দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন ঢাকার খোঁজে…

রাস্তার পাশেই খোলা ডাস্টবিন; আবর্জনার অধিকাংশই ডাস্টবিনের বাইরে। পথচারী নাকে হাত চেপে দুর্গন্ধ রোধের চেষ্টায়রত। চলছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি; প্রচণ্ড গরমে জানালা বন্ধ করে ধুলাবালি থেকে রেহাই পাওয়ার চেষ্টা বাসযাত্রীর। গণশৌচাগারের অভাবে ফুটপাতেই প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাধ্য হচ্ছে কেউ কেউ। ড্রেনভর্তি নোংরা আবর্জনায়; যা মশার উৎপত্তিস্থল। নিত্যদিন এমন সব অসংগতি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। নানা রকম দূষণে এ মহানগর যেন ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের চরম অব্যবস্থাপনা আর নাগরিকদের অসচেতনতাতেই সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। বেশ কিছুদিন ধরেই নগর অভিভাবকহীন। নেই কেনো নগরপিতা। এ মাসেই হতে যাচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিজয়ী নতুন মেয়রদ্বয়ের (উত্তর ও দক্ষিণ) কাছে নগরবাসীর প্রথম প্রত্যাশা দূষণমুক্ত নান্দনিক ঢাকার।

প্রতিবছরের আন্তর্জাতিক জরিপে বসবাস অযোগ্য নগর তালিকার শীর্ষে থাকে ঢাকা। যেকোনো দেশ ও জাতির জন্য এ প্রাপ্তি অত্যন্ত অসম্মানের ও অগৌরবের। নগরের অপরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবই মূলত দায়ী এ কলঙ্কের জন্য। সড়ক, ফুটপাত, বাজার, খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, লেকপাড়সহ পুরো নগরেই ধুলা-ময়লা। ডাস্টবিনের অভাবে চিপসের প্যাকেট, চকলেটের খোসা, পানীয় বোতল, বাদামের ঠোঙা, কাগজ ইত্যাদি যেখানে সেখানে ফেলছে নগরবাসী। এগুলো একদিকে যেমন নগরকে নোংরা করছে, তেমনি ড্রেনে মিশে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার। সড়কের দুই পাশে স্থাপনার দেয়ালে পোস্টার, দেয়াললিখন, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদির কারণে ঢাকার সৌন্দর্য ব্যাহত হচ্ছে চরমভাবে। এ ছাড়া নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে ফুটপাতে বসবাসরত ছিন্নমূল পরিবারগুলো নানাভাবে নষ্ট করছে নগরের পরিবেশ। পর্যাপ্ত গণশৌচাগার না থাকায় অধিকাংশ নাগরিক রাস্তার আশপাশে যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো গৃহস্থালি ও শিল্পবর্জ্যে চরম দূষণের শিকার। সব মিলিয়ে ঢাকা পরিণত হয়েছে চরম অব্যবস্থাপনার এক নগরে।

মহানগরের ধুলাদূষণ পৌঁছেছে অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে। শীত ও চৈত্রের এ সময়ে ধুলার মাত্রা বেড়ে যায় বহুগুণ। দমকা বাতাসে ও যানবাহন চলাচলে তা ছড়িয়ে পড়ে শহরময়। বিশেষ করে রাস্তার পাশের দোকান, অফিস ও বাসাবাড়িতে। ধুলা স্থাপনার বাহ্যিক সৌন্দর্যহানি ছাড়াও অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে ব্যাহত করে চরমভাবে। আসবাব, ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি, পোশাক, কার্পেট কোনো কিছুই বাদ যায় না এ থেকে। ঢাকার বাতাসে ধুলার সঙ্গে মিশে থাকে নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, সীসা, ক্যাডমিয়ামের মতো বায়ুদূষণকারী উপাদান। এসব উপাদান পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

চিকিৎসকদের মতে, অত্যধিক ধুলায় শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাসহ বাড়ে নানা রোগব্যাধি। বিশেষ করে বয়স্ক লোক ও শিশুরাই এতে দুর্ভোগের শিকার হয় বেশি। ধুলাবালিপ্রবণ এলাকাগুলোতে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, যক্ষ¥ারোগের প্রকোপ বেশি। খাবারের অরুচি, অ্যাসিডিটি, বদহজমসহ নানা ধরনের রোগের কারণ ধুলাবালি। রাস্তার পাশে বা ফুটপাতে অবস্থিত খাবারের দোকানে রাখা খাবারে জমছে ধুলা। এই ধুলার সঙ্গে নানা রোগ-জীবাণুও খাবারে মিশে মানুষকে সহজেই রোগাক্রান্ত করে তুলছে। মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার পাশাপাশি মানুষ সহজ শিকার হচ্ছে এসব রোগের; যার মধ্যে রয়েছে-

