আঁধার পেরিয়ে আলোর পথে

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের পরিবেশ সম্মেলনে ভারতের প্রধাণমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন বেশ জোরগলায়। আসছে ২০২২ সালে ভারত তার স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী (৭৫ বছর) উদ্যাপন করবে। এ সময়ের মধ্যে ভারতে আর অন্ধকার থাকবে না। দেশের পুরো জনসংখ্যা চলে আসবে বিজলি বাতির আওতায়। আর এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের ৪০ শতাংশই আসবে নন-ফসিল ফুয়েল থেকে! আরেকটু খোলাসা করে বললে গ্রিন এনার্জি থেকে। এসব যদি স্বপ্ন মনে হয় পাঠক তাহলে আসুন আপনাকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এক সোলার পাওয়ার গ্র্যান্টের গড়ে ওঠার গল্প শোনাই। নাম যার ‘তামিলনাড়ু মেগা সোলার পাওয়ার প্রজেক্ট’।

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের রাজ্য তামিলনাড়ু। প্রকৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা রয়েছে এ জনপদে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩০০ দিনই প্রখর সূর্যালোক পায় এ অঞ্চল। আর তাই ভারত যখন বৃহৎ এক সোলার গ্র্যান্টের কথা চিন্তা করল, তখনই সবার আগে মাথায় এল তামিলনাড়ু রাজ্যের ছোট্ট গ্রাম কামুতির নাম। সেই মোতাবেক কাজ শুরু করল আদানি গ্রুপ ২০১৫ সালের শেষ ভাগে। সামনে ছিল প্রায় অসম্ভব এক লক্ষ্য! মাত্র ৮ মাসের মধ্যে ৬৪৮ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এক বিশাল সোলার গ্র্যান্ট তৈরি ও ন্যাশনাল গ্রিডে তা থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।

২০১৫ সালের জুলাই মাসে ‘আদানি পাওয়ার’ গ্রুপের প্রকৌশলীরা যখন কামুতির প্রকল্প স্থানে পৌঁছালেন তখন তাঁরা যেন এক বিস্তীর্ণ জঙ্গলে এসে পড়লেন! ২৫ হাজার একরের বিস্তীর্ণ এক ভূ-ভাগ। যেখানে কিনা বসাতে হবে ২৫ লাখ সোলার প্যানেল! আর সেই সঙ্গে থাকবে শয়ে শয়ে ইনভার্টার, ছোট ছোট পাইলিং হবে প্রায় ৪ লাখ আর থাকবে সরবরাহ লাইন। হিসাব করে দেখা গেল, পুরো প্রকল্পে যে পরিমাণ তার ব্যবহার করা হবে তা লম্বালম্বি করে বসালে দূরত্ব হয় প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কিলোমিটার, যা কিনা দিল্লি থেকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরের আকাশ পথে দূরত্বের সমান! ওহ আচ্ছা, প্রকৌশলীদের কিন্তু আরও বানাতে হবে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সব স্থাপনা।

তবে সবার আগে দরকার একটা সাইট অফিস আর যাবতীয় মালপত্র রাখার জন্য গোডাউন। আট মাসের এই প্রজেক্টে প্রথম মাস শুধু ব্যয় হলো জঙ্গল পরিষ্কারের মাধ্যমে প্রকল্পের মাটি সমান করে সাইট অফিস আর গোডাউন তৈরি করতেই। এর মধ্যেই বিশ্বের নয়টি দেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামালের চালান আসতে শুরু করল। আগেই বলে রাখি, এই প্রজেক্টে ব্যবহার করা হয়েছে চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, ইসরায়েল, ইতালি, জার্মানি, তুরস্ক ও সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামাদি।

পাঠক, এতক্ষণে হয়তো প্রজেক্টের বিশালতা ধীরে হলেও খোলাসা হচ্ছে নিশ্চয়, তাই না? আসুন, একটি মজার তথ্য দিই আপনাকে। তামিলনাড়ু মেগা সোলার পাওয়ার প্রজেক্টে যে পরিমাণ স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে তা দিয়ে অনায়াসে চার-চারটি আইফেল টাওয়ার বানানো যাবে। এই প্রজেক্টে সর্বমোট ৩০ হাজার মেট্রিক টন গ্যালভানাইজড স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রজেক্টের শুরুতেই নির্মাতাদের মুখোমুখি হতে হয় বাজে এক সমস্যার! আর তা হলো প্রকৃতির রুদ্ররূপ। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মানেই উপমহাদেশে বর্ষাকাল। আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস এ বছরই কি না তামিলনাড়ুতে বিগত ১০০ বছরের মধ্যে সবচোয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হলো। সঙ্গে শুরু হলো প্রলয়ংকরী বন্যা। কাজ আর এগোবে কি! পুরো প্রজেক্ট সাইটই যে পানির নিচে। কিন্তু মানুষ কি আর প্রকৃতির কাছে হার মানে! বন্যার পানি নামামাত্র কাজ শুরু হলো পুরোদমে। আগের কাজের কমতি পোষাতে প্রকল্পের শেষ চার মাস কাজ চলল তিন শিফটে, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা।

