Image

মন্ট্রিয়েলের বায়োস্ফিয়ার

কানাডার কুইবেক প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর মন্ট্রিয়েল। এই শহরসংলগ্ন নদী সেইন্ট লরেন্সের দুটি দ্বীপ সেইন্ট হেলেন আইল্যান্ড আর নটর ডেম আইল্যান্ড নিয়ে পার্ক জঙ দ্রাপো (Pare Jean-Drapeau) উপশহর। মন্ট্রিয়েলের বায়োস্ফিয়ারটি এখানেই অবস্থিত। বায়োস্ফিয়ার হচ্ছে কানাডার প্রথম পরিবেশবান্ধব জাদুঘর। এই মিউজিয়ামটির উদ্দেশ্য হচ্ছে সেইন্ট লরেন্স নদী আর গ্রেট লেকের ইকোসিস্টেমের প্রতি মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। বছরে তিন লক্ষাধিক দর্শনার্থীর পদধূলি পড়ে এখানে। বায়োস্ফিয়ারটির মালিকানা সিটি অব মন্ট্রিয়েলের হলেও এটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে এনভায়রনমেন্ট কানাডা।

অবশ্য শুরুতে এটি জাদুঘর হিসেবে নির্মাণ করা হয়নি। পার্ক জঙ দ্রাপো ১৯৬৭ সালের ওয়ার্ল্ডস ফেয়ার এক্সপো ’৬৭-এর সাইট নির্বাচিত হয়। এই ওয়ার্ল্ডস ফেয়ারের আমেরিকান প্যাভিলিয়ন তৈরির দায়িত্ব পেয়েছিলেন স্থপতি বাকমিনিস্টার ফুলার। স্থপতি ফুলার যিনি জিওডেসিক ডোমের জনপ্রিয় স্রষ্টা; একই সঙ্গে সমান দক্ষ, তিনি চেয়েছিলেন নিজের এই কাজটির মাধ্যমে এমন কিছু করতে, যেটা একই সঙ্গে তাঁর কাজ এবং আমেরিকাকে আলাদাভাবে বিশ্বে পরিচিতি দেবে। আমেরিকান প্যাভিলিয়ন হিসেবে তিনি নিজস্ব স্টাইলে ২০ তলার সমান একটা বিশালাকৃতির ডোমের ডিজাইন করেন। সাধারণত স্থপতিরা ডোম বা গোলাকৃতির স্থাপনার ক্ষেত্রে অর্ধগোলকের নকশা নিয়ে ভাবেন। কিন্তু ফুলার নতুন কিছু করতে চেয়েছিলেন। বায়োস্ফিয়ার তাই অর্ধগোলাকৃতির না হয়ে প্রায় পূর্ণ গোলক হয়ে গেল (দুই-তৃতীয়াংশ গোলক)। ফুলারের নকশায় তৈরি আমেরিকান এই প্যাভিলিয়ন ৫৬ লাখেরও অধিক দর্শনার্থীর মন কাড়তে সক্ষম হয়েছিল। আর এক্সিবিশনেও ছিল দর্শনার্থীদের আকর্ষণের জন্য অ্যাপোলো মিশনের স্পেসশিপ থেকে শুরু করে আধুনিক আমেরিকান শিল্পকলা পর্যন্ত। এই বায়োস্ফিয়ারের স্টিলের অবকাঠামোতে রয়েছে অ্যাক্রিলিকের প্রলেপ, তাই এটাকে দেখে মনে হয় যেন একটা বিশালাকৃতির জ্বলজ্বলে হীরকখণ্ড।

ওয়ার্ল্ডস ফেয়ার শেষ হলেও প্যাভিলিয়নটিকে সরিয়ে ফেলা হয়নি। যদিও এটাকে রেখে দেওয়ার মতো কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু বাজেটস্বল্পতার কারণে এটিকে ওই মুহূর্তে ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়নি। তাই শেষমেশ এটি মন্ট্রিয়েল শহরেই রয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার বায়োস্ফিয়ারটিকে মন্ট্রিয়েল শহরকে উপহার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এক্সপো ’৬৭ শেষ হওয়ার পর বেশ কয়েক বছর এটি বিভিন্ন উদ্ভিদ আর পাখির প্রদর্শনীর জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে ১৯৭৬ সালে এর রিনোভেশনের কাজের সময় দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগে। আগুনে এর বাইরের অংশটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই নিরাপত্তা এবং পুনর্গঠনের কাজের জন্য ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বায়োস্ফিয়ারে দর্শনার্থী ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

