ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বহুমুখী চাহিদা মেটাতে সুষম উন্নয়ন ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে ভূমির বৈজ্ঞানিক ব্যবহার একান্ত জরুরি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ভূমির উপরিভাগের পাশাপাশি ভূমির অভ্যন্তরেও উন্নয়নকাজ পরিচালনা করছে। ড্রেনেজ ও যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে সড়ক টানেল সিস্টেমের কোনো বিকল্প নেই। ইংল্যান্ড সেই ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে মাটির নিচ দিয়ে টানেলের মাধ্যমে মেট্রোরেল চালু করে যোগাযোগব্যবস্থায় এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের মতো ঘন বসতিপূর্ণ দেশে অনেক আগেই টানেল সিস্টেম চালুর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক সমস্যার কারণে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। আমাদের এখানে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এখনো সড়ক টানেল সিস্টেম গড়ে তুলে নাগরিক সুবিধা বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দূরদর্শিতার অভাবে যদি এর নির্মাণকাজ করা সম্ভবপর না হয় তবে দুই দশক পরেও সক্ষমতা ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমরা সড়ক টানেল-ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হব না।
যা যা থাকছে …
সড়ক টানেল মূলত মাটির বা পানির নিচ দিয়ে নির্মিত বিশেষ ধরনের প্যাসেজওয়ে, যা মূলত চারপাশে পরিবেষ্টিত মাটি ও পাথরের মধ্য দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে খননকাজ পরিচালনার মাধ্যমে নির্মিত। বেশি ডায়ামিটারসমৃদ্ধ পাইপলাইনকে অনেকে টানেল ভেবে ভুল করে। যদিও টানেল নির্মাণে মাটির খননকাজে অনেক ক্ষেত্রেই টিউব ব্যবহার করা হয়। যেকোনো স্থানে টানেল নির্মিত হয় মূলত পায়ে হাঁটা পথের জন্য, গাড়ি কিংবা রেলগাড়ি চলাচলের জন্য অথবা ক্যানেল সৃষ্টিতে। কিছু কিছু টানেল আবাসস্থলের পানির চাহিদা, হাইড্রো ইলেকট্রিক স্টেশন ও ড্রেন বা নর্দমার পানি পরিবহনে সক্ষম। ইউটিলিটি টানেল মূলত গ্যাস, টেলিফোন, বৈদ্যুতিক সংযোগ সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন এবং মানুষ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পরিবহনে নির্মাণ করা হয়। আর গোপন সড়ক টানেল সামরিক বাহিনী কর্তৃক তাদের চাহিদা অনুযায়ী নির্মিত হয়। এ ছাড়া বনের পশুদের স্বাভাবিক চলাচল নির্বিঘ্ন করে মানুষের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের জন্য সড়ক টানেল নির্মাণ করা হয়। টানেলের দৈর্ঘ্য মূলত ১৫০ মিটার বা ৪৯০ ফুটের বেশি হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক টানেল নির্ধারণী বিশেষত্বে ভিন্নতা রয়েছে।
সড়ক টানেল নির্মাণের ইতিকথা
প্রথম দিকে সড়ক টানেলের নির্মাণ পদ্ধতি সীমাবদ্ধ ছিল খননকাজ আর সামরিক প্রকৌশলীবিদ্যায়। ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে যুক্তরাজ্যে Clay kicking -এর মাধ্যমে সড়ক টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয়। Clay Kicking হচ্ছে শ্রমিক দ্বারা ম্যানুয়ালি ক্লে-নির্ভর শক্ত মাটির মধ্যে দিয়ে টানেল খনন করা। Clay Kicking-এর আগে Mattocks পদ্ধতিতে টানেলের খননকাজ পরিচালিত হতো। কিন্তু এই পদ্ধতিতে টানেল খনন করলে মাটির কাঠামোতে অনেক বেশি আঘাত করায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকত। আর Clay Kicking পদ্ধতিতে নির্মাণকাজে যেমন কোনো রকমের শব্দদূষণ হয় না, তেমনি এটা নরম ক্লে মাটিতে নির্মিত বিল্ডিংয়ের কোনো ক্ষতি করে না। Clay Kicking একটি