১০০ পেরিয়ে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে

আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। এখন সেই দেশের দুই প্রান্তকে একই সুতোয় গাঁথার চিন্তা যদি কেউ করে থাকে, তাহলে সেই পথের দূরত্ব কত হতে পারে চিন্তা করুন তো একবার! আরেকটা কথা, এই দুই শহর কিন্তু পড়েছে দুটি ভিন্ন মহাদেশে। ভ্লাদিভস্টক পড়েছে পূর্ব রশিয়া বা এশিয়া প্যাসিফিকে আর রাজধানী মস্কো কিন্তু ইউরোপ মহাদেশে! তাহলে তো সত্যিই দুশ্চিন্তার বিষয়!

১৮৫০ সালের দিকে রাশিয়ার রাজধানী পশ্চিমের বড় শহর মস্কোর সঙ্গে রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলের শহর ভ্লাদিভস্টককে রেলপথে যুক্ত করার তেমনি এক চিন্তা শুরু করেন রাশিয়ার নীতিনির্ধারকেরা। কিন্তু তা করতে হলে সে সময়ে প্রায় অবিশ্বাস্য ৯২৮৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রয়োজন। আর যদি সংক্ষিপ্ত ও সহজতম পথ অনুসরণ করতে হয়, তাহলে অতিক্রম করতে হবে ভলগা, অব, ইয়েন্সিই, আমুরের মতো ১৬টি বড় বড় নদী। সেই সঙ্গে পাহাড়ের নিচ দিয়ে টানতে হবে দুই কিলোমিটারের সুদীর্ঘ একটি টানেল। এই কর্মযজ্ঞ যেমন কষ্টকর ঠিক তেমনি ব্যয়বহুলও। তাহলে কি থেমে যাবে রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন? ঠিক এই সময়ে এগিয়ে আসে বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও দেশ। তারা এই রেল রোড নির্মাণে বিভিন্ন শর্তে লোন দেওয়ার প্রস্তাব দেয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া চায়নি যে রাষ্ট্রের সর্Ÿবৃহৎ এই স্থাপনার ওপর বিদেশি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ থাকুক। তাহলে উপায়? না, সে সময় আর কোনো উপায়ই ছিল না। রাশিয়া তাই এই প্রকল্পকে ঠেলে দেয় আরও ২৫ বছর পেছনে।

২৫ বছর পরে ১৮৯১ সালে সম্রাট তৃতীয় আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া এই ঐতিহাসিক স্থাপনার নির্মাণ শুরু করে, তখন তার পুরো নির্মাণব্যয় নিজেরা বহন করার মতোই সামর্থ্য অর্জন করে ফেলেছিল তারা। ১৮৯১ সালে পুরোদমে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের কাজ শুরু হয়। এই নির্মাণকাজটি তৎকালীন সোভিয়েত অর্থমন্ত্রী সের্গেই ভিট তত্ত্বাবধান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফার্স্ট ট্রান্স-কন্টিনেন্টাল রেল রোডের মতো’ রাশিয়ার প্রকৌশলীরাও ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথের বিপরীত দুই প্রান্ত থেকে নির্মাণকাজ শুরু করেন। এই রেলওয়ে প্রজেক্টে একই সঙ্গে কাজ করে প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক। যাদের মধ্যে বিপুল এক অংশ ছিল সেনাবাহিনীর সদস্য। এই কারণেই ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের কাজ এত কম সময়ে শেষ হয়।

পূর্বের শহর ভ্লাদিভস্টকের উসুরি নদীর তীর ঘেঁষে উত্তর দিকে চলে গেছে এই রেলপথ। তাই এটি সে অঞ্চলে ‘উসুরি রেলওয়ে’ নামেও পরিচিত। ১৮৯০ সালে উরাল নদীর ওপর দিয়ে একটি সেতু নির্মিত হয় এবং ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলপথ এশিয়া মহাদেশে প্রবেশ করে। অব নদীর ওপরের সেতুটি ১৮৯৮ সালে নির্মিত। এই রেলওয়ের কারণেই ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া নভোনিকোলেভেস্ক শহর, পরে সাইবেরিয়ার অন্যতম বড় শহর নভোসিবির্স্কে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রেলওয়ে নেটওয়ার্ক দিয়ে মিত্র বাহিনীর জন্য অস্ত্রবাহী ট্রেন চলাচল করত।

উইকিপিডিয়া

ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের বিস্তৃতি

ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ের মূল অংশটিই হলো পশ্চিমের মস্কো থেকে পূর্বের ভ্লাদিভস্টক শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ৯ হাজার ২৮৮ কিলোমিটার রেলপথ। এই পথ যেতে সময় লাগে প্রায় সাত দিন! এটিই মূলত পরিচিত ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নামে। আর এই মূল রেলপথের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও চারটি পথ। সেগুলো-