সে বছরেই এনভায়রনমেন্ট কানাডা এটিকে ১৭৫ লাখ ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বায়োস্ফিয়ারকে একটা আকর্ষণীয় জাদুঘরে রূপ দেওয়া, যেখানে পরিবেশসংক্রান্ত নানা বিষয় প্রদর্শিত হবে, যা থেকে পরিবেশের প্রতি তৈরি হবে মানুষের ভালোবাসা। আর চাইলেই কেউ পাশের বিখ্যাত লেকের পানির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এটি নিয়ে গবেষণাও করতে পারবে। স্থপতি এরিক গদিয়ারকে এর ইন্টেরিয়রকে নতুনভাবে সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। অবশ্য ফুলারের মূল নকশা অপরিবর্তনীয় রাখা হয়। পুনর্নির্মাণের কাজ শেষে ১৯৯৫ সালে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বায়োস্ফিয়ারকে জাদুঘর করার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেইন্ট লরেন্স নদী আর গ্রেট লেকের যে নিজস্ব এক অনন্য ইকোসিস্টেম রয়েছে, তার প্রচারণা চালানো।

উইকিপিডিয়া

বায়োস্ফিয়ারটির ব্যাস ২৫০ ফুট আর এর উচ্চতা ২০৬ ফুটের মতো। ৪৮ হাজার ৭০০ বর্গফুটের সার্ফেস এরিয়ার এই মিউজিয়ামের প্রায় ৪০ শতাংশই জানালা। যেন এটি সত্যিকার অর্থেই এর পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যতা বজায় রেখেছে। এর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও ছিল বেশ জটিল। প্রায় গোলাকৃতির হওয়ায় এর তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন, অপর দিকে এটিকে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার মোটেই ঠিক ছিল না। সেইন্ট লরেন্স নদীর উপস্থিতির জন্য জিওথার্মাল সিস্টেম হিসেবে এর পানির ব্যবহারের কথাও কেউ কেউ ভেবেছিলেন। কিন্তু সে ভাবনা ধোপে টেকেনি। কারণ, আইল্যান্ডকে প্রাকৃতিক ভূমিক্ষয় থেকে রক্ষার জন্য ১৯৬৭ সালে মেমব্রেন স্থাপনা করা হয়। অবশ্য মেমব্রেন না থাকলেও খুব একটা সুবিধা হতো না। কেননা এখান থেকে পানির ব্যবহার কোনো না কোনো সময় বাধা পেতই। লেকের জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদেই সেটি করতে হতো। সৌভাগ্যবশত, একটা পরীক্ষায় দেখা যায় যে ভূগর্ভস্থ পানি বায়োস্ফিয়ারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এখান থেকে প্রায় ৬১০ কিলোওয়াট শক্তি পাওয়া যাবে কুলিং (Cooling Capacity)-এর জন্য আর ৩৬০ কিলোওয়াট শক্তি পাওয়া যাবে হিটিং (Heating Capacity)-এর জন্য।

জিওথার্মাল সিস্টেমের জন্য দুটি ভূগর্ভস্থ পাম্প ৩০০ ফুট নিচে বসানো হয়েছে, যেটির মধ্য দিয়ে ৩৫০ গ্যালন/ মিনিট গতিতে এবং নিয়ত ৯০ সে. তাপমাত্রায় দুটি হিট এক্সেঞ্জার প্লেটে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির তাপমাত্রা এই হিট এক্সেঞ্জার প্লেটে স্থানান্তরিত হচ্ছে এবং পুনরায় দুটি ভিন্ন পাম্পের মাধ্যমে মাটির নিচে ফিরে যাচ্ছে আর পানির এই আবর্তন পুনরাবৃত্তিক।

জিওথার্মালের ক্ষেত্রে আবহাওয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এর জন্য আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩১০ সে. এবং সর্বনিম্ন ২৬০ সে.। যেহেতু পরিবেশের কথা চিন্তা করে থার্মাল সিস্টেমে কোথাও অ্যান্টি-ফ্রিজিং কিছু ব্যবহার করা হয় না আর শীতের সময় থার্মালের পানিপ্রবাহের তাপমাত্রা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে (৪.৫০ সে.), কানাডার মতো শীতপ্রধান দেশে তুষারপাতও বিবেচ্য বিষয়। তাই চার ফুট গভীরতায় হাইড্রোথার্মাল পাইপে একটা অনমনীয় উচ্চ ঘনত্বের ইন্স্যুলেশন বসানো হয়েছে যেন এটি ঠান্ডার কারণে পানির জমাট বেঁধে যাওয়া রোধ করতে পারে।