যেভাবে দূষিত হচ্ছে নগর

  • গৃহস্থালির বর্জ্য যথাস্থানে না ফেলে যেখানে-সেখানে ফেলা হচ্ছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের সময় যথাযথভাবে সংগ্রহ করছে না। কিছু ময়লা থেকে যাচ্ছে প্রতিদিনই। এ ছাড়ও আবর্জনা পরিবহনের সময় অসাবধানতা ও অবহেলার কারণে বর্জ্য রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে, যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে পরিবেশদূষণের।
  • দিন দিন বাড়ছে প্যাকেটজাত খাবারের চাহিদা। চিপস, চকলেট, বিস্কুট, পানীয় ইত্যাদির খালি প্যাকেট ও বোতল ডাস্টবিনে না ফেলে যেখানে-সেখানে ফেলায় নোংরা হচ্ছে নগর।
  • সংগত কারণেই প্রতিদিন সড়কে ধুলা-ময়লা জমছে। প্রতিদিন তা ঠিকমতো অপসারণ বা পরিষ্কার না করায় বাড়ছে দূষণ।
  • ভবন বা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রী রাস্তার ওপর ফেলে রাখায় ধুলাদূষণের সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার ওপর ও আবাসিক এলাকায় ইট ভাঙার মেশিনে ইট ভাঙার সময় ধুলা উৎপন্ন হয়ে সৃষ্টি করছে দূষণের।
  • দালানকোঠা বা অবকাঠামো ভাঙার সময়ও যথাযথ পদ্ধতি ও প্রতিরোধক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ধুলাদূষণ তৈরি হচ্ছে।
  • মাটি, বালু, ইটসহ নির্মাণ ও অন্যান্য সামগ্রী বহনে ঠিকমতো আচ্ছাদন দেওয়া হয় না। ফলে তা থেকে বাতাসে ধুলা ছড়াচ্ছে।
  • গ্যাস, পানি, টেলিফোন, স্যুয়ারেজ ইত্যাদি পরিসেবার ভূগর্ভস্থ সংযোগ প্রায় সব ক্ষেত্রে রাস্তার নিচ দিয়ে যায়। এসব পরিসেবার সংযোগ, মেরামত, বৃদ্ধি ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তা খনন করা হয়। খননে সৃষ্ট মাটি রাস্তার ওপরই স্তূপ করে রাখা হয়। নানাভাবে এই মাটি পুরো রাস্তা ও এর আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে দূষণ ঘটায়।
  • রাস্তার পাশের ড্রেন পরিষ্কার করার সময় ড্রেন থেকে তোলা আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে রাখা হচ্ছে, যা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং শুকিয়ে ধুলায় পরিণত হয়ে ধুলাদূষণ সৃষ্টি করছে।
  • বিভিন্ন এলাকায় ভাঙা ও ত্র“টিপূর্ণ রাস্তা দীর্ঘদিন মেরামত করা হয় না। এ থেকে প্রচুর ধুলা উৎপন্ন হয়। বাতাস বা যানবাহনের গতিতে এসব ধুলা সব সময় বাতাসকে দূষিত করছে। তা ছাড়া রাজধানীতে উড়ালসড়ক ও মেট্রোরেলের নির্মাণকাজেও প্রচুর ধুলার সৃষ্টি হচ্ছে।
  • ফুটপাতের ত্র“টিপূর্ণ গঠনের কারণে সহজেই ধুলা জমছে। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে এই ধুলা। 
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের যথাযথ উদ্যোগ, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার, লোকবলের অভাব ধুলা-আবর্জনা সৃৃষ্টির অন্যতম কারণ।

