দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা। মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, কুমার ও নবগঙ্গা নদীর পলল সমৃদ্ধ অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জনপদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের মুক্তিযুদ্ধে জেলাটির ভূমিকা অপরিসীম। স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতেই চুয়াডাঙ্গা শত্রুমুক্ত থাকায় ও প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় জনপদটি হয়ে ওঠে রণাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ব্যাপক কৃষিজ উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও অগ্রসর হয়, যাতে অবদান রাখে কতিপয় সফল ব্যবসায়ী। এমনই একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী সোহেল রানা (শামিম)। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আসমানখালী বাজারের মেসার্স জনতা ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা নাজমুল হুসাইনের সহযোগিতায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের আদ্যান্ত।
ব্যবসায়ী শামিমের জন্ম ২৪ অক্টোবর ১৯৮৩ চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গায়। বাবা মৃত আবুল কাশেম ও মা মোছা. তহমিনা খাতুন। তিনি ভোগাইল বগাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৯ সালে মাধ্যমিক ও আলমডাঙ্গা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। তখন হঠাৎ করেই বাবা মারা যান। এ অবস্থায় তিনি আর বিদেশ না গিয়ে বরং পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন। বাবার ছিল টিন ও পাইপের ব্যবসা। ছোটবেলা থেকে মাঝেমধ্যে দোকানে বসলেও তখন ব্যবসা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। তা সত্ত্বেও নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক কৌশলে খুব দ্রুতই ব্যবসার প্রসার ঘটাতে সক্ষম হন। নির্মাণপণ্য ব্যবসাসম্ভারে যোগ করেন রড, সিমেন্ট, পাম্প, হার্ডওয়্যার ও স্যানিটারিসামগ্রী।
ব্যবসায়িক পরিবার হিসেবে এলাকায় রয়েছে তাঁদের সুদীর্ঘ পরিচিতি। অত্র অঞ্চলে শুধু তাঁর বাবাই নির্মাণপণ্যের ব্যবসা করতেন। আর কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ব্যবসাটা ছিল একচেটিয়া। পরে কতিপয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও তাঁদের জনপ্রিয়তার কারণে অধিকাংশ ব্যবসায়ীই সফলভাবে ব্যবসা করতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। এরপর থেকে ক্রমেই তাঁর ব্যবসা প্রসার ঘটতে থাকে। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির চুয়াডাঙ্গা টেরিটরির অন্যতম সেরা সিমেন্ট বিক্রেতা হন তিনি। প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সিমেন্ট বিক্রি করায় কোম্পানির পক্ষ থেকে স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন এসি, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার, ডিনারসেট, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। এ ছাড়া সুযোগ পেয়েছেন সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপাল ভ্রমণের। অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও তিনি ছিলেন অনন্য। তিনি পারটেক্স পাম্পের একজন সম্মানিত পরিবেশক। সাফল্যের এমন ধারাবাহিকতায় স্থানীয় বাজারে জায়গা কিনে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়েছেন। বর্তমানে বাজারে রয়েছে তিনটি শোরুম ও চারটি গোডাউন। এ ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর রয়েছে ভুসিমালের ব্যবসাও।
ব্যবসায়ী শামিম বিয়ে করেছেন ২০০৭ সালে। সহধর্মিণী দিলারা পারভীন। তাঁদের সুখের সংসারে এক মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়ে সানজিদা মিম, আসমানখালী কিন্টারগার্ডেন স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলে তামিম রেজা সদ্যই জন্মেছে। ব্যবসা নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটান এ ব্যবসায়ী। একা ব্যবসা সামলাতেই হিমশিম খান! এর ওপর আবার সপ্তাহে সাত দিনই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় পরিবারকেও পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। তা সত্ত্বেও আপনজনদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেড়াতে যান প্রতিবছর।
একজন কিশোর তাঁর বাবার ব্যবসার হাল ধরে ব্যবসাকে কয়েক বছরের মধ্যেই অনেক বড় পরিসরে উন্নীত করা অনেক বড় সৌভাগ্য ও সাফল্যের ব্যাপার। আর সে কাজটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন ব্যবসায়ী শামিম। কিন্তু ব্যবসার পথটি তেমন মসৃণ ছিল না নবীন এ ব্যবসায়ীর জন্য; ছিল রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং। জনপদটিতে বিভিন্ন নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির প্রাদুর্ভাব থাকায় একসময় প্রচুর চাঁদা দিতে হয়েছে তাঁকে। বাকিতে পণ্য বিক্রি করে অর্থ আদায় করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে, এমনকি অনেক টাকা অনাদায়িও রয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও তিনি নতুন নতুন ব্যবসায়িক কৌশল অবলম্বন করে এটি সামলেছেন ভালোভাবেই। কম মুনাফায় মানসম্মত পণ্য বিক্রি, সঠিক ওজন ও পণ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে ক্রেতাকে অবহিত করা এবং সুব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা আস্থা অর্জন করেছেন। নিজের এমন অর্জনে তিনি সন্তুষ্ট। এখন তিনি ব্যবসার সুবিধার্থে বাজারে একটি বড় শোরুম করতে চান, যেখানে ক্রেতাসাধারণকে আর পণ্যের জন্য নানা জায়গায় দৌড়াতে হবে না; এক ছাদের তলে মিলবে সব সেবা।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।