….পূর্ব প্রকাশের পর
রুফ ট্রিটমেন্ট
নির্মিতব্য একটি ইমারতের সম্পূর্ণ স্ট্রাকচার নির্মাণ শেষে সর্ব ওপরের ছাদ থেকে বৃষ্টির পানিনির্বিঘ্ন নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং উন্মুক্ত ছাদের ওপর পতিত রোদ্রোত্তাপ যাতে নিচের ফ্লোরে প্রবাহিত হয়ে সেখানে বসবাসকারী মানুষের জন্য অস্বস্তি সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে সর্বশেষ আরসিসি ঢালাইকৃত ছাদের উপরিভাগে তাপ নিরোধক স্তর হিসেবে অপর আরেকটি ঢালাই দেওয়া হয়। নিচের ফ্লোরে তাপ প্রবাহ বন্ধ করতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে আরসিসি ঢালাইকৃত ছাদের ওপর ৩ ইঞ্চি পুরুত্বে লাইম কংক্রিট (এলসি) ঢালাই করা হয়ে থাকে। অত্র লাইম কংক্রিটের প্রচলন ইদানীং প্রায় বিলুপ্তির পথে হলেও টপ ফ্লোরে মানুষের বসবাস স্বস্তিদায়ক করতে লাইম কংক্রিটই বেশি কার্যকর হিসেবে বিবেচিত। এর বিকল্প হিসেবে ইদানীং বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে কিন্তু সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ফলে লাইম কংক্রিট ঢালাই করার বিষয়টি আবার প্রচলিত নিয়মে চলে আসতে পারে বলে আমার বিশ্বাস, যা হোক, ঢালাই করার জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল জোগাড় করা এবং কাজের গুণগত মান রক্ষা করে কাজটি সুসম্পন্ন করা বেশ কষ্টসাধ্য ও কঠিন বিষয়। লাইম কংক্রিট ঢালাই সাধারণত ২ : ২ : ৭ (লাইম : সুরকি : খোয়া) অনুপাতে করা হয়ে থাকে। এই ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহৃতব্য লাইম (চুন) প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত লাইম স্টোন পুড়িয়ে তৈরি করা হয়।
খনি থেকে উত্তোলিত চুনাপাথর সংগ্রহ করে বিশেষভাবে তৈরি করা চুল্লির সাহায্যে আগুনে পোড়ানো হয়। অতঃপর পোড়ানো পাথরসমূহ ঠান্ডা করে বস্তা আকারে বিক্রির জন্য বাজারজাত করা হয়। বস্তাবন্দী এই পোড়ানো পাথর কেনার পর বস্তা থেকে বের করে পাকা প্ল্যাটফর্মের ওপর বিছিয়ে এর ওপর ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিলে এই পোড়া লাইম স্টোনগুলো লাইম পাউডারে পরিণত হয়। কিন্তু প্রকৃতিগত কারণে এসব পাথর অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে পাউডার হয় না। তাই কাজে ব্যবহার করার আগে অত্র পাউডার চালনি দিয়ে চেলে নেওয়া অত্যাবশ্যক। কারণ, লাইম কংক্রিট ঢালাই করার জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে প্রাপ্ত লাইম পাউডারের (চুন) মধ্যে পাথর আকারে চাকা বেঁধে থাকা কোনো লাইম স্টোন ব্যবহার করা উচিত নয়। মনে রাখা দরকার, লাইম কংক্রিট ঢালাইয়ে লাইম পাউডার (চুন) সিমেন্ট কংক্রিটে ব্যবহৃত সিমেন্টের মতো বাইন্ডিং মেটারিয়াল হিসেবে কাজ করে থাকে। ফলে, এটা সুরকি ও খোয়ার সঙ্গে সমানভাবে না মিশলে কংক্রিট ঠিকমতো জমাট বাঁধতে পারে না। এমতাবস্থায়, ছাদে ড্যাম্প দেখা দেওয়া এবং লাইম কংক্রিট উঠে যাওয়াসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অতএব, পোড়ানো পাথরগুলো ঠান্ডা হওয়ার পর ফুটানো বা ফাটানোর জন্য পাকা জায়গায় বিছিয়ে এর ওপর পানি ছিটানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে সব জায়গায় সমানভাবে পানি পড়ে এবং সব পাথর