বেহাল ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (Waste Management) বলতে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, পরিবেশ বিপর্যয় রোধসহ নগরের সৌন্দর্য বজায় রাখতেই এ কাজগুলো করা হয়। এ ছাড়া একটি আদর্শ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনাকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। যেমন- খাবার বর্জ্য থেকে জৈবসার, বিদ্যুৎ বা বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী, কাচ ও সিরামিক, ধাতব পদার্থগুলোকে আবারও ব্যবহারের উপযোগী করা প্রভৃতি। কিন্তু রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তেমন তৎপরতা দেখা যায় না। তবে কিছু বেসরকারি এনজিও ও প্রতিষ্ঠান আবর্জনা রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া অসংখ্য দরিদ্র জনগোষ্ঠী ময়লা-আবর্জনার ভেতর থেকে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী প্লাস্টিক বোতল, কাগজ, ধাতব ও অন্যান্য বস্তু সংগ্রহ করে জীবিকা ধারণের পাশাপাশি রিসাইক্লিংয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। ময়লা-আবর্জনা সৃষ্টির বিভিন্ন উৎস রয়েছে। এর অন্যতম-

এসব বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্ট বর্জ্য-আবর্জনাসমূহকে আবার কয়েক ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন-

আবর্জনার বিভিন্ন ধরন ও উপযোগিতা থাকলেও এ দেশের অধিকাংশই ডাম্পিং করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। কিছু আবর্জনা পুড়িয়েও ফেলা হয় কিন্তু সেগুলো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না তা বিবেচনা করা হয় না। এসবের মধ্যে অনেক পুনর্ব্যবহারযোগ্য আবর্জনাও থাকে। যেমন-

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঢাকা সিটি করপোরেশন

সীমিত জনবল, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যানবাহনসংকট ইত্যাদি সীমাবদ্ধতা নিয়ে নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা সিটি করপোরেশন। দীর্ঘদিন এ দায়িত্ব পালন করলেও এখনো সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা আনতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। নগরের নাগরিকদের জন্যও নেই তেমন কোনো দিকনির্দেশনা। ফলে নগরকে কোনোভাবেই দূষণমুক্ত করা যাচ্ছে না। ভোর ছয়টার আগেই নগরের সড়ক ঝাড়ু দেওয়া ও আবর্জনা পরিষ্কার করার নিয়ম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। কিন্তু সকাল নয়টার পরও সড়ক ঝাড়ু দিতে দেখা যায়, এমনকি তারা রাস্তায় নামে আটটার পরে। বেলা ১১টার দিকেও তারা ডাস্টবিনের ময়লা সংগ্রহ করে। এরপর কর্মব্যস্ত সড়ক দিয়েই খোলা বা অর্ধঢাকা আবর্জনাবাহী ট্রাক চলাচল করে, যা থেকে বাতাসে ময়লা ও দুর্গন্ধ ছড়ায়। জনসাধারণের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত বিরক্তিকর। সিটি করপোরেশনের থেকে কখনো কখনো ধুলাবহুল জায়গায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু তা খুব একটা কাজে আসছে না। কিছুক্ষণ বাদে আবার সৃষ্টি হচ্ছে ধুলার।

প্রতিদিন রাজধানীতে কী পরিমাণ বর্জ্য উৎপাদিত হয়, তার সঠিক কোনো হিসাব নেই ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে। তবে সিটি করপোরেশন সূত্র থেকে যে ধারণা পাওয়া যায় এতে অনুমান করা যায়, ঢাকায় প্রতিদিন চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। তবে বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষা মতে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে ডাম্পিং হয় ৩ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন নগরে মাথাপিছু উৎপাদিত বর্জ্য ৫৬০ গ্রাম। ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, মহানগরের রাস্তার পাশে বর্জ্য ফেলার জন্য প্রায় সাড়ে চার শ কন্টেইনার বসানো হয়েছে। বর্জ্য অপসারণের জন্য জাপানি উন্নয়ন সংস্থা বা জাইকার কাছ থেকে পাওয়া ১০০টি গাড়ির সাহায্যে এসব ঢাকনাবদ্ধ কন্টেইনারে বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া বাড়তি বর্জ্য খোলা ট্রাকের মাধ্যমেও স্থানান্তর করা হয়। তবে তা নগরের আয়তন এবং জনসংখ্যার তুলনায় যথেষ্ট নয়। এ ছাড়া অবৈজ্ঞানিক এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে প্রতিদিন সৃষ্ট বর্জ্যরে অনেকটাই থেকে যায় রাস্তাঘাটে কিংবা বাড়ির আশপাশে। বৃষ্টি ও বাতাসে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ড্রেনে মিশে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে, যা পরিবেশ বিপর্যয়সহ নানা রকম নাগরিক দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠছে। এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের ডাম্পিং ব্যবস্থা পরিবেশবান্ধব নয়। অপরিকল্পিত ডাম্পিংয়ে একের পর ভরাট হচ্ছে খাল-বিল। 

