কন্টেইনার স্থাপত্য: আধুনিক স্থাপত্যে অতিমাত্রা

শুনতে অবাক লাগলেও কন্টেইনার আর্কিটেকচার কিন্তু স্থাপত্য জগতে নতুন কিছু নয়। চোখ বন্ধ করেই বলে দেওয়া যায় এ শব্দের মানে। এই স্থাপত্যকর্মে বিশ্ব যতটা এগিয়েছে, যত রকমের কাজ হয়েছে বা এক্সপেরিমেন্ট চলেছে, তা আর কোনো স্থাপত্য নিয়ে হয়েছে কি না সন্দেহ! কন্টেইনার আর্কিটেকচার হলো স্থাপত্যের সেই শাখা, যেখানে শিপিং কন্টেইনারের স্টিল স্ট্রাকচার নিয়ে কাজ হয়। ব্যবহৃত কন্টেইনারগুলো সাধারণত জাহাজে পণ্য পরিবহন করার পর ফেলে দেওয়া কিংবা একেবারে নতুন কন্টেইনারকে কাজে লাগিয়ে এর বিভিন্ন রকম পরিবর্তন এনে একে নান্দনিক রূপ দেওয়া হয়। একে কার্গোটেকচার নামেও অভিহিত করেন অনেকেই। কার্গোটেকচার শব্দটা মূলত কার্গো আর আর্কিটেকচার, এই শব্দ দুটির সমন্বয়ে গঠিত। মোট কথা করোগেটেড স্টিল স্ট্রাকচারকে সুনিপুণ হাতে বসবাস বা অফিস স্পেস হিসেবে কাজে লাগানোই কন্টেইনার আর্কিটেকচারের মূল কথা।

জাহাজে করে যেসব কার্গো বিভিন্ন দেশ থেকে মালামাল নিয়ে আসে, তা হয় খুবই মজবুত। এ কারণেই এটা দিয়ে আর্কিটেকচার করাটা এত বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে গত কয়েক দশকে। এর জনপ্রিয়তার আরও একটা কারণ কন্টেইনারের সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়া। এখন দেখা যাচ্ছে বিশ্বের নানা জায়গায় এই কন্টেইনার দিয়েই বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এভাবে নির্মিত বাড়িগুলো পরিবেশবান্ধবও। ইট বা সিমেন্টের তুলনায় এগুলোর ইকোলজিক্যাল ক্ষতি অনেক কম। বানাতে যে শক্তি খরচ হয় তা শুধু মাল পরিবহনই নয়, পরে বাড়ি বানানোর কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে অনেক কম শক্তি খরচেই। এ কারণে স্থপতিদের কাছে কন্টেইনার আর্কিটেকচার ধীরে হলেও পেয়েছে এত জনপ্রিয়তা।

শক্তিমত্তা ও স্থায়িত্ব

শিপিং কন্টেইনারগুলো অনেক দিক থেকেই অধুনা বিল্ডিং ম্যাটেরিয়েলসের চেয়ে অনেক বেশি আদর্শস্থানীয়। এগুলো এমনভাবে বানানো যেন তা বেশি ভার বহন করতে পারে। মাঝসমুদ্রে প্রায়ই ঝড় ওঠে। ভয়াবহ ঝড়ের মধ্যে পড়েও মালামালসহ যেন জাহাজটি অক্ষত থাকে, সে জন্য এটি বানানো হয় এয়ারটাইট করে। ভারবাহী হওয়ায় এতে থাকে না কোনো খুঁত। এ কারণেই মাল পরিবহন শেষে বাসাবাড়ির কাজে এটিকে ব্যবহার করেন অনেকেই। বাড়ির বাসিন্দাদের দেখাদেখি স্থপতিরাও আগ্রহী হন এটি নিয়ে কাজ করতে। এরপরই নির্মাণে শুরু হয় অন্য ধরনের এক বিপ্লব। যার ফল আমরা দেখছি বিশ্বের নানা প্রান্তে সৃষ্ট কার্গোটেকচারে।

মডিউল

শিপিং কন্টেইনার প্রায় সবগুলোই দৈর্ঘ্য-প্রস্থে দুই রকমের হয়। সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য হয় ৪৫ ফুট পর্যন্ত। এর ব্যবহৃত ডিজাইন খুব সাধারণ হয়, যাতে ঘটে সৌন্দর্যের প্রকাশ। অনেক সময় অনেক কন্টেইনার একসঙ্গে যুক্ত করে ডিজাইন করা হয়। যাতে স্ট্রাকচার বিশালাকৃতি ধারণ করে। আবার একই আকারের কারণে একটা সুন্দর প্রোটোটাইপ ডিজাইন তৈরি হয়, যখন সুন্দর একটা স্ট্রাকচার তৈরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

