হাজার বছরেও অবিচল বৃহদেশ্বর মন্দির

রোমান সভ্যতার অনন্য এক মাস্টার পিস হিসেবে পিসার হেলানো টাওয়ারের কথা কেই বা না জানে! তবে এটি টাওয়ার হিসেবে যতটা না বিখ্যাত তার উচ্চতার জন্য, তার চেয়েও বেশি খ্যাত এর হেলে পড়ার কারণে! লন্ডনের বিগ বেনও বেশ কিছুটা হেলে পড়েছে যা ভবিষ্যতে আরও হেলে পড়বে! তা এখন কি তবে আমরা এর নির্মাতাদের দোষ দেব, যে কী বানিয়েছে এসব যা টেকে না! তা বোধ হয় বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে না। কারণ, এগুলো সাধারণ কোনো ভবন নয়। এগুলো কিন্তু আকাশচুম্বী সুউচ্চ টাওয়ার। আর আপনাকে মেনে নিতেই হবে যে সেই আমলে নিশ্চয় আজকের মতো এত আধুনিক নির্মাণসামগ্রী আবিষ্কৃত হয়নি। তবে এখন আসি, এক হাজার বছরের পাথরের তৈরি একটা প্রাচীন টাওয়ার মন্দিরের কথায়, যা কি না সুউচ্চ হওয়ার পরেও হাজার বছরেও এতটুকুও হেলেনি। তাহলে নিশ্চয় মাথায় আসবে এটি নির্মাণে বোধহয় খুব মূল্যবান উন্নতমানের সিমেন্ট-বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এমনটিই যদি ভেবে থাকেন পাঠক, তবে তৈরি হোন অবাক হওয়ার জন্য।

আজ শোনাব এক হাজার বছর পুরোনো এক টাওয়ার টেম্পলের গল্প। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বৃহদেশ্বর মন্দিরের গল্প। এই মন্দিরটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে শত শত বছর ধরে আরাধনার স্থান হিসেবে সম্মানিত। এখানে সনাতন ধর্মের মানুষেরা নিয়মিত আসেন ধর্মীয় আচারে যোগ দিতে। এই টাওয়ার মন্দিরটির মূল টাওয়ারটির পুরোটাই তৈরি পাথরে। পাথর দিয়ে তৈরি না বলে আরেকটু ভালো হয় যদি বলি ‘পুরোটাই’ তৈরি শুধু পাথর দিয়েই। জি, ভুল শুনছেন না মোটেও। একটির ওপর আরেকটি বিশালাকার পাথর বসিয়েই বানানো হয়েছে এর পুরোটা। পাথরে পাথরে জোড়া দিতে ব্যবহার করা হয়নি কোনো ধরনের সিমেন্ট, সুরকি, কাদা, বালু, মাটি বা অন্য কিছু!

এবার ভাবছেন তাহলে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে এই অদ্ভুত স্থাপনা? এবার নিশ্চয় ভাবছেন যে তাহলে নিশ্চয় আসল কারসাজি লুকিয়ে আছে এর মূল ভিত্তিতে। হয়তো মাটির অনেক গভীর পর্যন্ত খুঁড়ে এর ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। যদি এমনটিই ভেবে থাকেন পাঠক, তবে আপনাকে হতাশ করতে হচ্ছে। আপনাকে আরও একটু বিস্মিত করব এবার। মাটির নিচে এর কোনো ধরনের ভিতই নেই! এর পুরোটাই মাটির ওপরে! শুধু পাথর দিয়েই তৈরি, কোনো ধরনের সিমেন্ট, বালু, কাদা, মাটি বা সুরকির ব্যবহার নেই, সেই সঙ্গে নেই কোনো ভূগর্ভস্থ ভিত। তাও হাজার বছর ধরে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে! সাহিত্যিকের ভাষায়, এক চুলও হেলে পড়েনি আর বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এক ডিগ্রিও হেলে পড়েনি এই স্থাপনা।

