নির্মাণে জীবন্ত উপকরণ

উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে বিশ্ব জুড়ে। প্রতিনিয়তই গড়ে উঠছে শহর, নগর, আবাসন আর অবকাঠামো। অথচ ক্রমবর্ধমান এ উন্নয়ন চাহিদার সঙ্গে ঘাটতি রয়েছে জোগানের। কারণ, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত প্রায় সম্পূর্ণ কাঁচামালই আসে প্রকৃতি থেকে। প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত বিধায় কাঁচামালের ঘাটতি পূরণে গবেষকেরা খুঁজছেন নতুন নতুন উপায়। তাঁদের প্রাণান্ত চেষ্টায় খোঁজ মিলেছে নির্মাণপণ্যের বিকল্প কিছু উপকরণের। জীবন্ত নির্মাণ উপকরণ বা বায়োলজিক্যাল কনস্ট্রাকশন ম্যাটেরিয়াল নামে পরিচিতি পাওয়া এসব উপকরণ এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছে ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে। নির্মাণকাজেও শুরু হয়েছে এসব উপকরণের বহুল ব্যবহার। 

জীবন্ত নির্মাণ উপকরণের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। ১৯৯০ সালে বিল্ডিংয়ের ওভারকোট হিসেবে প্রবাল খনিজকরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উপকরণের যাত্রা। কংক্রিটের মাইক্রোবাইয়োলজিক্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে এই উপকরণ প্রথম আবিষ্কার করেন গবেষকেরা। এই শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের রেন¯েøয়ার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ২০০৭ সালে প্রথম মাইসেলিয়ামভিত্তিক বিল্ডিং ইনস্যুলেশন উপকরণ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। গবেষণার অংশ হিসেবে ‘গ্রিনস্যুলেট’ প্রকল্পের আওতায় ইকোভেটিভ ডিজাইনের সঙ্গে একবিংশ শতাব্দীর মানুষের পরিচয়ের প্রয়াস ছিল। প্রথমে খুব বেশি সাফল্য না থাকলেও পরে কম্পোজিটগুলো ব্যবহার করে প্যাকেজিং এবং কাঠামোগত নির্মাণ উপকরণ আবিষ্কৃত হয়। 

২০১৩ সালে বৃহদাকারে যুক্তরাজ্যের কারডিফ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন্ত নির্মাণ উপকরণ নিয়ে একটি প্রকল্প পরিচালনা করে। এই উপকরণ নিয়ে এটিই প্রথম বৃহদায়তনের প্রকল্প। কয়েক বছর পর ২০১৬ সালে আমেরিকান প্রতিরক্ষা বিভাগও এরকম নির্মাণ উপকরণ আবিষ্কারে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন দেশে গবেষণার ফলসরূপ কিছু নির্মাণ উপকরণ আবিষ্কৃৃত হয়, যা বিল্ডিংয়ের স্থায়িত্ব বাড়াতে দারুণ কার্যকরী। এসব উপকরণের মধ্যে রয়েছে- 

সেলফ-রেপলিকেটিং কংক্রিট

সেলফ-রেপলিকেটিং কংক্রিট একটি যৌগিক মিশ্রণ। বালু ও হাইড্রোজেল স্ক্যাফোল্ডের সমন্বয়ে গঠিত, যা সিনেকোকোকাস ব্যাকটেরিয়া ধারণ করে। বালু ও হাইড্রোজেলের এই মিশ্রণটি একটি সাধারণ কংক্রিটের মিশ্রণের চেয়ে কম পিএইচ, নিম্ন আয়নিক শক্তি এবং নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ধারণ করে। এটি ব্যাকটেরিয়া বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। স্ক্যাফোল্ডের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো পুরো মিশ্রণে ছড়িয়ে পড়ে। অপর দিকে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের মাধ্যমে এই মিশ্রণকে খনিজকরণ করা হয়, যা কংক্রিটের শক্তির মূল কারণ। খনিজকরণের পরে বালু-হাইড্রোজেল মিশ্রণটি কংক্রিট বা মর্টার হিসেবে নির্মাণে ব্যবহৃত শক্তিশালী উপকরণ। 

সেলফ-রেপলিকেটিং কংক্রিট ১০০ শতাংশ আর্দ্রতায় সর্বোচ্চ সক্রিয় থাকে। আর্দ্রতার তারতম্যের জন্য নির্মাণের এই জীবন্ত উপকরণের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় না। ৫০ শতাংশ আর্দ্রতায়ও মিশ্রণটির সেলুলার কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। তাই কোনো নির্মাণের ক্ষেত্রে এই কংক্রিটের ওপর আস্থা রাখা যায়। সেলফ-রেপলিকেটিং এই কংক্রিটের ব্যাকটেরিয়া সক্রিয়া হওয়ার পর থেকে এই উপকরণে নির্মিত স্থাপনা দিন দিন হতে থাকে বেশি স্থিতিস্থাপক।

