…..পূর্ব প্রকাশের পর
স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার সাপ্লাই
একটি ইমারত নির্মাণকাজের সার্বিক গুণগত মান রক্ষা করা এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণকল্পে স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই পাইপ লাইনসমূহ বসানো এবং ফিটিংস-ফিক্সারস লাগানোর কাজগুলো অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে করাটা জরুরি। কারণ, ইমারত নির্মাণ-পরবর্তী, ব্যবহারকালীন এর নানা সমস্যা (যেমন- পানি লিক করা, পাইপ লাইন জ্যাম হওয়া ইত্যাদি) দেখা দিতে পারে, যা সমাধান করা যেমন কঠিন, তেমনই ব্যয়সাধ্যও বটে। ফলে এসব কাজ বাস্তবায়ন-পূর্ব প্রয়োজনীয় সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক। একটি প্রবাদ আছে- ‘Prevention is better than cure’।
অতীতে আমাদের দেশে স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমের জন্য পাইপ লাইনসমূহ সারফেসড ওয়্যারিং করা হতো। অর্থাৎ ইটের গাঁথুনি করার পর দেয়ালে আস্তর দেওয়া/মোজাইক করা/টালি লাগানোর কাজগুলো শেষ করার পর সরাসরি দেয়ালের ওপর পাইপসমূহ বসিয়ে ক্লাম্প দিয়ে আটকে দেওয়া হতো। এভাবে পাইপ লাইন স্থাপনের কাজটি ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ এবং ব্যবহারকালীন পানি লিক করা কিংবা পাইপ জ্যাম হওয়ার মতো কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা ছিল সহজেই মেরামতযোগ্য। কিন্তু দৃষ্টি নান্দনিকতার বিষয়টি চিন্তা করে এখন আর সারফেসড ওয়্যারিং করা হয় না।
বর্তমান নির্মাণকাজে স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমের জন্য ইটের গাঁথুনি শেষ করার পর দেয়ালে গ্রুভ করে তার ভেতরে পাইপসমূহ বসানো হয়। এরপর আস্তর দিয়ে/মোজাইক করে/টালি লাগিয়ে এসব পাইপ লাইন ঢেকে দেওয়া হয়, যার ফলে একে কনসিলড ওয়্যারিং বলা হয়। ইটের দেয়াল গাঁথুনি করার পর ঠিকমতো জমাট বাঁধার আগে গ্রুভ কাটা উচিত নয়। কনসিলড ওয়্যারিংয়ের ক্ষেত্রে গ্রুভ কাটা, পাইপ বসানো, প্লাস্টার করা, টাইলস ফিটিং করা, রং করা ইত্যাদি কাজ পর্যায়ক্রমিকভাবে সম্পন্ন করা হয়। ফলে, কাজ শেষ করতে সময় বেশি লাগে এবং খরচও বাড়ে।
প্রসঙ্গত, এই পদ্ধতিতে স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার সাপ্লাই পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে ফিটিংস-ফিক্সারসসহ প্রয়োজনীয় মালামাল এবং কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করণার্থে সংশ্লিষ্ট সবার সচেতন হওয়া অপরিহার্য। কারণ, পাইপ লাইন বসানো এবং ফিক্সারসসমূহ লাগানোর কাজ শেষে ফিনিশিং দেওয়ার পর যদি কোথাও কোনো লিক কিংবা জ্যাম দেখা যায়, তাহলে তার উৎসস্থল খুঁজে বের করতে অনেক বেগ পোহাতে হয় এবং এই উৎসস্থল খোঁজার জন্য অনেক ভাঙাচোরাও করতে হতে পারে। যাতে মানসিক ও শারীরিক ভোগান্তি ছাড়াও আর্থিক অপচয় বৃদ্ধি পায়।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে কনসিলড ওয়্যারিংয়ের ক্ষেত্রে নির্মাণ-পরবর্তী ব্যবহারকালীন সমস্যাদি এড়ানোর জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে, পাইপ লাইনগুলো ওয়্যারিং শেষ করার পর দেয়াল প্লাস্টার করা কিংবা টাইলস লাগানোর আগেই স্থাপিত পাইপ লাইনের সঙ্গে পানির সাপ্লাই লাইন সংযোগ দিয়ে প্রেসার পাম্পের সাহায্যে লিক টেস্ট করা জরুরি। এই কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে দক্ষ একজন প্রকৌশলী কিংবা সুপারভাইজারের তদারকি সাপেক্ষে টেস্ট করা এবং টেস্টের সন্তোষজনক ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।
আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, আমাদের দেশে অতীতকালে সাধারণত ওয়াটার সাপ্লাই লাইনের জন্য জিআই (গ্যালভানাইজড আয়রন) পাইপ ও জিআই ফিটিংস এবং স্যানিটেশন সিস্টেমের জন্য সিআই (কাস্ট আয়রন) পাইপ ও সিআই ফিটিংস ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে, উভয় ক্ষেত্রেই পিভিসি কিংবা ইউপিভিসি পাইপ ও ফিটিংসমূহ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই পিভিসি কিংবা ইউপিভিসি পাইপ এবং জিআই কিংবা সিআই পাইপের ধারণক্ষমতা এক নয়, এক নয় পাইপ লাইন স্থাপনের কর্মপদ্ধতিও। তাই কাজের ত্রুটির কারণে লাইনসমূহে লিক হওয়ার সমস্যাটি বেড়েছে।
এই সমস্যাসমূহ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পিভিসি কিংবা ইউপিভিসি ফিটিংসসমূহ লাগানোর সময় কর্মরত মিস্ত্রিদের অনভিজ্ঞতাবশত হয় অতিরিক্ত চাপে এগুলো ফেটে যায় নতুবা অল্প চাপে লাগানোর দরুন ঠিকমতো টাইট হয় না। পাইপ লাইন ওয়্যারিং শেষে ফিক্সারসসমূহ লাগানোতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে, পরবর্তী সময়ে পানি লিক করা কিংবা লাইন জ্যাম হওয়ার বিষয়গুলো প্রকট আকার ধারণ করে। অতএব, সব কাজ সুষ্ঠুমতো হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য অভিজ্ঞ প্রকৌশলী কিংবা সুপারভাইজার দ্বারা নিয়মিত তদারকির বিষয়টি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