ইকো ওয়াচ

২০১৬ সাল; মার্চ মাস চলে এল। কাজ তখন প্রায় শেষের দিকে। খবর পাওয়া গেল মার্চের ৯ তারিখ সকালে ভারত থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এ কি তবে খারাপ খবর? মোটেই না। এ যেন শাপে বর। কারণ, সোলার পাওয়ার গ্র্যান্টের মূল শক্তিই হলো সূর্য কিরণ। মূলত সূর্যরশ্মি যখন সোলার প্যানেলে এসে পড়ে তখন প্যানেলের ভেতরের ইলেকট্রন চলাফেরা শুরু করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। প্যানেলে উৎপন্ন হওয়া ডিসি কারেন্ট (ডাইরেক্ট কারেন্ট) এরপরে ইনভার্টারে পৌঁছালে তাকে এসি কারেন্টে (অল্টারনেটিভ কারেন্ট) রূপান্তরিত করা হয় ও সরবরাহ লাইনের সাহায্যে গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। মূল কাঁচামাল যেহেতু সূর্যরশ্মি; তাই স্বভাবতই পুরো প্রক্রিয়াটিই ঘটে দিনের বেলায়। আর এ ক্ষেত্রে পিক-টাইম ধরা হয় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সময়টাকে। এখন দেখা গেল ২০১৫ সালের ৯ মার্চ ঠিক সেই সময়েই হবে আংশিক সূর্যগ্রহণ। সূর্যগ্রহণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন নেমে এল শূন্যের কোঠায়। তারপর আবার কিছুক্ষণ পরে আংশিক সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়ামাত্র তা বেড়ে এল স্বাভাবিক মাত্রায়। ইঞ্জিনিয়াররা পুরো বিষয়টিই কন্ট্রোল রুমে বসে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখলেন। এবং তাঁদের পরিশ্রম সার্থক বলেই প্রমাণিত হলো। সিস্টেম চলল কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই। গ্রিডেও হলো না কোনো সমস্যা।

প্রকল্পের কাজ এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে। কিন্তু শেষ হইয়াও যেন হইল না শেষ! ২৫ লাখ সোলার প্যানেল তো বসানো হলো। সেই প্যানেলগুলোর কিন্তু মেঘলা আকাশ ছাড়াও আরও একটি বড় শত্রু রয়েছে। আর তা হলো ধূলিকণা। সাধারণত ভালো মানের সোলার প্যানেল একটানা ২৫ বছর বা তারও বেশি কাজ করতে পারে যদি তাদের ভালোমতো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ সোলার প্যানেলের ওপর ধুলোবালু জমতে না দেওয়া হয় ও ঠিকভাবে পরিষ্কার রাখা হয়। কথাটা বলা খুব সহজ যদি সোলার প্যানেলের সংখ্যা হয় ১০-১২। কিন্তু, এই মেগা প্রজেক্টে একটা-দুইটা নয় প্যানেলের সংখ্যা ২৫ লাখ। প্রতিদিন যদি এই ২৫ লাখ প্যানেল পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হয় তাহলে মানুষ লাগবে কতজন আর পানিই বা লাগবে কত লাখ কিউবিক লিটার তা হিসাব করতে গেলেই তো ভয় পেতে হয়। যদি এত বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হয় তাহলে ‘গ্রিন এনার্জিকে’ আর ‘গ্রিন এনার্জি’ বলি কীভাবে? এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন ইসরায়েলের প্রকৌশলীরা। তাঁরা এক অসাধারণ অটোমেটেড রোবট তৈরি করলেন। ছোট ছোট রোবটকে সংযুক্ত করে দিলেন সোলার প্যানেলের গায়ে। যা কি না প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় মাইক্রো ফাইবারের ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করে ফেলবে পুরো ২৫ লাখ সোলার প্যানেল। আর খরচ হবে না এক ফোঁটাও পানি। আরেকটা কথা এই ক্লিনার রোবট নিয়ন্ত্রণ করা যাবে দূরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসেই। আর রোবটগুলো নিজেরদের জ্বালানি নিজেরাই বানাবে সূর্যরশ্মির সাহায্যে।  

এই না হলে পুরোপুরি গ্রিন প্রজেক্ট! মার্চের এ মাসেই ভারতের এই মেগা সোলার পাওয়ার প্রজেক্টের এক বছর পূর্ণ হবে। এই তামিলনাড়ু মেগা সোলার প্রজেক্ট এক বছরে বড় ধরনের তেমন কোনো ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই বিরতিহীনভাবে আলো দিয়ে চলেছে প্রায় ৬০ হাজার বাড়িতে! একসময় যেসব এলাকার মানুষেরা কখনো বিদ্যুতের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি, তাদের ঘরময় আজ আলো। সোলার পাওয়ার আসায় দূর হয়েছে অন্ধকার। এখন শুধুই আলোর ছড়াছড়ি। কি দিন, কি-ইবা রাত। সূর্য মামা আছেন না!

তামিলনাড়ু মেগা সোলার পাওয়ার প্রজেক্ট
ধরন: সোলার পাওয়ার
ক্ষমতা: ৬৪৮মেগাওয়াট
গ্র্যান্টের আয়তন: ২৫ হাজার একর
প্রজেক্টের অবস্থান: কামুতি, তামিলনাড়ু, ভারত
নির্মাতা প্রতিষ্ঠান: আদানি গ্রুপ, ভারত
কাঁচামাল সরবরাহকারী দেশ: ৯টি (চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, ইসরায়েল, ইতালি, জার্মানি, তুরস্ক ও সুইজারল্যান্ড)
মোট ব্যয়: ৪,৫৫০ কোটি রুপি
প্রজেক্ট সময়কাল: ২৬০ দিন (২৫ জুলাই, ২০১৫-৩১ মার্চ, ২০১৬)

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৩তম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭।

ফয়সাল হাসান সন্ধী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top