রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা

আমাদের অনেক আতংক ও ভীতির মধ্যে ঢাকা শহরের চলমান ট্রাফিক জ্যাম অন্য রকম এক ভীতি সঞ্চার করে, যা একাধারে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই ক্ষতি শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো দেশ ও জাতির। মনে রাখা দরকার, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে দেশটির সার্বিক উন্নতি। তাই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের পুরোভাগেই এসে যায় যাতায়াতব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টি। এতেই নির্মিত অবকাঠামোসমূহের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো কর্মপরিকল্পনাই ফলপ্রসূ হবে না। অপার সম্ভাবনাময় দেশ বাংলাদেশ, শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে ক্রমবর্ধমান বিশ্বে অনেকটাই পিছিয়ে আছি আমরা। গুণীদের মতে, ‘We are not poor, but poorly managed’। সুতরাং, আমাদের প্রতিটি কাজের জন্য সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, সফল বাস্তবায়ন এবং তার সুফল পেতে সার্বিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধন অপরিহার্য।

জনবহুল এই নগরে অসহনীয় ‘ট্রাফিক জ্যাম’ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিদ্যমান কারণগুলোর মধ্যে দুর্বল ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা’ অন্যতম, যা দ্রুত নিরসন করতে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো জরুরি। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ যাতায়াতব্যবস্থা দেশটির আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রসারতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সুতরাং এই ক্ষেত্রটিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কর্তৃক সর্বাধিক নজরদারি নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আজ চরমে পৌঁছেছে। ফলে জনদুর্ভোগ ও জাতীয় অপচয় বেড়ে কোথায় পৌঁছেছে তা নির্ণয় এবং এই অপচয় রোধকল্পে সুচিন্তিত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। এর পেছনেও যথার্থ কিছু কারণ রয়েছে। যেকোনো সমস্যা সমাধানকল্পে সর্বাগ্রে যেটি প্রয়োজন, তা হলো, সমস্যাটি কী? কেন হচ্ছে? কোথা থেকে হচ্ছে? তার বিশদ বিশ্লেষণপূর্বক যথাযথ কারণ নির্ণয় এবং নির্ণীত কারণগুলোর অগ্রগণ্যতা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রতিটি কারণ দূরীকরণার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মনে রাখা দরকার, একটি বিষয়ের উন্নতি করতে তার বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে সময় ও সঙ্গতির সঙ্গে মিলিয়ে নির্দিষ্ট একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আর এই কর্মপরিকল্পনাটি হতে হবে বাস্তবসম্মত এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু ট্রাফিক জ্যামের মতো জনগুরুত্বপুর্ণ এই সমস্যাটি সমাধানকল্পে দৃশ্যত কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাস্তবতার আলোকে বিচার-বিশ্লেষণপূর্বক নির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে তদনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় প্রকৃত অর্থে কোনো সুফল বয়ে আনতে পারছে না। যতই দিন যাচ্ছে ততই সমস্যা বাড়ছে, বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি ও জাতীয় অপচয়। হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার জ্বালানি এবং যানবাহনের কর্মক্ষমতা বা স্থায়িত্ব কমছে, যা বর্তমান বিশ্বে নজিরবিহীন। উন্নত দেশে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ বলতে বোঝায় চলমান গাড়িগুলোর স্বাভাবিক গতি কমে যাওয়া। কিন্তু আমাদের দেশে ‘ট্রাফিক জ্যাম’ হলো নির্বিঘ্ন একটি রাস্তার ওপর গতিশীল যানবাহনগুলো স্থবির হয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা।