  • ইঅগ রেলওয়ে- বৈকাল হ্রদের পাশ দিয়ে আমুর মেইন লাইন পর্যন্ত
  • ট্রান্স-মঙ্গোলিয়ান রেলওয়ে-রাশিয়া থেকে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর হয়ে চীনের রাজধানী বেইজিং পর্যন্ত
  • ট্রান্স-মাঞ্চুরিয়ান রেলওয়ে- রাশিয়ার সাইবেরিয়া থেকে মাঞ্চুরিয়া হয়ে চীনের রাজধানী বেইজিং পর্যন্ত
  • ট্রান্স-কোরিয়ান রেইলওয়ে- রাশিয়ার খাসান থেকে উত্তর কোরিয়ার রাজিন শহর পর্যন্ত

যাত্রাপথে এই রেলপথ আটটি টাইম জোন অতিক্রম করেছে। তবে ঘড়ির কাঁটার কোনো পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয় না। কারণ, পুরো রাশিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার জন্য রাজধানী মস্কোর সময়কেই স্থানীয় সময় হিসেবে বিবেচনা করে। তবে রেলপথ যখন মঙ্গোলিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ করে, তখন সেখানকার স্থানীয় সময়কেই গ্রহণ করে।

নির্মাণের ১০০ বছর পরেও ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ। অবশ্য শুধু রেলপথ বললে ভুল বলা হবে। আসলে পানিপথ, আকাশপথ, সড়কপথের কথা বিবেচনায় আনলেও এই ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়েই হলো রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের মাধ্যম।

আর তা হবেই-বা না কেন? রাশিয়ার মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশই যে এই ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক দিয়ে হয়ে থাকে। প্রতিবছর এই রেলওয়ে নেটওয়ার্ক দিয়ে ইউরোপে প্রায় দুই লাখ কন্টেইনার রপ্তানি হয়। আর প্রতিবছর প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে যে পরিমাণ পণ্য এ পথে আমদানি-রপ্তানি করে থাকে রাশিয়া তার পরিমাণ প্রায় অবিশ্বাস্য বললেই চলে। এই পথে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে মোট রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৬০ মিলিয়ন টন!

উইকিপিডিয়া

অফিশিয়ালি এই রেলপথের নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১৬ সালে কিন্তু তারপরেও এর টুকিটাকি নির্মাণকাজ আজ অবধি চলছে এবং রাশিয়ান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে এর বিশালতার কারণে এই নির্মাণকাজ নাকি চলতেই থাকবে। কারণ, এই রুটের সম্প্রসারণ ঘটছে নিয়মিত। বৈকাল হ্র্রদে পাশ দিয়ে প্রায় ২০১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে এই রেলপথ। এই রেলপথে দুই কিলোমিটারের একটি অন্ধকার টানেলও রয়েছে। প্রতিবছর বহু পর্যটক এই পথে ভ্রমণ করেন। এই রেল রোডের অভিজ্ঞতা নিতে আসেন তাঁরা। আর বহু রাশিয়ান প্রতিনিয়ত অবিরাম ভ্রমণ করে চলেছেন এই রেলওয়ে নেটওয়ার্ক দিয়ে। আর এ কারণেই বোধ হয় রাশিয়ার তথা রাশিয়াসংলগ্ন বহু অঞ্চলের জন্য এই ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কটি পরিচিত ‘লাইফলাইন’ হিসেবে।

এক নজরে ট্রান্স-সাইবেরিয়ান রেলওয়ে
মূল রেলপথের দূরত্ব: ৯২৮৮ কিলোমিটার
মস্কো থেকে ভ্লাদিভস্টক যাত্রার সময়: ৭ দিন
লাইনের ধরন: ব্রডগেজ
নির্মাণকাজ শুরু: ১৮৯১
নির্মাণকাজ সমাপ্ত: ১৯১৬
যুক্ত করেছে: ৮০টি শহর
বড় নদী অতিক্রম করেছে: ১৬টি
টাইম জোন অতিক্রম করেছে: ৮টি
আনুমাণিক নির্মাণব্যয়: ৭০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
টিকিটের মূল্য: ৬৫০-৮৭০ মার্কিন ডলার (মস্কো-ভ্লাদিভস্টক)
৭০০-৯০০ মার্কিন ডলার (মস্কো-বেইজিং)

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৫তম সংখ্যা, মে ২০১৭।

ফয়সাল হাসান সন্ধী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top