কেন্দ্রীয় কারাগারের নতুন রূপকল্প

পুরান ঢাকা, যার ইতিহাস অনেক পুরোনো। প্রায় ৪০০ বছর ধরে রাজধানী হিসেবে এটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পুরান ঢাকার এই গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার। প্রথমে এটি ছিল আফগানদের কেল্লা। পরে ইসলাম খাঁ এটি আফগানদের থেকে দখল করে মোগল সাম্রাজ্যের পরিচালনাস্থল হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন এবং ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করেন। এই কেল্লার সামনেই গড়ে উঠেছে আজকের বিখ্যাত চকবাজার। বলা যায়, মোগল আমল থেকেই এই স্থানকে ঘিরে ঢাকার রাজধানী হওয়ার গৌরবময় অধ্যায়ের শুরু। মোগলরা থাকার সময়ই এখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েদি এনে রাখা হতো। পরে ইংরেজরা এসে এটিকে পূর্ণাঙ্গ কারাগারে রূপান্তর করে, যার মাধ্যমে গোড়াপত্তন হয় আজকের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের। কারাগার হিসেবে এটির ইতিহাস ২২৮ বছরের। ২০১৬ সালে এসে এই কারাগারটি স্থান পরিবর্তন করে চলে যায় কেরানীগঞ্জে। এখন কারাগারের স্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

২৫ ফুট লম্বা দেয়ালঘেরা এই কারাগারটি ছিল অত্র এলাকার পরিচিতি। তখনকার ব্যবসা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সুদৃঢ় থাকার কারণ ছিল প্রাচীন এ কারাগারটি। কিন্তু কারাগারটির স্থান পরিবর্তন করার পর থেকেই এখানে ব্যবসা ও নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দিচ্ছে এবং যা দিন দিন বাড়ছে। এ ছাড়া ঢাকা নগরী এত ঘন বসতিতে পরিণত হওয়ার কারণে অনেক সুযোগ-সুবিধাই এখানে অনুপস্থিত। এসব সমস্যার সমাধানের ভাবনা নিয়ে আমি আমার থিসিস প্রজেক্টের কাজ শুরু করি। এই প্রজেক্টটি যাঁদের সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব ছিল তাঁরা হলেন চুয়েটের সহকারী অধ্যাপক মো. নাজমুল লতিফ, সহকারী অধ্যাপক সজীব পাল, সহকারী অধ্যাপক সজল চৌধুরী, সহকারী অধ্যাপক মুস্তাফিজ আল মামুন, প্রভাষক রেজওয়ানা সোমা এবং বুয়েটের সহযোগী অধ্যাপক প্যাট্রিক ডি রোজারীও।

এই স্থানটিতে কী হওয়া উচিত তা বের করার আগে কিছু পরিসংখ্যান জানা উচিত এই এলাকার মানুষ কী চায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতে এখানে কী হওয়া উচিত। এলাকার মানুষের দরকার-

  • পার্ক
  • খেলাধুলার জায়গা
  • কমিউনিটি সেন্টার
  • এ ছাড়া এমন কিছু করা, যা অনিরাপত্তার সমস্যা দূর করবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে হওয়া উচিত-

  • পার্ক
  • বহুমুখী হল
  • পার্কিং
  • জিমনেশিয়াম
  • কারা জাদুঘর
  • রেস্টুরেন্ট

দুটি পরিসংখ্যান থেকে গবেষণা করে প্রজেক্টটিতে রাখা হয়েছে-

  • পার্ক
  • মাল্টিপারপাস হল
  • পার্কিং
  • বিদ্যালয়
  • জিমনেশিয়াম
  • কারা জাদুঘর
  • রেস্টুুরেন্ট
  • পাঠাগার।

কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে অনেক স্থাপনা আছে, যেগুলোর কোনো প্রয়োজন কিংবা ঐতিহাসিক মূল্য নেই। তাই যেসব ভবনের ঐতিহাসিক মূল্য আছে, সেগুলো ও যেসব ভবন নতুনভাবে নির্মিত সেগুলো রেখে বাকি সব ভেঙে ফেলা উচিত। ঐতিহাসিকভাবে মূল্য আছে এমন ভবনের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত চারটি লাল ভবন, বঙ্গবন্ধুর কারাগার, চার নেতার কারাগার, ফাঁসির মঞ্চ ও প্রবেশ ভবনটি। এগুলোর কয়েকটিকে পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করা হবে আর কয়েকটিকে নতুন কাজে ব্যবহার করা হবে। যেমন চারটি লাল বিল্ডিংয়ে হাসপাতাল, মেঘনা ও সুরমা হবে জেল মিউজিয়াম আর অন্যটি হবে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

