বাংলাদেশের নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে সাধারণত অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত আলোচনা থাকলেও নগর পরিকল্পনা, আবাসন, পরিবেশ, জলবায়ু সহনশীল নগর নকশা এবং টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্টভাবে তেমন কিছু বলা থাকে না।
২১শ শতকে নগরায়ণ অর্থনৈতিক উৎপাদন, সামাজিক গতিশীলতা, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক। বিশ্বব্যাপী আজ প্রায় ৫৬% মানুষ শহরে বসবাস করে, যা ২০৫০ সালে ৭০% ছাড়িয়ে যাবে (UN-Habitat, 2020)। বাংলাদেশে এই হার বর্তমানে প্রায় ৪০%, কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত বিস্তার, আবাসন সংকট এবং পরিবেশগত অবক্ষয়ের ফলে শহরগুলো বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
কেবল “পরিবেশ রক্ষা করব”, “শহর উন্নয়ন করব”, “গ্রাম উন্নয়ন হবে” এমন ফাঁপা বুলি দিয়ে নয় বরং জলবায়ু পরিবর্তনকে ভবিষ্যতের জন্য ফেলে না রেখে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা, আবাসন ও গ্রাম উন্নয়নকে এখনো দ্বিতীয় সারির বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অথচ এই বিষয়গুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্বাস্থ্য, কাজ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এগুলোকে ইশতেহারের কেন্দ্রে আনতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইশতেহারগুলোতে নগর উন্নয়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবহেলিত। এই রচনার উদ্দেশ্য হলো বিশেষজ্ঞদের মতামতের সহায়তায় এই ঘাটতির প্রকৃতি, মাত্রা ও প্রভাব বিশ্লেষণ করা।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর ইশতেহার বিশ্লেষণ
এই ইশতেহারে পরিবেশ বিষয়ক সিদ্ধান্তে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী দখল ও দূষণ বন্ধ, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তাদের শক্তিশালী দিক হলো, এখানে জলবায়ু পরিবর্তনকে জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখা হয়েছে। নদী রক্ষা ও দূষণ কমানোর স্পষ্ট অঙ্গীকার এবং গ্রিন এনার্জির ইঙ্গিতও এই ইশতেহারে বলা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রিন বিল্ডিং সার্টিফিকেশন, জলবায়ু অভিযোজন ডিজাইন ও নগর স্থিতিশীলতা ইত্যাদি প্রসঙ্গগুলো উঠে এসেছে। বিশেষ করে ঢাকার উপর চাপ কমাতে সেকেন্ডারি সিটির কথা বলা হয়েছে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে লিফলেটের কাগজের জন্য তারা ব্যবহার করছেন পরিবেশবান্ধব বনকাগজ যা প্রশংসনীয়।
তবে দুর্বলতা হিসেবে বলতে হয়, বাস্তবায়ন কাঠামো ও কোনো সময়সীমা নেই, এবং বাজেট বা মেট্রিক্স নেই। এ ছাড়াও শহরভিত্তিক পরিবেশ দূষণ যেমন বায়ু দূষণ, শব্দ দূষণ, দৃশ্য দূষণ, নগর তাপদ্বীপ প্রভাব (urban heat island effect) নিয়ে গভীর আলোচনা নেই।
(খুঁজুন, সূচি<দ্বিতীয় অধ্যায়<বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ পৃ: ২৬, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ পৃ: ২৬; খুঁজুন, সূচি<চতুর্থ অধ্যায়: অঞ্চলভিত্তিক সুষম কাঠামো পৃ: ৩৯-৪১)
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ, মার্কসবাদী দল) ইশতেহার বিশ্লেষণ
বাসদ (মার্কসবাদী)-এর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ, আবাসন ও নগর পরিকল্পনা বিষয়গুলো সীমিত পরিসরে আলোচিত হয়েছে। তবে এর শক্তিশালী দিক হলো পরিবেশ প্রসঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ বিধ্বংসী প্রযুক্তি ও কীটনাশক বন্ধ, নদী–পাহাড় রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের জাতীয় নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা পরিবেশ সংকটকে রাজনৈতিক ও শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিতে চিন্তা করে। তাছাড়া ন্যায্য বাড়ি ভাড়া প্রসংগটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নগরভিত্তিক পরিবেশ সমস্যা যেমন নিয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো অনুপস্থিত। আবাসনে স্বল্পমূল্যের ঘর, বস্তি উচ্ছেদ বন্ধ ও ভূমি সংস্কারের প্রস্তাব থাকলেও পরিবহন পরিকল্পনা, ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট, হাঁটাবান্ধব নগর, উন্মুক্ত স্থান নিয়ে পরিকল্পনা অনুপস্থিত যা ইশতেহারের একটি সীমাবদ্ধতা।