কাঠের তক্তার ওপর ৪৫০ বাঁকিয়ে কাজের স্থান থেকে দূরে রাখা হয় এবং এর শেষ মাথায় কাপের মতো একটি যন্ত্র যুক্ত থাকে, যার দ্বারা খুব সহজেই মাটির একটি অংশ কেটে বের করা যায়। বাইরের দিকে মাটির সঙ্গে যুক্ত করে রাখা যায়। এই পদ্ধতিতে সড়ক টানেল নির্মাণে আগেই নির্মাণকৃত কোনো ধরনের অবকাঠামো স্থানান্তর বা ধ্বংসের প্রয়োজন হয় না। এই পদ্ধতিতে যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম ভূগর্ভস্থ নালার সংস্কারকাজ করা হয়েছিল। তা ছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর সৈনিকদের জার্মান সীমান্তে অবাধে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই পদ্ধতিতে টানেল নির্মাণ করা হয়েছিল।
মাটি পরীক্ষা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
যেকোনো ধরনের টানেল নির্মাণকারী প্রজেক্টের প্রথমেই ওই অঞ্চলে গর্ত করে নমুনা (Sample) সংগ্রহ করা হয় এবং মাটির অন্যান্য পরীক্ষার সাহায্যে ওই স্থানের ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এরপর নির্মাণপদ্ধতি ও নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূ-তত্ত্বীয় বিষয়াদি রয়েছে সড়ক টানেলের নকশা ও নির্মাণকাজের জন্য এগুলোও বিবেচনায় নেওয়া একান্ত জরুরি। যেমন-
১. স্ট্যান্ড আপ টাইম (Stand-up-time)
স্ট্যান্ড আপ টাইম হচ্ছে এমন একটি নির্দিষ্ট সময়, যখন টানেলের জন্য খননকৃত মাটি বাইরের কোনো ধরনের কাঠামো সাপোর্ট ছাড়া নিজ অবস্থান ধরে রাখতে পারে। মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম জানার পর প্রকৌশলীরা সিদ্ধান্ত নেন কত দূর পর্যন্ত মাটি বা পাথর খননের পরে বাইরে থেকে সাপোর্টের প্রয়োজন হবে। এবং সে অনুযায়ী খননকাজ সম্পন্ন করা হয়। যে অঞ্চলের মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম যত বেশি, সেই সড়ক টানেলের খননকাজ তত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। বিশেষ ধরনের বা আকৃতির পাথুরে ও ক্লে (Clay) মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম অনেক বেশি হয় এবং বালুযুক্ত মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম অনেকাংশে কম হয়ে থাকে।
২. পানির অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ
টানেলের নির্মাণকাজে ভূ-অভ্যন্তরীণ পানির অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। যদি কোনো ধরনের ছিদ্র দিয়ে পানি টানেলের মধ্যে প্রবেশ করে তবে তা মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম অনেক কমিয়ে দেয়। তা ছাড়া এই অবস্থায় নির্মাণকাজ পরিচালনা করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং খননকাজের জন্য ব্যবহৃত শ্যাফট (Shaft) অনেক বেশি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। পানির অনুপ্রবেশ রোধে বেশ কিছু পদ্ধতি রয়েছে; এর মধ্যে একটি কার্যকরী পদ্ধতি হচ্ছে মাটি ফ্রিজিং (Freezing) করে ফেলা। এর ফলে খননকারী শ্যাফটের চারপাশের মাটিকে অনেক বেশি শীতল করে রাখে, যার ফলে মাটিতে অবস্থিত পানিকে বরফে পরিণত করে ফেলে। এবং অতিরিক্ত পানির অনুপ্রবেশকে রোধ করে। এর থেকে সহজ ও বহুলভাবে পরিচিত পদ্ধতি হচ্ছে মাটির মধ্যে পাইপ বসিয়ে পাখার সাহায্যে খনন কাজের আশপাশ থেকে পানি বের করে আনা এবং এটা টানেল এবং শ্যাফট উভয়ের জন্যই দারুণ কার্যকরী।
৩. টানেলের আকার আকৃতি
