ইমারত নির্মাণ ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-১১)

….পূর্ব প্রকাশের পর

পানিনিষ্কাশন ও পয়ঃপ্রণালি

একটি ইমারতের নির্মাণ কাজ শেষ করার পর ভবনটি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে সেখানে পানি নিষ্কাশন ও পয়ঃপ্রণালির সুব্যবস্থা থাকা অত্যাবশ্যক। মনে রাখা দরকার, কোনো ভবনের নির্মাণকাজ যতই মানসম্মত কিংবা দৃষ্টিনন্দন হোকনা কেন, যদি তা ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য আনা না যায়, তবে সেই সৌন্দর্য কিংবা মানের কোনো মূল্যই থাকে না। তাই ইমারতটি ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করার আগেই উল্লেখিত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা দরকার।

প্রসঙ্গত, নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এককালে নদীর কলতান আর পাখির গানে এ দেশের মানুষের ঘুম ভাঙত। তাই হয়তো আমাদের দেশের মানুষের পানি ব্যবহারের চাহিদাটা অন্যান্য দেশের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। যা হোক, মানুষের ব্যবহৃত এই পানি ও প্রাত্যহিক বর্জিত মানববর্জ্য যথাযথভাবে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে তা প্রকৃতির পাশাপাশি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটা ছাড়াও স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ নানা সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

অতএব, একটি ইমারতে বসবাসকারী মানুষের ব্যবহৃত পানিও শরীর থেকে নির্গত মানব বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ভবনটি নির্মাণকালেই পর্যাপ্ত পাইপলাইন স্থাপন করা, ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ সিস্টেম নির্মাণ করা এবং তা পৌরসভা/সিটিকরপোরেশন/ওয়াসাকর্তৃক নির্মিত ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেমের সঙ্গে যথাযথভাবে সংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। ইমারতের ব্যবহৃত পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য আলাদা আলাদাভাবে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়ে থাকে। অত্র কাজে সাধারণত ভবনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করা হয়।

পানিও পয়োনিষ্কাশনের জন্য স্থাপিত এই পাইপলাইনসমূহ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য স্থাপনকালে যত দূর সম্ভব বাঁক এড়িয়ে চলা জরুরি। তবে খাড়াভাবে স্থাপিত পাইপলাইনের ক্ষেত্রে বেশি উচ্চতায় স্থাপনকৃত পাইপলাইনে পানির নিম্নগামী প্রেসার কমানোর জন্য মাঝে মাঝে অফসেট ব্যবহার করে কৃত্রিম বাঁক সৃষ্টির প্রয়োজন দেখা দেয়। পানি ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য স্থাপিতব্য এই পাইপলাইনসমূহকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা হয়,

১. মানব বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ‘সয়েলপাইপ’এবং

২. ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশনের জন্য ‘ওয়েস্টওয়াটারপাইপ’।

উভয় প্রকার পাইপলাইন স্থাপন করার পর ব্যবহারকালীন টয়লেট বা কিচেনের মধ্যে থেকে দুর্গন্ধ যাতে বাইরে আসতে না পারে সে জন্য প্রতি ফ্লোরে একটি করে ট্র্যাপ ব্যবহার করা হয়। এই ট্র্যাপে পানি আটকে থাকায় কোনোরকম দুর্গন্ধ ভেতরে আসতে পারেনা। এছাড়া এই পাইপলাইনের মধ্যে পচা দুর্গন্ধ সৃষ্টি হওয়ায় পাইপের ভেতর গ্যাসের সৃষ্টি হতে পারে। ফলে ওই পাইপলাইনগুলো ছাদের ওপর পর্যন্ত তুলে গ্যাস বেরহ ওয়ার জন্য ছিদ্রবিশিষ্ট একটি কাওল অত্র পাইপের ওপরের উন্মুক্ত প্রান্তে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এই ৪ ইঞ্চি ব্যাসের ভার্টিক্যাল (খাড়া) পাইপলাইনসমূহ মেইন ড্রেনেজও স্যুয়ারেজসিস্টেমের সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার জন্য গ্রাউন্ড লেভেলেপ্লিন্থ ওয়ালের সঙ্গে প্রতিটি লাইনের জন্য একটি করে ইনস্পেকশনপিট তৈরি করা হয়। সেখান থেকে ৬ ইঞ্চি কিংবা ৯ ইঞ্চি ব্যাসের ভূগর্ভস্থ আড়াআড়িভাবে (হরিজন্টাল) স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে অত্র লাইনসমূহ পৌরসভা/সিটিকরপোরেশন/ওয়াসা কর্তৃক নির্মিত মেইন ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজলাইনের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরা হয়।

আড়াআড়িভাবে (হরিজন্টাল) স্থাপিত ভূগর্ভস্থ একটি পাইপলাইনের সঙ্গে ইমারত থেকে নেমে আসা৪ ইঞ্চি ব্যাসের কয়টি খাড়া পাইপলাইন সংযোগ দেওয়া হয়, এর ওপর ভিত্তি করে আড়াআড়িভাবে স্থাপিত পাইপের ব্যাস ৬ ইঞ্চি, ৯ ইঞ্চি কিংবা তদূর্ধ্ব হয়ে থাকে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনসমূহ সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে সর্বোচ্চ ২০ ফুট অন্তর একটি করে ইনস্পেকশনপিট নির্মাণ করতে হয়। যাতে পাইপলাইনের নিষ্কাশনব্যবস্থা কোনো কারণে বিঘ্নিত হলে তা মেরামত করা বা সচল করা সহজ হয়।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে যেসব আবাসিক এলাকায় ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজসিস্টেমের ব্যবস্থা নেই, সেখানে প্রতিটি বাড়ির জন্য জনবসতি অনুযায়ী নির্ধারিত ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি সেপটিক ট্যাঙ্ক ও একটি সোকপিট নির্মাণ করে পানি ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। অত্র নিষ্কাশন ব্যবস্থায় ইমারত থেকে নেমে আসা পাইপলাইনসমূহ সরাসরি সেপটিক ট্যাঙ্কে সংযোগ দেওয়া এবং সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে শুধু তরল পদার্থ নিষ্কাশনের জন্য একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে সোকপিটের সঙ্গে সেপটিক ট্যাঙ্কের কানেকশন দেওয়া হয়।