অনেক রহস্য করেছি পাঠক। আর নয়। আসুন খোলাসা করি, ১০১০ সালে রাজা প্রথম চোলা নির্মিত এই বৃহদেশ্বর টাওয়ার মন্দিরের অসাধারণ স্থাপত্যিক রহস্য, যা কি না আধুনিক যুগের স্থাপত্যশিল্পীদেরও অনেক ক্ষেত্রেই বিস্মিত করবে। প্রথমেই একটু ধারণা দিই যে ২১৬ ফুট উঁচু বিশাল এই স্থাপনা তৈরিতে কী বিপুল পরিমাণ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। যে পরিমাণ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তার সম্মিলিত ওজন ১ দশমিক ৩ লাখ টন। যদিও জেনে অবাক হবেন যে যেখানে এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে তার আশপাশে ৬০ কিলোমিটারের মধ্যে এ ধরনের পাথর নেই। তাহলে এসব পাথর সেই এক হাজার বছর আগে নিয়ে আসা হলো কোথা থেকে? আর নিয়েই-বা আনা হলো কীভাবে? এবার আপনাকে মনে করিয়ে দেব প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন দ্রব্য পরিবহনে হাতির ব্যবহারের কথা। এখানেও ঠিক তাই-ই হয়েছিল। প্রায় তিন হাজার হাতিকে ব্যবহার করা হয়েছে এই বিপুল পরিমাণ পাথর পরিবহনে।

আর এই পাথরগুলো নির্মাণস্থানে আনার পরে টাওয়ার নির্মাণের জন্য কোনো ভিত খোঁড়া হয়নি। একদম সমতলভূমির ওপর একের পর এক পাথর বসিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়। স্থাপনাটি যেন নিজস্ব একটা ভারসাম্য পায় তার জন্য টাওয়ারের একদম নিচের অংশ বেশ প্রশস্থ করা হয়। এবং ওপরের দিক ধীরে ধীরে সরু করে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ পাথর কী করে একটার সঙ্গে আরেকটা জুড়ে থাকল নিজে থেকেই তা নিয়ে ‘পাজল’ মিটছে না তো? তাহলে জানিয়ে রাখি যে পদ্ধতিতে পাথরগুলো একটি অপরটির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে সেই পদ্ধতিটির নাম ‘পাজল টেকনিক’ বা ‘ইন্টারলক মেথড’। পাথরগুলো একটির ওপর আরেকটি, একটির পাশে আরেকটি স্থাপনের সময় বিশেষ ইন্টারলক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। মানে পাথরগুলোকে খোদাই করে এমন বিশেষ ধরনের আকার দেওয়া হয়েছে যে সেগুলো যখন পাশাপাশি, ওপর-নিচ বসানো হয়, তখনই সেগুলো নিজে থেকেই জোড়া লেগে যেতে থাকে বা ইন্টারলক হয়ে পড়ে। আর এ কারণেই এই বৃহদেশ্বর টাওয়ার মন্দির হাজার বছর ধরে অবিচল দাঁড়িয়ে আছে ঠিক যেমনটি ছিল নির্মাণের সময়।

রহস্য কিছুটা মিটলেও আরেকটু রহস্য রয়েছে। ২১৬ ফুট উঁচু এই টাওয়ারটির একদম শীর্ষে যে বিশালাকার গম্বুজ রয়েছে, তা কিন্তু মাত্র একটি বৃহৎ আকারের পাথর খোদাই করে বানানো। এবং সেটির ওজন বিস্মিত করবে যে কাউকে। ৮১ টন। এখন যুগ যুগ ধরে বিজ্ঞানীরা এই প্রশ্ন নিয়ে ধাঁধার মধ্যে থেকেছেন যে এই বিশালাকৃতির পাথরখণ্ড অত ওপরে কীভাবে তোলা সম্ভব। কারণ, ১ হাজার বছর আগে এই বিশালাকার পাথরখণ্ড ওঠানোর মতো কোনো যান্ত্রিক ক্রেন সে সময় ছিল না নিঃসন্দেহে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই বিশালাকার পাথরখণ্ড ২০০ ফুট ওপরে তোলার জন্য ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ মাটির র‌্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছিল। এবং র‌্যাম্পের ওপর পাথরখণ্ডটি বসিয়ে হাতি, ঘোড়া ও মানুষের সাহায্যে সেটিকে টেনে ওপরে তোলা হয়। এবং এই কাজটি করতে সময় লেগেছিল পাকা ছয় বছর!

