গৃহদর্শন

আবাসিক ভবন নিয়ে লেখার আগে ‘ঘর’ সম্পর্কিত ভাবনাগুলো গুছিয়ে মনের মধ্যে থিতু করতে চাই। নিঃসন্দেহে ঘরের আকার আছে। ঘরহীন অবস্থা নিরাকৃতির শামিল। সেটা যে সম্ভব না তেমন নয়, কিন্তু দর্শনগত দিক থেকে আলাদা। বুদ্ধের অনুসারী ছিলেন অনাকারিক ধর্মপাল। তাঁদের ধারণাটাই হলো ঘর ভেঙে তথা ঘরহীন থাকা। ঘরের কোনো অস্তিত্ব তাঁদের দর্শনে নেই। আবার একেবারেই যে নেই তা কিন্তু নয়। মানে ‘আধ্যাত্মবাদ’কে সব সময় আমরা ‘বিষয়’ থেকে আলাদা করে ভাবতে অভ্যস্ত তাই মুশকিলটা বেশি। আমাদের দেহঘর যেমন কয়েক দিনের, তেমনি করে এই গৃহও ঠিক কয়েক দিনের। এই দর্শন ছিল মূলত সক্রেটিসের। তাই গৃহকে যদি একটি যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে সেই ‘দুদিনের’ আবাসের কাছাকাছি একটা নাগাল পাওয়া সম্ভব। যেটাকে প্রখ্যাত স্থপতি করবুসিয়ার বলেছেন, ‘Dwelling Machine, Efficient Machine’ সে ক্ষেত্রে কোন কোন গৃহযন্ত্র হিসেবে ভালো ফাংশন করবে, কোনটা নয়। কী করে ভালো ফাংশন করানো সম্ভব সেটাই স্থপতির লক্ষ্য।

ঘর বানানো, বাঁধা- এ-জাতীয় কথার মধ্যেই বন্ধনটা খুব স্পষ্ট। বক্তার মতে একটি আবাসনের ১১টি লক্ষণ থাকে। যেমন-

১.     পরিবেশের প্রতিকূল অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে স্থান তা-ই বাসা। ফলে যেই মাত্র মানুষ রোদ ঠেকাতে কপালের ওপরে হাত দিলেন, তখন থেকেই আসলে স্থাপত্যের শুরু!

২.    ‘আমার’ ঘর, এইখানে ‘আমার’ ঘটনাটা মুখ্য। কারণ, তা স্থানের ওপরে মালিকানা নিশ্চিত করে।

‘বিঘে দুই

ছিল মূল ভুঁই’

         মালিকানা নিয়ে মম অনুভূতি যেখানে তীব্র!

৩.    যেকোনো মানুষের জন্য স্থায়ী ঠিকানা একটা বড় ব্যাপার। এই চিরস্থায়ী আবাসের ভাবনা তাই ঘর, তা সেই ঘরে থাকা হোক বা না হোক।

৪.    ‘আমার’ সম্পত্তি সংরক্ষণের স্থান। ‘আমার’ কেনা যা কিছু, দলিলপত্র যেখানে সুরক্ষিত, সংরক্ষিত সেটিই ঘর, যাকে Accusative Home বা Instrumental Home-ও বলা যায়।

৫.    এই পয়েন্ট থেকে ঘর সম্পর্কিত কিছু অ্যাবস্ট্রাক্ট ধারণার সঙ্গে আমরা পরিচিত হব। ঐতিহ্য ব্যাপারটি অতীত পরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার ভবিষ্যতে যেতে হলে বস্তুত আমাদের অতীতের পানেই ফিরে ফিরে চাইতে হয়। তবে অতীতের চিরচেনাদের একটা টুইস্টের সঙ্গে সামনের দিকে তাকানোর মতো ব্যাপারটিই কিন্তু ঘটেছিল রেনেসাঁ বিপ্লবে।

৬.   বিশ্রাম ও রমণের স্থান। বিশ্রাম বা  ঘুম বাসার একটা অন্যতম ফাংশন। কারণ মৃত মানুষের বাসার দরকার পড়ে না। ফলে মানুষকে ঘুমাতে হয় এবং এরপরেই তার জাগরণ সম্ভব। তাই বাসাকে Home as a Repair এমন আইডিয়ার জায়গা থেকেও ভেবেছেন আইরিশ ইয়াং। আর প্রেম বা হাত ধরাধরি বাইরে সম্ভব হলেও রমণের জন্য মানুষকে Enclosure-এর মধ্যে আসতেই হয়। সভ্যতার লক্ষণ বলে কথা।

