….পূর্ব প্রকাশিতের পর…
নিয়মানুযায়ী মেশানো কংক্রিট শাটার বা ফর্মে ঢালার পদ্ধতিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ রাখতে হবে যেন বেশি ওপর থেকে কংক্রিট ফেলানো না হয়। এতে খোয়া ও সিমেন্ট মিশ্রিত বালু আলাদা হয়ে যেতে পারে, যা কংক্রিটের প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনে অন্তরায় সৃষ্টি করে। কংক্রিট পানি দিয়ে মেশানোর পর থেকে সাধারণত ৪৫ মিনিটের মধ্যে ইনিশিয়াল সেটিং শুরু হয়ে যায়। ফলে কংক্রিট যথাস্থানে ঢালার পর দ্রুত কম্পেকশন করা দরকার। এই কম্পেকশন ক্ষেত্রবিশেষে রড বা বাঁশ (কলামের ও বিমের ক্ষেত্রে), কাঠ বা স্টিলের পাট্টা (ছাদের ক্ষেত্রে) কিংবা ভাইব্রেটিং মেশিনের (সর্বক্ষেত্রেই) সাহায্যে করা হয়। কংক্রিট যেভাবেই কম্পেকশন করা হোক না কেন, তা সমভাবে হওয়া বাঞ্ছনীয়। নইলে কংক্রিটে হানিকম্ব দেখা দিতে পারে, যাতে দুর্বল কাঠামো তৈরি হয় এবং ইমারতের স্থায়িত্ব কমে যায়। কংক্রিট জমাট বাঁধার পর অর্থাৎ কাজ শেষ করার পর থেকে ১০ ঘণ্টা (কংক্রিটের ফাইনাল সেটিং টাইম) পার হওয়ার পর হতে পরবর্তী ১৪ দিন পর্যন্ত কিউরিং করা অত্যাবশ্যক। কিউরিং বিভিন্ন নিয়মে করা হয়ে থাকে। উন্নত দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাষ্পের সাহায্যে কিউরিং করা হয়। এ ছাড়া কংক্রিট মেম্বারের ওপর চট পেঁচিয়ে মাঝে মাঝে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা, সমতল স্থানে পানি আটকিয়ে রাখা কিংবা শুধু পানি স্প্রে করার মাধ্যমে কিউরিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। সিমেন্টের সঙ্গে পানি মিশ্রণের পর রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে কংক্রিটে ডিহাইড্রেশন হয়, যা শক্তি সঞ্চারে বিঘ্ন ঘটায়। সুতরাং জমাট বাঁধা কংক্রিটের কাংখিত শক্তি নিশ্চিত করার জন্য কিউরিংয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
ফর্ম বা শাটার খোলা
যেকোনো কংক্রিট জমাট বাঁধার পর শাটার খোলারও একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, যা মেনে চলা অত্যাবশ্যক। একটা ইমারতের কোন অংশের শাটার ঢালায় শেষ হওয়ার কতক্ষণ/কত দিন পর খোলা যাবে, তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল। যেমন- স্ট্রাকচারের ধরন, কংক্রিটের অনুপাত, মেম্বারের দৈর্ঘ্য ইত্যাদি। ফলে যেকোনো শাটার খোলার আগে অবশ্যই ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। সাধারণত পাইল ক্যাপ বা ফুটিং, কলাম ও গ্রেড বিম ইত্যাদি মেম্বারগুলোর সাইড শাটার ২৪ ঘণ্টার আগে এবং ছাদ ও বিমের তলার শাটার ১৫ দিনের আগে খোলা উচিত নয়। সাধারণ মানুষেরা নিজেদের বাড়িঘর তৈরি করতে অনেকেই কন্ট্রাক্টর বা মিস্ত্রিসর্বস্ব হয়ে পড়েন, যা আদৌ কাম্য নয়। কন্ট্রাক্টর কিংবা মিস্ত্রিরা তাঁদের অজ্ঞতাবশত কিংবা সময় বাঁচানোর জন্য তড়িঘড়ি শাটার খুলে ফেলেন, যা ইমারতের স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া শাটার খোলার সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন, যাতে কংক্রিটের ওপর চাপ না পড়ে। শাটার খোলার পর যদি কোনো অংশে ছোটখাটো হানিকম্ব দেখা যায়, তাহলে কংক্রিটে ব্যবহৃত বালু-সিমেন্টের অনুপাত অনুসারে বালু সিমেন্ট মিলিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মেরামত করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি কোনো অংশে বেশি হানিকম্ব দেখা দেয়, সে ক্ষেত্রে মেরামত করার আগে অবশ্যই ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ নেওয়া দরকার। এসব বিষয়ের সুষ্ঠু তদারকির ওপর নির্ভর করে কাজের সার্বিক মান। সুতরাং যেকোনো নির্মাণকাজের মান ও গুণাগুণ বজায় রাখতে উল্লে¬খিত বিষয়গুলো মেনে চলা অপরিহার্য।