ফেটে পাউডারে পরিণত হতে পারে। নইলে যে পরিমাণ পাথর ফাটবে না সেগুলো কাজে ব্যবহার করার অনুপযোগী বলে গণ্য হবে এবং ওই পরিমাণ চুন আবার নতুন করে কিনে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় সমস্ত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় চুনের অনুপাত কমে গিয়ে দুর্বল কংক্রিট তৈরি হবে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ চুন ঠিকমতো না ফুটার কারণে চুনের অপচয়ও বাড়বে।
লাইম কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহৃতব্য সুরকি নিয়েও সাধারণ মানুষের মাঝে ভ্রান্ত একটি ধারণা কাজ করে। সুরকি বলতে সাধারণত ইট গুঁড়া করা পাউডারকে বোঝানো হয়ে থাকে। যা প্রকৃত অর্থে প্রথম শ্রেণির ইট থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু বিদ্যমান বাজারে যেসব সুরকি বিক্রি হয় তা অতি নিম্নমানের (কম পোড়া) ভাঙা ইট গুঁড়া করে তৈরি করা। নিম্নমানের ইট সহজে গুঁড়া করা যায় এবং এ থেকে প্রাপ্ত ইটের গুঁড়াকেই ভালো মানের পাউডার মনে করা হয়।
ফলে, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এই পাউডারকেই ভালো কাজের উপযোগী বলে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং নিম্নমানের এই গুঁড়া বিক্রি করে বেশি লাভবান হতে চান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এসব পাউডার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একেবারে ধুলা সমতুল্য হয়ে থাকে, যা কাজের গুণগত মান রক্ষার্থে বিশেষ অন্তরায় সৃষ্টি করে। এ ছাড়া এ জাতীয় সুরকি ব্যবহারে ঢালাইকৃত ছাদ অতি অল্প সময়ে নষ্ট হয়ে যায় এবং ওপরের ঢালাই ড্যাম্প হয়ে নিচের আরসিসি ছাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, লাইম কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় খোয়াও প্রথম শ্রেণির ইট থেকে তৈরি হওয়াটা জরুরি। এ ক্ষেত্রেও দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া ব্যবহার করার জন্য সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়ে থাকে, যা একইভাবে কাজের গুণগত মান রক্ষার্থে অন্তরায় সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। লাইম কংক্রিট ঢালাইকাজের পদ্ধতি একটু ভিন্ন হওয়ায় অনভিজ্ঞ জনবল অত্র কাজে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় খোয়া ও সুরকি নির্বাচন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা সহজ হয়।
সাধারণত, এসব কাজের ব্যাপারে মানুষের অজ্ঞতা ও সরলতার সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী তাঁদের ফায়দা লোটার চেষ্টা করেন। যা হোক, ইমারত নির্মাণের জন্য লাইম কংক্রিট ঢালাই করা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ, যা সম্পর্কে সম্যক কোনো ধারণা বা অভিজ্ঞতা না থাকলে তা অর্জন করা জরুরি। অন্যথায়, একজন অভিজ্ঞ লোকের পরামর্শ নেওয়া কিংবা তাঁর দ্বারা তদারকি নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই কোনো অবহেলা প্রদর্শন করা উচিত নয়।
