নির্মাণসংক্রান্ত পাঠকপ্রিয় প্রকাশনা ‘বন্ধন’-এর নিয়মিত একজন লেখক আমি। প্রায় ৭ বছর যাবৎ এই পত্রিকার সঙ্গে আমার অন্তরঙ্গ সম্পৃক্ততা। ফলে, প্রতি মাসেই নিয়ম করে পত্রিকাটি পাই আমার টেবিলে। শত ব্যস্ততার মাঝেও বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদনগুলো পড়ার চেষ্টা করি। এরই ধারাবাহিকতায় ‘বন্ধন’-এর মে-২০২১ সংখ্যাটিতে প্রকাশিত প্রচ্ছদ কাহিনি ‘টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন’ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনসহ তদ্সংক্রান্ত তিনটি সাক্ষাৎকার পড়ে ঢাকার ‘যানজট নিরসন’ বিষয় নিয়ে নতুন করে কিছু লেখার আগ্রহটা দমাতে পারলাম না।
প্রসঙ্গত, ‘বন্ধন’-এ লেখার শুরুর দিকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার বেশ কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তন্মধ্যে ঢাকার ‘যানজট নিরসন’ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে ‘যানজটের কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান’ সংবলিত বিশদ একটি আলোচনাও স্থান পেয়েছিল, যা পর্যায়ক্রমিকভাবে এ সংক্রান্ত অন্য একটি মাসিক পত্রিকা ‘মুক্ত আকাশ’, ডিসেম্বর-২০১৩ এবং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ’, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-২০১৪ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সুদীর্ঘ প্রায় ২০ বছর যাবৎ ‘বন্ধন’ মুক্ত আকাশ, ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ পত্রিকাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ‘টিকিউএম ও নির্মাণ’ সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আমার লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু, সামাজিকমাধ্যম, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি কিংবা নীতিনির্ধারণী কোনো সংস্থা বা সূত্রের সঙ্গে আমার তেমন কোনো পরিচয় না থাকায় ঢাকার ‘যানজট নিরসন’ সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আমার ভাবনার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারিনি। তবে, এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ‘ইধহমষধফবংয চৎড়ভবংংরড়হধষ ঊহমরহববৎং জবমরংঃৎধঃরড়হ ইড়ধৎফ (ইচঊজই) এবং ‘মুক্ত আকাশ’ কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে আমার লেখা এবং উপস্থাপিত একটি টেকনিক্যাল পেপার ‘জড়ষব ড়ভ চৎড়ভবংংরড়হধষ ঊহমরহববৎং রহ ঘধঃরড়হধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ’ বিষয়ক সেমিনারের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেনের হাতে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং নিউজ’, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-২০১৪ সংখ্যাটি ধরিয়ে দিয়ে ‘ঢাকা শহরের যানজটের কারণ এবং সম্ভাব্য সমাধান’ সংক্রান্ত লেখাটি গুরুত্বসহকারে দেখার অনুরোধ জানিয়েছিলাম।
আশা করেছিলাম, মন্ত্রী মহোদয় আমার লেখাটি বিশেষভাবে পর্যালোচনা করত সম্ভাব্য বিষয়গুলো বাস্তবায়নকল্পে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। তবে, আমার লেখা সুপারিশমালার মধ্য থেকে একটি বিষয়, ‘যথাযথ সিগন্যাল মেনে জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা পার হওয়া’-এর ব্যাপারে নিয়ম অমান্যকারী পথচারীকে অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত করার বিষয়টি বাস্তবায়নে কিছুদিনের জন্য ঢাকা শহরের কোনো কোনো জায়গায় ট্রাফিক পুলিশকে তৎপর হতে দেখেছিলাম, যা খুব বেশি দিন চলেছে কিংবা কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন কোনো নজির আমার চোখে পড়েনি।