এই কারাগারে ছয়টি প্রবেশপথ ঠিক করা হয়েছে, যেগুলো দিয়ে মানুষ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খুব সহজে হেঁটে যেতে পারবে। মানুষ যদি এই স্থানটির মধ্যে হাঁটাচলা শুরু করে তাহলে আশপাশের ব্যবসা-বাণিজ্যের  উন্নতি হবে, সঙ্গে যানজটের পরিমাণও কমবে। প্রতিটি প্রবেশপথে আরবান পকেট রাখা হয়েছে, যেটি ওই এলাকার নির্দিষ্ট কমিউনিটি ব্যবহার করবে এবং প্রতিটিতে টং দোকান দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে টং দোকান খুবই গুরুত্ব বহন করে। এখানে বিভিন্ন বয়সের লোকেরা আড্ডা দেয় এবং এতে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো হয়। এ ছাড়া যে রাস্তায় টংয়ের দোকান আছে, সেখানে নিরাপত্তাও থাকে ভাল।

কারাগারটি স্থানান্তর করার পর থেকে নিরাপত্তা একটি বড় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, যারা এখানে অপরাধ করে তারা ১৩-২৮ বছরের যুবক। তাদের আসলে অবসর সময়ে কিছুই করার থাকে না। এ জন্য এই প্রজেক্টটিতে একটি বড় খেলার মাঠ রাখা হয়েছে, যাতে সবাই খেলতে পারে এবং অপর এলাকার মানুষের সঙ্গে সহজেই পরিচিত হতে পারে। এ ছাড়া এখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য জায়গা ও বড়দের হাঁটার রাস্তা দেওয়া হয়েছে, যা বিভিন্ন বয়সের মানুষের একসঙ্গে থাকা ও পরিচিত হওয়ার সুযোগ দেবে।

এখন আবার একটু পিছনে ফিরে যাই। এই স্থানটির ইতিহাস আফগান থেকে শুরু হলেও এর গৌরব শুরু মোগলদের হাত ধরে। এখানে এরপর ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সব স্থাপনা আছে। খালি নেই মোগলদের কোনো নিদর্শন। তাই এই প্রজেক্টির বাগানটি করা হয়েছে মোগলদের আলোকে, যাতে গৌরবের ইতিহাসের সব স্মারক থাকে।

উইকিপিডিয়া

দেয়াল ভাবনা

বর্তমান কারাগারের চারপাশে ২২ ফুট লম্বা উঁচু দেয়াল আছে। এই দেয়াল কারাগারটিকে চারপাশের লোকালয় থেকে আলাদা করে রাখত। এখন যেহেতু কারাগার নেই, তাই দেয়ালেরও প্রয়োজন নেই। কিন্তু এলাকার পরিচিতি রয়েছে এই দেয়ালে। তাই এলাকার প্রবেশপথে দেয়াল রেখে দেওয়া হবে, যা দেখে দর্শনার্থীরা দেয়ালের অবস্থান বুঝতে পারবে এবং বাকি অংশ ভেঙে ফেলা হবে।

এ ছাড়া অন্যান্য কাজের মধ্যে আছে প্রধান প্রবেশপথটি; যা রেখে দেওয়া হয়েছে। এর অন্যান্য তলা অফিস হিসেবে ভাড়া দেওয়া হবে। এখানে একটি মাল্টিপারপাস হল দেওয়া হয়েছে, যার নিচে ১৫০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। নতুন নির্মিত জেল অফিসার্স গেস্ট হাউসটিকে গেস্ট হাউস হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে, যাতে পর্যটকেরা এখানে থাকতে পারে। কারাগারের পাশে একটি ছোট প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, এটিকে সরিয়ে মহাপরিদর্শকের বাংলোর পাশে একটি বড় বিদ্যালয় করা হয়েছে। আর বাংলোটিকে পাঠাগার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এই প্রজেক্টটিতে সবুজের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ৩৮ একর জায়গার ৬০ শতাংশই সবুজ ও পুকুরে সাজানো। যদি এই নকশা আশপাশের জায়গার সঙ্গে মেলানো যায়, তাহলে আশা করা যায় এই স্থানটি একই সঙ্গে দেশ ও এলাকার মানুষের মিলনস্থলে  পরিণত হবে, যা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

স্থপতি শাহ মো. হাছিন শাদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top