ব্যবসায় দরকার আত্মার শুদ্ধতা

মানুষের জীবনে উত্থান-পতন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জীবনে চলার পথে আসে নানা বাধা-বিপত্তি। সুসময়ে সুবিধাভোগীর অভাব না হলেও জীবনের চরম দুঃসময়ে পাশে পাওয়া যায় না কাউকেই। দুঃসহ যন্ত্রণা পোহাতে হয় নিজেকেই। কঠিন মনোবল আর দৃঢ়চেতা মানুষ ছাড়া দুর্দিন কাটিয়ে আবারও সুদিন আনতে পারে না। এ জন্য চাই ধৈর্য আর দূরদর্শিতা। বাস্তবজীবনে এমনই এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া সফলজন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান মিজু। মধুপুর বাজার, ঝিনাইদহের ‘মেসার্স এম আর এন্টারপ্রাইজ’-এর স্বত্বাধিকারী। যাঁর জীবনের গল্প বলতে গেলে লিখতে হয় একটি উপন্যাস! বন্ধন-এর নিয়মিত আয়োজন ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে এবার এ সংগ্রামীর জীবনের উত্থান-পতনের গল্প। সঙ্গে ছিলেন আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির আঞ্চলিক বিপণন কর্মকর্তা মো. মোহন রায়হান।

ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের জন্ম ১৯৬০ সালে ৭ আগষ্ট ঝিনাইদহ সদরের ইস্তেফাপুর গ্রামে। পিতা মরহুম কাওসার উদ্দীন শেখ ও মা মরহুমা হাজেরা বেগম। ঝিনাইদহ ওয়াজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর জড়িয়ে পড়েন ব্যবসায়। ভুসিমাল দিয়ে ব্যবসার শুরু। পরে যুক্ত হন ধান ও পাটের ব্যবসায়। এরপর জড়িয়ে যান সার ও কীটনাশকের ব্যবসায়। অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা ও ব্যবসায়ী কৌশল দিয়ে সহজেই আয়ত্ত করেন ব্যবসাকে। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে এক বন্ধুর সঙ্গে জড়িয়ে যান ঠিকাদারির কাজে।  কয়েক বছর বেশ কটি নির্মাণকাজে যুক্ত থাকলেও সততার কারণে তেমন মুনাফা করতে পারেননি। এমনকি প্রায় ৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয় এ ব্যবসায়। এমন ক্ষতিতে মুষড়ে পড়েন তিনি। তবুও দমে না গিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে উদ্যোগী হন নিজ ব্যবসায়। ঐকান্তিক চেষ্টায় আবারও গুছিয়ে নেন ব্যবসা; আসতে থাকে মুনাফা।

মুনাফার টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য কেনেন কিছু জায়গা-জমি, যা অবদান রাখে সাংসারিক স্বচ্ছলতায়। এরই মধ্যে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বাবার সংসার থেকে পৃথক হয়ে আলাদা সংসার শুরু করেন। ব্যবসার মূলধন দিয়ে জমি কেনায় শূন্য হয়ে পড়ে হাত। কীভাবে ব্যবসা করবেন; আর কীভাবেই বা সংসার চালাবেন সে পথ তাঁর জানা ছিল না। সহযোগিতার মতো কাউকে তখন পাশে পাননি। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল সর্বসাকল্যে ৮০০ টাকা আর বন্ধুর কাছ থেকে ধার নেন ৫০০ টাকা। এই ১ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে মাত্র কয়েক বস্তা সিমেন্ট কেনেন। তা দিয়েই বাজারে ছোট্ট একটি টিনশেড দোকানে নতুন করে শুরু করেন সিমেন্ট ব্যবসা। বাজারও ছোট, তাই পণ্য বিক্রি হতে সময় লাগত বেশ। তবুও তিনি ধৈর্যহারা হননি। সিমেন্ট শেষ হলে আরও বেশি বেশি সিমেন্ট কিনতেন। এভাবে ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিসর আর নিজের দুরবস্থা কাটিয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন স্বাবলম্বী। পরে যুক্ত হন রড ও সেনেটারি সামগ্রীর ব্যবসায়।

মধুপুর বাজার মূলত গ্রাম্য বাজার। সেখানে খুব বেশি পণ্য বিক্রি হয় না। এ জন্য তিনি শহরের বিভিন্ন স্থানে পণ্য সরবরাহ করে বিক্রি করা শুরু করেন। গুণগতমান, সুলভ মূল্য, সঠিক ওজনে পণ্য বিক্রি এবং তাঁর ব্যক্তিগত পরিচিতি থাকায় বিভিন্ন স্থানের ক্রেতারা তাঁর কাছ থেকেই পণ্য কিনতেন। ফলে তিনি নির্মাণপণ্য ব্যবসায় একজন স্বনামধন্য ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি, ঝিনাইদহ টেরিটরির একজন এক্সক্লুসিভ রিটেইলার। কীটনাশকসহ অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও তিনি অনন্য। সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে ফ্রিজ, এলইডি টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ক্রোকারিজ সামগ্রী, নগদ টাকাসহ পেয়েছেন অনেক উপহার। এ ছাড়া ঘুরে এসেছেন থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভারত। রয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অফার।

ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বিয়ে করেন ১৯৮৫ সালে। সহধর্মিণী মোছা. রাফেজা বেগম। এ দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে মাকসিমা আক্তার মিনা বিবাহিত। ছেলে রিয়াজুল করিম সজীব ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজে মাস্টার্স পড়ছে, পাশাপাশি ব্যবসা দেখাশোনা করে। মধুপুর বাজার কমিটির বর্তমান সেক্রেটারি সফল এ ব্যবসায়ী।

৩৬ বছরের ব্যবসায়িক জীবন তাঁর। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজ একজন সফল ব্যবসায়ী হলেও জীবনের অনেক কঠিন পরীক্ষা তাঁকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে। তবু তিনি কখনো লোভ করেননি। কারণ, তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন সফলতা পেতে সর্বাগ্রে দরকার আত্মার শুদ্ধতা; হতে হবে সৎ। তখন সারের ব্যবসায় যুক্ত। নওয়াপাড়া, যশোরে যান সার কিনতে। একটি মোকাম থেকে ৮০ বস্তা ইউরিয়া সার কিনেন। কিন্তু মোকামের ম্যানেজার ভুল করে ১৬০ বস্তার ভাউচার (ডিও) দেন। তখন তিনি বিষয়টি খেয়াল না করলেও যখন গাড়িতে মাল তোলেন তখন বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি মাল না নিয়ে মোকামে ফিরে ভাউচারটি ম্যানেজারকে দেখিয়ে ভুল ধরিয়ে দেন। ম্যানেজার তাঁর এমন সততায় অত্যন্ত খুশি হন। প্রতিশ্রুতি দেন সব ধরনের সহযোগিতার। এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে তাঁর ব্যবসায়িক জীবনে। তিনি কখনো কারও ক্ষতি করেননি, তার প্রতিদানও পেয়েছেন। গ্রাম্য কোন্দলের বলি হয়ে অনেকবার বিপদে পড়েছেন; জীবন পড়েছে সংশয়ে। কিন্তু প্রতিবারই আল্লাহর রহমতে বেচেঁ গেছেন। কেউই তাঁর ক্ষতি করতে পারেনি। চিরদিন ন্যায়ের পথে চলা এই মানুষটি বাকি জীবনটাও এ নীতিতেই চলতে চান। তার এ পথচলা সুগম হোক, বন্ধন-এর চাওয়াও সেটিই।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

মাহফুজ ফারুক
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top