যা-ই হোক, ১৯৮৭ সাল থেকে ঢাকায় বসবাস করছি স্থায়ীভাবে। সেই আশির দশকে ঢাকার ট্রাফিক ভলিউম আর আজকের ট্রাফিক ভলিউমের পার্থক্যটা স্বচক্ষে অবলোকনকারী ছাড়া অন্য কারোর পক্ষে এখনকার বাস্তবতা অনুমান করতে পারার কথা নয়। বিষয়টি অতি প্রাসঙ্গিক তাই একটু পেছন থেকেই শুরু করছি। ১৯৮৭ সালের কোনো এক ঈদে আমি ঢাকায় ছিলাম; ঈদের ছুটির অখণ্ড অবসরে একদিন পরিবার নিয়ে মোটরসাইকেলযোগে শহর ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। বর্তমানে অনেকেরই হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে জনমানবহীন ও গাড়িশূন্য ঢাকা শহরের রাস্তায় সেদিন দিনের আলোয় ঘোরাঘুরি করতেও আমার বুক দুরু দুরু করে কাপছিল। তাই, রণে ভঙ্গ দিয়ে নিরাপদে বাসায় ফেরার পর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে শুধু টিভি দেখে পরবর্তী দিনগুলো কাটিয়েছি।
অতঃপর, নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি চোখের সামনে ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে শহরের যানজট, যা এখন জনভোগান্তির চরম সীমা অতিক্রম করেছে। অসহনীয় এই যানজটে নাকাল ও নাজেহাল হচ্ছে নগরের মানুষ, নাভিশ্বাস উঠছে ভুক্তভোগীদের। ঢাকার জনসংখ্যার তুলনায় বাড়েনি রাস্তাঘাট, উন্নত হয়নি যানবাহনব্যবস্থা ও ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনাও। বরং যানবাহন ও ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার অবনতি হয়েছে বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না।
ফলে, সাধারণ মানুষের ঘাম নিঃসৃত কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়া, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া, পরিবেশ নষ্ট হওয়া, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন আজ সমগ্র জাতি। অত্র বিষয়টি নিয়ে নানা তথ্য-উপাত্তসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লেখালেখি আর আলোচনার অন্ত নেই। কিন্তু কোনো কিছুতেই বিদ্যমান পরিস্থিতির ফলপ্রসূ কোনো উন্নতি দৃশ্যমান হচ্ছে না। যদিও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু যানজটের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না আপামর জনসাধারণ। ক্রমবর্ধমান এই যানজট নিরসনকল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়নেরই একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ ঢাকা শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় ‘টার্নিং ইয়ার্ড’ নির্মাণ।
প্রথমেই বলেছি, ‘টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন’ বিষয়ক প্রতিবেদনসহ এ সংক্রান্ত তিনটি সাক্ষাৎকার পড়ে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে কিছু লেখার আগ্রহ সামলাতে পারলাম না। তাই আমি ‘টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন’ প্রসঙ্গে ব্যক্তিগত কিছু মতামত এবং ঢাকা শহরের যানজট নিরসনকল্পে আমার চিন্তাপ্রসূত কিছু বিষয় তুলে ধরতে চাই। ‘টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন’ অবশ্যই প্রশংসনীয় ও বাস্তবসম্মত একটি বিষয়। কিন্তু প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে প্রস্তাবিত স্থান এবং এর সুবিধা-অসুবিধাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল, যা আদৌ হয়েছিল কি না কিংবা কোন পর্যায়ে কাদের সঙ্গে হয়েছিল তা আমার জানা নেই। তাই এ বিষয়ে দেওয়া আমার বক্তব্যকে সমালোচনা না ভেবে আলোচনা হিসেবে গণ্য করার অনুরোধ রইল।
আজকের বিষয়ের ওপর দুজন আলোচক, ড. আদিল মুহাম্মদ খান, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এবং কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ, সহকারী অধ্যাপক, অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট-এর আলোচনার সূত্র ধরে বলছি, এই ধরনের সমাধান বাস্তবায়নকল্পে প্রস্তাবিত এলাকার ট্রাফিক ভলিউম, বিদ্যমান রাস্তার প্রসারতা এবং পারিপার্শি¦ক অবস্থা বিবেচনা করে টার্নিং ইয়ার্ড ডিজাইন ও বাস্তবায়ন করা অত্যাবশ্যক। কোনো চলমান রাস্তার ওপর ‘টার্নিং ইয়ার্ড’ নির্মাণ করার ক্ষেত্রে তথাস্তÍ ঈধৎৎরধমব ডধু (বাহন পথ) কোনোভাবে সংকুচিত করা সমীচীন নয়। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত এলাকায় প্রধান রাস্তার প্রসারতা (ঞড়ঃধষ ডরফঃয) অবশ্যই বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। নইলে, নব নির্মিত টার্নিং ইয়ার্ডের ঈধৎৎরধমব ডধু (বাহন পথ) গলাচিপা (ইড়ঃঃষবহবপশ) হয়ে যাবে এবং অধিকতর যানজটেরকারণ হবে। বনানী/মহাখালীতে নির্মিত টার্নিং ইয়ার্ডে সেটারই প্রমাণ মিলেছে।