কন্টেইনার আর্কিটেচার করতে গেলেই কন্টেইনার কাটা ও ওয়েলডিংয়ের জন্য দক্ষ জনবলের দরকার। এ ক্ষেত্রে  বিশাল এক শ্রমবাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়। এটি দিয়ে কনস্ট্রাকশন করতে গেলে শ্রমবাজারে অন্য ধরনের শ্রমিকশ্রেণি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়, যা বিশ্ববাজারে যেকোনো দেশের শ্রমবাজারে শ্রমিকদের মান উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কন্টেইনার আর্কিটেকচার অনেক কম সময়ে তৈরি করা সম্ভব। ফলে এটা থেকে খুব সহজেই মুনাফা পাওয়া যায়।

কন্টেইনার আর্কিটেকচারে ব্যবহৃত কন্টেইনারগুলো পরিবহনের কাজে মূলত বড় ট্রাক বা রেলে ব্যবহৃত হয়। জাহাজের মাল খালাস হয়ে গেলেই এগুলো প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে অচল হয়ে পড়ে। তখন এগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য শিপইয়ার্ডে নেওয়া হয়। একদম চকচকে নতুন কন্টেইনারের দাম ১ হাজার ২০০ ইউএস ডলার (৯,৩৬,০০০ টাকা) বা এর কাছাকাছি। ব্যবহারের পর সাফসুতরো করে এর কাছাকাছিই দামে রিকন্ডিশন কন্টেইনার কেনা যায়।

তবে এই কন্টেইনার আর্কিটেকচারের আছে কিছু অসুবিধাও। প্রথমত, পরিবেশের বাড়তি উত্তাপে উত্তপ্ত হয় সহজেই। উত্তপ্ত অবস্থায় বেশ প্রসারিত হয়। উঠে যায় রঙের প্রলেপ। খুব দ্রুত প্রসারণশীল বলে অনেক সময় এগুলো অতিরিক্ত চাপে ও তাপে বেঁকে যেতে পারে। আবার বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয় যদি ঠিকমতো খেয়াল রাখা না হয়। তদুপরি বড় স্পেস তৈরি করাটা একটু খরচে ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকমতো কাটা যায় না এর করোগেটেড সার্ফেসের জন্য। এগুলোর একটা নির্দিষ্ট মাপ আছে। সেটা ২০ থেকে ৪০ ফুট মাত্র। তাই এগুলো দিয়ে বাঁকানো ধরনের ফ্লেক্সিবল ডিজাইনও করা যায় না। আবার প্রচণ্ড শীত ও বর্ষায় স্টিলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে না পারলে ঘরের ভেতরকার জিনিসপত্র দ্রুতই নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। আর্দ্রতার তারতম্য ঠিক না করলে জং ধরে যায় স্টিলে। এতে ইন্টেরিয়র স্পেসগুলো যেমন- সিলিং বা পর্দা নষ্ট হতে শুরু করে। আবার বিশাল আকৃতির হওয়ায় ক্রেন ছাড়া এগুলোকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানো যায় না। ইট, বালু, সিমেন্ট সাধারণ শ্রমিকেরাই বহন করতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কন্টেইনার আর্কিটেকচার বেশ ব্যয়বহুল। এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো কন্টেইনারের চারপাশ খুব শক্ত ও মজবুত হলেও এর ছাদ বেশ নরম। মাত্র ৩০০ কেজি লোড নিতে সক্ষম। তাই তিন বা চারতলার বেশি উচ্চতার ডেড লোড ও লাইভ লোড এটি নিতে পারে না। অনেক সময় বিশালাকার জাহাজে করে মাল পরিবহনের সময় এগুলোর ছাদ ড্যামেজ হয়, যা ওয়েলডিং ছাড়া ঠিক করা সম্ভব নয়।