টানেলের খনন স্থানের মাটির স্ট্যান্ড আপ টাইম টানেলের আকার-আকৃতির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তাই টানেলের আকার নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা একান্ত প্রয়োজন। যদি টানেলটি এর উচ্চতার তুলনায় বেশি চওড়া হয়, তাহলে এর সারফেসের দ্বারা প্রযুক্ত Self-weight বেশিক্ষণ ধরে রাখতে সক্ষম হবে না। ফলে এর স্ট্যান্ড আপ টাইম অনেকাংশে কমে আসবে। আর যদি সড়ক টানেলটির উচ্চতা বেশি হয় তবে এর স্ট্যান্ড আপ টাইম বাড়বে এবং এর নির্মাণকাজ সহজ হবে। টানেলের জন্য বর্গাকার ও আয়তকার আকৃতিতে নিজের থেকে সাপোর্ট দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। তাই যত দূর সম্ভব টানেলের জন্য এ ধরনের আকার-আকৃতির কথা চিন্তায় না আনাই ভালো। যদিও কী ধরনের মাটিতে নির্মাণকাজ হবে, সেটা কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
টানেল নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টানেল নির্মাণকালীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা নির্মাণকাজের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাই কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একান্ত কাম্য। নির্মাণকাজ শুরুর আগেই সম্পূর্ণ প্রকল্প শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে তা নির্ধারণ করা দরকার। এর সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ শ্রমিক, নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মেশিন আগে থেকেই ঠিক করে নির্মাণকাজ শুরু করা উচিত। যে স্থানে নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হবে, সেই স্থানের ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে সব ধরনের জরুরি কাজ আগে থেকেই সমাধান করে নির্মাণকাজে যাওয়া উচিত।
সড়ক টানেল প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ
প্রাচীন নগর ঢাকা আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। মহানগরের মর্যাদা পাওয়ার পর থেকেই ঢাকার ব্যাপ্তি অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ঢাকা নগরের আয়তন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং ১৯৯১ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটনের আয়তন ১৬০০ বর্গ কিলোমিটার এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের আয়তন ধরা ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার আর এখানকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ। আর বর্তমানে ঢাকা শহরের ব্যাপ্তি চারদিকে আরও বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এবং বসবাসকারী জনসংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়েছে। এ নগরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিমে তুরাগ, পূর্বে বালু ও উত্তরে টঙ্গী খাল অবস্থিত। যার কারণে ঢাকার মাটি নরম পলি বা কাদামাটি।
ভূ-তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতকে বিবেচনা না এনে ঢাকা শহরের দ্রুত নগরায়ণের কারণে নগর এলাকার ভূ-পরিবেশে (Geo-Environment) এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। জলাবদ্ধতা, দূষণ, জলতাত্ত্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, স্থান বিশেষে ভূমির অবনমন ও ভবন ধসে পড়া এসব সমস্যা ভূ-পরিবেশসংক্রান্ত পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হয়।
ঢাকার ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত আন্তভূ-পৃষ্ঠ পাললিক স্তরক্রম থেকে তিনটি সুস্পষ্ট ভূ-তাত্ত্বিক এককের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। যথা- (১) কর্দম স্তর সমষ্টি, (২) পানি ও অতি মিহি বালুকণা, সহযোগে লালাভ আঠালো (Plastic) কাদার বৈশিষ্ট্য, (৩) কর্দম স্তরবিশিষ্ট মাঝারি থেকে মোটা হলুদাভ বাদামি বালু ও মাঝেমধ্যে নুড়িতে গঠিত ভূমি টিলা স্তরবিশিষ্ট উপরিভাগ অসংগতভাবে অধিশায়িত নগরের ভেতরে খোদিত খাল ও খাদসমূহের তলদেশ সাম্প্রতিক পলিজ প্লাবণভূমি অবক্ষেপ পূর্ণ, যা আবার নিম্নভূমি পলল ও উচ্চভূমি পললে বিভক্ত।