পুনশ্চ উপরোল্লিখিত দুজন আলোচকের আলোচনায় উঠে এসেছে, ‘টার্নিং ইয়ার্ডে যানজট নিরসন’ সমাধানটি উত্তরার আজমপুরে ফলপ্রসূ হলেও বনানী/মহাখালীতে এটি ফলপ্রসূ হয়নি। অতএব, কোনো স্থানে ‘টার্নিং ইয়ার্ড’ নির্মাণকল্পে প্রস্তাবিত এলাকার ট্রাফিক ভলিউম, বিদ্যমান রাস্তার প্রসারতা এবং পারিপার্শি¦ক অবস্থা যে বড় একটি ফ্যাক্টর, এতে সেটাই প্রমাণ করে। এ ছাড়া, আমি এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন পরবর্তীকালে একটি দৈনিক পত্রিকায় এর সুফল-কুফল নিয়ে লেখা একটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম। যাতে যানবাহনের চালক ও পথচারীদের সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি তাদের আলোচনার সারাংশ ছিল, বিদ্যমান যানজট নিরসনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার পর অত্র এলাকার যানজট আরও বেড়েছে। এরপর, অত্র পথে যাতায়াতের সময় বনানী/মহাখালীতে নির্মিত টার্নিং ইয়ার্ডটি সরেজমিনে দেখার পর আমিও মন্তব্য করেছিলাম যে প্রকল্পটি অবশ্যই চিন্তাপ্রসূত কিংবা ফলপ্রসূ হয়নি।
অত্র প্রকল্পের ত্রুটিপূর্ণ বিষয়গুলোকে কীভাবে ত্রুটিবিহীন করে ফলপ্রসূ করা যায়, সেই জায়গাটাতে আমাদের পৌঁছানো দরকার। দরকার নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিটি কাজ সুসম্পন্ন করে এর সুবিধা-অসুবিধাগুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। তাই, উদ্ভাবনীমূলক প্রতিটি কর্মকাণ্ডে চউঈঅ-(চষধহ-উড়-ঈযবপশ-অপঃ) পদ্ধতি অবলম্বন করত পর্যায়ক্রমিকভাবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, কার্যকারিতা যাচাই এবং সংশোধন করার বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করা অপরিহার্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উদ্ভাবনীমূলক কারও কোনো কাজের ব্যাপারে অন্যের করা কোনো মন্তব্যকে নেতিবাচকভাবে না দেখে প্রকৃত অর্থে ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে ভাবা দরকার। আমি মনে করি একইসাথে বিশ্বাস করি, ঈৎরঃরপরংস রং ঃযব ংপড়ঢ়ব ড়ভ রসঢ়ৎড়াবসবহঃ. ঞযঁং, বি ধষধিুং হববফ ঃড় নব ঢ়ৎড়ধপঃরাব, ৎধঃযবৎ ঃযধহ ৎবধপঃরাব। মনে রাখা দরকার, একটি ‘ণবং’-এর দশটি ভিন্নতর উত্তর হতে পারে, কিন্তু একটি ‘ঘড়’-এর দ্বিতীয় কোনো উত্তর হয় না। তাই কোনো কিছুকেই নেতিবাচকভাবে নেওয়া আমাদের উচিত নয়।
আরও একটি বিষয়, যেকোনো সমস্যা সমাধানকল্পে একক চিন্তাপ্রসূত কোনো সমাধান এবং এর তড়িৎ বাস্তবায়ন সাধারণত ফলপ্রসূ হয় না। অবশ্যই, একজনের মাথা থেকে ভালো একটি সমাধান বের হতে পারে, কিন্তু সেটা বাস্তবায়নের আগে অন্যান্যের মতামত নেওয়া এবং সুষ্ঠুভাবে পর্যালোচনা করা অত্যাবশ্যক। কারণ, প্রতিটি সমস্যা সুষ্ঠুভাবে সমাধান করার লক্ষ্যে অত্র সমস্যার মূলে যেতে হবে। ঞছগ-এর নিয়মানুসারে প্রথমে কারণ ফল নির্ণয় জঈঅ (জড়ড়ঃ ঈধঁংব অহধষুংরং) করা প্রয়োজন। যেখানে একাধিক কারণ বেরিয়ে আসতে পারে। ফলে এদের কোনটার গুরুত্ব কতটুকু তা নির্ণয় করে গুরুত্ব অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করা এবং তদনুযায়ী সব সমাধান বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আর এসব কাজের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।
জাপানিজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে বিভিন্ন বিষয়ে উদ্ভূত সমস্যাদির যথাযথ কারণ নির্ণয় জঈঅ এবং সম্ভাব্য সমাধানসমূহ খুঁজে বের করার জন্য তাদের সব কর্মক্ষেত্রেই দলগত প্রচেষ্টা প্রচলিত। এই দলগত প্রচেষ্টায় নিয়োজিত দলকে ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল (কিউসিসি)’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। একটি ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল’-এর সদস্যসংখ্যা ৩ থেকে ১০ জন পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম। তারা প্রতিটি কাজের জন্য চউঈঅ সাইকেল প্রস্তুত করাসহ সব পদ্ধতি অবলম্বন করে। এ বিষয়ে বারান্তে বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে।
যা-ই হোক, আমি পুনরায় আজকের প্রধান আলোচ্য বিষয়ের ওপর আলোকপাত করার চেষ্টা করছি। প্রসঙ্গত, আমি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করার সময় শখের বশে ঐচ্ছিক হিসেবে ‘আকিটেক্চার ও টাউন প্ল্যানিং’ নামে একটি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল লাভ করেছিলাম। আমার সুপ্ত বাসনা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মানবিক তাড়নায় সেই নব্বইয়ের দশক থেকেই ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে আমি চিন্তা করে আসছি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের লেভেল ক্রসিং যেমন-সোনারগাঁও হোটেলের মোড়, বিজয় সরণি মোড়, মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্করে নির্মাণযোগ্য, যান চলাচল উপযোগী একটি ‘ভেইকুলার আন্ডারপাস’-এর ডিজাইন ও মডেল তৈরি করে আমার অফিস ডেস্কে সাজিয়ে রেখেছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সূত্র আর পরিচিতির অভাবে বাস্তবায়ন প্রস্তাব দিতে পারিনি কোথাও।
আমি আমার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ ঘুরে তাদের সড়ক ও রাজপথ নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছি। দেখেছি তাদের সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভেইকুলার আন্ডারপাস, ওভারপাস, ইউ লুপ, টার্নিং ইয়ার্ড, পার্কিং ইয়ার্ড এবং বিভিন্ন আকৃতির ইন্টার সেকশন দ্বারা সুসজ্জিত। ১৯৮১ সালে ইরাকের বাগদাদ শহরে সিগন্যাল খেয়াল না করে রাস্তা পার হওয়ায় অর্থ দণ্ড দিয়েছি। ১৯৯৬ ভারতে ট্রাফিক পুলিশের ভয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারের থরকম্পন দেখেছি। ২০১৭ সালে কানাডার টরন্টোতে নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্কিং না করে উন্মুক্ত ও ফাঁকা জায়গায় গাড়ি পার্কিং করায় মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনেছি। আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলসে পার্কিং ইয়ার্ডে গাড়ি পার্কিং করার জায়াগা না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কোথাও দাঁড়ানোর সুযোগ মেলেনি। বিদেশভ্রমণের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায়, আমার ঘোরা দেশসমূহের মধ্যে কোথাও কোনো রাস্তার ওপর গাড়ি পার্কিং করতে দেখিনি আমি কোনো দিনই।
অথচ, আমাদের দেশে রাজপথের এক-তৃতীয়াংশ রাস্তা গাড়ি পার্কিংয়ের দখলে, সেই সঙ্গে ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণে অব্যবস্থাপনাও প্রকট। রাস্তায় যানবাহন কিংবা পথচারী পারাপারে কোথাও কোনো নিয়মশৃঙ্খলা চোখে পড়ে না। বিদ্যমান আইনের কোনো প্রয়োগ নেই বরং আছে অপপ্রয়োগ। নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা শহরের সড়কব্যবস্থা তথা ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা। ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় উদ্ভূত সমস্যাগুলো নিয়ে আমার লেখা বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন এবং সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশমালা দীর্ঘদিন আগে একবার প্রকাশিত হলেও তার কোনো বাস্তবায়ন চোখে পড়েনি। তাই সেগুলো আরেকবার তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার বিশ্বাস, ঢাকার রাজপথে গাড়ি পার্কিং বন্ধ এবং ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে পারলেই ৫০ শতাংশ যানজট কমে যাবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু, দল-মতনির্বিশেষে সর্বত্রই যথাযথ আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সব নিয়মনীতি প্রতিষ্ঠিত করা। আর বাকি ৫০ শতাংশ যানজট অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব। সুতরাং প্রাথমিকভাবে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে; ক. অংশের সমস্যাগুলো সমাধান করা এবং সময় ও সঙ্গতি অনুযায়ী খ. অংশের সমস্যাগুলো সমাধান করার লক্ষ্যে আলাদা আলাদা দুটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও দ্রুত বাস্তবায়নকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রসঙ্গত, গবেষক, লেখক ও আলোচকদের অনেকের আলোচনাতেই আমাদের দেশের জনবসতির তুলনায় রাস্তাস্বল্পতার কথাটি প্রায়ই উঠে আসে, সেই সঙ্গে আসে আরও অনেক তত্ত্ব¡কথা এবং সুদূরপ্রসারী ও মাথাভারী কিছু পরিকল্পনা। তাই বলছি, ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘ঈঁঃ ুড়ঁৎ পড়ধঃ ধপপড়ৎফরহম ঃড় ুড়ঁৎ পষড়ঃয’, (নিজের চরকায় তেল দাও) আমাদের এই প্রবাদটি মনে রেখে বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। রাস্তাস্বল্পতার বিষয়টি সত্য হলেও যে রাস্তা আছে, সেটিই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে কীভাবে বিদ্যমান সমস্যাটি আংশিক হলেও দ্রুত সমাধান করা যায়, সেই দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, আমাদের চিন্তাবিদ ও গবেষকদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী উন্নত দেশের রাস্তার পরিমাণ তাদের জনবসতি এলাকার ২৫ শতাংশের তুলনায় আমাদের দেশে মাত্র ৮ শতাংশ। এই তথ্যটি বিভিন্ন মহলে বারবার ধ্বনিত হলেও, তাদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক অবস্থার তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায় সেটি কখনোই তুলে ধরা হয়নি। তাই আরেকটি প্রবাদ, “ঞযরহশ মষড়নধষষু, ধপঃ ষড়পধষষু” এই চিন্তাধারার সঙ্গে আমাদের কাজের সামঞ্জস্যতা রক্ষা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
সর্বশেষ, আমার দৃষ্টিতে ঢাকা শহরে ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টির কারণ শুধু রাস্তাস্বল্পতাই নয়। বাস্তবতার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে আমাদের রাস্তাসমূহে ট্রাফিক জ্যামের প্রধান কারণ দুটি, ক) ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, খ) যথোপযোগী অবকাঠামোর অভাব। এই দুটি প্রধান কারণের উপকারণসমূহ এবং সম্ভাব্য সমাধান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো, বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরে এলে সার্থক হবে আমার এ প্রচেষ্টা।
ক) ‘ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা’র দুর্বলতার ফলে যানজট সৃষ্টির কারণ ও প্রতিকারসমূহ-
কারণ প্রতিকার
ব্যস্ততম রাস্তার বড় অংশজুড়ে গাড়ি পার্কিং করায় বিদ্যমান রাস্তার পরিবহন ক্ষমতা কমে যাওয়া। সর্ব অবস্থায় সবার জন্য রোড পার্কিং নিষিদ্ধ করা (উল্লেখ্য, রোড পার্কিং কিংবা নিয়মবহির্ভূত স্থানে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য উন্নত দেশসমূহের প্রধানমন্ত্রীও জরিমানার হাত থেকে রেহায় পান না)।
টাউন সার্ভিস বাস/মিনিবাসসমূহ রাস্তায় চলাচলে কোনো নিয়মনীতি না মেনে যত্রতত্র, যেনতেনভাবে এমনকি চলমান রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো। টাউন সার্ভিস বাস/মিনিবাসের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর গাড়ি থামানোর স্টেশন চিহ্নিত করা এবং তদ্নুযায়ী গাড়ি থামাতে বাধ্য করার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। (বর্তমান রাস্তায় নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি থামানোর জন্য এমন কিছু সাইনবোর্ড দেখা গেলেও তার কোনো কার্যকারিতা দেখা যায় না।)