এই বিষয়টির ওপর সভা-সেমিনার, লেখালেখি অনেক কিছুই হচ্ছে, হচ্ছে না শুধু সুষ্ঠু কোনো প্রতিকার। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা অনেক প্রবন্ধ পড়েছি, যোগ দিয়েছি এতদ্সংক্রান্ত সভা-সেমিনারে, শুনেছি অনেক ‘টক শো’। নানাজনের লেখা প্রবন্ধ পড়ে এবং আলোচনা শুনে মনে হয়েছে, সবাই সমস্যাটি সমাধানে মূল কারণগুলো অন্বেষণ না করে পুঁথিগত কিছু তথ্য এবং উচ্চাভিলাষী ও কল্পনাপ্রসূত বিষয়ের ওপর আলোকপাত করছে মাত্র, যা বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন প্রচুর অর্থ ও সময়ের। এসব লেখালেখি কিংবা আলোচনায় একই ধারায় তথ্যবহুল এবং কল্পনাপ্রসূত বিষয়গুলোই বারবার তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সমস্যার মূল কারণসমূহ চিহ্নিত এবং সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করার মতো কোনো পরামর্শ আমি অন্তত খুঁজে পাইনি। যদিও তেমন কোনো বিশেষজ্ঞ আমি নই, তা ছাড়া ক্ষুদ্র কর্ম পরিসর আমার। তবুও আমার পাঠ্য বিষয়ের মধ্যে ‘রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিষয়ের ‘ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ অধ্যায় থেকে লব্ধ জ্ঞান এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে সেই নব্বইয়ের দশক থেকে অনেক ভাবনা ভেবেও কিছু করার সুযোগ মেলাতে পারিনি আজ অবধি। তাই আমার অদম্য সেই ভাবনাটির বহিঃপ্রকাশেই এ লেখা।  

গবেষক, লেখক ও আলোচকদের অনেকের আলোচনাতেই আমাদের দেশের জনবসতির তুলনায় রাস্তাস্বল্পতার কথাটি প্রায়ই উঠে আসে, সঙ্গে আসে আরও অনেক তত্ত্বকথা এবং সুদূরপ্রসারী ও মাথা ভারী কিছু পরিকল্পনাও। তাই বলব, ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘Cut your coat according to your cloth’ এই প্রবাদটি বোধ হয় আমরা ভুলে গেছি। নইলে রাস্তাস্বল্পতার পাশাপাশি যে রাস্তা আছে সেটিই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কীভাবে বিদ্যমান সমস্যাটি আংশিক হলেও দ্রুত সমাধান করা যায়, সেই পরামর্শও উঠে আসত। উল্লেখ্য, পরিসংখ্যান বলছে, উন্নত দেশে রাস্তার পরিমাণ তাঁদের জনবসতি এলাকার ২৫ শতাংশের তুলনায় আমাদের দেশে মাত্র ৮ শতাংশ। এই তথ্যটি বিভিন্ন মহলে ধ্বনিত হলেও, তাঁদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক অবস্থার তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায় সেটি কখনোই তুলে ধরা হয়নি। তাই আবারও বলতে হয়, ‘Think globally, act locally’।

বিষয়ভিত্তিক এ রকম লেখা এক প্রবন্ধে পড়েছিলাম, ১ শতাংশ লোককে সুবিধা দিতে গিয়ে ৯৯ শতাংশ লোককে ভোগান্তিতে ফেলা আদৌ সমীচীন নয়, এই উক্তিটির সঙ্গে আমি শতভাগ একমত। অত্র বিষয়টি অবশ্যই আমাদের চিন্তাভাবনায় আনা দরকার। উন্নত বিশ্বে সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার ব্যাপারটি সর্বাগ্রে চিন্তা করা হয় এবং তদনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নার্থে পরিচালিত হয় সার্বিক প্রশাসন ব্যবস্থা। আমাদের দেশে কাগজ-কলমে এ ধরনের কিছু নিয়মনীতি থাকলেও বাস্তব চিত্রটা পুরোটাই উল্টো। সবকিছু নিয়ন্ত্রণকল্পে আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই। ক্ষেত্রবিশেষে আছে অপপ্রয়োগ। কখনো কখনো রক্ষকই ভক্ষক, এ কথা বললেও বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। সুতরাং রাষ্ট্রীয় সুশাসন অর্থাৎ আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারলেই এহেন জনদুর্ভোগ থেকে অনেকাংশেই আমরা নি®কৃতি পেতে পারি, এটা আমার বিশ্বাস। তাই অত্র সমস্যাটি সমাধানকল্পে চিহ্নিত কিছু কারণ এবং তা নিরসনার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুনজর দরকার। ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টির কারণ রাস্তাস্বল্পতা নয়, বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের প্রধান কারণ দুটি: ১. ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, ২. যথোপযোগী অবকাঠামোর অভাব। ফলে, দেশে বিদ্যমান ৮ শতাংশ রাস্তাই যদি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় তবে অন্তত ৫০ শতাংশ ট্রাফিক জ্যাম নিরসন সম্ভব। আর এটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই পরবর্তী পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে এসে যাবে এটাও নিশ্চিত করে বলা যায়। বাকি ৫০ শতাংশ অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব। সুতরাং প্রাথমিকভাবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করত উল্লেখিত ক অংশের সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং সময় ও সংগতি অনুযায়ী খ অংশের সমস্যাগুলো সমাধান করার লক্ষ্যে আলাদা আলাদা দুটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কাম্য।

