নদী, খাল, ঝিল পারাপারে সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নির্মাণ করছে সেতু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানামাত্রিক পরিবর্তন এসেছে সেতুর অবকাঠামোতে। ফলে যোগাযোগব্যবস্থা হয়েছে সহজ, নিরাপদ ও গতিময়। এই সেতুর নকশা, ডিজাইন ও ইতিহাস মানবসভ্যতা, বিভিন্ন শহর ও দেশের ঐতিহ্যের স্মারক। সড়কপথে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দীর্ঘ, লম্বা, শক্তিশালী আইকনিক সেতু প্রকৌশলীদের বৃহত্তর কৃতিত্বের শাশ্বত সাক্ষ্য বহন করে। পৃথিবীর অনেক দেশেই বিশালাকৃতির সেতু রয়েছে, যেগুলো গভীর উপত্যকা, বড় নদী বা উপসাগর অতিক্রম করেছে, যা উচ্চ প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় অনন্য। তবে এই সেতুগুলোর মধ্যে খুব কমই পেয়েছে ‘গ্রেট সেতু’-এর মর্যাদা। যদিও গ্রেট সেতুর মর্যাদা পাওয়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই তবে সব গ্রেট সেতুতেই রয়েছে আকর্ষণীয় কিছু বিষয়ের সমন্বয়। একটি গ্রেট সেতু বা মহান সেতুর বিশেষত্ব হচ্ছে এই সেতু অনন্য বা ব্যতিক্রমী অন্য সাধারণ সেতু থেকে, বিশেষ করে স্প্যানের দৈর্ঘ্য, সৌন্দর্য, সাধারণের কাছে আবেদনের দিক বিবেচনায়।
ঐতিহাসিকভাবে তৈরি এসব আকর্ষণীয় সেতু ও কাঠামো পেয়েছে মানুষের প্রশংসা হয়েছে মূল্যায়িত। আগে, প্রায় ১৫০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন সপ্তাশ্চার্য বা বিস্ময়কর ঘটনাগুলো বলতে সবচেয়ে বিখ্যাত মানবসৃষ্ট স্থাপনাগুলোকেই বুঝাত। পরে ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কিছু বিখ্যাত সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল (যেমন, তুরস্কের স্মারণাতে ক্যারাভান সেতু, যেটি এখনো ব্যবহার করা হয়) যদিও ওই সেতুগুলোকে সপ্তাশ্চার্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে উন্নতি ঘটেছে নির্মাণশিল্পের; পরে এমন অনেক স্থাপনা ও অবকাঠামোই সেই সময়কার পৃথিবীর অষ্টম বিস্ময় বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। এদের মধ্যে ১৮৮৩ সালে তৈরি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত ‘ব্রুকলিন সেতু’ ও ১৯৩৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিসকোতে তৈরি ‘গোল্ডেন গেট’ সেতু অন্যতম।
মানবসভ্যতার বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট মহান স্থাপনা ও অবকাঠামো ওই সময়ে লব্ধ জ্ঞান ও নির্মাণ প্রযুক্তির বাহক হিসেবে সগৌরবে টিকে আছে আজও। যেমন, রোমান সময়ের সৃষ্ট স্থাপনা ও বিগত সাত-আট শতকে তৈরি স্থাপনার নির্মাণশৈলী ও টেকসই এর দিক থেকে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সে কারণেই যখন আমরা কোনো স্থাপনা কিংবা সেতুর ক্ষেত্রে ‘গ্রেট’ হিসেবে চিহ্নিত করব তখন আমাদের উচিত হবে ওই স্থাপনা নির্মাণ সময়কালের সহজলভ্য প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলীর কথা বিবেচনায় নেওয়া। অর্থাৎ যখন আমরা সেতুর বিকাশ পর্যালোচনা করব, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যুগের একটি কাঠামোর গুণগতমান, প্রযুক্তি ও স্থাপত্য নকশার সঙ্গে পুরোনো দিনের তৈরি কাঠামোর গুণগতমান, প্রযুক্তি ও স্থাপত্য কাঠামোর সার্বিক পার্থক্য থাকবেই। এ ছাড়া তখনকার সময়ের প্রযুক্তিগত দিকসহ সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও অন্য কারিগরদের কৃতিত্ব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
গ্রেট যত ঐতিহাসিক সেতু
ঐতিহাসিক বিবেচনায় নির্মাণ প্রযুক্তির বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেট সেতুকে চারটি সময়কালের ভিত্তিতে ভাগ করা যেতে পারে। সেগুলো-
১. প্রাচীন
২. মধ্যযুগীয় রেনেসাঁ
৩. শিল্পবিপ্লবের সময়
৪. আধুনিক যুগ।
প্রাচীনকালের সেতুসমূহ মূলত সামরিক বাহিনীর যুদ্ধ ও অন্যান্য সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মিত। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ৪০-৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিন স্তরে তৈরি পাথরের সেতু পন্ট ডু গার্ড, ৫০ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি বিজয়ের সময়ে রাইন নদীর উপড়ে জুলিয়াস সিজার কর্তৃক তৈরি ট্রোজান সেতু (১০৪ খ্রিষ্টপূর্ব) এবং ৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে দানিয়ুব নদীর ওপরে তৈরি কনস্ট্যান্টটাইন সেতু। মধ্যযুগীয় রেনেসাঁর সময়ে নির্মিত সেতুসমূহ মূলত পাথরের তৈরি। এই সব সেতু প্রধানত ওই সময়ে শহরের মধ্যকার নদীনালা পারাপারে তৈরি করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ১৫৬৪ সালে তৈরি ফ্লোরেন্সে অবস্থিত Ponte Vecchio, ১৫৯১ সালে ভেনিসে তৈরি Rialto সেতু এবং ১২০৯ সালে তৈরি পুরোনো লন্ডন সেতু অন্যতম।
দীর্ঘ স্প্যান সেতু তৈরির সূচনা হয় শিল্পবিপ্লবের সময়ে। ওই সময়ের সেতুগুলোর মাঝে বিখ্যাত ১৮২৬ সালে তৈরি ৫৭৭ ফুট দীর্ঘ স্প্যানের মেনাই স্ট্রেইট সাসপেনশন সেতু, দুটি ৪৫৯ ফুট দীর্ঘ স্প্যানের সমন্বয়ে ১৮৫০ সালে তৈরি ব্রিটানিয়া সেতু। এই দুটি সেতুই বক্স গার্ডার আকৃতিতে তৈরি। এ ছাড়া ১৮৬৪ সালে তৈরি ৭০২ ফুট দীর্ঘ স্প্যানবিশিষ্ট ক্লিপটন সাসপেনশন সেতু, ১৮৮৪ সালে গুস্তাভ আইফেলের নকশাকৃত ৫৪১ ফুট দীর্ঘ স্প্যানবিশিষ্ট Garabit Viaduct এবং ১৮৯০ সালে তৈরি ১৭০৯ ফুট স্প্যানের Firth of Forth সেতু অন্যতম। বেশ কিছু সেতু রয়েছে, যেগুলো নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে বিশ^খ্যাত, তবুও এসব সেতুগুলোকে গ্রেট সেতু ভাবা হয় না। এর মধ্যে Verrazano সেতু, যার স্প্যান অনেক দীর্ঘ হলেও সেতুর প্রস্থ তুলনামূলকভাবে অনেক সরু, বসফরাস প্রণালিতে নির্মিত বসফরাস-১ সেতু, যা দুইটি মহাদেশকে যুক্ত করেছে। এ ছাড়া অনেক কেব্্লযুক্ত সেতু রয়েছে, যা তাদের দীর্ঘ স্প্যানের জন্য বিখ্যাত। যার মধ্যে Narmandy, Sutong, Stonecutters, Maracaio Bay, Rion Antirion, Millau Viaduct, Sunniberg, Russky Island সেতু উল্লেখের দাবি রাখে।
সিগনেচার সেতু
অনেক শহরের প্রশাসক নিজেদের শহরের ঐতিহ্যের সাক্ষী ও এলাকার প্রতীক হিসেবে বিশেষভাবে সেতু নির্মাণ করেছে। এর মাঝে অন্যতম নেদারল্যান্ডের রটেরডামে ১৯৯৬ সালে নির্মিত ইরাসমাস সেতু, এটি মূলত একটি ঝুলন্ত সেতু, যার মূল স্প্যান ৯৩২ ফুট দীর্ঘ। ২০০২ সালে লন্ডনে তৈরি মিলেনিয়াম সেতু, এই কেব্্ল সেতুর মূল স্প্যান ৪৭২ ফুট দীর্ঘ এবং এটি পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত। ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়াতে তৈরি সানডিয়াল সেতু। ১৯৯২ সালে স্পেনের সেভিয়াতে তৈরি ৬৫৬ ফুট দৈর্ঘ্যরে Puente del Alamillo সেতু। যদিও এটি মূলত বিখ্যাত হয়েছে এর বিতর্কিত নকশার কারণে। এটির ব্যাক অ্যাংকর না থাকায় কেব্্ল সেতুর মৌলিক গুণাবলি থেকে বিচ্যুত হয়েছে, যাতে হারিয়েছে কার্যক্ষমতার অনেকাংশ। যদিও এই সেতুটি দর্শনার্থীদের চটকদার আকর্ষণের কারণ তবে এ ধরণের সেতুর ডিজাইন ডিজাইনকারীরা নিরুৎসাহিত করে। ২০১৬ সালে তৈরি ১২৬৩ ফুট দীর্ঘ সানফ্রানসিসকোর অকল্যান্ড বে সেতুটি অদক্ষ এক নকশা হিসেবে বিবেচিত। এই সেতুতে তুলনামূলক নির্মাণ ব্যয় একই রকম অন্য একটি সেতু তৈরি করতে যে পরিমাণ খরচ, নির্মাণসামগ্রী এবং সময় প্রয়োজন তার তুলনায় বাড়ে ৭ থেকে ৮ গুণ। সিগনেচার সেতুর প্রায় সবই ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হয়েছে এবং নির্মাণের প্রযুক্তির সাপেক্ষে অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। যদিও এই সিগনেচার বা স্বাক্ষর নকশা সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ও স্থানীয় অঞ্চলের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত, তবুও এই ব্যতিক্রমী কাঠামোর মধ্যে কোনোটিই গ্রেট সেতুর মর্যাদা পায়নি।
রেকর্ড দীর্ঘ স্প্যান্স
যেসব সেতু তৈরির সময়ে দীর্ঘতম স্প্যানের জন্য রেকর্ড স্থাপন করেছে সেগুলোকে গ্রেট সেতু বলা হয়। যেকোনো ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে দীর্ঘতম স্প্যানের সেতু তৈরির মানে হচ্ছে অত্যন্ত প্রতিভাধর ও গোছাল ডিজাইনারের দল এবং নির্মাণপ্রতিষ্ঠান এর পেছনে সমন্বিতভাবে কাজ করেছে। এসব অর্জন শুধু সম্ভব হয়েছে যখন সর্বোচ্চ স্তরের প্রকৌশলী ও স্থপতিরা প্রতিযোগিতা করে ওই সময়ের প্রকৌশল উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে চ্যালেঞ্জিং ও জটিল অবকাঠামো নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছে। দীর্ঘ স্প্যান ব্রিজের মধ্যে গুটিকয়েক সেতু, যেগুলো সৃষ্টির সময়ে দীর্ঘ স্প্যানের রেকর্ড তৈরি করেছে সেগুলোই পেয়েছে গ্রেট সেতুর মর্যাদা।
আধুনিক গ্রেট সেতু
বিংশ শতাব্দীতে অবকাঠামোগত বিশ্লেষণ এবং নির্মাণপ্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন গ্রেট সেতু নির্মাণে রেখেছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। এ ছাড়া ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সৃষ্ট কিছু সেতুও আধুনিক গ্রেট সেতুর অন্তর্ভুক্ত। আধুনিক গ্রেট সেতুর মধ্যে পাঁচটি সেতুর সংক্ষিপ্ত বিবরণ রইল এ আলোচনায়। এগুলো ছাড়া ডেনমার্কে অবস্থিত গ্রেট বেল্ট পূর্ব সেতু, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত জর্জ ওয়াশিংটন সেতু, যুক্তরাজ্যে অবস্থিত হেমার ইস্টারউরি সেতু অন্যতম।
গোল্ডেন গেট সেতু, সানফ্রান্সিসকো, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
এই সেতুটি সোনালি দুয়ার হিসেবে খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় সেতু। ১৯১৬ সালে সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৩৭ সালে। এটি তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করাই অসম্ভব ছিল যে এ রকম একটি সেতু তৈরি করা সম্ভব। আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের মতে, আধুনিক বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের একটি ‘দ্য গোল্ডেন গেট সেতু’। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে যে বিষয়গুলোর, তাদের অন্যতম এ সেতুটি। এই সেতুটি দেখতে প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু ভিড় করে। এই সেতুটির দীর্ঘতম স্প্যানের দৈর্ঘ্য ৪২০০, ফুট যা ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম স্প্যান। সানফ্রান্সিসকোর সঙ্গে মেরিন কান্ট্রির যোগাযোগব্যবস্থার আশ্চর্য নিদর্শন সেতুটি। প্রায় ২২ বছর ধরে নির্মাণকৃত এই সেতুটি তৈরিতে খরচ হয়েছিল তৎকালীন প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার, যা এখনকার দিনের প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে বিভিন্ন জরিপের ফলাফল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আত্মহত্যাপ্রবণ স্থান হিসেবে এক নম্বর স্থানটি যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর ঝুলন্ত সেতু দ্য গোল্ডেন গেট এর দখলে।
