ঢাকা নগরীর ট্রাফিক চলাচলব্যবস্থা (শেষ পর্ব)

সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো অন্ত নেই। তাই আমাদের জীবনটাই সমস্যাবহুল। অর্থনীতির ভাষায়, ‘অভাব অফুরন্ত, আয় সীমিত, সময় সীমাবদ্ধ’। তাই সব সীমাবদ্ধতা ও চাহিদার সঙ্গে সংগতি রক্ষা করে পথ চলার কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় নিত্যনতুন সমস্যার। অতএব, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে তার সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে বের করা, বিদ্যমান সমস্যার প্রতিকার করা এবং সম্ভাব্য সমস্যাবলির প্রতিরোধ নিশ্চিত করে পথ চলার নামই জীবন।

তাই, আমি আমার ব্যক্তিজীবনে নানা সমস্যা সমাধান করে চলার মধ্যে ঢাকা শহরে নিত্যদিনের ‘ট্রাফিক জ্যাম’-এর ক্রমবর্ধমান দৃশ্য অবলোকনকরত প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ এবং সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। কিন্তু বিরাজমান পরিস্থিতির কোনো প্রতিকার কিংবা প্রতিরোধব্যবস্থা আমার হাতে না থাকায় লেখালেখির মাধ্যমে বৃথা আস্ফালন করা ছাড়া অন্য কোনো গত্যন্তর দেখি না। দুর্বলের সবল হাতিয়ারÑকিছু করতে না পারলেও কিছু বলা, সেই মানসিকতা নিয়ে ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকল্পে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে আসছি দীর্ঘদিন যাবৎ।

আমার প্রাতিষ্ঠানিক ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা এবং সুদীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে ঢাকা শহরের অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের সমাধানসংক্রান্ত চিন্তার ফসল হিসেবে যেসব কারণ আমি খুঁজে পেয়েছি, তা বিভিন্ন সময় নানা পত্রিকার মাধ্যমে সবিস্তারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতির কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত না হওয়ায় সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব/সুপারিশমালা আশু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পুনরায় তুলে ধরছি। আমার বিশ্বাস, বর্ণিত বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে বিদ্যমান সমস্যার সমূহ উন্নতি ঘটানো সম্ভব যা এখন সময়ের দাবি।

প্রতিদিন বেড়ে চলা অসহনীয় ট্রাফিক জ্যামের কারণে নাকাল, নাজেহাল ঢাকা শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে যে যে সুপারিশগুলো অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা দরকার;

  • সড়কে পার্কিং বন্ধ করা
  • ফুটপাত দখলমুক্ত করা
  • অদক্ষ এবং প্রশিক্ষণবিহীন ড্রাইভার দ্বারা গাড়ি চালানো বন্ধ করা
  • অটোমেটিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করা এবং তা মেনে চলতে বাধ্য করা
  • টাউন সার্ভিস বাসসমূহ অলটারনেটিভ স্টপেজে দাঁড়ানোর জন্য পলিসি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা
  • টাউন সার্ভিস বাসের জন্য স্টপেজ নির্ধারণ করা এবং যত্রতত্র বাস থামাতে না দেওয়া
  • দ্রুতগতি এবং ধীরগতিসম্পন্ন গাড়ির জন্য আলাদা আলাদা লেন তৈরি করা
  • ঘন ঘন লেভেল ক্রসিং বন্ধ করা
  • সব পথচারীকে জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারে বাধ্য করা
  • নিয়মনীতি কিংবা ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীকে তাৎক্ষণিক অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত করা প্রভৃতি।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতিটির ক্ষেত্রেই চরম অনিয়ম বিদ্যমান, যার কারণে কোনোভাবেই ট্রাফিক চলাচলব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না আর এটাই চরম বাস্তবতা। একটি দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। তাই ঢাকা শহরের রাস্তার বিরাজমান পরিস্থিতিতে ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠিন প্রয়োগ প্রয়োজন। এ ছাড়া সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সম্ভাব্য স্থানসমূহে রাস্তা প্রশস্ত করা এবং ছোট গাড়িগুলো চলাচল করতে পারে এমনভাবে ডিজাইনকৃত ভেইকুলার আন্ডারপাস নির্মাণ করা অত্যাবশ্যক।

আমার দেখা ও জানামতে, বিভিন্ন দেশে লেভেল ক্রসিংগুলো ভেইকুলার আন্ডারপাসের মাধ্যমে পাস করানো হয়েছে, যা নির্মাণ ব্যয়সাশ্রয়ী এবং ট্রাফিক জ্যাম কমানোর জন্য খুবই কার্যকর একটা ব্যবস্থা। ঢাকা শহরের এমন অনেক লেভেল ক্রসিংকে ভেইকুলার আন্ডারপাসের মাধ্যমে পাস করানো সম্ভব বলে আমি মনে করি। উদাহরণস্বরূপ গুলিস্তান, শাহবাগ, বাংলামোটর, মগবাজার, বিজয় সরণি, মিরপুর-১০ নম্বর ইত্যাদি ট্রাফিক পয়েন্টে প্রয়োজনে   ভূ-অভ্যন্তরীণ সার্ভিস কানেকশনগুলোকে স্থানান্তর করে ভেইকুলার আন্ডারপাস নির্মাণ করা যেতে পারে।

এ ধরনের আন্ডারপাসের একটি ডিজাইন এবং মডেল তৈরি করে দীর্ঘদিন যাবৎ আমি সেটাকে লালন করছি। কিন্তু কোথাও উপস্থাপন করার মতো তেমন কোনো সুযোগ পাইনি। তৈরি করা সেই মডেলটির একটি ফটোগ্রাফ সংযোজন করা হলো। প্রয়োজনে প্রস্তাবিত সাইটসমূহের বাস্তব অবস্থা জরিপ করে নির্মাণসংক্রান্ত সব ধরনের পরামর্শ দেওয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। এই পৃথিবীতে সমাধানবিহীন কোনো সমস্যা নেই, যত সমস্যা আছে, তার অধিক সমাধান আছে। কে কোন সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করবে, সেটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও লব্ধ জ্ঞানের ওপর।

আমাদের দেশে অনেক কিছুই হয়, বাংলায় প্রবাদ-‘মশা মারতে কামান দাগা’ এমন কিছু বিষয়ও দেখা যায় মাঝেমধ্যে। বিদ্যমান নানা সমস্যা সমাধানকল্পে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে এমন অনেক কাজই বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়, যার ফলাফল দীর্ঘ মেয়াদে সুফল বয়ে আনার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ফলে জনজীবনের ভোগান্তি কোনো কোনো সময় কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যায়। তাই, যেকোনো সমস্যার প্রকৃত কারণ নির্ণয় করে তার প্রতিকার এবং প্রতিরোধকল্পে সুচিন্তিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।

শেষে এসে বলতে চাই, ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের কারণে জনভোগান্তিসংক্রান্ত বিষয়গুলো বারবার উত্থাপিত হলেও বাস্তবায়নকারী সংস্থা কর্তৃক কার্যকর এবং টেকসই কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয় না। মাঝেমধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হলেও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না। এমতাবস্থায়, উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়নকল্পে নিরবচ্ছিন্ন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধমে বিরাজমান অবস্থার উন্নয়ন ঘটানোর লক্ষ্যে যে যার জায়গা থেকে সচেষ্ট হোন, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করে এখানেই শেষ করছি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৯।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top