পৃথক হয়নি মেডিকেল বর্জ্য

নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে এখনো আলাদা করা যায়নি মেডিকেল বর্জ্যকে। স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ বর্জ্য আলাদা না করে এখনো ফেলা হয় ডাস্টবিন, রাস্তাঘাটসহ যত্রতত্র। রাজধানীর সরকারি হাসপাতাল ছাড়াও এক হাজারেরও অধিক ছোট-বড় প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ম মানছে না। ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ, রক্ত ও পুঁজযুক্ত তুলা, গজ, ব্যান্ডেজ, মানব-প্রত্যঙ্গ, ওষুধের শিশি, ব্যবহৃত স্যালাইন, রক্তের ব্যাগ, রাসায়নিক দ্রব্যসহ সব ধরনের চিকিৎসা আবর্জনা বিশেষ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার নিয়ম রয়েছে। সুনির্দিষ্ট আইন, প্রচার ও অসচেতনতার কারণেই এসব বর্জ্য যথাযথভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ না করায় ছড়িয়ে পড়ছে হেপাটাইটিস ‘বি’, হেপাটাইটিস ‘সি’, যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া এমনকি বাড়ছে এইডসের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি। নিয়ম হলো, এসব বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করে ‘বায়োমাস’ পদ্ধতিতে ১২০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলা। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

বন্ধন

পরিশোধিত হচ্ছে না শিল্পবর্জ্য

বর্জ্য শোধনাগার কেন্দ্র (ইটিপি) স্থাপন না করেই চলছে রাজধানীসহ আশপাশের শিল্পকারখানা। ট্যানারি, গার্মেন্টস, রাসায়নিক শিল্প থেকে লাখ লাখ ঘনমিটার তরল ও কঠিন বর্জ্য নির্গত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানাগুলোতে বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় নগরের ২২ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপে বলা হচ্ছে, ৩০টি কঠিন রোগের অন্যতম কারণ দূষণ। বর্জ্যদূষণের কারণে রাজধানীর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় অতিরিক্ত হারে বেড়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর আশপাশের সবগুলো নদী ব্যাপক দূষণের শিকার। ফলে নদীগুলো নগরের সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে রাখতে পারছে না তেমন অবদান।

অপ্রতুল রিসাইক্লিং ব্যবস্থা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্জ্য-আবর্জনা থেকে শিল্পের কাঁচামাল পেতে নতুন রিসাইক্লিং আইন রয়েছে। ইউরোপে বর্জ্যশিল্পের আয়তন বর্তমানে ৫০ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো মান্ধাতা আমলের। যে বর্জ্য থেকে উৎপাদন হতে পারত বিদ্যুৎ, জৈবসারসহ মূল্যবান সম্পদ, সেখানে এ বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ডাম্পিং করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অবশ্য সীমিত পরিসরে পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতলসহ শিল্পজাত কিছু কিছু বর্জ্যকে এ দেশেও কাজে লাগানো হচ্ছে। অথচ ঢাকা শহরে উৎপাদিত বর্জ্যরে অধিকাংশই রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। গবেষণা মতে, ঢাকা শহরে বর্তমানে উৎপাদিত ১২৮ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্যরে শতকরা ৮৩ ভাগ রিসাইকেল হয়। এ ছাড়া কাগজ বর্জ্য উৎপাদিত হয় ২৬০ মেট্রিক টন এবং রিসাইকেল হয় যার শতকরা ৬৫ ভাগ; কাচ জাতীয় বর্জ্য উৎপাদিত হয় ৪৬ মেট্রিক টন এবং রিসাইকেল হয় শতকরা ৫২ ভাগ; ধাতব বর্জ্য উৎপাদিত হয় ২৭ মেট্রিক টন এবং রিসাইকেল হয় শতকরা ৫০ ভাগ এবং জৈব বর্জ্য উৎপাদিত হয় ২ হাজার ২১১ মেট্রিক টন এবং তা রিসাইকেল হয় না বললেই চলে। এসব রিসাইক্লিং হয়ে থাকে মূলত ব্যক্তিমালিকানায়। বেসরকারি সংগঠন ওয়েস্ট কনসার্নের মতে, ঢাকা শহরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার দরিদ্র মানুষ এই রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে জড়িত। প্রতিদিন ৪৫০ টন বর্জ্য এভাবে পরিশোধন হয়ে প্রতিবছর আয় হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিসর

ধরনউত্তরদক্ষিণ
আয়তন (বর্গ কি.মি.)৭৫৪২
বর্জ্য উৎপাদন (২০১২ জুন)২১৮৬ টন১৯৩৮ টন
বর্জ্য সংগ্রহ (২০১২ জুন)১১০০১৪০০
কন্টেইনার১৮০২৭০
সংগ্রাহক যানবাহন১১৫২৩৫
দাপ্তরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী২৫৭৩৫২
পরিচ্ছন্নতাকর্মী২৬৬১৫৩০০

সিটি করপোরেশনের যত সীমাবদ্ধতা

  • জনবলের অভাব, বিশেষত ব্যবস্থাপনা ও টেকনিক্যাল ব্যক্তি
  • পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব
  • সিটি করপোরেশনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা
  • দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকা
  • আইনের সীমাবদ্ধতার অভাব এবং প্রয়োগ না থাকা
  • পরিবেশ শিক্ষার প্রকট অভাব
  • বাজেটস্বল্পতা
  • নতুন নতুন আবর্জনাযুক্ত হওয়া।

একটি শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি দায়িত্ব নাগরিকদেরও। এমনকি নগর পরিষ্কার রাখতে নাগরিকেরাই অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন- যেখানে সেখানে আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা। সরকারের একার পক্ষে আইন করে বা ক্ষমতা প্রয়োগ করে একটি দেশকে পরিচ্ছন্ন করা সম্ভব নয়। তবে সরকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কিছু উপায় বের করতে পারে। যেমন- আমাদের এখানে রাস্তায় ময়লা ফেলার সুব্যবস্থা নেই, তাই পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া আবর্জনার সঠিক পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সড়কে, বাসস্ট্যান্ডে, স্কুলে, পার্কে তিন খোপবিশিষ্ট ওয়েস্ট বিন বসানো যেতে পারে। যেগুলোর প্রতিটি আলাদা আলাদা রং করা থাকবে। একটিতে পলিথিন বা বোতলজাত দ্রব্য, অন্যটিতে কাগজ বা কাপড় এবং বাকিটিতে ধুলা-ময়লা ফেলানোর জন্য। এ ছাড়া উন্নত দেশের মতো রাত্রিকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা। অর্থাৎ নিয়ম থাকবে গৃহস্থালিসহ অন্যান্য বর্জ্য সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং তা প্রশাসন নিজ ব্যবস্থাপনায় রাতের মধ্যে সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া, যেন সকালের শহরটা হয় ঝকঝকে-তকতকে। এ ছাড়া সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন নগর গড়তে-

  • যথাস্থানে আবর্জনা ফেলা
  • নগরে পর্যাপ্ত ওয়েস্টবিনের ব্যবস্থা করা
  • প্রতিদিনই নগরের সড়ক, পার্ক, ফুটপাত পরিষ্কার করা
  • নগরের সব ধরনের ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে ফেলা
  • গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণ ও বিশেষ যানবাহন সরবরাহ করা
  • গৃহস্থালি, শিল্প, দাপ্তরিক ও হাসপাতালের বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ এবং ডিসপোজাল করা
  • রাত ১০টা থেকে ভোর চারটার মধ্যে ডাস্টবিন বা নির্দিষ্ট স্থানে আবর্জনা ফেলা
  • পরিসেবার সংযোগ মেরামত, বৃদ্ধি ও নতুন সংযোগ স্থাপনের সময় রাস্তা খননে সৃষ্ট মাটি ভালোভাবে অপসারণ করা
  • ভবন বা অন্য কোনো অবকাঠামো নির্মাণকালে ব্যবহৃতসামগ্রী রাস্তায় না রাখা
  • নির্মাণকাজ ও ভবন ভাঙার সময় যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা
  • ধুলা সৃষ্টি হতে পারে এমন কিছুকে বহনের সময় ঢেকে দেওয়া
  • ড্রেনে আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকা
  • ড্রেন পরিষ্কার করে আবর্জনা রাস্তার পাশে জমিয়ে না রাখা
  • দোকান বা প্রতিষ্ঠানের আবর্জনা দিনের পরিবর্তে রাতে ফেলা
  • সিটি করপোরেশন কর্তৃক আবর্জনা সংগ্রহ ও পরিবহনের সময় যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা, যাতে আবর্জনা ছড়িয়ে না পড়ে
  • রাস্তা নিয়মিত মেরামত এবং মেরামতের সময় কালক্ষেপণ না করা
  • পলিথিনের ব্যবহার কমানো
  • যেখানে সেখানে থুথু ও পানের পিক ফেলা থেকে বিরত থাকা
  • যেখানে-সেখানে আবর্জনা যেন না ফেলা হয়, সে জন্য কার্যকর আইন প্রণয়ন করা
  • সড়কদ্বীপের দেয়াল কিছুটা উঁচু করা, যাতে পানি দিলে বা বৃষ্টিতে কাদামাটি না বেরোতে পারে।