বাসদ, মার্কসবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহার
(খুঁজুন, মৌলিক অধিকার)
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২৬ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে সুশাসন, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবাসন এবং পরিবেশ খাতে মাত্র একটি দফা দেখা যায়। আবাসনে কেবল নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য স্বল্পমূল্যের ঘর উল্লেখ আছে। কিন্তু নগর পরিকল্পনা, বস্তি উন্নয়ন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, জমি ব্যবস্থাপনা বা ট্রানজিট-নির্ভর নগর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেই।
পরিবেশ খাতে ‘তিন শূন্য ভিশন’ থাকলেও তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা নেই। ফলে ইশতেহারটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক হলেও নগরায়ণ ও পরিবেশ সংকট মোকাবিলায় কার্যকর নীতিগত কাঠামো প্রদানে পিছিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার
(খুঁজুন, ইশতেহারে ১৪ ও ২৩ নং দফা)
জাতীয় নাগরিক পার্টির ইশতেহার বিশ্লেষণ
৩৬ দফা ভিত্তিক এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ওপর প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে আবাসন ও পরিবেশ খাতে গুরুত্ব কম দেখা যাচ্ছে। আবাসনে স্বল্পমূল্যের ঘর উল্লেখ থাকলেও নগর পরিকল্পনা, বস্তি উন্নয়ন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, জমি ব্যবস্থাপনা, উল্লম্ব আবাসন বা ট্রানজিট-নির্ভর সম্প্রসারণ নেই।
পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও নগর জলবায়ু সহনশীলতা, বায়ুদূষণ, তাপদ্বীপ প্রভাব, সবুজ অবকাঠামো বা নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামো অনুপস্থিত।
এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহার
(খুঁজু্ন, ইশতেহারে ৯, ৩০ ও ৩১ নং দফা)
নির্বাচনী ইশতেহারে অনুপস্থিত বিষয়গুলো:
১. গণপরিবহনভিত্তিক নগর উন্নয়ন (Transit Oriented Development):
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য দ্রুত নগরায়িত শহরে গণপরিবহন কেন্দ্রিক উচ্চ-ঘনত্বের নগর সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে TOD কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এটি যানজট, দূষণ এবং শহরের সম্প্রসারণ চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
২. পদচারী ও জনবান্ধব নগর:
নগর এলাকায় পথচারীবান্ধব সড়ক, সাইকেল লেন, উন্মুক্ত ও সবুজ স্থান এবং পার্ক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এটি শহরের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে।
৩. নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন:
নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য ভাড়াভিত্তিক সামাজিক আবাসন এবং উল্লম্ব আবাসন সম্প্রসারণে নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জমির ব্যবহার সর্বাধিক কার্যকর হয় এবং বস্তি পুনর্বাসন মানবিকভাবে সম্ভব হয়।
৪. মাস্টারপ্ল্যান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার:
রাজউক ও অন্যান্য নগর উন্নয়ন সংস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আধুনিক মাস্টারপ্ল্যান সংস্কার প্রণয়ন করতে হবে। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পুনর্গঠন জরুরি।
৫. এলাকাভিত্তিক ভূমি ব্যবহার বিভাজন (Zoning, mixed-use development ও open space ratio):
