সুমিষ্ট খেজুরের রস আর সুস্বাদু গুড়ের জনপদ যশোর। পরিচয়ের শেষ এখানেই নয়। দেশের সবচেয় বড় স্থলবন্দর বেনাপোলের অবস্থান এ জেলাতেই। উপযুক্ত আবহাওয়ার দরুন এখানে চাষ হয় উৎকৃষ্ট মানের বাহারি সব ফুল। দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ফুলের গ্রাম গদখালী, দেশের চাহিদা মিটিয়ে যেখান থেকে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বর্ণিল সব ফুল। আর এসব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল যশোর জেলার শার্শা উপজেলা। এ উপজেলার ছোট্ট শহর নাভারন। এ শহরের নতুন বাজারের মেসার্স কে এন এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মো. আশরাফুল ইসলাম খোকা এলাকার একজন সফল নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী। বন্ধন-এর ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বের এ সংখ্যার সফল মুখ তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের আঞ্চলিক বিক্রয় কর্মকর্তা মো. ওয়ালিদুর রহমানের সহযোগিতায় জানাব তাঁরই সাফল্যগাথা।
ব্যবসায়ী খোকার জন্ম ১৯৭৭ সালের ৭ ডিসেম্বর, যশোর জেলার শার্শা থানার একঝালা গ্রামে। পিতা মরহুম লুৎফর রহমান এবং মা মোছা. হাসিনা বেগম। ১৯৯৪ সালে শার্শা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক পড়াকালীন জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান মালয়েশিয়া। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে জড়িয়ে যান পরিবহন ব্যবসায়। নির্মাণপণ্য ব্যবসার শুরু ২০০১ সালে। প্রাথমিক পর্যায়ে রড, সিমেন্ট ও ঢেউটিন দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পর্যায়ক্রমে যুক্ত হন ইট, খোয়া, প্লেইনশিট, ফ্লাটবার, অ্যাঙ্গেল, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলা এবং হার্ডওয়্যারসামগ্রী ব্যবসায়।
ব্যবসায়ী খোকা স্বল্প পুঁজি এবং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই যুক্ত হন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। মাত্র ২০০ ব্যাগ সিমেন্ট, এক গাড়ি রড আর কিছু ঢেউটিনই ছিল তাঁর শুরুর ব্যবসায়িক পণ্যসম্ভার। এতদ্্সত্ত্বেও পণ্যগুলো কয়েক দিনেই বিক্রি করেন তিনি। এমন সাফল্যে উৎসাহ পান আরও অধিক পণ্য সংস্থানে। ক্রমেই বাড়তে থাকে বেচাকেনা আর ব্যবসার পরিসর। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি অত্র অঞ্চলের অন্যতম সেরা নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। ন্যায্য দামে গুণগতমানের পণ্য পাওয়ায় দূর-দূরান্তের ক্রেতারা ভিড় করতে থাকেন তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। আকিজ সিমেন্টের সূচনালগ্ন থেকেই সিমেন্ট বিক্রির সঙ্গে জড়িত তিনি। প্রতিনিয়ত বিক্রি করছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পণ্য। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানির নাভারন টেরিটরির বার্ষিক সর্বোচ্চ বিক্রেতা তিনি। অন্যান্য পণ্য বিক্রিতেও তিনি অনন্য। বিএসআরএম, এসসিআরএম ও একেএস স্টিলসহ দুটি সিমেন্ট কোম্পানির স্থানীয় পরিবেশক তিনি। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য বিক্রির সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন কোম্পানি কাছ থেকে পেয়েছেন মোটর সাইকেল, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, ডিজিটাল ক্যামেরা, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ নানা উপহারসামগ্রী। সুইজারল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ অফার নিয়মিত পান। এ ছাড়া কোম্পানির দেওয়া সব ধরনের অফার তিনি সহজেই জিতে নেন।
ব্যবসায়ী খোকা নির্মাণপণ্য ব্যবসায় সফলতা অর্জন করলেও অত্র অঞ্চলে তেমন পরিচিত ছিলেন না। গ্রাম থেকে শহরে এসে ব্যবসায় পসরা সাজান। এলাকার অপরিচিত মুখ হলেও নিজের কৌশল, সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকেই তিনি ক্রেতার চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ব্র্যান্ড ও মানসম্মত পণ্যেরও ব্যাপারে তিনি আপসহীন, ক্রেতা চাহিদা মাথায় রেখেই করেন নিজ ব্যবসা। এমন ব্যবসায়িক নীতির কারণে কঠিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ এ বাজারে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা করছেন তিনি। প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে তাঁর রয়েছে সুসম্পর্ক। প্রতিশ্রুতি বজায় রাখায় কখনোই পণ্য পেতে বেগ পেতে হয়নি। ব্যবসার এমন ধারাবাহিক উন্নয়নে যশোরের শার্শা, নাভারন ও বেনাপোলে একটি করে শোরুম ও ছয়টি গোডাউন স্থাপন করেছেন। এসব ব্যবসায় জড়িয়ে আছে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার। এদের সবাইকে তিনি নিজের পরিবারের সদস্যই মনে করেন।
ব্যবসায়ী খোকা বিয়ে করেছেন ২০০০ সালে। সহধর্মিণী নার্গিস পারভীন। এ দম্পতির দুই যমজ ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে আনিশা তাসনিম অর্পি আকিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। যমজ ছেলেদের একজন অমিত হাসান অমি এবং অন্যজন অনিকুজ্জামান অনিক নাভারন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। ব্যবসায়িক ব্যস্ততা সত্ত্বেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই খুঁজে পান আসল সুখ। বছরে দু-একবার তাদের নিয়ে বেড়াতে যান দেশের নানা প্রান্তে। এলাকায় সেবামূলক ও ধর্মীয় কাজেও রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি।
বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের ব্যবসায়িক স্বর্গরাজ্য নাভারন। প্রতিনিয়তই বাড়ছে এ জনপদের ব্যবসায়িক পরিসর ও সম্ভাবনা। আর এ সম্ভাবনার সদ্ব্যবহার করতে বৃহৎ পরিসরে টাইলস ও হার্ডওয়্যার ব্যবসার পরিকল্পনা রয়েছে ব্যবসায়ী খোকার। বর্তমান ব্যবসার সাফল্য তাঁকে নতুন ব্যবসা শুরুর সাহস জোগায়; করে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত। তাঁর এ অভিপ্রায় দ্রুতই বাস্তবায়িত হোক; বন্ধনও চায় তেমনটিই।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮২তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭।