ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৬)

….পূর্ব প্রকাশের পর

মোজাইক

পূর্বে ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজে বিত্তবান (যাঁরা মোজাইকের পরিবর্তে মার্বেল পাথর বসানোর সামর্থ্য রাখেন) ছাড়া সবার কাছে মোজাইক ফ্লোরই আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। মোজাইক ফ্লোরের রং ও কাজের ধরন অনুসারে বিভিন্ন রকমের হয়। সাধারণত ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজে আরসিসি ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর ১ ইঞ্চি  পুরুত্বে রাফ পেটেন্ট স্টোন ঢালাই দিয়ে তার ওপর মোজাইক ঢালাই করা হয়।

মোজাইক ঢালাইয়ের ইনগ্রিডিয়েন্ট হিসেবে মার্বেল চিপস (বিভিন্ন সাইজ এবং রঙের হতে পারে), মার্বেল ডাস্ট ও সিমেন্ট (গ্রে অথবা হোয়াইট) ব্যবহৃত হয়। ফ্লোরের নকশা এবং ব্যবহারকারীর রুচি অনুসারে এসব উপাদানের মিশ্রণের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়। মোজাইক ফ্লোর ঢালাই করার পর নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত কিউরিং শেষে মোজাইক কাটা পাথর দিয়ে মেশিনে বা হাতে কেটে সমান করে ফিনিশিং দেওয়ার জন্য অ্যাসিড ও মোমপলিশ করা হয়।

মোজাইক ফ্লোর সাধারণত দুভাবে নির্মিত হয়;

১. প্রি-কাস্ট মোজাইক

২. কাস্ট-ইন-সিটু মোজাইক।

প্রি-কাস্ট মোজাইক

প্রি-কাস্ট মোজাইক ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজে নির্দিষ্ট ফ্লোরের ওপর সরাসরি ঢালাই না করে অন্য জায়গায় বিভিন্ন সাইজের টালি আকারে ৩-৪ ইঞ্চি পুরুত্বে মোজাইক ঢালাই করে জমাট বাঁধানো হয়। এরপর পর্যাপ্ত পরিমাণ কিউরিং শেষে রাফ ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর সিমেন্ট মর্টার দিয়ে টালিগুলো বসানো হয়। টালি বসানো হলে পুনরায় কিউরিং করার পর পাথর দিয়ে কেটে যথারীতি পলিশ করাসহ ফিনিশিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

কাস্ট-ইন সিটু মোজাইক

আরসিসি ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর ১ ইঞ্চি পুরুত্বে রাফ ঢালাই (পেটেন্ট স্টোন) করতে হয়। অত্র রাফ ঢালাই করার সময় গ্লাস স্ট্রিপ ব্যবহার করে বিভিন্ন সাইজের প্যানেল তৈরি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে (বিশেষ শৌখিনতাবশত) প্যানেল তৈরি করার জন্য ব্রাসের স্ট্রিপও ব্যবহার করা হয়। অতঃপর মার্বেল চিপস, মার্বেল ডাস্ট ও সিমেন্টের সংমিশ্রণে ৩/৮ ইঞ্চি পুরুত্বে মোজাইক ঢালাই করে উপরোল্লিখিত একই নিয়মে ফিনিশিং দেওয়া হয়।

উৎসস্থল, কোয়ালিটি, সাইজ ও রংভেদে বাজারে নানা ধরনের মার্বেল চিপস পাওয়া যায়। সাধারণত ব্যবহারকারীর রুচি ও আর্থিক সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় মালামাল নির্বাচন করা হয়। বিভিন্ন সাইজ ও রঙের মার্বেল চিপসের মিশ্রণে ফ্লোরের দৃষ্টিনান্দনিকতা কী রকম হবে, তার কিছু রেডিমেড নমুনা দোকানের ডিসপ্লেতে দেখা যায়। যেখানে বিভিন্ন সাইজ ও রঙের চিপস কী অনুপাতে মেশাতে হবে তারও একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়।

শুধু মার্বেল চিপস নয়, মোজাইকের কাজে ব্যবহারের জন্য সিমেন্টেরও রকমফের রয়েছে। যেমন- গ্রে সিমেন্ট এবং হোয়াইট সিমেন্ট। এ দুটি সিমেন্টের দামের ব্যবধান অনেক। ফলে, মোজাইক ঢালাইয়ের কাজে কোন সিমেন্ট ব্যবহার করা হবে, তা ব্যবহারকারীর আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজনে শুধু গ্রে সিমেন্ট অথবা শুধু হোয়াইট সিমেন্ট কিংবা বিভিন্ন অনুপাতে গ্রে ও হোয়াইট সিমেন্টের মিশ্রণ তৈরি করেও মোজাইক ঢালাইয়ের কাজ  করা যেতে পারে।

