আইএসও-৯০০১ : ২০০৮ সনদ (পর্ব ২)

….পূর্ব প্রকাশের পর

আইএসও সনদের বিভিন্ন শাখা বা সিরিজের মধ্যে ‘আইএসও ৯০০১ (কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ১৪০০০ (এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ৫০০০১ (এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ২২০০০ (ফুড সেফ্টি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ৩১০০০ (রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ২৭০০১ (ইনফরমেশন সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ৩৭০০১ (অ্যান্টি ব্রাইবারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম), ‘আইএসও ৪৫০০১ (অকুপেশনাল হেলথ অ্যান্ড সেফ্টি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া এসব সিরিজের রয়েছে নানা ভার্সন, যা যুগের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে অত্র সিস্টেমের ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হয়ে থাকে। যেমন ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০০১ থেকে ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০০৮ এবং ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০০৮ থেকে ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০১৫-তে উন্নীত হয়েছে, যা ২০১৮ সাল থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ ২০১৮ সালের পর থেকে ‘কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’-এর ওপর যে সনদ দেওয়া হবে সেখানে ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০০৮ সার্টিফাইডে’র স্থলে ‘আইএসও ৯০০১ ঃ ২০১৫ সার্টিফাইড’ উল্লেখ থাকবে।

যা হোক ‘আইএসও সনদসংক্রান্ত বিষয়াবলি আমাদের দেশে এখনো ততটা প্রচার-প্রসার না পাওয়ায় এর প্রকারভেদসহ নানা খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে আমাদের অজানা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (টিকিউএম) সিস্টেম চর্চার কার্যকারিতা ও যথার্থতা মূল্যায়ন করার জন্য ‘আইএসও সনদ’কে একটি পরিমাপক যন্ত্র হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। কিন্তু সর্বজনীনভাবে টিকিউএম চর্চা করার বিষয়টিতে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। ফলে, ‘আইএসও সনদ প্রাপ্তির বিষয়টিও আমাদের দেশে এখনো মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠান এবং সিস্টেমের ওপরই সীমাবদ্ধ।

তারপরও বলতে চাই, বাংলাদেশের অতীত আর বর্তমান অবস্থার তুলনা করলে দেখা যাবে তুলনামূলকভাবে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে কোয়লিটি সম্পর্কিত সচেতনতা বেড়েছে অনেক, যা উত্তরোত্তর বাড়বে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। যে দেশের সাধারণ মানুষ একসময় টিকিউএম কিংবা আইএসও সনদের নামই জানত না, সেখানে আমরা এখন এগুলো নিয়ে চিন্তা তথা চর্চা করছি এবং চেষ্টা করছি অত্র চর্চাসমূহের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে সার্বিক কর্মপরিবেশ ও পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে, যা লক্ষণীয় একটি বিষয়। বলাই বাহুল্য, দেশ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে করে টিকিউএম চর্চা করা এবং আইএসও অর্জন করার মতো বিষয়গুলো আমাদের কাছে একসময় অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে এবং এ সম্পর্কে তখন নতুন করে আর কাউকে কোনো কিছু বোঝাতে হবে না।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, টিকিউএম চর্চা কিংবা আইএসও সনদ অর্জন করার জন্য বিশেষ কোনো আয়োজনের দরকার নেই, প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন শুধু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। যাতে আমরা আমাদের প্রতিটি কাজ ও উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে আত্মপ্রণোদিত হয়ে সংশ্লিষ্ট সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারি। মনে রাখা দরকার, ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’ এবং মানুষের সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার জন্যই মানুষ কর্তৃক সম্পাদিত সব কাজের গুণগত মান রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা আমাদের এই দায়িত্ব ও কর্তব্য কতটুকু সঠিকভাবে পালন করতে পারছি তা পরিমাপ করার জন্য টিকিউএম চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সর্বোপরি, এসব কাজের ফলাফল বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংশোধন কিংবা সংযোজন করাসহ সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘ক্রেতাসন্তুষ্টি’ জরিপ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যা অবশ্যকরণীয়।

সুতরাং আমাদের সব ধরনের সেবা এবং উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে এতদ্সংক্রান্ত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন অপরিহার্য, যা নিশ্চিত করতে পারলেই টিকিউএম চর্চা কিংবা আইএসও সনদ অর্জনের বিষয়গুলো পদ্ধতিগতভাবেই এসে যায়। এ জন্য আলাদা কোনো নিয়ম বা অনুশীলনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ‘ক্রেতাসন্তুষ্টি’ জরিপ করার ব্যাপারে আমরা কতটুকু ওয়াকিফহাল? অত্র বিষয়টি আদৌ আমলে নিচ্ছি কি না কিংবা ‘ক্রেতাবা ক্রেতাসন্তুষ্টি’ বলতে কী বুঝি, সেই জায়গায় ঢুকতে পেরেছি কি না, সেটিই মুখ্য বিষয়।