৭.    আগুন জ্বালিয়ে রান্না করা, শীতে উষ্ণতা আনা। মোট কথা রান্নাঘরকে হার্ট চিন্তা করে বানানো স্থান হলো ঘর।

৮.    স্নানাগার, শৌচালয় ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দৈনন্দিন কাজ করা যায় ঘর কিন্তু এমন স্থানও।

৯.    নিভৃত একটি জায়গা, যেখানে আবরণ খুলে নিজের শারীরিক এক্সপ্রেমেন্ট করা সম্ভব, নিজেকে বিনির্মাণ করা সম্ভব। আত্ম-বিশ্লেষণ এবং কল্পনার জন্য আদর্শ স্থান।

১০.  সামাজিক মানুষের অসামাজিকতার স্থান অর্থাৎ পলায়নের স্থান, এটিও ঘর!

এসব তো গেল ঘরের বৈশিষ্ট্যগত আলাপ। কিন্তু ঘরের মধ্যে কী ঘটে থাকে, সেসব নিয়েও কিছু বিশ্লেষণ আছে।

  • শিশু, নারী এবং ক্রীতদাস এরাই হলো সবচেয়ে ব্যক্তিগত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। বাসা তাই Abuse করার একটা জায়গায় রূপান্তরিত হয়েছে।
  • Home Sweet Home  থেকে Om Sweet Om-এর বিবর্তন নিয়েও মজা করা হয়।
  • বাসা Oppression আর পুরুষতন্ত্র চর্চার অন্যতম প্রাচীন সংগঠন। মা, স্ত্রী, কন্যা, দাসপ্রথা এসবের মধ্য দিয়ে রানাবান্না সেবা-যত্ন এই জাতীয় কাজের মধ্যে লিঙ্গীয় বৈষম্য এখনো টিকিয়ে রেখেছে বাসা। আজ অবধি কোনো বেস্ট হোম মেকিং অ্যাওয়ার্ড নেই জগতে।
  • বাসা হলো প্রাচীন গোঁড়ামির অন্যতম সচল স্থান।

দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, যিনি কখনো বাসা ছাড়েননি তিনি আসলে মানুষই হননি! তাই লোকেটিভ হোম-এর ধারণা তিনি বাতিল করে বলা চলে, ‘Home is a place that we left!’, সম্পূর্ণরূপে অপাদান কারক। মজার বিষয় হলো, ‘বাসা’ তৈরি হওয়ারও এটাই নাকি পূর্বশর্ত! জীবনানন্দ দাশ যেরকম বনলতা সেনের চোখকে তুলনা করেছেন ‘পাখির নীড়’-এর সঙ্গে, সেটা কিন্তু এই গৃহত্যাগী চেতনা থেকেই! বাংলা সাহিত্যে অলংকরণের মধ্যে এ এক অনন্য বাক্য:

‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’

কলোনিয়াল ব্রিটিশ বুর্জোয়া চেতনায় যেমন কয়েকজনকে বাসা ছাড়া না করলে কয়েকজনের বাসা হয় না। ‘আমার’ বাসা, ‘আমার’ এলাকা, ‘আমার’ টেরিটরি কী করে ফিক্সড হয় তা নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। এক আমেরিকান লোকের বিশাল জমি-জায়গা। জমির এক কোণে ছোট একটা বাড়ি। এক পাগল শাবল নিয়ে এসে সেই জমিতে চাষ করতে গেলে জমির মালিক ভদ্রলোক এসে বললেন,

 জমির মালিক: আপনি এখানে চাষ করছেন কেন?

পাগল:  আপনি বলার কে?

জমির মালিক:  আমি এই জমির মালিক!

পাগল: কী করে হলেন?

জমির মালিক: আমার বাবা দিয়েছেন আমাকে!

পাগল:  তাঁকে কে দিলেন?

জমির মালিক: তাঁর বাবা!

পাগল: তাঁকে?

জমির মালিক:  তিনি রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে পেয়েছেন।

পাগল: বেশ তো! আমার কাছে শাবল আছে, আমিও যুদ্ধ করব এই জমির জন্য!!