রডের ডিজাইন ও ব্যবহার
অস্থি-মজ্জার সমন্বয়ে তৈরি মানবদেহের স্ট্রাকচার, অস্থি ছাড়া মজ্জার নিজস্ব কোনো শক্তি নেয়, যার ওপর ভর করে সে শক্ত ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তেমনি কংক্রিট স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে অস্থি বলতে রড, যা কংক্রিট দিয়ে তৈরি সব স্ট্রাকচারের শক্তি ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আর এই রডের পরিমাণ, অবস্থান, গুণাগুণ ইত্যাদি সবকিছুর ওপর নির্ভরশীল একটি স্ট্রাকচারের নিজের অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ও ব্যাপ্তিকাল। তাই যেকোনো স্ট্রাকচার ডিজাইন করতে রডের সূক্ষ¥ বিশ্লে¬ষণ ও ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এই কাজটি কোনো অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া করানো আদৌ উচিত নয়। অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারদের ফি বেশি, এ অজুহাতে অনেক সময় আমরা পিছিয়ে আসি, যা কোনোভাবেই ঠিক নয়। কারণ, একজন অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের ফির টাকা আপাতত দৃষ্টিতে অতিরিক্ত খরচ দেখা গেলেও বাস্তুবে এতে সাশ্রয়ই বেশি।
প্রসঙ্গত, টাকার সাশ্রয় করতে অনভিজ্ঞ কোনো ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ডিজাইন করালে সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব দুটোÑ একটি পূরণীয়, অপরটি অপূরণীয়। অনভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়াররা কম ফি নিয়ে যে ডিজাইন করে থাকেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেটা হয় আন্ডার ডিজাইন, নয়তো ওভার ডিজাইন। আন্ডার ডিজাইন হলে ইমারতের ক্ষতি, যা অপূরণীয় এবং ওভার ডিজাইন হলে অর্থের ক্ষতি যা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। তাই কোনো অবস্থাতেই ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের ফি বাঁচানোর চিন্তা করা বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। এ ছাড়া রড কাটা, সোজা করা, বাঁকা করা, জায়গামতো বসানো এবং সঠিকভাবে বাঁধার বিষয়টিও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রডের বিশ্লেষণ ও বসানোর ক্ষেত্রে নেগেটিভ-পজিটিভ জোন আছে, তদনুযায়ী পরিমাণ ও অবস্থান ঠিক রেখে সঠিকভাবে রড বসানো ও বাঁধা জরুরি। সুতরাং যেকোনো ইমারত নির্মাণের সময় উল্লে-খিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ঝুঝে নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। রড কাটা ও বাঁধার পর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে চেক করিয়ে কংক্রিট ঢালায় করা উচিত।
৩. সুপার-স্ট্রাকচার