ক. ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ফলে জ্যাম সৃষ্টির কারণ ও প্রতিকার

কারণপ্রতিকার
ব্যস্ততম রাস্তার একটি অংশজুড়ে গাড়ি পার্কিং করায় বিদ্যমান রাস্তার পরিবহন ক্ষমতা কমে যাওয়া।সর্বত অবস্থায় সবার জন্য রোড পার্কিং নিষিদ্ধ করা (উল্লেখ্য রোড পার্কিং কিংবা নিয়মবহির্ভূত স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য উন্নত দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও জরিমানা দিতে হয়)।
ফুটপাত ও রাস্তার অংশজুড়ে বাজারের পসরা বসিয়ে পথচারী চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা।রাস্তার ওপর এবং ফুটপাত থেকে বাজারের পসরা সরিয়ে নির্বিঘ্নে পথচারী চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে নিস্ক্রিয় করে অধিক সময় গাড়ি আটকিয়ে রাখা যা ক্রমপুঞ্জীভূত হয়ে দীর্ঘ জ্যাম সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং-ব্যবস্থা অনুযায়ী ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়ম ভঙ্গকারী যেই হোক তাঁকে আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা। (এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা আপডেটেড করা দরকার তবে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।)
টাউন সার্ভিস বাস/মিনিবাস রাস্তায় চলাচলে কোনো নিয়মনীতি না মেনে যত্রতত্রভাবে এমনকি চলমান রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো।,১. টাউন সার্ভিস বাস/মিনিবাসের জন্য নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব পর পর স্টেশন চিহ্নিত করে দেওয়া এবং তদনুযায়ী গাড়ি থামাতে বাধ্য করা।   ২. একই রুটে চলাচলকারী বাস/মিনিবাসগুলোকে সব স্টেশনে থামতে না দিয়ে অল্টারনেটিভ স্টেশনে থামানোর ব্যবস্থা করা।
টাউন সার্ভিসে মিনিবাসের সংখ্যা বেশি হওয়া এবং রাস্তায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো।মিনিবাসের পরিবর্তে বড় বাস নামানো এবং রাস্তার ওপর গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা বন্ধ করা।
টাউন সার্ভিসে মিনিবাসের সংখ্যা বেশি হওয়া এবং রাস্তায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো।মিনিবাসের পরিবর্তে বড় বাস নামানো এবং রাস্তার ওপর গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা বন্ধ করা।
রিকশা/ভ্যানের জন্য নিষিদ্ধ রাস্তাগুলোতেও নির্বিঘ্নে রিকশা/ভ্যান চলাচল করা।নিষিদ্ধ রাস্তায় রিকশা/ভ্যান চলাচল বন্ধ করা প্রয়োজনে আলাদা লেন করে দেওয়া।  
ফিটনেসবিহীন কিংবা রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী গাড়ি নির্বিঘ্নে রাজপথে চলাচল করা।ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো।
যথাযথ নিয়ম না মেনে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া এবং অনভিজ্ঞ/লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে রাস্তায় গাড়ি চালানো।ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সব নিয়মনীতি অনুসরণ করে লাইসেন্স প্রদান করা এবং অনভিজ্ঞ ও লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করা।
পথচারী পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারী কর্তৃক কোনো নিয়মনীতি মেনে না চলা বা মেনে চলতে বাধ্য না করা।জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ ছাড়া পথচারীর রাস্তা পারাপার নিষিদ্ধ করা এবং তা নিয়ন্ত্রণকল্পে বিদেশের মতো নিয়ম ভঙ্গকারীকে অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা।
ব্যস্ততম রাস্তার ওপর চলাচলকারী যানবাহনসমূহ ডানে মোড় নেওয়ার জন্য ঘন ঘন রোড ডিভাইডারের কাটা থাকা।        রোড ডিভাইডারের কাটাসমূহ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর বন্ধ করে ডানে মোড়ের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সিগন্যালিংয়ের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক সব সময় একই নিয়মনীতি মেনে না চলা।সর্বত্র একই নিয়ম মেনে চলার লক্ষ্যে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা।
ব্যস্ততম রাস্তার মধ্যে ভিক্ষুক এবং ফেরিওয়ালাদের নির্বিঘ্নে চলাচল করা।রাজপথে ভিক্ষুক/ফেরিওয়ালা চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা।
দ্রুতগামী ও ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা লেন চিহ্নিত না করা।প্রতিটি রাস্তা দু-তিনটি লেনে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন গতিসম্পন্ন যানবাহনগুলোকে নির্দিষ্ট লেনে চলাচলে বাধ্য করা।           
ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকল্পে নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশের সময়োপযোগী অভিজ্ঞতা না থাকা।ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কাজে নিয়োজিত প্রতিটি পুলিশসদস্যকে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলো শুধু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু মানসিকতার পরিবর্তন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আইন বড় কঠোর এবং তা রাজা-প্রজা সবার ক্ষেত্রেই একইভাবে প্রযোজ্য। আইন ভঙ্গকারী যেই হোন না কেন, তাঁকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য যথার্থ শাস্তি পেতে হয়। আমাদের দেশেও সেই নিয়ম চালু করা এবং তা কঠিনভাবে মেনে চলা এখন সময়ের দাবি।