ব্রুকলিন সেতু, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন ব্রুকলিন সেতু। এই সেতুটি নিউইয়র্ক শহরে অবস্থিত সবচেয়ে জনপ্রিয় স্থাপনার একটি। ১৮৬৯ সালে শুরু হয়ে প্রায় ১৪ বছর সময় লেগেছিল এর নির্মাণকাজ শেষ হতে। ইস্ট নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি ম্যানহাটন ও ব্রুকে যুক্ত করেছে। ব্রুকলিন সেতু মূলত ঝুলন্ত সেতু। দুটি বিশালাকার টাওয়ার অসংখ্য কেব্্ল দিয়ে ধরে রেখেছে পুরো সেতুটিকে। টাওয়ার দুটির মাঝের দূরত্ব ৪৮৬ মিটার, সব মিলিয়ে সেতুটি দৈর্ঘ্য ১.৮ কিলোমিটার। বড় টাওয়ারটির উচ্চতা ৮৪ মিটার এবং এর ওপরের অংশটি গোথিক শৈলীতে নির্মিত। সেতুটি যখন নির্মিত হয়, এটিই ছিল নিউইয়র্কের সবচেয়ে হাতে গোনা উঁচু কয়েকটি স্থাপনার একটি। যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি সেতুটিতে যাতে মানুষও পায়ে হেঁটে পারাপার হতে পারে এবং একই সঙ্গে সেতুটি থেকে দুপাশে ব্রুকলিন আর ম্যানহাটনের আকাশচুম্বী ভবনগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে, সে জন্য সেতুটির রাস্তার ঠিক ওপরে একটি পায়ে হাঁটার পথ তৈরি করা হয়েছে। শুধু এই পায়ে হাঁটা পথের ওপরে দাঁড়িয়ে ইস্ট নদী আর উপশহর দুটিকে দেখতে প্রতিবছর লক্ষাধিক পর্যটক ভীড় করে এখানে।
টাওয়ার সেতু, লন্ডন, যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের টাওয়ার সেতু তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত। টেমস নদীর ওপরে অবস্থিত সেতুটির দীর্ঘতম স্প্যানের দৈর্ঘ্য ২৭০ ফুট। এই সেতুটির নামকরণ করা হয়েছিল লন্ডনের টাওয়ারের নামানুসারে, এটি লন্ডন শহরের ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক। টাওয়ার সেতুর দুটো প্রধান টাওয়ার রয়েছে, যেগুলো প্রধান রাস্তা থেকে ৩৪ মিটার এবং জোয়ারের সময় যত দূর পর্যন্ত নদীর পানি ওঠে সেই চিহ্ন থেকে প্রায় ৪২ মিটার উঁচুতে দুটো হাঁটার পথ দ্বারা যুক্ত। নদীর দুই তীর থেকে বের হওয়া রাস্তা সেতুর এমন একটা অংশে এসে পৌঁছায়, যেটা ফাঁক হয়ে দুধারে খাড়া হয়ে যেতে পারে। সেতুর এই বিশালাকৃতি পাতগুলোর একেকটার ওজন প্রায় ১,২০০ টন এবং সেগুলো খুলে ৮৬ ডিগ্রি কোণে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রায় ১০,০০০ টন ওজনের জাহাজগুলো নিরাপদে সেতুর নিচ দিয়ে পেরিয়ে যেতে পারে।
সিডনি হারবার সেতু, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
পৃথিবী গ্রেট সেতুগুলোর অন্যতম সিডনি হারবার সেতু। গিনেজ বুক ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী বিশ্বের একক স্প্যানবিশিষ্ট সবচেয়ে প্রশস্ত সেতু এটি। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত এ সেতুটি বিশ্বের মানুষের কাছে এতটাই পরিচিত যে অনেক ক্ষেত্রে এটিকে অস্ট্রেলিয়ার পরিচয়বাহী হিসেবেও ধরা হয়। বিশেষ করে বন্দর আর বিখ্যাত অপেরা হাউসের পাশে সেতুটির অবস্থানের দৃশ্য সিডনি আর অস্ট্রেলিয়ার প্রতীক হিসেবে পরিচিত বিশ্ববাসীর কাছে। প্রায় ১ হাজার ১৪৯ মিটার দীর্ঘ এ সেতুটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছে প্রায় দশ বছর। সেতুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় ১৯৩২ সালের ১৯ মার্চ। সেতুটি নির্মাণে সে সময় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৬২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড। সিডনির বাসিন্দাদের কাছে ‘কোর্ট হ্যাঙ্গার’ নামে খ্যাত এ সেতুটিকে যখন খুলে দেওয়া হয় তখন এটি প্রথমবারের মতো সিডনির বিখ্যাত পোতাশ্রয়ের উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। চালু হওয়ার প্রথম দিকে প্রতিদিন সেতুটি অতিক্রম করত প্রায় ১১ হাজার যান। কিন্তু বর্তমানে সেতু ব্যবহারকারী যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজারে। এখানে অনুষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত আতশবাজির খেলা হচ্ছে সিডনি হারবার ব্রিজের মূল বিশেষত্ব। প্রতিবছর ইংরেজি নববর্ষের সময় সেতু নিকটবর্তী সিডনি অপেরা হাউস ও তৎসংলগ্ন পোতাশ্রয়ের দুই প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া আতশবাজির খেলা যা উপভোগ করতে সারাবিশ্ব থেকে ভিড় জমায় অগণিত পর্যটক। পৃথিবীর মানুষের কাছে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় এক স্থাপনা।
আকাশি-কাইকো সেতু, জাপান
ঝুলন্ত এই সেতুটি জাপানের কোবে শহরের সঙ্গে আওয়াজী আইল্যান্ডকে যুক্ত করেছে। এটি হোনশু-শিকোকু হাইওয়ের অংশ হিসেবে অতিক্রম করেছে ব্যস্ত আকাশি প্রণালি। প্রায় দশ বছর ধরে চলা এই সেতুটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ১৯৯৮ সালে যাতে ব্যয় হয় তৎকালীন ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রায় ৩.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ঝুলন্ত সেতুর কেন্দ্রীয় অংশে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম কেন্দ্রীয় স্প্যান, যার দৈর্ঘ্য ১,৯৯১ মিটার। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সেতুটিকে কেন্দ্র করে চলে ভ্রমণের ব্যবস্থা। ভ্রমণকারীদের বিস্তারিত জানানো হয় সেতুর ইতিহাস সম্পর্কে এবং তারা যেতে পারে ৩০০ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন সাসপেনশন টাওয়ারের সর্বোচ্চ উচ্চতায়।
গ্রেট সেতুর বৈশিষ্ট্য
যেসব বৈশিষ্ট্যের কারণে একটি সেতু মূলত ‘গ্রেট সেতু’ হিসেবে মর্যাদা পায়; তা হচ্ছে-
- এটিকে অত্যন্ত পরিকল্পিত অবকাঠামো হতে হয়
- যে স্থাপনাকে ঘিরে থাকে দীর্ঘকালের স্বপ্ন
- পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙ্গে অন্য আরেকটি বিখ্যাত অবকাঠামোর চেয়ে উত্তমরূপে সৃষ্ট হতে হয়
- অত্যন্ত আকর্ষণীয়, সহজ ও দৃঢ়তার সঙ্গে পরিবেশবান্ধব হতে হয়
- প্রকৌশল ও স্থাপত্যের অনন্য অর্জন এটি, যা সৃষ্টির সময়ের চমৎকার নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
পৃথিবীতে অনেক বিখ্যাত সেতু তার সব ধরনের ডিজাইন, নির্মাণ কাঠামোর দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও গ্রেট সেতুর বিবেচনায় আসেনি। এর কারণ হচ্ছে গ্রেট সেতু সৃষ্টির জন্য আলাদাভাবে কোনো ধরনের মানদণ্ড নেই, সাধারণত দর্শনার্থীদের স্বীকৃতির মধ্য দিয়েই অনেক সেতু পেয়েছে ‘গ্রেট’-এর মর্যাদা, যা মূলত বিবেচনায় এসেছে উচ্চতর কাঠামোগত নকশা, প্রাকৃতিক সমন্বয় ও অসামান্য নির্মাণশৈলীর কারণে।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯৭তম সংখ্যা, মে ২০১৮।