ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (শেষ পর্ব)

….. পূর্ব প্রকাশের পর

উপসংহার

যেকোনো নির্মাণকাজের সার্বিক গুণগত মান রক্ষার্থে প্রকল্প বাস্তবায়নকল্পে ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণাগুণ, কাজের পদ্ধতি, নিয়োজিত লোকবলের কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, সুষ্ঠু তদারকি ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। ‘টিকিউএম’-এর ভাষায়, 5Ms (Man, Machine, Materials, Method & Money)-এর সুষ্ঠু প্রয়োগই একটি কাজের মান নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি। এখানে সুষ্ঠু প্রয়োগের বিষয়টিও বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তাই আমাদের প্রতিটি কাজ বাস্তবায়ন করার আগে এসব বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনে নেওয়া এবং তা মেনে চলা অপরিহার্য।

যা-ই হোক, আমার প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ’ সম্পর্কে লেখাটি শেষ করার আগে আর একবার বলতে চাই, একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ স্থায়িত্বতা নিশ্চিত করণার্থে এর কাঠামোগত প্রাথমিক স্তর ‘সাব-গ্রেড’ (ভিত বা বনিয়াদ) নির্মাণের কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাব-গ্রেড তৈরির জন্য ব্যবহৃতব্য মাটির কেমিকেল কম্পোজিশন পরীক্ষা করার পাশাপাশি মাটির মধ্যে যেন অন্যান্য পদার্থ যেমন: ঘাস-পাতা, খড়-কুটো, বাঁশ-কাঠ, কাগজ-পলিথিন ইত্যাদি মিশ্রিত না থাকে তা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

তাই, নির্মিতব্য সড়কের জন্য ‘আর্থ এমব্যাঙ্কমেন্ট’ তৈরির লক্ষ্যে নির্বাচিত বরোপিট থেকে আনীত মাটি নির্ধারিত স্থানে বিছিয়ে দেওয়ার পর মাটিতে এ জাতীয় পদার্থ (যা মাটির কম্প্যাক্শন প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে) থাকলে তা কম্প্যাক্শনের কাজ শুরু করার আগেই অপসারণ করে ফেলা জরুরি। অতঃপর মাটির ঢেলাগুলো ভেঙে দেওয়া, মাটিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়া ইত্যাদি পর্যায়ক্রমিকভাবে সব পদ্ধতি অবলম্বন করার পর মাটি যথাযথভাবে কম্প্যাকশন করে প্রস্তুতকৃত ‘আর্থ এমব্যাঙ্কমেন্ট’-এর গুণগত মান ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অত্র ল্যাবরেটরি টেস্টে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া না গেলে কম্প্যাকটেড মাটি ট্রাক্টরের সাহায্যে আলগা করে নিয়ে পুনরায় ধারাবাহিকভাবে সব পদ্ধতি অবলম্বন করার পর আগের মতো একইভাবে কম্প্যাকশন শেষ করার পর আবারও স্যাম্পল কালেকশন করে ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। অতঃপর সড়কের অন্যান্য স্তর (সাববেইজ, বেইজ কোর্স, সারফেস কোর্স ইত্যাদি) নির্মাণের কাজগুলো ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণগত মান এবং কাজের পদ্ধতিসহ সব নিয়মনীতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

মনে রাখা দরকার, নির্মিতব্য রাস্তার সাব-গ্রেড (ভিত বা বনিয়াদ) যদি যথাযথভাবে নির্মাণ করা না হয়, তাহলে রাস্তার স্থায়িত্বতা কমে যাবে। ফলে, যেকোনো রাস্তার সাব-গ্রেড নির্মাণের ক্ষেত্রে মালামাল ও কাজের গুণগত মান রক্ষার্থে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া, পরবর্তী প্রতিটি লেয়ারের কাজ সম্পন্ন করতেও ড্রইং ও স্পেসিফিকেশন অনুসারে সব মালামাল ও কাজের গুণগত মান রক্ষা করা অপরিহার্য। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করণার্থে অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া এবং নিয়মিতভাবে সুষ্ঠু তদারকি করার কোনো বিকল্প নেই।

