ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৭)

….পূর্ব প্রকাশের পর

টালির ফ্লোর নির্মাণ কাজে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইটেমটি ব্যয়বহুল, যার অপচয় রোধ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবার সজাগ ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ফলে নির্দিষ্ট একটি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় টালির পরিমাণ নিরূপণ করার লক্ষ্যে মিস্ত্রিনির্ভর হওয়া চলবে না। কারণ, মিস্ত্রিরা কোনো কোনো সময় প্রয়োজনের অনেক বেশি পরিমাণ টালি কেনার জন্য এস্টিমেট দিয়ে থাকে। যাতে তারা কোনো রকম সতর্কতা ছাড়া ইটালিগুলো ইচ্ছামতো কাটা-ছাঁটা করে সম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে পারে।

অন্যদিকে, কেউ কেউ আবার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম এস্টিমেটও দেয়। ফলে, সংগৃহীত টালি বসানোর পর যখন সম্পূর্ণ কাজ শেষ করতে পারেনা, তখন অসমাপ্ত কাজের জন্য নতুন এস্টিমেট দিয়ে থাকে। এতে যে বিভ্রাটটি দেখা দেয় তা হলোÑআগের কেনা টালি হয়তো আর মার্কেটে নেই কিংবা থাকলেও রঙের তারতম্য দেখা দিচ্ছে। প্রসঙ্গত, একই কোম্পানির একই কোড নাম্বারের টালিও বিভিন্ন লটে সাইজ ও রঙের তারতম্য দেখা যায়।

এই সাইজ ও রঙের তারতম্যের বিষয়টি অতি সূক্ষ¥, যা দুই লটের টালি পাশাপাশি ধরে মেলানো ছাড়া বোঝা কঠিন। তাই, কাজের শুরুতেই প্রয়োজনীয় টালির পরিমাণ নিরূপণ করাটা জরুরি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামালের এস্টিমেট বেশি কিংবা কম দেওয়ার বিষয়টি আসে অনভিজ্ঞতা থেকে। ফলে, কাজের মান রক্ষা করা এবং কাজ সম্পাদনে বিড়ম্বনা এড়াতে একজন অভিজ্ঞ মিস্ত্রি কিংবা প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া অত্যাবশ্যক।

টালির কাজে সাধারণত ভাঙা, ফাটা, কাটা ইত্যাদি কারণে প্রকৃত পরিমাপ থেকে ৫%-১০% পর্যন্ত বেশি টালি লাগতে পারে। বাটালিকাটা এবং প্রতিটি টালির কাটা অংশের যথাযথ ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। অতএব, টালির অপচয় রোধকল্পে প্রকৃত পরিমাপ থেকে এই ৫%-১০% বেশি লাগার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। অন্যথায়, অপচয় বেড়ে যাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে যে প্রকৃত কাজের মাপের তুলনায় ৩০%-৪০% অতিরিক্ত টালি কেনা হয়েছে এবং কাজের শেষে কোনো টালি অবশিষ্ট নেই।

এছাড়া আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, তাহলো টালির সাইজ যত বড় হবে, অপচয়ের বিষয়ে তত বেশি সতর্ক হতে হবে। কারণ, একটি টালির আয়তন বেশি হওয়ায় প্রতিটি নষ্ট (ফাটা, কোনাভাঙা কিংবা ভুল করে কেটে ফেলা ইত্যাদি) টালির গুণিতকহারে অপচয় বাড়তে থাকে। যেমন- ০-৬” x ০-৬” সাইজের একটি টালির আয়তন মাত্র ০.২৫ এসএফটি। যেখানে ২’-০” x ২’-০” সাইজের একটি টালির আয়তন ৪.০০ এসএফটি। অর্থাৎ একটি টালির আয়তন অন্যটির ১৬ গুণ। অতএব, একটি বড় টালি নষ্ট হওয়া আর একটি ছোট টালি নষ্ট হওয়ার ফলাফল এক নয়।

উল্লেখ্য, টালি ও টালির কাজের পরিমাপ উভয়ই‘এসএফটি’ হিসাবে করা হয়। ফলে, টালি অপচয় রোধকল্পে উপরোল্লিখিত তথ্যটি মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া, টালি বসানো কাজের জন্য মিস্ত্রির মজুরিও ‘এসএফটি’তে হয়। অর্থাৎ প্রকৃত কাজের মাপ অনুসারে লেবার বিল পরিশোধ করা হয়।  অতএব, অত্র কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল এবং কাজের পরিমাপ নির্ণয় করার নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট সবার সম্যক কিছু ধারণা থাকা দরকার, যামালামাল কেনা এবং কাজের বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