একই রুটে চলাচলকারী বাস/মিনিবাসগুলোকে সব স্টেশনে থামতে না দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু নম্বর ব্যবহার করার মাধ্যমে অল্টারনেটিভ স্টেশনে গাড়ি থামানোর ব্যবস্থা করা, যা উন্নত দেশসমূহে বিদ্যমান।
পথচারী পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং ও ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারী কর্তৃক কোনো নিয়মনীতি মেনে না চলা বা মেনে চলতে বাধ্য না করা। জেব্রা ক্রসিং কিংবা ফুটওভারব্রিজ ছাড়া পথচারীর রাস্তা পারাপার নিষিদ্ধ করা এবং তা নিয়ন্ত্রণকল্পে বিদেশের মতো নিয়ম ভঙ্গকারীকে অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত করা।
দ্রুতগামী এবং ধীরগতিসম্পন্ন যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা লেন চিহ্নিত না করা। প্রতিটি রাস্তায় ভিন্ন ভিন্ন গতিসম্পন্ন যানবাহনের জন্য আলাদা আলাদা লেন তৈরি এবং তা মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
ফুটপাত ও রাস্তার বিশেষ একটা অংশজুড়ে বাজারের পসরা বসিয়ে পথচারী চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। রাস্তার ওপর ও ফুটপাত থেকে বাজারের পসরা সরিয়ে নির্বিঘ্নে পথচারী চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থাকে নিস্ক্রিয় করে ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক হাত উঁচিয়ে অধিক সময় গাড়ি আটকিয়ে রাখা, যা ক্রমপুঞ্জীভূত হয়ে দীর্ঘ জ্যাম সৃষ্টির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা অনুযায়ী ট্রাফিক চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিয়ম ভঙ্গকারী যেই হোক, তাকে আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদান করা (এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা আপডেটেড করা দরকার, তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা)।
রিকশা/ভ্যানের জন্য নিষিদ্ধ রাস্তাগুলোতেও নির্বিঘ্নে রিকশা/ভ্যান চলাচল করা। নিষিদ্ধ রাস্তায় রিকশা/ভ্যান চলাচল বন্ধ করা, প্রয়োজনে আলাদা লেন করে দেওয়া।
টাউন সার্ভিসে মিনিবাসের সংখ্যা বেশি হওয়া এবং রাস্তায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো। মিনিবাসের পরিবর্তে বড় বাস নামানো এবং রাস্তার ওপর গাড়ি চালানো প্রতিযোগিতা বন্ধ করা।
ফিটনেসবিহীন কিংবা রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী গাড়িসমূহ নির্বিঘ্নে রাজপথে চলাচল করা। ফিটনেসবিহীন গাড়িসমূহ চলাচলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
যথাযথ নিয়ম না মেনে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া এবং অনভিজ্ঞ/লাইসেন্সবিহীন চালক দ্বারা রাস্তায় গাড়ি চালানো এবং চালক কর্তৃক অশুভ প্রতিযোগিতায় নামা। (অনভিজ্ঞতার কারণে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়) ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে সব নিয়মনীতি অনুসরণ করে লাইসেন্স প্রদান করা এবং অনভিজ্ঞ ও লাইসেন্সবিহীন চালক দ্বারা গাড়ি চালানো বন্ধ করা।
ব্যস্ততম রাস্তার ওপর চলাচলকারী যানবাহনসমূহ ডানে মোড় নেওয়ার জন্য ঘন ঘন কাটা (ইউ টার্ন) থাকা। রোড ডিভাইডারের কাটাসমূহ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বন্ধ করে ডানে মোড়ের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সিগন্যালিংয়ের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক সব সময় সর্বত্র একই নিয়মনীতি মেনে না চলা। সর্বত্র একই নিয়ম মেনে চলার লক্ষ্যে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি ও তা বাস্তবায়ন করা।
ব্যস্ততম রাস্তার মধ্যে ভিক্ষুক এবং ফেরিওয়ালাদের নির্বিঘ্নে চলাচল করা। রাজপথে ভিক্ষুক/ফেরিওয়ালা চলাচল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা।
ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকল্পে নিয়োজিত ট্রাফিক পুলিশের যথাযথ অভিজ্ঞতা না থাকা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকাজে নিয়োজিত প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ আছে, যা শুধু কর্তৃপক্ষের নজরদারি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু মানসিকতার পরিবর্তন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। মনে রাখা দরকার, উন্নত বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আইন বড় কঠোর এবং তা রাজা-প্রজা সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। আইন ভঙ্গকারী যেই হোন না কেন, তাঁকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য যথার্থ শাস্তি পেতে হয়। আমাদের দেশেও সেই নিয়ম চালু করা এবং তা কঠিনভাবে মেনে চলার বিকল্প নেই।
খ) ‘যথোপযোগী অবকাঠামো’র অভাবে যানজট সৃষ্টির কারণ ও সমাধানসমূহ-
কারণ প্রতিকার
সড়কের অপর্যাপ্ততা অবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে দেওয়া, বিদ্যমান রাস্তার শ্রেণিবিন্যাস করা (লেন সৃষ্টি করা এবং একমুখী রাস্তা চিহ্নিত করা) এবং ফ্লাইওভার নির্মাণ করা।
লেভেল ক্রসিং বিদ্যমান রাস্তাসমূহের লেভেল ক্রসিংয়ে যানবাহন চলাচলের জন্য আন্ডারপাস অথবা ওভারপাস তৈরি করা।
দূরপাল্লার যানবাহনসমূহ ব্যস্ততম শহরের মধ্য দিয়ে চলাচল করা। দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব বাইপাস/সার্কুলার রাস্তা তৈরি করা।
‘খ’ অংশে চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধানে সময় ও অর্থের সংশ্লিষ্টতা আছে বিধায় এগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুষ্ঠু একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করার জন্য যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার এবং ‘ক’ অংশে উল্লেখিত সমস্যাসমূহ স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করে বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থার অধিকতর উন্নয়নের লক্ষ্যে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভিত্তিতে ভেইকুলার আন্ডারপাস, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, মেট্রোরেল ও স্কাইরেল নির্মাণ করার মতো আরও বড় বড় প্রকল্প পর্যায়ক্রমিকভাবে হাতে নেওয়া অপরিহার্য। গুণীজনদের মতে, ‘ডব ধৎব হড়ঃ ঢ়ড়ড়ৎ, নঁঃ ঢ়ড়ড়ৎষু সধহধমবফ’। এই প্রবাদ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা জরুরি।
সর্বোপরি, সমস্যাবহুল জীবন আমাদের, সমস্যা থাকবেই। তবে তা সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই আমাদের কর্তব্য। আর কাজগুলো সঠিকভাবে করতে হলে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা (যার ওপর পুরো কর্মকাণ্ড নির্ভরশীল) তৈরির কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রয়োজন মেধা, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ইতিবাচক মানসিকতাসম্পন্ন কর্মঠ ও একনিষ্ঠ জনবল। মনে রাখা দরকার, শুধু ইতিবাচক মানসিকতা থাকলেই অনেক কঠিন সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব। আর নেতিবাচক চিন্তা করলে কোনো কিছুই সম্ভব নয়। কারণ, আগেই বলেছি, ‘না’-এর কোনো বিকল্প নেই, কিন্তু ‘হ্যাঁ’-এর বিকল্প অনেক। সুতরাং আমাদের এই যানজট, জনদুর্ভোগ ও জাতীয় অপচয় থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে যত দ্রুত সম্ভব উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলো সমাধানকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সচেতন-সজাগ হওয়া অত্যাবশ্যক।
লেখক:
ডিজিএম (কিউএ) অ্যান্ড এমআর, এসইএল
লাইফ ফেলো, দি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ
লাইফ সদস্য- বিএসটিকিউএম, বিএএএস, এওটিএস (জাপান)
লিড অডিটর, আইএসও- ৯০০১:২০০৮ অ্যান্ড ২০১৫ (কিউএমএস)