পুনশ্চ: স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই পাইপ লাইন স্থাপনের জন্য বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন মানের মালামাল বিদ্যমান, যার দরদামেরও অনেক পার্থক্য। মনে রাখা দরকার, মান যার ভালো, দামও তার একটু বেশি। তাই ভালো মানের মালামাল কিনতে দাম একটু বেশি দিতে হতে পারে; এটাই স্বাভাবিক। অতএব, দামের সাশ্রয় চিন্তা করে নিম্নমানের মালামাল কিনে ভবিষ্যতে নানা সমস্যার মুখোমুখি না হওয়াই শ্রেয়। এ ছাড়া কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতেও একটু বেশি পারিশ্রমিক দিয়ে ভালো মানের (অভিজ্ঞ) লোকবল নিয়োগ দেওয়াটা জরুরি।
স্যানিটেশন ও ওয়াটার সাপ্লাই লাইনের পাইপসমূহ সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে স্থাপনের পর ফিনিশিং আইটেম হিসেবে ফিক্সারসসমূহ লাগানো হয়। এ ক্ষেত্রেও ভালো মানের বা কোয়ালিটিসম্পন্ন মালামাল কেনার কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে খরচ বড় একটি বিষয়, যা উপেক্ষা করা যায় না। বিশেষ করে, স্যানিটারি ফিক্সারসসমূহের কোয়ালিটিভেদে দামের পার্থক্য বিস্তর। বিব কক, অ্যাঙ্গেল স্টপ কক, কনসিলড স্টপ কক, বেসিন মিক্সার, শাওয়ার মিক্সার, সিঙ্ক মিক্সার, মুভিং শাওয়ার, কমোড, বেসিন প্রতিটি আইটেমেরই কোয়ালিটি অনুযায়ী দামের পার্থক্য রয়েছে।
বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির চোখ ও মন জুড়ানো বিভিন্ন মানের মালামাল বিদ্যমান। এগুলোর দামের তারতম্যও অনেক। এমনকি একই কোম্পানির একই আইটেমের দামের পার্থক্যও আকাশচুম্বী। তাই, মানুষ তাঁর আর্থিক সংগতি ও রুচির সমন্বয় করে এসব মালামাল ব্যবহার করে থাকে। অতএব, কোয়ালিটি-সচেতন ব্যক্তিদের জন্য এসব মালামাল ও দামের তারতম্যের বিষয়ে সম্যক কিছু ধারণা থাকা দরকার। এ লক্ষ্যে বর্তমান বাজারে বহুল প্রচলিত নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির বিভিন্ন মালামালের দামের পার্থক্যসহ কিছু আইটেমের একটি মূল্য তালিকা:
উপরোল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, একটি প্রকল্পের নির্মাণব্যয় নিয়ন্ত্রণকল্পে নিম্নমানের মালামাল কেনা এবং অনভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেওয়া আদৌ সমীচীন নয়। কারণ, কমদামি মালামাল ব্যবহার করা কিংবা কম খরচে অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে কাজ করানোতে সাশ্রয় হওয়ার পরিবর্তে খরচ আরও বেড়ে যায়। তাই আপাত দৃষ্টিতে খরচ একটু বেশি হলেও মালামাল ও কাজের কোয়ালিটি নিশ্চিত করা জরুরি। জাপানিদের ভাষায়, ‘Quality reduces cost’। কিন্তু, ভালো মানের মালামাল ও কাজে দামের পার্থক্য দেখলে সাধারণভাবে বিষয়টি মানতে কষ্ট হয়।
তবে বাস্তবিক অর্থে বিষয়টি সত্য। যার ব্যাখ্যাটা এমন, যে যার ক্ষেত্র অনুযায়ী মিলিয়ে নিতে পারেন। আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমার বাসায় ২০০১ সালে ২,৫০০ টাকায় একটি বেসিন মিক্সার লাগিয়েছিলাম, যা আজ অবধি চলছে, আরও কত দিন চলবে জানি না। অন্যদিকে, ১,২০০ টাকায় আর একটি বেসিন মিক্সার লাগিয়েছিলাম, যা তিন বছরের মাথায় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন যদি বার্ষিক খরচের হিসাব করি তাহলে দেখা যায়, ২,৫০০/১৭ = ১৪৭.০৫ টাকা এবং ১,২০০/৩ = ৪০০.০০ টাকা। অর্থাৎ ‘Quality reduces cost’ প্রমাণিত।
এ ছাড়া একটি কোয়ালিটিসম্পন্ন জিনিস ব্যবহারে তার দীর্ঘস্থায়িত্বতা, ব্যবহারিক সুবিধা, মানসিক তুষ্টি সব মিলে আর্থিক বিষয়টি আর মুখ্য থাকে না। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রেই আর্থিক দিকটি বিবেচনা করার আগে উল্লেখিত বিষয়গুলো ভেবে দেখা দরকার। সবশেষে বলতে চাই, নির্মাণকাজে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে কোনোভাবেই কোয়ালিটির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া উচিত নয়। অত্র বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের স্লোগান, ‘Quality comes first, profit is its logical sequences’। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই এ রকম ভালো কিছু চিন্তা করা উচিত বলে আমি মনে করি।
চলবে….
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯০তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৭।