এত সব সমস্যার পরও কিন্তু একটুও থেমে নেই কন্টেইনার আর্কিটেকচারের জয়যাত্রা। কন্টেইনার আর্কিটেকচার প্রথম কে শুরু করেছিলেন? এটা নিয়ে একটা বড় ধরনের প্রশ্ন আছে। কার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এই আইডিয়া প্রথম বেরিয়েছিল? জানতে ইচ্ছে হলেই ফিরতে হবে পেছনে। ফিউচারিস্ট স্ট্যুয়ার্ট ব্র্যান্ড একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন। বিষয় ছিল ‘কীভাবে বাড়িঘর বানানো শেখা যায়’। তিনি লেখালেখিতেই প্রথমবার কন্টেইনারকে ঢুকিয়ে দেন সোজা অফিস স্পেস হিসেবে।

২০০৬ সালে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার স্থপতি পিটার ডি মারিয়া প্রথমবারের মতো দোতলা বাড়ি ডিজাইনের অংশ হিসেবে কন্টেইনারের ব্যবহার শুরু করেন। এখানে আবার নিয়মকানুন বড়ই কড়া। আমাদের দেশের মতো নিয়মকানুনে এতটা শৈথিল্য নেই। তাই নিয়ম মেনে ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে একেবারে গ্যারান্টি দিয়েই তবে সেই ডিজাইনখানা করতে পেরেছিলেন। ইউবিসির কোড অনুযায়ী সেই ডিজাইন আরবান সিটি ম্যানেজমেন্টের আন্ডারে কনস্ট্রাকশনকৃত কন্টেইনার সিটিতে-১-এ অবস্থিত। এই কোম্পানিটি পরে আরও অনেক বাড়ির কাজে কন্টেইনারকে ব্যবহার করেছে। ২০০৬ সালে ডাচ্ কোম্পানি টেম্পোহাউজিং আমস্টারডামে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কন্টেইনার হাউজিংয়ের কাজ শেষ করে। এই হাউজিংয়ে এক হাজার শিক্ষার্থী থাকার মতো জায়গা তৈরি করা হয়।

২০০২ সালে আইএসও শিপিং কন্টেইনার স্ট্যান্ড এলোন শিপিং কন্টেইনারগুলোকে পানি পরিশোধনাগারের কাজে লাগাতে শুরু করে, যা ছিল ব্যবসা-সহায়ক মজবুত ও কম সময়ক্ষেপণকারী প্রক্রিয়া। এখানে অতিরিক্ত বাসা নির্মাণের জন্য কন্টেইনারগুলোকে কাজে লাগানো হয়েছিল। ব্রায়ান ম্যাকার্থি নামের মেক্সিকান এমবিএর শিক্ষার্থী নিজের চোখে দেখেছিলেন গরিব মানুষের থাকার জায়গার বড্ড অভাব। এই জায়গাটা ছিল কুইদাদ জুয়ার্জ শহরে। মেক্সিকোর এই শহরে ব্রায়ান কন্টেইনার হাউজিং প্রপোজ করে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন, যেগুলো গরিব মেক্সিকান শ্রমিকদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০১০ সালে জার্মান স্থপতি স্টিফান বিইজ ছয়টি ৪০ ফুট দীর্ঘ শিপিং কন্টেইনারকে কাজে লাগিয়ে একটা বিশালাকৃতির ডেক ডিজাইন করেন ভিআইপিদের জন্য। এটি ছিল স্কাফোল্ডিং স্ট্রাকচারের, যার নাম ভুডু মিউজিক এক্সপেরিয়েন্স। একটু ভুতুড়ে শোনালেও এটা খুব খ্যাতি অর্জন করেছিল এর বাহিক্য সৌন্দর্যের জন্য। অক্টোবর ২০১৩ সালে গুগল প্রথমবারের মতো তাদের সুপারস্ট্রাকচারে কন্টেইনারের ব্যবহার করে। এর পরপরই কন্টেইনার আর্কিটেকচার বিশ্বজুড়ে রাজত্ব শুরু করে বহুল প্রচারে।