ভূগর্ভস্থ সব ধরনের পাইপিংয়ের ক্ষেত্রে গ্যালভানাইজড স্টিলের ব্যবহার করা হয়েছে, যেন এটি মাটির নিচের সব ধরনের চাপ, তাপমাত্রার ভিন্নতা এবং অন্যান্য বিষয় থেকে নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা, চাপ, পানিপ্রবাহের মাত্রা এগুলো দেখভালের জন্য সেন্সর বসানো আছে আর এটি একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। হিট এক্সেঞ্জার প্লেট দুটি ভূগর্ভস্থ পানির কারণে বা পাইপের তাপের কারণে কোনো দূষণ হওয়া থেকে থার্মাল সিস্টেমকে রক্ষায় কাজ করে।

জিওথার্মাল সিস্টেমের ডিজাইন করার সময় বাতাস চলাচলের বিষয়টিকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সর্বক্ষণ দুটি ভলিউম সিস্টেম জনপ্রতি ২৫.৭ ঘনফুট/মিনিট পরিমাণে আর ১১.৬ ঘনফুট/মিনিট গতিতে পরিষ্কার মুক্ত বায়ুর প্রবাহ নিশ্চিত করতে নিযুক্ত রয়েছে। এই বায়ুপ্রবাহ ব্যবস্থাপনা সরাসরি হিট পাম্পের ফিরতি এয়ার ডাক্টের সঙ্গে যুক্ত যেন এটি বায়োস্ফিয়ারের ভেতরে সঠিক পরিমাণে বাতাসের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বায়োস্ফিয়ারে বছরে ১ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট শক্তির প্রয়োজন হয়, যা কি না প্রচলিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা থেকে ২১ শতাংশ কম শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে।

নিচে বায়োস্ফিয়ারে ব্যবহৃত জিওথার্মাল সিস্টেমের অপারেটিং ডায়াগ্রাম দেওয়া হলো:

বায়োস্ফিয়ারের সৌন্দর্য ছাড়া এর ভেতরে গেলে আপনি আসলে কি দেখতে পাবেন? বায়োস্ফিয়ার আসলে সব বয়সীদের জন্য দারুণ দর্শনীয় এক স্থান। বিশেষত, বাচ্চাদের জন্য যারা হ্যান্ডস-অন ইন্টার‌্যাক্টিভ (হাতে-কলমে কিছু শেখা) প্রদর্শনী ভালোবাসে। এখানকার প্রদর্শনীতে (ডিসপ্লে ও সিনেমা) গ্রেট লেক আর সেইন্ট লরেন্স নদীর গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রিভার ওয়াটারশেড আর এর পারিপার্শ্বিকতা এই এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করে। ওয়াটারশেডে বিশেষ প্রোগ্রামেরও আয়োজন করা হয়ে থাকে, যেমন- বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্ট, খেলা, প্রদর্শনী এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, ‍জুলাই ২০১৭।

Related Posts

প্রাডা গ্যালারিয়া: বহুমাত্রিক স্থাপত্যের যাত্রা শুরু

ইতালির মিলান শহর ফ্যাশন, শিল্প ও স্থাপত্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এবার সেই শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার ভেতরেই নতুন এক…

গোল্ডেন সেকশন থেকে কোস্টারিকার পাহাড়ে ত্রিভুজাকৃতির বাড়ি

কোস্টারিকার নোসারা অঞ্চলের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের ওপর উঁচু একটি পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে কিউবিও৩ আর্কিটেক্টস-এর (QBO3 Arquitectos) সাম্প্রতিক…

বাগানের ভেতর রঙিন খিলানে বিস্তৃত হলো এক ইরানি বাড়ি: গেলারেহ হাউস

তেহরানের উপকণ্ঠে ফলের বাগান ঘেরা একটি ছোট্ট উইকএন্ড ভিলাকে কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী বাসগৃহে রূপান্তর…

বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA

লিবিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের ঐতিহাসিক বন্দরনগরী বেঙ্গাজি। এখানে ২০৫০ সাল সামনে রেখে তৈরি হচ্ছে এক নতুন নগর-পরিকল্পনা। জাহা হাদিদ…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

prada galleria
গোল্ডেন সেকশন থেকে কোস্টারিকার পাহাড়ে ত্রিভুজাকৃতির বাড়ি
রান্নাঘরে খেলাচ্ছলে টুইস্ট নিয়ে এসেছে ডিজাইনবুম শপের নতুন কিউরেটেড সংগ্রহ
বাগানের ভেতর রঙিন খিলানে বিস্তৃত হলো এক ইরানি বাড়ি: গেলারেহ হাউস
বেঙ্গাজির নতুন পরিকল্পনার রূপরেখা আঁকছে ZHA
ফেসবুক পোস্ট থেকে ফিরে এলো ফুটুরো হাউস
ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেকচার ও কার্বন নি:সরণ
আসন্ন RIBA ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের শর্টলিস্টে রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি
হারানো মসজিদ