লাউকাঠি, লোহালিয়া, আন্ধারমানিক, পায়রাগঞ্জ, তেঁতুলিয়া, পাঙ্গাশিয়া, আগুনমুখা নদী বয়ে চলেছে পটুয়াখালীর বুক চিরে; মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব নদী দেখে মনে হবে এই তো নদীমাতৃক বাংলাদেশ! নদীতে ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার, জাহাজ ও লঞ্চের অবাধ বিচরণ দেখেই অনুমান করা যায় এ জনপদের মানুষ নদীর ওপর কতটা নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের কোলে গড়ে ওঠা দক্ষিণা জেলা পটুয়াখালী খ্যাতি সাগরকন্যা হিসেবেও। দক্ষিণের এ জনপদের সফল একজন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়ী মো. কৌশিক আহমেদ কামাল বিশ্বাস। শহরের নতুন বাজার, লাউকাঠি খেয়াঘাট এলাকায় অবস্থিত মেসার্স রাণী বিশ্বাস এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী তিনি। আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের এরিয়া ইন-চার্জ মো. সাইফুল ইসলামের সহযোগিতায় এবারের ‘সফল যাঁরা কেমন তাঁরা’ পর্বে থাকছে সফল এ ব্যবসায়ীর ব্যবসা ও পারিবারিক জীবনের গল্প।
ব্যবসায়ী কামাল বিশ্বাসের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮২, পটুয়াখালী শহরের নতুন বাজারে। বাবা মরহুম মো. সিরাজুল হক বিশ্বাস ও মা মরহুমা রাণী বিশ্বাস। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়। পটুয়াখালী লতিফ মিউনিসিপ্যাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বনে যান পুরোদস্তুর এক ব্যবসায়ী। বংশপরম্পরায় তাঁরা ব্যবসায়ী। বাবার ছিল তেল মিলের ব্যবসা। নিজের ব্যবসার হাতেখড়ি একই ব্যবসায়। বছর কয়েক পরে একই সঙ্গে শুরু করেন স মিলের ব্যবসা। পাশাপাশি চলতে থাকে ঠিকাদারি। ২০০০ সালে বড় ভাই মো. মাসুদ বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হন নির্মাণপণ্য ব্যবসায়। প্রায় পাঁচ বছর পর আলাদা হয়ে শুরু করেন একক ব্যবসা। বর্তমানে বাজারে রয়েছে তাঁর একটি শোরুম ও তিনটি গোডাউন। এ ছাড়া তিনি সরকারি ওএমএস চালের স্থানীয় পরিবেশক।
পটুয়াখালীর নতুন বাজার, লাউকাঠি খেয়াঘাট আদতে একটি ব্যবসাপল্লী। অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও নির্মাণপণ্যের আধিক্যই চোখে পড়ে। আসলে বাজারটিই গড়ে উঠেছে লাউকাঠি নদীর পারে। নদীপথে পণ্য আনা-নেওয়ার সুবিধার্থেই গড়ে ওঠেছে এ বাজার। দূর-দূরান্তের মানুষেরা খুচরা বা পাইকারি পণ্য কিনতে এ বাজারেই ভিড় করে। তাই এখানকার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা উপলব্ধি করেই ব্যবসায়ী কামাল বিশ্বাস এ বাজারেই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠাও এ এলাকাতেই। এলাকার সবাই তাঁর পরিচিত হওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণে বেশ সহায়ক হয়েছে। ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি পণ্য বিক্রি করেন। তাদের গুণগতমানের পণ্য কিনতে আগ্রহী করে তোলেন। চেষ্টা করেন কম মূল্যে এবং সঠিক ওজন নিশ্চিত করে পণ্য বিক্রি করতে।
ব্যবসায়ী কামাল বিশ্বাস বর্তমানে আকিজ সিমেন্ট কোম্পানি ও কেএসআরএম স্টিলের একজন ডিলার। তাই খুচরা বিক্রির পাশাপাশি পরিবেশক হিসেবে পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে অব্যাহত রয়েছে তাঁর আপ্রাণ চেষ্টা। জেলার বিভিন্ন নির্মাণপণ্যের দোকানে যান, তাঁদের পণ্য বিক্রির ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলেন। কোনো সমস্যা থাকলে সমাধানের চেষ্টা করেন। এ ছাড়া ফোনে খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং যাবতীয় ব্যবসায়িক কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন ম্যানেজার গৌতম দাস। এ ছাড়া কোম্পানির অফিসাররাও বাজার সম্প্রসারণে নানাভাবে সহায়তা করে। এভাবেই অর্জিত হয় তাঁর বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা। সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ কোম্পানির কাছ থেকে পেয়েছেন টেলিভিশন, ল্যাপটপ, ডিনার সেট, মোবাইল, ঘড়ি, ডিভিডি প্লেয়ার, নগদ টাকাসহ নানা উপহার। এ ছাড়া সুযোগ ছিল সুইজারল্যান্ড, চীন, থাইল্যান্ড, নেপাল ভ্রমণের। সময়ের অভাবে সব জায়গায় যেতে না পারলেও ঘুরে এসেছেন নেপাল।
ব্যবসায়ী কামাল বিশ্বাস বিয়ে করেন ২০১২ সালে। স্ত্রী মোছা. শিরিন আক্তার। সারা দিন ব্যবসায়িক ব্যস্ততা থাকলেও চেষ্টা করেন পরিবারকে সময় দিতে। অবসরে টেলিভিশন দেখেন। কিছুটা সময় পেলেই ঘুরতে যান কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে। এ ছাড়া রাঙামাটি, বান্দরবান, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিন, সিলেটসহ দর্শনীয় জায়গায় ঘুরেছেন সস্ত্রীক। খাবার মধ্যে তাঁর পছন্দের তালিকায় রয়েছে গরুর মাংস, খিচুড়ি ও বিরিয়ানি। তিনি পটুয়াখালী জেলা চেম্বার অব কমার্স এবং বাজার দোকান মালিক সমিতির সম্মানিত সদস্য। এ ছাড়া বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসার সঙ্গেও তিনি জড়িত। তাঁর ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৩০ জন কর্মচারী।
লাউকাঠি খেয়াঘাট বাজার নির্মাণপণ্য ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র হলেও এখানকার ব্যবসার প্রকৃতি বেশ জটিল। কারণ, এখানে বাজারের পরিসরের তুলনায় পণ্যের পরিবেশকের সংখ্যা অধিক। ফলে অসম প্রতিযোগিতা করেই তাঁকে এখানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে বকেয়া বিক্রির অনাদায়ী টাকা আদায় করা খুবই কঠিন। এমনকি হালখাতা করেও টাকা ওঠানো যায় না। তবুও তিনি তাঁর ব্যবসায়িক কৌশল এবং নিজের সততা, মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