সেলফ-রেপলিকেটিং কংক্রিটের কাঠামো

এই উপাদানের কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় দেখা যায় এটিতে ইলাস্টিক মডুলাস ২৯৩.৯ এমপিএ এবং ৩.৬ এমপিএর একটি টেনসাইল শক্তি রয়েছে। উল্লেখ্য, উন্নত মানের কংক্রিটের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মান প্রায় ৩.৫ এমপিএ। এই কংক্রিটের শক্তির স্থিতিস্থাপকতা অনেক বেশি। ফলে এই উপকরণে নির্মিত ভবনে সহজেই ফাটল ধরে না। এই কংক্রিটের স্থিতিস্থাপকতা হলো ১৭০ নিউটন।   

সেলফ মেন্ডিং বায়ো-সিমেন্ট

সেলফ মেন্ডিং বায়ো-সিমেন্ট বিশেষ ধরনের সিমেন্ট, যা বায়োসিমেন্ট নামে খ্যাত। এর বিশেষত্ব হলো এই সিমেন্ট সহজে নষ্ট হয় না বিধায় এটি সাধারণ সিমেন্টের প্রতিদ্ব›দ্বী নয়, বিকল্প হিসেবে দারুন জনপ্রিয়। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি বলে বায়োসিমেন্ট সেলফ-হিলিং বা স্বনিরাময়যোগ্য অণুজীবের সংস্পর্শে থাকে। ফলে যুগ যুগ ধরে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারে। নির্মাণশিল্পের জীবন্ত উপকরণ হিসেবে অণুজীবের ব্যবহার দিনকে দিন বাড়ছে। বায়োসিমেন্ট বিশেষত এমন একটি উপকরণ, যা তার স্বয়ংক্রিয় সংস্কাররীতির জন্য সর্বাধিক পরিচিত। এই সিমেন্টের মূল উপকরণ হলো ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক। ক্যালসিয়াম কার্বনেটের (চুন) সঙ্গে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মতো বায়োস্কোপিক অণুজীবের বিশেষ সংমিশ্রণে উৎপাদিত হয় এই সিমেন্ট। 

মাইক্রোস্কোপিক অণুজীবগুলো বায়োকংক্রিট গঠনের মূল উপাদান কারণ তারা ক্যালসিয়াম কার্বনেটের তলদেশে বৃষ্টিপাতের প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই সিমেন্টে স্পোরোসারকিনা পেস্টুরি নামে একধরনের অণুজীব ব্যবহার করা হয়, যা কংক্রিটের মিশ্রণের সঙ্গে মিশে অটুট বন্ধন সৃষ্টিতে দারুণ ভূমিকা রাখে। ফলে স্থাপনা হয় বহুগুণ টেকসই। বিশেষ মাইক্রোবায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়াতেই সৃষ্টি হয় এই বিশেষ ধরনের সিমেন্ট। এ ছাড়া এই প্রক্রিয়ায় সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয় আরও কয়েকটি প্রভাবক। প্রথমত, মাইক্রোলজির মতো আলোকসংশ্লিষ্ট অণুজীব; দ্বিতীয়ত, সায়ানোব্যাকটেরিয়া এবং সালফেটের পরিমাণ হ্রাস করার মতো অণুজীব। সালফেট হ্রাস করার মতো অণুজীব হিসেবে ব্যবহার করা হয় ডেসাল্ফোবিব্রিও ডেসালফিউরিকানস। 

ক্যালসিয়াম কার্বনেট এই প্রক্রিয়ার মূল উপাদানসহ অণুজীবগুলো হলো সহায়ক কিংবা প্রভাবক। ক্যালসিয়াম কার্বনেটকে দীর্ঘস্থায়ী করে নিজে নিজে পুনর্বিন্যাস করতে যে প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়, তাকে বলা হয় নিউক্লিয়েশন। এই জীবন্ত উপকরণটির ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের নিউক্লিয়েশন চারটি কারণে টিকে থাকে। কারণগুলো হলো, ক্যালসিয়ামের ঘনত্ব, ডিআইসির ঘনত্ব, পিএইচ স্তর এবং নিউক্লিয়েশন প্রভাবকের প্রতুলতা। যতক্ষণ ক্যালসিয়াম আয়নের ঘনত্ব যথেষ্ট পরিমাণে থাকে, ততক্ষণ বর্ণিত অণুজীবগুলো ইউরোলাইসিস প্রক্রিয়ায় এমন পরিবেশ তৈরি করে, যাতে ক্যালসিয়াম কার্বনেট দীর্ঘ সময় ধরে নিজে নিজে পুনর্বিন্যস্ত হতে পারে। ফলে এই উপকরণে নির্মিত স্থাপনা হয় টেকসই। বর্তমানে বায়েসিমেন্টের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার দেখা যায় ফুটপাত নির্মাণে। ভবিষ্যতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বায়োসিমেন্টের পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদের। বর্তমানে এই সিমেন্টের ব্যাপক উৎপাদন শুরু না হওয়ায় ব্যবহারও যত্রতত্র দেখা যায় না। 