খ. যথোপযোগী অবকাঠামোর অভাবে ট্রাফিক জ্যামে সৃষ্ট কারণ ও সমাধান

কারণসমাধান
লেভেল ক্রসিংবিদ্যমান রাস্তাসমূহের লেভেল ক্রসিংয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস তৈরি করা।
দূরপাল্লার যানবাহনসমূহ ব্যস্ততম শহরের মধ্য দিয়ে চলাচল করা।দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব বাইপাস/সার্কুলার রাস্তা তৈরি করা।

উল্লিখিত সমস্যা দুটি সমাধানকল্পে সময় ও অর্থের সংশ্লিষ্টতা আছে বিধায় এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকতর উন্নয়নে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার ভিত্তিতে ভেইকুলার আন্ডার পাস, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, মেট্রো রেল ও স্কাই রেল নির্মাণের মত বড় বড় প্রকল্পও পর্যায়ক্রমে হাতে নেয়া প্রয়োজন।

সর্বোপরি, সমস্যাবহুল জীবন আমাদের, সমস্যা থাকবেই। তবে তা সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই আমাদের কাজ। আর এই কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হলে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা তৈরির বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন মেধা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ইতিবাচক মানসিকতা, যার ওপর আমাদের পুরো কর্মকাণ্ড নির্ভরশীল। মনে রাখা দরকার, শুধু ইতিবাচক মানসিকতা থাকলেই অনেক কঠিন সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব। আর নেতিবাচক চিন্তা করলে কোনো কিছুই হবে না। কারণ, ‘না’-এর কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু ‘হ্যাঁ’-এর বিকল্প অনেক। সুতরাং আমাদের এই ট্রাফিক জ্যাম, জনদুর্ভোগ ও জাতীয় অপচয় থেকে মুক্তির লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি চাইছি।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৮তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top