নির্দিষ্ট একটি ফ্লোর তৈরির কাজে টালির পরিমাণ এবং কাজের পরিমাপ নির্ণয় করা অত্যন্ত সহজ একটি বিষয়। কাজের জায়গাটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ গুণ করলেই কাজের ক্ষেত্রফল (পরিমাপ) বেরিয়ে আসে। অনুরূপভাবে একটি টালির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ গুণ করলেই একটি টালির ক্ষেত্রফল পাওয়া যায়। অতঃপর একটি টালির ক্ষেত্রফল দিয়ে সমস্ত কাজের জায়গার ক্ষেত্রফলকে ভাগ করলে মোট টালির সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব। এই আয়তন বা ক্ষেত্রফল বের করার নিয়মটি জেনে নিলেই কাজগুলো অত্যন্ত সহজ হয়। ফলে, একটি রুমে (কক্ষে) টালির কাজ করতে প্রয়োজনীয় টালির পরিমাণ নিরূপণ এবং প্রকৃত কাজের পরিমাপ হিসাব করার একটি নমুনা নিচে দেখানো হলো, যা থেকে টালি কেনা রজন্য পরিমাণ নিরূপণ এবং লেবার বিল পরিশোধ করার বিষয়গুলো সহজেই বোধগম্য হবে।

ধরা যাক,

১৫’-০”  লম্বা এবং ১২’-০”  প্রস্থবিশিষ্ট একটি রুমের ফ্লোরে টালির কাজ করাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে, প্রকৃত কাজের পরিমাণ বা ক্ষেত্রফল নিম্নরূপ-

ফ্লোর= ১৫’-০” x ১২’-০” = ১৮০.০০ এসএফটি

স্কার্টিং*= (১৫’-০” + ১২’-০” )x২= (৫৪’-০” )-(৩’-০” )= ৫১’-০” x ০’-৬”  =২৫.৫০  এসএফটি

মোট  = ২০৫.৫০ এসএফটি

(*স্কার্টিং বলতে একটি রুমের চারপাশের দেয়ালের খাড়াভাবে ৬”  (ইঞ্চি) পর্যন্ত উচ্চতার কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে। অতএব, ১৫’-০”  লম্বা এবং ১২’-০”  প্রস্থবিশিষ্ট একটি রুমের চারদিকের দেয়ালের মাপ = (১৫’-০”  + ১২’-০” )x ২ = ৫৪’-০”  (ফুট)। ধরে নেওয়া যাক, চারপাশের দেয়ালের মধ্যে একটি মাত্র দরজা আছে, যার আড়া আড়ি মাপ ৩’-০” । সেই অনুসারে, উল্লেখিত রুমের চারদিকের দেয়ালের মাপ দাঁড়াবে, (৫৪’-০” )+ (৩’-০” )= ৫১’-০” এবং ৬” উচ্চতায় স্কার্টিং করলে তার পরিমাণ হবে, ৫১’-০” x ০-৬”  =  ২৫.৫০  এসএফটি।)

উপরোল্লিখিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী কাজের প্রকৃত পরিমাপ হবে ২০৫.৫০এসএফটি,যা লেবার বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু, অত্র কাজের জন্য প্রয়োজনীয় টালি কেনার সময় প্রকৃত মাপ থেকে ১০% অতিরিক্ত টালি কিনতে হবে। অর্থাৎ (২০৫.৫+২০৫.৫x ১০%) =২২৬.০৫ এসএফটি।

আবার,

ধরে নেওয়াযাক, উল্লেখিতকাজেরজন্য ২’-০” x ২’-০” সাইজেরটালিব্যবহারকরাহবে,যারএকটিটালিরআয়তনবা ক্ষেত্রফল = ২’-০” x ২’-০”  = ৪.০০এসএফটিএবংঅত্র কাজেটালিরআনুমানিকঅপচয়সহ মোটপরিমাপ, ২২৬.০৫এসএফটি।

অতএব,

প্রয়োজনীয় টালির সংখ্যা হবে, ২২৬.০৫/৪.০০ = ৫৬.৫১টি বা ৫৭টি।

অর্থাৎ উল্লেখিত কাজের জন্য ৫৭টি = ৫৭x ৪.০০= ২২৮.০০ এসএফটি টালি কিনতে হবে।

এমনিভাবে প্রতিটি রুমের কাজের পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় টালির সংখ্যা বা পরিমাণ (এসএফটি) বের করা সম্ভব। সেই সঙ্গে, একটু সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করলে অপচয় রোধ করাও কঠিন কোনো বিষয় নয়।

তবে, একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তা হলো, অত্র কাজের লেবার বিল পরিশোধ করার সময় মিস্ত্রির শঠতা এবং মালিকের সরলতা হেতু যে পরিমাণ টালি কেনা হয়েছে সেই মাপ অনুযায়ী লেবার কন্ট্রাকটর বিল দাবি করতে পারে। কিন্তু এটি সঠিক নয়, অপচয়কৃত টালির পরিমাপ এই বিলের মধ্যে যোগ করা যাবে না। প্রকৃত কাজের মাপ অনুসারে লেবার বিল পরিশোধ করতে হবে।

চলবে…

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top