মাইসেলিয়াম কম্পোজিট

মাইসেলিয়াম কম্পোজিট এমন ধরনের নির্মাণ উপকরণ, যা দামে খুব সস্তা একইসঙ্গে পরিবেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ। এই নির্মাণ উপকরণটি ইউরোপ ও আমেরিকায় একটি উন্নয়নশীল উপকরণ। উন্নত বিশ্বের গবেষকেরা এই উপকরণ নিয়ে উচ্চতর গবেষণা পরিচালনা করছেন। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে পরীক্ষামূলকভাবে এই কম্পোজিট ব্যবহার করা হয়েছে। এই দেশগুলো এই কম্পোজিটের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে জনপ্রিয়। এই কম্পোজিটের মূল উপকরণ হলো কৃষিজ উৎপাদনের উচ্ছিষ্ট বা বর্জ্য। বায়ো-ফ্যাব্রেকশন পদ্ধতিতে এই উপকরণকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত একধরনের সিনথেটিক নির্মাণ উপকরণই হলো মাইসেলিয়াম কম্পোজিট। 

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পৃথিবীতে দিন দিন মানুষ যে হারে বাড়ছে, একই হারে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্য উৎপাদন। কৃষিজ উৎপাদন ও খাদ্যের উচ্ছিষ্ট অংশ আমরা ফেলে দিয়ে পরিবেশ দূষণ করি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো পুড়িয়েও পরিবেশ দূষণে অংশ নেই। গবেষকেরা এই উচ্ছিষ্ট কাজে লাগিয়ে অভিনব পদ্ধতিতে নির্মাণ উপকরণ তৈরির গবেষণা করছেন এক দশক ধরে। এর পুরোপুরি সাফল্য পাওয়া না গেলেও কিছুটা সাফল্য মিলেছে ইউরোপ ও আমেরিকায়। গোলার্ধের ওই অংশের দেশগুলোতে এই উচ্ছিষ্ট থেকে আবিষ্কৃত কম্পোজিট প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে এর চাহিদা। এক গবেষণায় দেখা গেছে ভারত ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন টন আবর্জনা জমা হয়। মাইসেলিয়ামভিত্তিক কম্পোজিটগুলো সাধারণত বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক, বিশেষত মাশরুম ব্যবহার করে সংশ্লেষ করা হয়। যৌগিক গঠনের জন্য ছত্রাকের একটি পৃথক জীবাণু বিভিন্ন ধরনের জৈব পদার্থের সঙ্গে ক্রিয়া করে। নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যযুক্ত কম্পোজিট তৈরি করতে সুবিধাজনক প্রজাতির ছত্রাক নির্ধারণ করতে হয়। নির্মাণের জীবন্ত উপকরণ তৈরিতে বিশেষত জি. লুসিডাম, গানোডার্মা এসপি, পি অস্ট্রিটাস, পি ওরটাস স্পা, টি ভার্সিকোলার, ট্রেমেটস এসপি প্রজাতির ছত্রাক ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ছত্রাকের মাইক্রোবের লাইসিয়াম জৈব পদার্থ হ্রাস করে ঘন কম্পোজিট তৈরি করা হয়, যা থেকে পরে বিভিন্ন প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী উপকরণ তৈরি করা হয়।

ভবিষ্যৎ বিবেচনায় উন্নত দেশে সময়ের আগেই শুরু হয়ে থাকে গবেষণা। জীবন্ত নির্মাণ উপকরণের গবেষণা এক দশক আগে শুরু হলেও বর্তমানে এর চাহিদা অনেক বেশি। শিগগিরই এ গবেষণা শেষ হবে এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। ব্যয়সাশ্রয়ী এ ধরনের নির্মাণ উপকরণ সব স্তরে অবকাঠামো উন্নয়নেও রাখবে প্রভ‚ত ভূমিকা। 
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৯তম সংখ্যা, মে ২০২১

রিগ্যান ভূঁইয়া
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top