বৃহদেশ্বর মন্দিরের ‘মুলাভার’ বা প্রধান দেবতা হলেন শিব। শিবের পাশাপাশি মন্দিরের দেয়ালজুড়ে চন্দ্র, সূর্য, দক্ষিণ মূর্তির বিশালাকার নানা চিত্র আঁকা রয়েছে। বৃহদেশ্বর মন্দিরটি এমনই একটি মন্দির, যেখানে আট মিটার লম্বা অষ্ট-দিকপালকের মন্দির রয়েছে। এই অষ্ট দিক হলো ইন্দ্র, অগ্নি, যম, বরুণ, নৈঋত, বায়ু, ঈশান ও কুবের। হাজার বছরের পুরোনো এই মন্দিরের সর্বত্র রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের ছাপ। মোট ৮১টি নৃত্যের ভঙ্গির কারুকাজ তাক লাগায় দর্শকদের। এ ছাড়া মন্দিরের ছাদে রঙিন তৈলচিত্র পর্যটকদের মন টানে। মন্দিরটির অন্দরে পাঁচ মিটার লম্বা নৃত্যরত শিবের মূর্তি রয়েছে। এ ছাড়া মন্দিরের ভাস্কর্যে তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ভরতনাট্যমের নাচের নানা মুদ্রার চিত্র রয়েছে। নিখুঁত হাতে সব তৈরি করেছিলেন সে সময়ের শিল্পীরা।

কী অদ্ভুত এক স্থাপত্য কল্পনা করা যায়! আরেকটু তথ্য দিই, এ মন্দিরের সামনেই একটা দৃষ্টিনন্দন বিশাল গোমূর্তি রয়েছে। ১৬ ফুট দীর্ঘ ও ১৩ ফুট উচ্চতার এই কৃষ্ণ বর্ণের চমৎকার গোমূর্তিটিও নির্মাণ করা হয়েছে মাত্র একটি বিশাল পাথরখণ্ডকে খোদাই করে। এটির নাম নন্দী। শিবমন্দিরটি তামিল মহারাজা রাজা চোলা প্রথম স্থাপন করেন। তাঁর সময়েই প্রথম মহান ‘তামিল চোলা’ স্থাপত্যের নকশা তৈরি হয়। সেই নকশা এখনো মন্দিরের সংগ্রহশালায় রয়েছে। এ ছাড়া পুঁথিতে মন্দিরের জাঁকজমক ও নিয়ম আচার লিপিবদ্ধ করা আছে, যা আজও নিয়মানুসারে পালন করা হয়। মন্দিরের সর্বত্র তামিল (চোলা) রাজার ক্ষমতা, সমকালীন শিল্প ও সম্পদের বিশালতার কথা প্রকাশ পেয়েছে।

এই মন্দির নির্মাণের পর থেকে এই চোলা স্থাপত্যশৈলীই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরে মন্দিরে স্থান করে নেয়। চোলা রাজার স্বপ্নাদেশেই নাকি এই রাজকীয় মন্দিরটি স্থাপিত হয়। মন্দিরে পূজিত হন পারিবারিক দেবতা শিব। সনাতনধর্ম ও পুরাতত্ত্ববিদদের মতে, দেবতা শিব হলো সর্বশক্তিমানের প্রতীক। এই স্থাপনায় রাজাও নিজেকে সেই দেবতা শিবের মতো করে নিজেকে শক্তিমান হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্রাবিড় মন্দিরগুলোর মতো স্থাপত্য ও ঐতিহ্যপূর্ণ এই মন্দিরটি দক্ষিণ ভারতের মতাদর্শকে সামনে আনে। ইউরোপীয় শিল্পের ধাঁচও লক্ষ করা যায় এই মন্দিরে। মন্দিরের অন্দরে বিভিন্ন রাজা ও দেব-দেবীর তৈলচিত্র, ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন দেবতার মূর্তি, স্থাপত্য ও শৈল্পিক নির্দশন অনেকটা শ্রীলঙ্কার রাজাদের তৈরি মন্দিরগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করা হয়, রাজা চোলা প্রথম শ্রীলঙ্কার কোনো রাজাকে অনুকরণ করে বিশালাকার মন্দিরটি তৈরি করেছিলেন। সেই সময় মন্দিরের স্থপতি ছিলেন কুনজারা মাল্লান রাজা, যাঁর নাম ছিল রাজা পেরুনথাচান। বাস্তুশাস্ত্র এবং আগম-এর মতো প্রাচীন গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে গোটা মন্দিরটি গড়ে তুলেছিলেন পেরুনথাচান। সেই সময় বাস্তুশাস্ত্রের স্থপতি হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম চেন্নাইয়ে এখনো বসবাস করছে।

বৃহদেশ্বর টাওয়ার মন্দির সুদীর্ঘ ১ হাজার বছর ধরে ঠাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে এই স্থাপনা মোকাবিলা করেছে ছয়-ছয়টি বড় আকারের ভূমিকম্প। অথচ একটুও টলেনি। এতসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের লিস্টেও নাম লিখিয়েছে অনন্য এই স্থাপনাটি। সত্যিকারের স্থাপনা তো একেই বলে, তাই না?

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৯তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৮।

ফয়সাল হাসান সন্ধী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top