ভূমি ব্যবহার আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক কার্যক্রমের সমন্বয়, এবং পর্যাপ্ত খোলা স্থান ও সবুজ এলাকার অনুপাত নিশ্চিত করতে হবে।
৬. জলবায়ু সহনশীল নগর নকশা (Climate-resilient urban design ও heat mitigation):
নগর নকশায় জলবায়ু সহনশীলতা, urban heat island কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. বস্তি পুনর্গঠন ও মানোন্নয়ন (Slum upgrading ও participatory planning):
বস্তি উচ্ছেদ নয় বরং মানবিক পুনর্বাসন ও সেবাভিত্তিক উন্নয়ন মডেল প্রণয়ন করতে হবে। স্থানীয় কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরিকল্পনা কার্যকর করা উচিত।
নগরায়ণ, পরিবহন, আবাসন ও পরিবেশের সমন্বিত নীতি নির্বাচনী ইশতেহারের কেন্দ্রে রাখা হলে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সামাজিক ন্যায়সংগত নগর ভবিষ্যৎ সম্ভব। বাংলাদেশে নগর সংকট সমাধানে এই নীতিগুলো কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে ইশতেহারগুলো পাঠ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরিবেশ সম্পর্কে
লেখক ও গবেষক তাহমিদ জামি জানান-
প্রথমেই বলা প্রয়োজন জলবায়ু ও পরিবেশ মোটাদাগে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় নি কোন ইশতেহারেই। এর মধ্যে বিএনপির ৪৮ পৃষ্ঠার দলিলে গাছ লাগানো, জলবায়ু অভিযোজন, সবুজ জ্বালানী লক্ষ্যমাত্রা ইত্যাদি আছে। তবে গাছ লাগানোর বাইরে তেমন কোন দৃঢ় নতুন আইডিয়া নেই, গতানুগতিক কথাই বেশি। জামাত ও বাসদের দফাগুলোতে পরিবেশ ও জলবায়ুর সেরকম উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাই নি। এনসিপি জ্বালানী, ইটিপি ইত্যাদির কথা বললেও তাও কিছুটা প্রচলিত আলাপেরই পুনরাবৃত্তি।
জ্বালানী, জলবায়ু নিরসন ও অভিযোজন, দুর্যোগ মোকাবেলা, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ — এসকল ব্যাপারে সরকারি সংস্থা, দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন সংস্থা, ইত্যাদির রুটিন কাজ থাকেই। সেখানে ইটিপি, ইটভাটা, অভিযোজন, জ্বালানী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অপারেশনাল লক্ষ্য ও তৎপরতা থাকে। কিন্তু নতুন সরকারের সুনির্দিষ্ট, উচ্চাকাঙ্খী নীতিগত লক্ষ্য দরকার প্রাণ-প্রতিবেশের প্রকৃত হেফাজতের জন্য। সেক্ষেত্রে কেবল গতানুগতিক আলাপের চর্বিত চর্বণ যথেষ্ট নয় বরং প্রকৃত বৈষম্যহীন ও পরিবেশবান্ধব ভাবনা দরকার। যেমন জাস্ট ট্রাঞ্জিশন বা ন্যায্য উত্তরণ নিয়ে একালে দুনিয়া জুড়ে কথা হচ্ছে।
জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের একটি নেতৃত্বের ভূমিকা দরকার। দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে পরিবেশ ও জলবায়ু প্রশ্নে সার্কের ভূমিকাকে রিএক্টিভেট করার অবকাশ আছে। ঢাকার মত বড় শহরকে পরিবেশবান্ধব, দুর্যোগ-প্রতিরোধী এবং তাপদাহ-মোকাবেলাক্ষম করে তোলার মতলব থাকা দরকার। শিল্পখাতে পানির অতিব্যবহার কমানো এবং একুইফার ধ্বংস কমাতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য দরকার। এরকম অসংখ্য ছোট বড় বিষয়ে আসন্ন সরকারি দলের মনোযোগ কাম্য।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারগুলো বিবেচনায় রেখে নগর পরিকল্পনা ও আবাসন প্রসঙ্গে স্থপতি আদর ইউসুফ বন্ধনকে জানান-
আর কিছু ঘণ্টা পর বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের ধারাবাহিক অভিযাত্রায় এটি নিঃসন্দেহে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচনকে ঘিরে জনমানুষের প্রত্যাশা যেমন গভীর, তেমনি অসীম। রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন দর্শন কীভাবে রূপরেখা পায়—সে প্রশ্নটিও আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