একটি ইমারতের সুপার-স্ট্রাকচার বলতে ভিতের ওপর থেকে টপ ছাদ পর্যন্ত সমস্ত অংশটাকে বোঝানো হয়। এ অংশে কাজের শ্রেণি বিভাগ অনেক। যেমন- কলাম, বিম, ছাদ ইত্যাদির কথা স্ট্রাকচার অংশে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ব্রিক ওয়ার্ক, জানালা, দরজা, প্লাস্টার, ফ্লোরিং, ইলেকট্রিক্যাল, স্যানিটারি, রং ইত্যাদি কাজ সুপার-স্ট্রাকচারের কাজের আওতাভুক্ত।
ব্রিক ওয়ার্কস
ইমারতের স্ট্রাকচার তৈরির পর প্রথমেই আসে ব্রিক ওয়ার্ক বা ইটের গাঁথুনির কাজ। নির্মিতব্য ইমারতটি ব্যবহারের সুবিধার্থে নিজেদের প্রয়োজনমাফিক রুম এবং অন্যান্য স্থান নির্দিষ্ট করতে ব্রিক ওয়ার্ক করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই ব্রিক ওয়ার্ক ইচ্ছামতো যত্রতত্র করা যায় না কিংবা করা উচিতও নয়। যেকোনো ইমারতের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করার আগে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন করা হয়ে থাকে। সেই আর্কিটেকচারাল ডিজাইনে রুমসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধাও দেখানো হয়। তদনুসারে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের লোড ক্যালকুলেশন করে একটি স্ট্রাকচারের বিভিন্ন মেম্বার ডিজাইন করা হয়। ফলে ব্রিক ওয়ার্ক বা ইটের গাঁথুনি করার সময় অবশ্যই আর্কিটেকচারাল ডিজাইন অনুসরণ করা উচিত। বিশেষ কারণবশত, আর্কিটেকচারাল ডিজাইনের পরিবর্তন কিংবা পরিবর্র্ধন করার প্রয়োজন পড়লে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনারের সঙ্গে আলাপ করা ছাড়া ইচ্ছামতো কাজ করা ঠিক নয়।
মালামাল
ব্রিক ওয়ার্কে মালামালের গুণাগুণ এবং সঠিক কর্মপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। অত্র কাজের মালামাল বলতে ইট, বালু, সিমেন্ট ও পানি। প্রতিটি আইটেমের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে, যা কাজের আগে নিশ্চিত করা দরকার। ইট, বালু ও পানি এই তিনটি ক্ষেত্রেই লবণদূষণ থাকতে পারে, যা ইমারতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক এবং অবশ্যই পরিত্যজ্য। বালু ও পানিতে লবণ ছাড়াও কাদা-মাটি, খড়-কুটা ইত্যাদি বর্জ্য পদার্থ থাকতে পারে, যা বাঞ্ছনীয় নয়। এ ছাড়া বালুর এফএম (ফাইননেস মডুলাস) সঠিক মানের হওয়া উচিত। ইটের ক্ষেত্রে মোল্ডিং সঠিক হওয়া, ঠিকমতো পোড়ানো ও সাইজ সঠিক হওয়া বাঞ্ছনীয়।
কর্মপদ্ধতি
প্রতিটি কাজেরই নির্দিষ্ট একটি কর্মপদ্ধতি আছে, আছে নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা। এ ছাড়া সব কাজের আগে একটি প্রস্তুতি পর্ব থাকে। ব্রিক ওয়ার্কের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে মালামাল চেক করা, কাজের জায়গা প্রস্তুত করা, ইট ভেজানো, বালু চালা, ভারা-মাচা জোগাড় করা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এরপর সিমেন্ট ও বালু ঠিকমতো মেশানো এবং ইটের গাঁথুনিতে জয়েন্টগুলোতে ঠিকমতো মসলা (সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ) দিয়ে পূরণ করা এবং লেয়ারগুলো উভয় দিকে (ভার্টিক্যাল ও হরিজন্টাল) সোজা হওয়া জরুরি। সবশেষ, একই দেয়ালে এক দিনে তিন ফুটের বেশি উচ্চতায় গাঁথুনি করা ঠিক নয়। সর্বোপরি, ব্রিক ওয়ার্ক বা ইটের গাঁথুনি করার সময় জানালা-দরজার স্থানসহ অন্যান্য ছোটখাটো স্থাপনা যা দেয়ালের মধ্যে স্থাপন করা হবে, এসব স্থান খালি রাখা দরকার।
চলবে…..
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৬তম সংখ্যা, অক্টোবর ২০১৫