মোজাইক ফ্লোর সচারচর টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন হয়। কিন্তু এ ফ্লোর ঢালাই করা এবং ফিনিশিং দেওয়ার কর্মপদ্ধতিসমূহ বেশ কঠিন একই সঙ্গে সময়সাপেক্ষ। এ ছাড়া এ কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণগতমান নিশ্চিত করা এবং কাজের পদ্ধতিসমূহ সঠিকভাবে মেনে চলা বেশ কষ্টসাধ্য। উপরিউক্ত, মোজাইক ফ্লোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজটিও তুলনামূলকভাবে কঠিন। ফলে ইদানীং মোজাইকের ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে মোজাইক ফ্লোরের প্রচলন না থাকলেও সিরামিক টালি ব্যবহারে নির্মিত ফ্লোরসমূহে বর্তমানে যেসব সমস্যা (টালি ভেঙে যাওয়া, ফেটে যাওয়া, উঠে যাওয়া ইত্যাদি) দেখা দিচ্ছে, সেই তুলনায় মোজাইক ফ্লোর তৈরি করাই ভালো। মোজাইক ফ্লোর বছরের পর বছর ব্যবহারেও কোনো সমস্যা হয় না। বরং পুরোনো কিংবা নোংরা হয়ে যাওয়া মোজাইক ফ্লোরের ওপর পুনরায় মেশিন চালিয়ে ফিনিশিং দিলে তা আবার নতুন রূপ ধারণ করে। ফলে উল্লেখিত সুবিধা-অসুবিধাদি বিবেচনা করে মোজাইক ফ্লোরের চাহিদা নতুনভাবে আবারও দেখা দিতে পারে।

তাই মোজাইক ফ্লোর নির্মাণে কাজের গুণগতমান রক্ষা এবং খরচ সাশ্রয় করাসংক্রান্ত কিছু বিষয় বলতে চাই। প্রথমত, কাজের গুণগতমান রক্ষাকল্পে প্রয়োজনীয় মালামালের গুণাগুণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষ করে ব্যবহৃত হোয়াইট সিমেন্টের গুণগতমানের ওপর মোজাইকের স্থায়িত্ব ও ফিনিশিংয়ের কোয়ালিটি নির্ভর করে। অতীতে হোয়াইট সিমেন্টের সঙ্গে মার্বেল ডাস্ট মিশিয়ে ভেজাল সিমেন্ট সরবরাহের জন্য একটি দুষ্টু চক্র অত্যন্ত সক্রিয় ছিল, যার ফলে মোজাইক ফ্লোর তৈরি করা পর খুব খারাপ এক অভিজ্ঞতা হতো। এ ছাড়া মার্বেল চিপসের উৎসস্থল ও দামের পার্থক্য মিলিয়ে গুণগতমানের তারতম্য অনেক। ফলে ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণগত মান বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অভিজ্ঞতা ও সচেতনতা সঠিকভাবে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। মালামালের গুণাগুণ নিশ্চিত করার পর কাজের পদ্ধতিগত বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যেমন- বিভিন্ন মালামাল সঠিক অনুপাত অনুযায়ী মেশানো, পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা খুবই জরুরি।

সর্বোপরি, সঠিকভাবে মিশ্রিত শুকনা মালামাল পানি দিয়ে মেশানোর পর যে কংক্রিট তৈরি হয়, তা ফ্লোরে ঢালা, ফিনিশিং দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ পানি দিয়ে মেশানোর পর থেকে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা অপরিহার্য। ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার ১০ ঘণ্টা পর সম্পূর্ণ এলাকায় পানি আটকিয়ে সর্বনিম্ন ২১ দিন পর্যন্ত কিউরিং করা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এরপর কাটিং মেশিন চালানো, পাথর ও সিরিশ কাগজ দিয়ে হাতে ঘষা, অক্সালিক অ্যাসিড ও মোম পলিশ করা ইত্যাদি কাজগুলো পর্যায়ক্রমিকভাবে শেষ করা হয়ে থাকে।

মোজাইকের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল ও লেবার খরচ সবই ‘এসএফটি’ (বর্গফুট) হিসেবে নির্ণয় করা হয়। প্রতি ‘এসএফটি’ ফ্লোর ঢালাই করতে কী পরিমাণ মালামাল লাগবে এবং লেবার খরচ কত হবে তার একটি আনুমানিক ধারণা একজন অভিজ্ঞ মিস্ত্রি কিংবা প্রকৌশলী দিতে পারেন। সে অনুসারে সমগ্র কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মালমাল এবং লেবার খরচ বাবদ সর্বমোট খরচের একটি প্রাক্কলনও তৈরি করা যায়। তবে, কাজ শেষ করতে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে প্রকৃত খরচ কিছু কম বা বেশি হতে পারে এমন বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন।

