত্ত্বেও তিনি এলাকার অনেক বেকার যুবককেও নির্মাণপণ্য ব্যবসায় আগ্রহী করে তোলেন। তাঁদের পণ্য ও সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পেতে সহায়তা করেন। এভাবেই তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপগুলো একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বিয়ে করেছেন ১৯৯৭ সালের ১৫ মে। সহধর্মিণী ফারজানা আফরোজ রমা। এ দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুমাইয়া জারিয়াত অহনা আকিজ কলেজিয়েট স্কুলের মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী, ছেলে ফাহিম ফয়সাল স্বাধীন দিশারী শিশু একাডেমির প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে রোকেয়া জারিয়াত অনন্যা, বয়স মাত্র ৮ মাস। উল্লেখিত ব্যবসা ছাড়াও তাঁর রয়েছে পরিবহন ব্যবসা, মাছের ঘের ও আম বাগান প্রকল্প। বর্তমানে তিনি নাভারন সার ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি।
নাভারণ এলাকায় সফলতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান। তাঁর ব্যবসার অগ্রগতি এবং সার্বিক সাফল্যে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি নিরন্তর কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির এজিএম, সেলস (ইস্ট রিজিয়ন) মশিউর রহমান ডালিম, যাঁর অনুপ্রেরণায় তিনি পরিবেশকত্ব নিয়েছেন, সি.ম্যানেজার, সেলস (ওয়েস্ট রিজিয়ন) নাসিম হাসান পিকুল, যিনি ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নে দিকনির্দেশনা দেন এবং সি. এরিয়া ম্যানেজার মো. ইয়ামিন আলী, যাঁর সার্বিক সহযোগিতায় তিনি হতে পেরেছেন একজন সফল ব্যবসায়ী।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৮তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৭।