প্রসঙ্গক্রমে, লাইম কংক্রিট ঢালাই কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু বিষয় উল্লেখ করতে চাই। প্রাথমিকভাবে ওপরে আলোচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় মালামাল জোগাড় করা নিশ্চিত করতে হবে। অতঃপর চুন, সুরকি ও খোয়া একত্রে ভালোভাবে মেশানোর জন্য গ্রাউন্ড লেভেলে একটি পাকা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে তার ওপর প্রথমে খোয়া, এর ওপর সুরকি এবং সর্ব উপরে চুন সমানভাবে বিছিয়ে নিয়ে কোদাল কিংবা বেলচার সাহায্যে শুকনো অবস্থায় ভালোমতো মিশিয়ে নিতে হবে। মালামাল মেশানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে মিশ্রিত মালামালের রং সর্বত্র একই ধরনের হয়। এরপর একপাশ থেকে অল্প অল্প করে পানি দিয়ে পুনরায় কোদাল কিংবা বেলচার সাহায্যে সমস্ত মালামাল সুন্দরভাবে মেশাতে হবে। মেশানোর পর ত্রিপল বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এই ভেজানো মালামাল প্রতিদিন একবার একইভাবে মেশাতে হবে এবং অন্তত সাত দিন পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চালাতে হবে। এভাবে মেশানোর পর একসময় অত্র মালামালে একটি আঠালো ভাব দেখা দেবে।
আঠালো ভাব পরিলক্ষিত হওয়ার পর অত্র মালামাল ছাদের ওপর তুলে সমস্ত এলাকায় স্লোপ ঠিক রেখে সমানভাবে বিছিয়ে দিতে হবে। নিচে থেকে সাত দিন ভেজানো এবং পচানো মালামাল ছাদে তুলে বিছানোর পর কাঠের তৈরি বিশেষ একধরনের পিটুনি দিয়ে আস্তে আস্তে পিটিয়ে কম্প্যাকশন করতে হবে। এভাবে পেটানোর কাজটি ধারাবাহিকভাবে সাত/আট দিন পর্যন্ত চলতে পারে, যা ভালোমতো কম্প্যাকশন হওয়ার ওপর নির্ভরশীল।
অত্র লাইম কংক্রিট ঠিকমতো কম্প্যাকশন হলো কি না তা দেখার একটি সাধারণ উপায়, কাঠের তৈরি পিটুনি দিয়ে পেটালে কিছুটা মেটালিক আওয়াজ আসবে এবং পেটাতে গেলে হাতে ব্যথা লাগবে। কম্প্যাকশন ভালো হওয়া কিংবা বিভিন্ন মালামালের বন্ডিং ভালো হওয়ার জন্য ভেজা মালামাল মেশানোর সময় এবং পেটানোর সময় চিটাগুঁড় পানিতে মিশিয়ে ঢালাইয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। পদ্ধতিগত দিক দিক দিয়ে এই কাজে জটিলতা একটু বেশি এবং এসব জটিলতা কাটিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করা জরুরি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শুকনো অবস্থা মালামাল মেশানো এবং ভেজা মালামাল সাত দিন পচানোর কাজটি অনেকে ছাদের ওপর নিয়েও করে থাকেন। তবে নিচে থেকে করাটাই উত্তম। সর্বশেষে, ছাদ পেটানোর কাজ সম্পন্ন করার পর চুন, সুরকি ও সিমেন্ট পানি দ্বারা মিশিয়ে একটি স্ল্যারি তৈরি করা হয় এবং কম্প্যাকটেড ছাদের উপরিভাগে অত্র স্ল্যারি ছিটিয়ে স্টিল ট্রাওয়েল (কুর্নি)-এর সাহায্যে সারফেস ফিনিশিং দিতে হয়।
এ ছাড়া ভাটিক্যাল ওয়াল ও হরিজন্টাল ছাদের কোনাকৃতি জয়েন্টগুলোতে পানি জমা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে লাইম কংক্রিটের জন্য ব্যবহৃতব্য একই মালামাল দিয়ে ত্রিভুজ (৬র্ দ্ধ৬র্ র্র্ ) আকৃতি করে কর্নারগুলো ফিনিশিং দিতে হয়, যাকে সাধারণত ঘুন্ডি বলা হয়। সর্বোপরি, মালামাল বিছানো বা লেভেলিং করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে ওপরের সারফেস লেভেলের স্লোপ ঠিকমতো হয়, যাতে বৃষ্টির পানি সুষ্ঠুভাবে নিষ্কাশিত হতে পারে।
চলবে…..
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯২তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৭।