সর্বশেষ, উল্লেখিত কাজসমূহ সুসম্পন্ন করতে মালামাল ও লোকবলের অপচয় রোধ করা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই লেবার ও মালামাল খরচের হিসাবটি শুরু থেকে শেষ অবধি প্রকৃত কাজের পরিমাপের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া দরকার। কাজের পদ্ধতিগত ত্রুটিবিচ্যুতির কারণেও অপচয় বেড়ে যেতে পারে। একটি কথা আছে- ‘রি-ওয়ার্ক ইজ অলওয়েজ এক্সপেন্সিভ’। সুতরাং সমগ্র কাজটি সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

সিরামিক টালি

ইদানীং ফ্লোর ফিনিশিংয়ের জন্য সিরামিক টালির প্রচলন অনেক বেশি। বাজারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের নানা বর্ণ, মান এবং সাইজের টালি রয়েছে। ব্যবহারকারী তাঁর নিজস্ব রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী এসব টালি পছন্দ করতে পারেন। ফ্লোর ফিনিশিংয়ের জন্য টালির ব্যবহার খুবই সহজ। টালি বসানোর কর্মপদ্ধতি অতি সাধারণ এবং সময়সাশ্রয়ী। এই কাজে নিয়োজিত মিস্ত্রির অভিজ্ঞতা ও আত্মসচেতনতাই কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট।

আরসিসি ঢালাইকৃত ফ্লোরের ওপর সিমেন্ট-বালুর মর্টারের সাহায্যে লেভেল মিলিয়ে সরাসরি টালি বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর নিয়মানুযায়ী কিউরিং করে জয়েন্টগুলো সিমেন্ট দিয়ে ভরাট করার পর ফ্লোরটি পরিষ্কার করলেই তা ব্যবহারের উপযোগী হয়ে যায়। সিরামিক টালির ফ্লোর পরিষ্কার করা বা রাখা খুবই সহজ। টালির ওপর সহজে কোনো দাগ পড়ে না। তবে টালি খুব ভঙ্গুর, ভারী কোনো জিনিস টালির ওপর পড়লে এটি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেতে পারে।

সিরামিক টালি দুই ধরনের

১.     ক্লে-বার্নড উইথ সিরামিক কোটেড

২.    হোমোজিনিয়াস।

এ ছাড়া টালি তৈরির পদ্ধতিগত বিষয় বিবেচনায় এর প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন- ম্যাট পলিশ, মিরর পলিশ, লেজার কাট ইত্যাদি। এতসব প্রকারভেদ একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়, এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষেও বাজারের বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে সরেজমিনে যাচাই করা ছাড়া সবকিছু জানা সম্ভব নয়। অতএব অত্র কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত বাজার সার্ভে করে বাজারের প্রাপ্যতা অনুযায়ী বিভিন্ন মালামালের সার্বিক গুণাগুণ ও দামের বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকা দরকার। 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে ক্লে-বার্নড উইথ সিরামিক কোটেড টালির ফ্লোর বেশি দিন ব্যবহারের ফলে সিরামিক কোটিং উঠে যাওয়া কিংবা দাগ (আঁচড়) পড়ে যাওয়ার মতো কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা সংশোধনকল্পে টালি পরিবর্তন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অন্যদিকে, হোমোজিনিয়াস টালির ফ্লোরের স্থায়িত্ব অনেক বেশি এবং উল্লেখিত সমস্যাগুলো থেকে নিরাপদ রাখা যায়। তবে সময়ের ব্যবধানে সব ধরনের টালি উঠে যাওয়ার যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা খুবই বিব্রতকর এবং ঝামেলাপূর্ণ বিষয়ও বটে।

অতএব, টালি ফ্লোরের উদ্ভুত সমস্যাদি এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে ব্যবহৃতব্য টালির গুণাগুণ নিশ্চিত করা এবং কাজের গুণগতমান রক্ষা করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে, মান সম্পন্ন টালি নির্বাচন করা এবং টালি বসানোর পদ্ধতিগত বিষয়গুলো সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে, কাজের পদ্ধতিগত বিষয়সমূহ ঠিকমতো মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার, আরসিসি ঢালাকৃত ফ্লোরের ওপর টালির বন্ডিং মজবুত হওয়ার ওপরই টালি উঠে যাওয়া কিংবা না ওঠার বিষয়টি নির্ভর করে। 

ফলে, টালি বসানোর আগে বিদ্যমান ফ্লোর ভালোমতো চিপিং এবং পরিষ্কার করা দরকার। এরপর টালি বসানোর জন্য ব্যবহৃতব্য সিমেন্ট মর্টার তৈরির নির্দিষ্ট অনুপাত ১: ৩ (সিমেন্ট : বালু) মেনে চলা, শুকনা সিমেন্ট-বালু সঠিকভাবে মেশানো, পানির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা, পানি দিয়ে মেশানো মর্টার সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে কাজে লাগানো নিশ্চিত করা, কাজের আগে টালি এবং ফ্লোর সঠিকভাবে ভিজিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।

চলবে….

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৬তম সংখ্যা, জুন ২০১৭।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top