জো সলভো পার্কের কন্টেইনার দোকান। মোবাইল কোম্পানির জন্য এটি দীর্ঘস্থায়ী কমদামি দোকান। অবস্থান দক্ষিণ আফ্রিকায়। যুক্তরাষ্ট্রে খালি কন্টেইনার দিয়ে মূলত মার্কেট বা দোকান বানানো হয়। কেননা এগুলো উত্তাপ পেলে দ্রুতই গরম হয়। ইউরোপের ইউক্রেনে সবচেয়ে বড় শপিংমল ৬৯ হেক্টর জমির ওপর অবস্থিত, যেটা ওডেসার সেন্ট্রাল পার্ট থেকে শুরু হয়ে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। এটাকে তলচক নামে ডাকেন অনেকে। তবে অফিশিয়াল নাম সেভেন্থ কিলোমিটার মার্কেট। এতে আছে ১৬ হাজার দোকানদার ও তাঁদের কর্মচারী। আছে ১ হাজার ২০০ সিকিউরিটি গার্ড ও ওয়ার্কার। এর সম্পূর্ণটাই কিন্তু কন্টেইনার দিয়ে বানানো। সারি সারি কন্টেইনার বসানো। এতেই গড়ে উঠেছে বিশাল বাজার। দেখলে আপনি নিশ্চিত হাঁ করে তাকিয়ে থাকবেন। মধ্য এশিয়ায় কিরঘিজস্তানের দরদর বাজারখানি পুরোটাই বিশাল কন্টেইনারের জঙ্গল। দোতলা সেই বাজারে কী নেই? কম দামে কি কিছু কিনতে চান? চলে যান দরদর বাজারে। ওখানে কাজাখস্তান ও রাশিয়া থেকেও পর্যটকেরা কমদামে পণ্য কিনতে আসেন।

২০১১ সালে বিশাল ভূমিকম্প হয় নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে। ওদের ক্যাসেল মলটি ভেঙে চুরমার হলো। কিন্তু এক মাস পরেই আবার শুরু হলো কেনাকাটা। এবার আর কর্তৃৃপক্ষ ভুল করল না। কংক্রিটের বদলে বানিয়ে ফেলে কন্টেইনার বাজার। আর ভয় কি! সবাই মিলে ফিরে গেলেন আসল কাজে, সেই পুরোনো ব্যবসায়। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে স্টারবাক্স কফির মতো বিখ্যাত কোম্পানি তাদের স্টোরেজ করেছে কন্টেইনারে, যা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। জলে-ঝড়েও নেই কোনো ক্ষতির আশঙ্কা। আছে শুধু অফুরন্ত মুনাফা। ব্যবসায়ীরা তো এই সুযোগটা নেবেনই।

কয়েক মাস আগে মে ২০১৫ সালে টেসলা মোটর কোম্পানি ঘোষণা দিল ওরা ওদের মোবাইল হোমে পুরো এশিয়া ও ইউরোপ ঘুরবে পণ্য নিয়ে। আর সেই মোবাইল হোম যে কন্টেইনার হোম, তা আর ওদের বলে দিতে হয়নি। ওরা নিজেরাই ডিজাইন করেছে ওগুলো।

কন্টেইনার আর্কিটেকচারের বিবর্তন

কন্টেইনার মূলত তিন ধরনের হয়। ছাদ খোলা কন্টেইনার, পাশ খোলা কন্টেইনার আর ফ্রিজিং কন্টেইনার। মূলত পাশ দিয়ে খোলে এমন কন্টেইনারগুলো দিয়ে আর্কিটেচারের কাজ হয়। এগুলোর উপরিতল কিছুটা বেশি ভার বহনে সক্ষম। এ কারণে এগুলোকে বেছে নিয়েছেন স্থপতিরা। সেই প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত কন্টেইনার আর্কিটেকচারের ইভোলিউশনগুলো খেয়াল করলে দেখা যাবে এর রয়েছে কিছু ধাপ, যা ছবিতে দৃশ্যমান। 

এভাবে ধাপে ধাপে কনসেপচুয়াল ইউজ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে স্থপতিরা কন্টেইনার আর্কিটেকচারকে উন্নত করেছে। একে কাজে লাগিয়েছেন। যাঁরা ভাবছেন কন্টেইনার দিয়ে এলিভেশন ট্রিটমেন্ট সম্ভব না, তাঁদের নিয়ে যাব অন্য রকম কিছু প্রজেক্টে। আসুন, একে একে দেখি কিছু ভালো প্রজেক্ট, যেগুলো কন্টেইনার নিয়ে বেশ সাহসী কাজ করেছে। দেখুন কীভাবে কন্টেইনার দিয়ে পুরো বাড়িটাই বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যেখানে কন্টেইনার দেখাই যাচ্ছে না নির্মাণের পরও। টোকিওতে লট এক আর্কিটেক্টসের করা ডিজাইনটি দেখে বিস্মিত না হয়ে পারবেন না। এই কন্টেইনারখানি মাথায় ভেঙে পড়বে না। একটি ছায়া সৃষ্টির জন্য একে জোড়া লাগানো হয়েছে। এতে বিল্ডিং সাইনেজও লেগেছে আবার এন্ট্রির কাজেও ব্যবহার করা হয়েছে।

