বাংলাদেশে রাস্তা নির্মাণের সামগ্রী হিসেবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিটুমিন মিশ্রিত নুড়িপাথর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বছর না যেতেই রাস্তাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। এতে যেমন ব্যয় বাড়ে তেমনি জ্বালানি অপচয় হয় বেশি। তাই বিকল্প হিসেবে কংক্রিট দিয়ে যদি রাস্তার কাজটি করা যায়, তবে তা হয় সাশ্রয়ী ও টেকসই।
যদি রাস্তা সংস্কারের প্রয়োজন হয় তবে সম্ভবত দুটি পথ খোলা আছে। একটি কংক্রিট আর অপরটি কালো বিটুমিনের সাহায্যে রাস্তা নির্মাণ। স্বভাবত মনে প্রশ্ন জাগতে পারে কোনটি সবচেয়ে উত্তম? প্রথমেই দেখে নেই এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়। আর তা কতটুকুই বা রাস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভৌত গুণাগুণের পার্থক্য
উত্তপ্ত অবস্থায় এসফেল্টের মিশ্রণ তৈরি হয় এগ্রিগেইট (পাথর, বালু ও গ্রেভেলের মিশ্রণ), তরল এসফেল্ট এবং তেলনির্ভর গ্লু অর্থাৎ যে গ্লু এসবকে ধরে রাখতে পারে। কংক্রিট তৈরির কাঁচামাল হচ্ছে লাইমস্টোন, শিলা আর পানির মিশ্রণ।
রাস্তা তৈরিতে কংক্রিট ও এসফেল্টের ব্যবহার
রাস্তা তৈরিতে এসফেল্ট ব্যবহার করলে পরে সেই রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতে হয় বেশি, যা কংক্রিটের তৈরি রাস্তার ক্ষেত্রে অনেক কম। যে কারণে রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ ও জনশক্তির প্রয়োজন হয় কম। কংক্রিটের রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণ অনেক সাশ্রয়ী।
অনমনীয় কংক্রিট এসফেল্টের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী। এর অর্থ হচ্ছে রাস্তা যদি কংক্রিটের তৈরি হয়, তবে যেখানে-সেখানে গর্ত চোখে পড়ে না। কংক্রিটের তৈরি রাস্তার উপরিভাগ অপেক্ষাকৃত বেশি মসৃণ থাকায় গাড়ি ব্রেক করার পর গাড়ির চাকা পিছলে না গিয়ে গতি থাকে নিয়ন্ত্রিত। যার জন্য গাড়ির চালক ও যাত্রীরা থাকে সুরক্ষিত।
রাস্তা নির্মাণে কাঁচামালের তুলনামূলক ব্যয় চিত্র
কংক্রিটের তৈরি রাস্তার স্থায়িত্ব যেকোনো স্থানে ২০ থেকে ৪০ বছর। কিন্তু যদি এসফেল্ট দ্বারা রাস্তা তৈরি করা হয়, তবে রাস্তার বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ কংক্রিটের তুলনায় হয় চার থেকে সাত গুণ বেশি। এতে দীর্ঘ সময়ের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেঁচে যাওয়ায় তা হবে দারুণ সাশ্রয়ী।
সম্প্রতি আমেরিকার আইওয়া অঙ্গরাজ্যের একটি সংবাদপত্র জানাচ্ছে, ওই এলাকার কংক্রিটে তৈরি রাস্তায় খুব কম রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে গত ৩০ বছরে। কিন্তু এসফেল্ট ব্যবহৃত রাস্তার উপরিভাগ পুনরায় রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়েছে ১৫ বছরের মাথায়। এসফেল্ট দ্বারা রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে সময় লাগে কংক্রিটের তৈরি রাস্তার প্রায় অর্ধেক।
পরিবেশগত পার্থক্য কাঁচামালের ভিন্নতায়
কংক্রিট প্রায় ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। পৃথিবীতে এটিই সবচেয়ে বেশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো নির্মাণের কাঁচামাল। তাই দেশের মাটিকে এই কাঁচামাল দিয়ে ভরাট করার পরিবর্তে এটাকে ভেঙে রাস্তা তৈরি বা অন্য কোনো অবকাঠামো তৈরির কাজে ব্যবহার করাই উত্তম।
এসফেল্ট তৈরিতে প্রায় পাঁচ গুণ ডিজেল জ্বালানি লাগে। আমেরিকার ফেডারেল হাইওয়ে প্রশাসনের ভাষ্যমতে, প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন গ্যালন ডিজেলের খরচ বাঁচানো সম্ভব, যদি এসফেল্টের পরিবর্তে কংক্রিটের রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তাই সহজেই অনুমান করা যায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন গ্যালন ডিজেল জ্বালানির মূল্য কত? এটাই প্রমাণিত হয় কী পরিমাণ জ্বালানি তেল প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে এসফেল্টে রাস্তা নির্মাণে।
যেহেতু সারা বছর কংক্রিটের তৈরি রাস্তা মেরামত করতে হয় কম। সেহেতু কম জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে। যদি জ্বালানি তেলের খরচ কমানো যায়, তবে সম্ভব বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় কমানো। কংক্রিটের তৈরি রাস্তার ওপর ট্রাক বা বাসে যাতায়াত করলে জ্বালানি খরচ কমে। এতে যেমন পরিবহন খরচ একদিকে কম হয়, তেমনি ট্রাক থেকে ধোঁয়াও কম বের হওয়ায় পরিবেশ থাকে ভালো।
কংক্রিটের তৈরি রাস্তা যেভাবে আলো ও বিদ্যুৎ বিলে প্রভাব ফেলে
এটি প্রায় সবারই জানা উজ্জ্বল বা সাদা পোষাকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় কম, বিশেষত গরমের দিনে। গাঢ় রং অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে। একই ব্যাপার রাস্তার নির্মাণসামগ্রীর ক্ষেত্রে। কংক্রিট হালকা ও প্রকৃতগতভাবে আলো প্রতিফলিত করতে সক্ষম। পক্ষান্তরে এসফেল্ট কালো রঙের হওয়ায় অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে। ফলে কংক্রিটে তৈরি রাস্তা ঠান্ডা থাকায় বিদ্যুৎ অপচয় হয় কম। কংক্রিটের তৈরি নির্মাণ স্থানে আলোর প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হয়। অপেক্ষাকৃত হালকা রঙের রাস্তার অভ্যন্তরে আলোর প্রতিফলন হয় ভালো। এতে সহজেই চলাচলরত রাস্তা স্বাভাবিকভাবে দেখা যাওয়ায় আলোর প্রয়োজন পড়ে কম। এ ছাড়া রাতে কংক্রিটের রাস্তায় পার্কিংয়ে কম আলোর প্রয়োজন পড়ে। এতে নিরাপত্তা হয় আরও জোরদার।
নির্মাণসামগ্রী হিসেবে সঠিক কোনটি?
উপরিউক্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাস্তা নির্মাণে কংক্রিটই হচ্ছে নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব। আর তাই কংক্রিটই সঠিক নির্বাচন রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