এসব সেপটিক ট্যাঙ্ক সাধারণত ডাবল বা ট্রিপল চেম্বারবিশিষ্ট হয়, যা বিভিন্ন বাড়ির চাহিদা অনুসারে নির্মিত ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ডিজাইন করে তদ্নুসারে নির্মাণ করা হয়ে থাকে। অত্র সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতরের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়, যাতে করে সব বর্জ্য ও পানি সেপটিকট্যাঙ্কে পড়ার পর প্রাকৃতিকভাবে সেডিমেন্টেশনের মাধ্যমে সলিডগুলো নিচে জমা হয়ে লিকুইড বা তরল পদার্থগুলো সোকপিটে চলে যেতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে সেপটিক ট্যাঙ্কের সঙ্গে সংযুক্ত এই সোকপিটকে সোকওয়েলও বলা হয়।

এই সোকপিটবা সোকওয়েল ও স্পেশাল ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ করতে হয়। সাধারণত সোকপিটবা সোকওয়েলের বহির্দেয়ালের ওপরের অংশ স্বাভাবিক নিয়মে সলিডব্রিকওয়ার্ক ও নিচের অংশ হানিকম্বড ব্রিকওয়ার্কের মাধ্যমে নির্মিত হয়ে থাকে। এরপর বিভিন্ন গ্রেডের খোয়া ও বালু দিয়ে পিটটি ভরাট করতে হয়। যাতে সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে সোকওয়েলে আসা সলিড ও তরল পদার্থের মিশ্রণ থেকে ছাঁকন-পদ্ধতির মাধ্যমে সলিড পদার্থগুলো নিচে জমা হয়ে শুধু তরল পদার্থের অংশটুকু দেয়ালের হানিকম্বড অংশের মধ্য দিয়ে ভূগর্ভে নামতে পারে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যে সময়ের ব্যবধানে এসব সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকপিটবা সোকওয়েল অকার্যকর হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুইপার দিয়ে পরিষ্কার করার মাধ্যমে তা আবার নতুনভাবে কার্যকর করা সম্ভব। মনেরাখা দরকার, একটি সেপটিক ট্যাঙ্ক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর ভেতরে সলিড জমা হতে হতে ট্যাঙ্কের নির্ধারিত ধারণক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই জমা হওয়া সলিড পরিষ্কার করে দিলে এটি আবার আগের ধারণক্ষমতায় ফিরে আসে। নইলে সেপটিক ট্যাঙ্কটি উপচে পড়ে আশপাশের পরিবেশ নষ্ট করে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একইভাবে, একটি সোকপিট বা সোকওয়েলও দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এর মধ্যে ভরাটকৃত বালু-খোয়াজমাট বেঁধে এর ছাঁকন-ক্ষমতা বন্ধ করে দেয়। ফলে পানি নিচে নামতে না পেরে ওপরে উপচে উঠে অনুরূপভাবে পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সোকপিট বা সোকওয়েলের এই অকার্যকর অবস্থা দূর করার জন্য ভেতরের জমাটবাঁধা বালু-খোয়া তুলে ফেলে আগের নিয়মে নতুন বালু-খোয়া ভরাট করে সোকপিট বা সোকওয়েলটি ব্যবহারের উপযোগী করা যায়। অন্যথায়, অকার্যকর সোকপিটবা সোকওয়েলটি বাদ দিয়ে নতুন সোকপিটবা সোকওয়েল নির্মাণ করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

অত্র সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকপিটবা সোকওয়েল নির্মাণ করার কাজটি ব্যয়বহুল। এছাড়া এর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণকল্পে সময়ের ব্যবধানে যে পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় সে কাজগুলোও বেশ কষ্টসাধ্য ও ঝামেলাপূর্ণও বটে। তারপরও যদি কোনো এলাকায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজেরব্যবস্থা না থাকে সে ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশ রক্ষা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এই সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকপিটবা সোকওয়েল নির্মাণ করার কোনো বিকল্প নেই। অতএব, ব্যয়বহুল ও ঝামেলাপূর্ণ মেনে নিয়েও এই কাজগুলো করা অপরিহার্য।

যা হোক, সময়ের বিবর্তনে ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেমের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে। বিশেষ করে শহর অঞ্চলে আলাদাভাবে আর কোনো সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকপিট বা ওয়েল নির্মাণ করার প্রয়োজন পড়ে না। যেসব এলাকায় পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে নির্মিত ইমারতসমূহের পানি ও পয়োনিষ্কাশনের জন্য স্থাপিত পাইপলাইনগুলো সরাসরি ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজলাইনের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। এতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম খরচে পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, পরিত্রাণ পাওয়া যায় উপরোল্লিখিত ঝামেলাপূর্ণ কাজ থেকে।

এ বিষয়ে পুনরায় উল্লেখ্য যে, ‘ইমারতনির্মাণ ও ব্যয়নিয়ন্ত্রণ’ আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। তাই আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, উপরোল্লিখিত কাজগুলো সুসম্পন্ন করা নিশ্চিত করতে এবং অপচয় রোধ করার লক্ষ্যে সেই একইভাবে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া, মালামাল ও কাজের গুণগত মান রক্ষা করার বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য।

চলব……

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৯১তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭।

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top