অর্থাৎ যেখানে আমার দৈহিক শ্রম মিশে আছে, সেটাই আমার জায়গা, সেই জায়গার ওপরে আমার অধিকার আছে। তাহলে কে খাটল? আমি খাটলাম। আমার কী খাটল? আমার দেহ খাটল। আমার দেহ কার!!! শরীরের সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, আমার ঘরের সঙ্গেই ঠিক ওই একই সম্পর্কের রেপ্লিকেশন।

এখন কথা হলো ‘আমি’ আর ‘আমার শরীর’ কি এক? এক হলে আর ‘আমার’ শরীর বলা চলে না। আলাদা হলে ‘আমার’ শরীর বলা সম্ভব। আমি আর আমার শরীর একও নই আবার আলাদাও নই। তাহলে আমি আর আমার ঘরের সম্পর্কের মধ্যে একটা দার্শনিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই সমস্যার সমাধানের আগ অবধি ঘরকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ কঠিন আছে বৈকি!

সে অর্থে ঘর ‘ঘর’ হয়ে ওঠে তখনই যখন:

১১. যে স্থানের দ্বার খুলে আমি সবাইকে আমন্ত্রণ করতে পারি, সেটাই আমার বাসা। এটি সবার মধ্যে প্রাণিজগৎ থেকে শুরু করে ঋতু পর্যন্ত বিরাজমান। যার কাছে এই অতিথি ঈশ্বর, তিনিই প্রকৃত গৃহবাসী। রবীন্দ্রনাথকে মনে না করে উপায় কী!

‘ওরে গৃহবাসী খোল্, দ্বার খোল্, লাগল যে দোল।

স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।

দ্বার খোল্, দ্বার খোল্।।

রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে,

রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে,

নবীন পাতায় লাগে রাঙা হিল্লোল।

দ্বার খোল্, দ্বার খোল্।।

বেণুবন মর্মরে দখিন বাতাসে,

প্রজাপতি দোলে ঘাসে ঘাসে।

মৌমাছি ফিরে যাচি ফুলের দখিনা,

পাখায় বাজায় তার ভিখারির বীণা,

মাধবীবিতানে বায়ু গন্ধে বিভোর।

দ্বার খোল্, দ্বার খোল্।।’

ইহজাগতিক চিন্তায় আসলেও ঘরকে না ছেড়ে তাকে ঘর বলা সম্ভব নয়। আমরা যে ঘরে রোজ ফেরত আসি তা হলো এক ইলিউশনের মতো। সেই চিন্তায় আমরা সবাই গৃহহীন। কিন্তু এখানে আমার ঘর ছিল ভেবে সেই নস্টালজিয়ার সুখ সঙ্গে করে অতীতে ফিরে ভবিষ্যৎকে আরও নিকটবর্তী করার ঘটনাটাই হলো ঘরে ফেরার আসল মজাটা।

ঘর ভেঙে ঘর করা সম্ভব। ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘মেঘে ঢাকা তারা’য় দেখাচ্ছেন ভাঙা চালের ভেতর দিয়ে তারাভরা আকাশ আর একই সঙ্গে চলছে গান,

‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে’

আবার বুদ্ধদেব ঘর ভেঙেছেন নির্বাণ প্রাপ্তির মাধ্যমে। জন্ম-জন্মান্তরের ফাঁদের এই স্থপতিকে তিনি ধরে ফেলেছেন। তিনি বলছেন,

‘হে স্থপতি তোমার ঘরের ছাদ ফেটেছে, আমি এখন বে-ঘর, বে-আমি!’

অতুল প্রসাদের গান শুনিয়ে আলোচনায় ইতি টানছি-

‘আবার তুই বাঁধবি বাসা কোন সাহসে?

আশা কি আছে বাকি হৃদয়-কোষে।

কতবার গড়লি রে ঘর,

কতবার এল রে ঝড়,

কতবার ঘরের বাঁধন পড়ল খ’সে

বাহিরের মুক্ত মাঠে

যেন তোর জীবন কাটে।

কেন তুই ক্ষুদ্রে বাটে থাকবি ব’সে,

সবারে কর রে আপন,

হ রে তুই সবার আপন;

ভুলে যা দুখের দাহন

ডুব দিয়ে গান-সুধার রসে।’

[অরিন্দম চক্রবর্তীর বক্তৃতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে]

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১২তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৯।

স্থপতি সুপ্রভা জুঁই
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top