ঢাকার মাটির গঠন প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর অভ্যন্তরীণ গঠন মূলত নরম পলি ও বালু মাটি দ্বারা গঠিত। তাই এখানে টানেল সিস্টেম নির্মাণের জন্য নরম মাটিতে সড়ক টানেল নির্মাণপদ্ধতিই গ্রহণযোগ্য। নরম মাটিতে টানেল করার জন্য মূলত Bored Tunnel নির্মাণ করা হয়। কেননা এর অধিকাংশ Cut & Cover Tunnel পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ওসব ক্ষেত্রে ব্যয় অনেক বাড়ার আশঙ্কা থাকে। Bored Tunnel-এ TBM মেশিন অথবা SCL মেশিন দ্বারা গর্ত করে পরবর্তী সময়ে মেশিন ও হস্তচালিত যন্ত্র দ্বারা টানেলের নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়।
টিবিএম বোরেড টানেল (TBM Bored Tunnel)
TBM মেশিন দিয়ে নির্মাণকৃত টানেল মূলত গোলাকার এবং এই পদ্ধতিতে নরম মাটিতে দীর্ঘ টানেল নির্মাণ সম্ভব। TBM দিয়ে শহর বা গ্রামের নরম মাটি ও আধা কর্দমাক্ত পরিবেশে সড়ক টানেল নির্মাণ করা যায়। মূলত কম লোড ধারণক্ষমতাসম্পন্ন মাটি ও যেসব স্থান থেকে পানি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। সেসব স্থানে TBM পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। TBM দিয়ে খননকৃত স্থানে প্রি-কাস্ট কংক্রিট পাশাপাশি সংযুক্ত করে সম্পূর্ণ টানেল নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়।
এসসিএল বোরেড টানেল (SCL Bored Tunnel)
SCL পদ্ধতি সাধারণত অপেক্ষাকৃত দৃঢ় মাটিতে টানেল নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। যেসব স্থান বা নির্মাণ সাইট থেকে খুব সহজেই পানি পরিবহন করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায়। SCL পদ্ধতিতে মূলত কম দীর্ঘ ও গোলাকার নয়, এমন ধরনের টানেলের নির্মাণকাজে প্রয়োগ করা হয়। SCL-এর দ্বারা নির্দিষ্ট Cross Section-এর মাটি কেটে প্রথমে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রাথমিক ধাপের কংক্রিট দিয়ে অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ করা হয় এবং পরবর্তী ধাপে Cust-in-situ কংক্রিট দিয়ে স্থায়ী টানেলের মূল কাঠামো নির্মাণ করা হয়।
নির্মাণপদ্ধতি ও ধারাবাহিকতা
টানেল এবং মাটির নিচের কাঠামো নির্মাণের সময় প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সম্পূর্ণ কাজটি যেন নকশা অনুযায়ী হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
সড়ক টানেলের অস্থায়ী কাঠামো
সড়ক টানেলের নির্মাণকাজ চলাকালীন অনেক অস্থায়ী কাঠামো প্রয়োজন হয় টানেলের চারপাশের মাটি ও টানেলকে ধরে রাখার জন্য। এসব কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী কাঠামো রয়েছে।
পানির নিচের টানেলসমূহ-
- প্রাথমিক সাপোর্ট প্রদানকারী কাঠামো।
- পানিরোধকারী পাটিশন ও নুড়িপাথরের ট্যাংক।
- বালু ও পাথর দ্বারা সৃষ্ট ভিত্তি।
- বিভিন্ন উপাদানের ওপর হাইড্রোলিক বল প্রয়োগের ব্যবস্থা।
খননকৃত টানেলসমূহের অস্থায়ী কাঠামো
- Fabrication-এর যথাযথ সুবিধা এবং খননকৃত মাটি বা পাথরের Handlin-এর ব্যবস্থা করা।
- অস্থায়ী সাপোর্ট প্রদানকারী কাঠামো নির্মাণ।
- TBM ফ্যাক্টরি টেস্ট সাইটে জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী একত্র করা এবং কার্য সম্পাদন করা।
মাটির নিচের কাঠামোসমূহ-
- মাটি ধরে রাখার কাঠামো নির্মাণ।
- Bracing কাঠামো অথবা মাটি দৃঢ়ভাবে তার স্থানে ধরে রাখার জন্য নির্মিত কাঠামো।
- Bracing ছাড়া গোলাকার ঝযধভঃ.