রাজধানীর অপরাধ প্রবণতা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। অপরাধবিষয়ক গবেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নোংরা পরিবেশ অপরাধবোধকে উসকে দেয়। আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক পরিবেশ মানুষের ভেতরের পাশবিকতাকে দমন করে মানবিক করে তোলে। তা ছাড়া রোগ-জীবাণুকে দূরে রেখে শারীরিক সুস্থতার জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমরা যেভাবে ঘর পরিষ্কার করি, সেভাবেই নগর পরিষ্কার করতে হবে। পরিবারের বড়রা যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে, তেমনি শিশুদের মধ্যেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়ক বিভিন্ন পাঠ্য ও ক্যাম্পেইনিং করানো যেতে পারে। এ ছাড়া এলাকাগতভাবে এটাকে সামাজিক আন্দোলন হাতিয়ারে পরিণত করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে-

  • এলাকাগতভাবে কমিউনিটি ও কমিটি করা
  • নিয়মিত আলোচনা করা
  • স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা
  • পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা
  • বিভিন্ন সংগঠন ও এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত প্রয়াস নেওয়া
  • রিসাইকেলিং, জৈব সার, বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি ব্যবস্থাপনায় যুবসমাজ তথা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা।
  • দেশীয় পদ্ধতিতে উন্নতমানের কারিগরি উপকরণ তৈরি করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখা
  • সব ধরনের গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।

অমিত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। অনেক অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার ঘেরাটপে থেকেও দেশ এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে নানা ধরনের শিল্পকারখানা। উৎপাদনের চাকাও হচ্ছে সচল। যেহেতু রাজধানীকেন্দ্রিক আমাদের অর্থনৈতিক পরিসর, সে কারণে সার্বিক দূষণের ভয়াবহ কবল থেকে ঢাকাকে রক্ষা করা না গেলে মহানগর একসময় স্থবির হয়ে পড়বে। ব্যাহত হবে বিদেশি বিনিয়োগ, এ দেশ থেকে উদ্যোক্তারা পাড়ি জমাবেন অন্যত্র। এ জন্য একটি পরিবেশবান্ধব দূষণমুক্ত ঢাকা গড়ে তুলতে হবে। একটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নান্দনিক নগর দূর করতে পারে অপরাধ, রোগব্যাধি। হীনম্মন্যতা এনে দিতে পারে ব্যাপক পর্যটন সম্ভাবনা। নবাগত মেয়রদ্বয়ের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা, দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন এক নগরের।

নগর পরিকল্পা বিশেষজ্ঞ, নগর গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু পরিকল্পনা দিয়ে কিছু হয় না, যদি তা বাস্তবায়ন না হয়।

তিনি বলেন, ঢাকাকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অনেক বিষয়ের প্রতি এখনই নজর দেওয়া প্রয়োজন। নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবহন, নদীনালা, খাল, ফুটপাত প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এসব কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব লক্ষণীয়। বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বিত কর্মপন্থার প্রয়োজন। এ জন্য অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে ঢাকার দুই নগরপিতাকে। যিনি নগর পিতা হবেন, তাঁর প্রধান কাজ হবে নাগরিকবান্ধব নগর গড়ে তোলা।

অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম বলেন, এই নগরের জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আবাসন, নগরবাসীর টয়লেট-সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। কয়েক বছর ধরেই ঢাকাকে নিয়ে পরিকল্পনা হচ্ছে। আর শুধু পরিকল্পনা দিয়ে কিছু হয় না, যদি তা বাস্তবায়ন না হয়। বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে এখনই।

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬০তম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৫

মারুফ আহমেদ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top