প্রসঙ্গত, আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ‘নরাক’-এর আন্তর্জাতিক ‘এক্সপ্রেস ওয়ে নম্বর ১’ (বাগদাদ থেকে বসরা) নির্মাণকাজের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পৃক্ত ছিলাম। এই নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মালামাল ও কাজের গুণগত মান নিজের চোখে অবলোকন করার পর দেশের বিভিন্ন প্রকার সড়ক নির্মাণকাজের জন্য ব্যবহৃত মালামাল, কর্মপদ্ধতি এবং কাজের গুণগত মান দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্ববোধ এবং কৃত কাজের ফলাফল মেনে নিতে আমার বড় কষ্ট হয়। এ সবকিছুর মূলে আমাদের সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায়ে সুশাসন, সুষ্ঠু তদারকি এবং জবাবদিহির অভাব, যা দূর করা অত্যাবশ্যক।

একটি কথা না বললেই নয়, দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি যা দেখেছি তাতে আমাদের দেশের মানুষের রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যাওয়ার একটা প্রবণতা প্রবলভাবে কাজ করে, যা একজন প্রকৌশল ব্যক্তিত্ব এবং দেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারি না। তাই, চলমান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছে। যদিও বিষয়গুলো অরণ্যে রোদনের মতো একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তারপরও বিবেকের তাড়নায় এসব লেখালেখি কিংবা আলোচনায় অংশগ্রহণ করা আমার পক্ষ থেকে নাগরিক দায়িত্ব পালনের একটা অংশ বলে আমি মনে করি।

সেই তাড়না থেকেই দেশের কিছু কিছু সড়ক নির্মাণ/মেরামত প্রকল্পের বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে ‘সড়ক নির্মাণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ’-এর ব্যাপারে সার্বিক বিষয়গুলো তুলে ধরে বিদ্যমান অবস্থার উন্নতিকল্পে আমার এই প্রচেষ্টা। তাই, আমার এই ধারাবাহিক লেখার প্রথম পর্বেই সড়কপথে চলাচলকারী জনমানুষের ভোগান্তির কথাগুলো সবিস্তারে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। জানি না, কারও কর্ণকুহরে পৌঁছে এটা কোনো সুফল বয়ে আনতে পারবে কি না। তারপরও বলব, আমার এই সামান্য প্রয়াস কোনো না কোনোভাবে সুফল বয়ে আনতে পারে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ‘সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ’, আর মানুষের সেই শ্রেষ্ঠত্বের (সেরা) প্রমাণ মেলে তার কর্মে। মানবিক, সামাজিক, বৈষয়িক, পেশাভিত্তিক এসব কর্মকাণ্ডের কোনোটাকে বাদ দিয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা যায় না। তাই মানুষের প্রতিটি কর্মের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার আত্মসচেতন হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, মানুষ হিসেবে আমাদের প্রতিটি কর্মেরই জবাবদিহি করার একটি বিষয় আছে, তা জাগতিক এবং পারলৌকিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এ ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতালব্ধ একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভোগ্যপণ্য উৎপাদন এবং সেবা প্রদান বিষয়ে ‘কাস্টমার সেটিসফেকশন’ নামের একটি অধ্যায় আছে, যা সংশ্লিষ্ট কাজের সার্বিক উন্নতির প্রধান চাবিকাঠি বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। আমি একটি বইয়ের ‘কাস্টমার সেটিসফেকশন’ অধ্যায় ওল্টাতে গিয়ে যে কঠিন একটি উপলব্ধি আমার হয়েছে, তা সবার জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করার সুযোগ পেলেই আমি তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। অত্র বইয়ের ‘কাস্টমার সেটিসফেকশন’ অধ্যায়ের প্রথমেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, Who is customer?           

Answer:

  1. First customer is yourself, you have to be satisfied about all of your products or services;
  2. Second customer is your employer, to whom yo are working, he needs to be satisfied;
  3. Third customer is the end users of your products or services; they need to be satisfied;
  4. Fourth and the last customer is the Creator; to whom your are liable to  explain all about your activities that are being performed on the earth, you must have to satisfy the creator.

এই বিশদ সংজ্ঞাটি থেকে আমার উপলব্ধি, কাস্টমারের প্রথম ও চতুর্থ সংজ্ঞা দুটো মনে রেখে নিজের আত্মতুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই ‘কাস্টমার সেটিসফেকশন’ নিশ্চিত করা যাবে, সমাধান মিলবে বিদ্যমান সব সমস্যারও। অতএব আমাদের সবার উপলব্ধি একই হওয়া উচিত। অর্থনীতির ভাষায়, ‘অভাব অফুরন্ত, সময় সীমাবদ্ধ, আয় সীমিত’। তাই আমাদের স্ব স্ব কর্মক্ষেত্রে সব নিয়মনীতি মেনে চলা নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে স্মরণ রাখা অত্যাবশ্যক। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১১১তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৯।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top