- সার্বিকভাবে ঝঈখ-এর নির্মাণপদ্ধতি।
নরম কাদামাটি থেকে শুরু করে শক্ত ও দৃঢ় পাথরের মধ্যে দিয়েও সড়ক টানেলের জন্য নির্মাণ ও খননকাজ করা হয়। টানেলের নির্মাণকৌশল মূলত নির্ভর করে মাটির অবস্থা ও অবস্থান, ভূ-গর্ভস্থ পানির অবস্থান, দৈর্ঘ্য ও টানেলের ব্যাসের ওপর, টানেলের গভীরতা, আকার-আকৃতি এবং এর ব্যবহারের ওপর। টানেলের তিন ধরনের নির্মাণপদ্ধতি বহুলভাবে পরিচিত-
- কাট অ্যান্ড কভার টানেল (Cut and Cover Tunnel)
- বোরেড টানেল (Bored Tunnel)
- ইমার্স টিউব টানেল (Immersed Tube Tunnel)
কাট অ্যান্ড কভার টানেল (Cut and Cover Tunnel)
কাট অ্যান্ড কভার হচ্ছে অগভীর টানেল নির্মাণের সহজ ও বহুল পরিচিত পদ্ধতি, যেখানে একটি অগভীর পরীক্ষা বা খাল খনন করে এর মধ্যে সড়ক টানেলের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে পরবর্তী সময়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে জড়ড়ভ সিস্টেম এমনভাবে নির্মাণ করা হয়, যাতে টানেলের ওপর অন্য কোনো কিছু নির্মাণ করা হলে এটা তার ভার বহন করতে সক্ষম হয়। দুটি পদ্ধতিতে মূলত এ ধরনের অগভীর টানেল নির্মাণ করা হয়। যথা-
- বটম আপ ম্যাথড (Bottom-up Method)
- টপ ডাউন ম্যাথড (Top-down Method)
বোরেড টানেল (Bored Tunnel)
- বোরেড টানেলে মূলত সাইটে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। এ ধরনের টানেল নির্মাণে, টানেলের উপরি ভাগের মাটি খনন বা সরিয়ে নেওয়া হয় না। এগুলো মূলত গোলাকার ও ঘোড়ার পায়ের আকৃতির হয়ে থাকে। নরম কাদামাটিতে ও দীর্ঘ টানেল নির্মাণে এই পদ্ধতি পরিলক্ষিত হয়। মূলত TBM ও SCL মেশিন দিয়ে বোরেড টানেলের খনন ও নির্মাণকাজ পরিচালনা করা হয়।
ইমার্স টিউব টানেল (Immersed Tube Tunnel)
এ টানেলগুলো যেকোনো ধরনের পানির মধ্যে ডুবানো থাকে। এর তলদেশে নুড়িপাথর বা বালু দিয়ে মজবুত ভিত্তি নির্মাণ করা হয়, যার ওপরে টানেলের মূল কাঠামো স্থাপন করা হয়। এতে পানি রোধকারী পার্টিশন ও নুড়িপাথরের ট্যাংক দিয়ে টানেলের মধ্যে পানির প্রবেশকে রোধ করা হয়।
জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে সড়ক টানেল
বাংলাদেশের বৃহত্তম শহরগুলোর প্রধান দুটি সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও যানজট। বর্ষাকালে খুব অল্প বর্ষণেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কেননা নগরায়ণের বিস্তরের সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা যেমন চালু করা সম্ভব হয়নি। তেমনি বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য যে নদী ও খাল ছিল তা দখল হয়ে ভরাট হয়েছে। কিছুদিন আগেও ঢাকা পরিবেষ্টিত ছিল চারপাশে অনেক খাল দিয়ে। বর্তমানে আর সেগুলোর অস্তিত্ব¡ নেই। তদুপরি সংকুচিত হয়ে হারিয়েছে তাদের স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতাও। এগুলোর অস্তিত্বও অদূর ভবিষ্যতে আর পাওয়া যাবে কি না তা সময়ই বলবে। অতি শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করবে।