নির্বাচন উপলক্ষে অংশগ্রহণকারী প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। উন্নয়ন, জীবনমান বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির নানা প্রতিশ্রুতি সেখানে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে নগরায়ণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বড় ও ছোট—সব দলের ইশতেহারেই কিছু আশাব্যঞ্জক পরিকল্পনার উল্লেখ লক্ষ্য করা যায়। সবুজায়ন, আবাসন, ব্লকভিত্তিক উন্নয়ন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে একজন স্থপতির দৃষ্টিকোণ থেকে ইশতেহারগুলো পর্যালোচনা করলে কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় ঘাটতি হিসেবে দেখা যায় রাজধানী ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে সুস্পষ্ট ও কার্যকর কোনো দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। বর্তমানে ঢাকার অস্বাভাবিক জনঘনত্ব, অবকাঠামোগত চাপ ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া টেকসই বিকল্প নেই। অথচ অধিকাংশ ইশতেহারে এই বিষয়টি হয় অনুল্লেখিত, নয়তো খুবই অস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত।
আরও লক্ষণীয় যে, উন্নয়ন ভাবনা এখনো মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরকেন্দ্রিক। এই ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ উপজেলা, পৌরসভা ও মফস্বল অঞ্চলকে ঘিরে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি বিস্ময়কর। অথচ আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কীভাবে গ্রামকে গ্রাম হিসেবেই উন্নত করতে পারি? গ্রামকে শহরে রূপান্তর না করে, তার নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়—সে বিষয়ে ইশতেহারগুলো নীরব।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর আবাসন, স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনপরিসরের নকশা—এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সুসংহত rural planning দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অনুপস্থিত। অথচ গ্রামভিত্তিক টেকসই পরিকল্পনাই পারে শহরমুখী অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত কমাতে এবং ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।
একইভাবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের জন্য অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনার অভাবও দৃষ্টি এড়ায় না। পাহাড়ি এলাকার ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্নের উত্তর ইশতেহারগুলোতে স্পষ্ট নয়। একক ছাঁচের উন্নয়ন পরিকল্পনা এখানে বরং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ও সামাজিক সংকট তৈরি করতে পারে।
তবুও এটাও সত্য, এবারের নির্বাচনী ইশতেহারগুলোতে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস রয়েছে। জীবনমান উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো দেখায়। এখন সময় এসেছে এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে শুধু নির্বাচনী বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার। নগর ও গ্রাম—এই দুই বাস্তবতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে, অঞ্চলভিত্তিক ও মানুষের জীবনকেন্দ্রিক পরিকল্পনাই পারে বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে একজন স্থপতির প্রত্যাশা তাই খুব সাধারণ—উন্নয়ন যেন কেবল ইট, কংক্রিট আর উঁচু ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং মানুষের বসবাসযোগ্য পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
তথ্যসূত্র:
UN-Habitat (2020). World Cities Report.
World Bank (2019). Toward Great Dhaka.
United Nations (2015). SDG 11 Framework.
ADB (2017). Transit-Oriented Development in Asian Cities.
Budge et al. (2001). Mapping Policy Preferences.
United Nations Sustainable Development Goal 11
Integrating environmental issues within party manifestos: research on climate policy in political programmes