২০০৯ সালে স্লোভেনিয়ার একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছাত্রদের জন্য একটা টেম্পোরারি শেড ছিল। তাতে বাচ্চাদের জন্য একটা আলাদা ভবনের দরকার হলো। তখনই ডাক পড়ল কন্টেইনার স্থপতিদের। তাঁরা এসে ডিজাইন করে দিয়ে গেলেন এটিকে। তাতে বাচ্চাদের পুরো ক্লাসরুম ঢুকে গেল নিমেষেই। আর্কিটেক্ট ছিলেন জ্যুও কোটনিক আর এন্ড্রেজ কোটনিক। এখনো ওখানে বাচ্চাদের ক্লাস হয় নিয়মিত।

রুফটপে কন্টেইনার

হালকা ওজনের কারণে বহুতল ভবনগুলোর ছাদের কন্টেইনার বসিয়ে তাতে বসবাস করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে ইদানীং। এতে গার্ডেনিংয়ের শখও পূরণ হচ্ছে কারও কারও। আবার ব্যাচেলর হোমও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ছবিটি এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিংয়ের ছাদের। দেখেছেন কী সুন্দর এটি! আপনার ঘরে ভালো লাগছে না? নদীতে বসবাস করতে চান? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পানির শব্দ শুনতে চান? তবে একটা নৌকা কিনে তাতে কন্টেইনার জুড়ে দিন। ব্যস হয়ে গেল আপনার ফ্লোটিং হোম।

কন্টেইনার দিয়ে বেশ সুন্দর ইন্টেরিয়র ডিজাইনও করা যায়। ঝকঝকে আর্কিটেকচার বা সুন্দর স্মুথ ফিনিশিং নেই, তবুও দেখতে জবরজং কন্টেইনার বসিয়ে দিন গানের স্টেজে। ব্যস হয়ে গেল সুন্দর একটা ব্যাকস্টেজ আর একটা টেম্পোরারি স্টেজ, যা শো করার জন্য দারুণ উপযুক্ত। সাউন্ড ভাইব্রেশন কমানোর ক্ষমতা যার ফেল্টের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমাদের দেশে তো পাবলিক টয়লেটের কোনো বালাই নেই। কিন্তু এখানে দেখুন কন্টেইনার কেটে কী সুন্দর করেই না টয়লেট বানিয়েছে ওরা। আর সেগুলো হয়ে গেছে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় টয়লেট সিম্বল। এর অবস্থান জার্মানিতে। ডিজাইন করেছে এ এফ এফ আর্কিটেক্টস।

যাঁরা বলেন, কন্টেইনার দিয়ে আর্কিটেকচার করা যায় না, এটা তাঁদের জন্য একটা ভালো উদাহরণ। লন্ডনের নর্থটাউনের এই আর্কিটেকচারখানি কন্টেইনার সিটি-২-এর অন্তর্গত। কী অদ্ভুত সুন্দর এই আর্কিটেকচার! আশা অদূর ভবিষ্যতে এ দেশে কন্টেইনার আর্কিটেকচার দিয়েই আবাসন সমস্যার সমাধানে স্থানীয় স্থপতিরা চিন্তাভাবনা শুরু করবেন। যেসব বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছে হাজারো মানুষ, সেগুলোতে কন্টেইনার বসিয়ে দিলেই এসব দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলোর জীবনমানের পরিবর্তন ঘটাবে। সাধারণ এ পরিবর্তনে ইট-পাথরের বাড়ির প্রয়োজন নেই। কন্টেইনারের লৌহ জীবন এদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে পারবে। বিদেশে যদি সম্ভব হয়, তবে এ দেশেও সম্ভব। বন্যা উপদ্রুত এলাকায় কন্টেইনার হোম হতে পারে এক ও একমাত্র সফল সমাধান, যা ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে মানুষকে রক্ষার পাশাপাশি প্রচণ্ড চাপ ও তাপে ভেঙে পড়বে না। এমন ধরনের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিবছর লাখ লাখ কন্টেইনার জং না ধরিয়ে কাজে লাগাতে পারি আমরা। সামান্য সদ্দিচ্ছাই যথেষ্ট। জরুরি এখন সদিচ্ছাটাই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখা, অক্টোবর ২০১৫

স্থপতি রাজীব চৌধুরী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top