প্রতিদিনই যানজটে রাজধানী হয়ে পড়ে অচল। ১০ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। এক সমীক্ষা বলছে, যানজটে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, আর দিনে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা। এরপরও বছরে যানবাহন বাড়ছে প্রায় শতকরা ১০ ভাগ হারে। একদিকে সড়ক পথ যেমন বাড়ছে না অন্যদিকে বেড়েই চলেছে যানবাহন। সড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই যান চলাচলের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। ফলে যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
সুপরিকল্পিতভাবে টানেল নির্মাণের মাধ্যমে দেশের বড় শহরগুলোর প্রধান এই দুটি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ভূগর্ভস্থ টানেল নির্মাণের ফলে শহরগুলোর ড্রেনেজ-ব্যবস্থাকে একটি ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা সম্ভব। যার ফলে বৃষ্টি পানি খুব দ্রুত সরে যেতে গিয়ে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে নগরবাসীর। অন্যদিকে টানেল দিয়ে অন্যান্য নাগরিক সুবিধা যেমন- গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া যাবে এবং কোনো ধরনের সমস্যা হলে কোনো ধরনের রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ছাড়াই তা রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। ফলে সরকারি অর্থের অপচয় অনেকটাই কমে আসবে। ভূগর্ভস্ত সড়ক টানেল নির্মাণের মাধ্যমে বড় শহরগুলোতে বিকল্প সড়কের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এতে করে মানুষের পায়ে হাঁটার পথ যেমন সৃষ্টি হবে, ঠিক তেমনি গাড়ি চলাচলের রাস্তা বাড়ার ফলে যানজট কমে আসবে অনেকাংশে।
টানেল পথে চালু করা যাবে মেট্রোরেল সার্ভিস। এতেও বিদ্যমান সড়কের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমবে। মেট্রোরেল-ব্যবস্থা চালু করা গেলে প্রতিদিন প্রায় গড়ে ১০ লাখ মানুষ এর মাধ্যমে দ্রুতই তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে, যা বিদ্যমান যানজটকে সহনীয় পর্যায়ে আনবে। এখনো যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এর নির্মাণকাজ শুরু করা না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হয়তো আমরা এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে পারব না। তাই সরকারের সঠিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনার মাধ্যমে নগরবাসী যথাশিগগিরই এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে। এমনটাই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
কর্ণফুলী টানেল কবে উদ্বোধন করা হয়?
কর্ণফুলী টানেল ২০২০ সালে উদ্বোধন করা হয়।
কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে কত খরচ হয়েছে? আয় কত?
কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ১০ হাজার ৩শ’ ৪৬ কোটি টাকা মোট খরচ হয়। টানেলটির প্রতিদিন গড়ে আয় হয় ১০ লাখ টাকারও বেশি।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