আমাদের প্রচলিত সমাজে কীভাবে কত দ্রুত ব্যবসায়িক প্রসার ঘটাতে পারি সে ব্যাপারে আমরা সদা সজাগ থাকলেও একই ব্যবসায় দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য কী করা দরকার সে ব্যাপারে অনেক পেছনের কাতারে অবস্থান আমাদের। উন্নত বিশ্বে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে করণীয় সব বিষয়ের ওপর তীক্ষè নজরদারির মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করেছে এবং তাদের ব্যবসায়িক পরিধি বাড়ানোর জন্য সার্বিকভাবে সচেষ্ট প্রতিনিয়তই। ফলে, ক্রেতাসন্তুষ্টি জরিপের বিষয়টি তাদের কাছে হয়ে দাঁড়ায় মুখ্য। অথচ আমরা অত্র বিষয়টি আমলে না নিয়ে কীভাবে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বাড়ানো যায় সে চিন্তায় বিভোর থাকি সব সময়। কিন্তু এটি যে কোনো বিচারেই সঠিক নয় এবং এর যে সুদূরপ্রসারী একটা কুফল আছে তা একবারও ভেবে দেখি না। ভাবি না সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিটি কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে হবে মহান স্রষ্টার কাছে।

অতএব, ক্রেতা কে? ক্রেতাসন্তুষ্টির প্রয়োজনীয়তা কী? কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়? ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবারই ভাবা দরকার। এমনই একটি ভাবনার মাঝে হঠাৎ করেই একদিন নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই, যা প্রায়ই আমি বিভিন্ন জায়গায় বলে থাকি। টিকিউএমের ওপর লেখা একটি বিদেশি বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে Customer satisfaction অধ্যায়ে এসে প্রথম যে টপিকটা আমার চোখে পড়ল Who is customer? আমার কাছে অতি স্বাভাবিক একটি প্রশ্নের অস্বাভাবিক এক উত্তর পেলাম সেদিন। কাস্টমার বলতে সাধারণ অর্থে আমরা যা বুঝি, তা হলো ভোক্তা বা ইন্ড ইউজার (en user)। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে যাঁরা আমাদের প্রদত্ত সেবা গ্রহণ করে কিংবা আমাদের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করে তাঁরাই আমাদের ভাষায় কাস্টমার।

আর এই কাস্টমার সন্তুষ্টির ব্যাপারটি আমাদের মাথাতেই আসে না। যদিও কাস্টমারকে সমাদর করা কিংবা তুষ্ট করার জন্য বাংলা ভাষায় ‘কাস্টমার লক্ষ¥ী’ বলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে, কিন্তু সেটা শুধু মুখে ও কাগজে বললে বোধ হয় অত্যুক্তি হবে না। যা হোক, সেদিন টিকিউএম সম্পর্কে লেখা বিদেশি ওই বইয়ের ভাষায় ‘ক্রেতা এবং ক্রেতাসন্তুষ্টি’র ব্যাপারে যে তথ্য আমি পেলাম তা অবিস্মরণীয় এবং সবার জন্য শিক্ষণীয় একটি বিষয়। তাদের ভাষায় ক্রেতা কে? শুধু এই সংজ্ঞাটিই যদি আমরা আত্মস্থ করতে পারি তা হলেই ক্রেতাসন্তুষ্টির ব্যাপারটিও অটোমেটিক এসে যায়। Who is customer? এর উত্তরটি উপরোল্লিখিত বইয়ের ভাষায় যা ছিল- There are four types of customers, they are as given below:

  1. first customer is yourself; you have to be satisfied first, on your products or services those are being delivered by you.
  2. Second customer is your organization; to whom you are working for; you have to satisfy them delivering your products or services.
  3. Third customer is the end user, who is intended to use or avail your products or services; they shall have to be satisfied by using or availing your products or services.
  4. The last & forth customer is the creator, to whom we are liable to explain about all of our activities. Thus, we have to satisfy the creator that, the activities those were being done by us were satisfactory to serve the purposes of a human being.

সে দিনের এই কঠিন প্রশ্ন-উত্তরের মুখোমুখি হয়ে আমার দিব্যচোখ খুলে যায়। কোথায় আমরা আর কোথায় আমাদের মানসিকতা? আর কোথায় বিদেশিরা? তাই আমি বলতে চাই, আমরা সবাই মানুষ এবং ধর্ম-মতনির্বিশেষে সব মানুষের সংজ্ঞাই এক এবং সেটাই হওয়া উচিত। অতএব, ক্রেতাসম্পর্কিত উপরোল্লেখিত সংজ্ঞাগুলো যদি আমরা আমাদের মাথায় ঢোকাতে পারি তাহলে ক্রেতা কে? ক্রেতাসন্তুষ্টি বলতে কী বোঝায়? এর আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে বলে আমার মনে হয় না। এরপরও স্মরণ রাখা দরকার, ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ মানুষের পাশাপাশি মুসলমান হিসেবেও আমরা দাবীদার। সেই মুসলমানিত্বের সংজ্ঞা যদি দেখি তবে কাস্টমারের প্রথম ও চতুর্থ সংজ্ঞা দুটিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলেই আর কোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না। আমরা মানসম্মত এমন পণ্য উৎপাদন করি, যা গ্রহণ বা ব্যবহার করে ক্রেতারা তাঁদের সন্তুষ্টি অবশ্যই খুঁজে পেতে পারেন।

যা হোক, উল্লেখিত বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা দরকার এবং তা নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু কর্ম পরিকল্পনা এবং নিয়মনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। আর এই অত্যাবশ্যকীয় বিষয়টি আমলে নিতে পারলেই টিকিউএম এবং আইএসও সনদপ্রাপ্তির বিষয়গুলো এমনিতেই এসে যাবে।

চলবে…..

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৭৯তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৬।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top