….পূর্ব প্রকাশের পর
আসবাবপত্র কিংবা জানালা-দরজা তৈরিতে দেশীয় কাঠের মধ্যে সেগুন বা টিকই সর্বোত্তম। এটি দৃষ্টিনন্দন, টেকসই এবং ব্যয়বহুল, যা ব্যবহারকারীর রুচি ও আভিজাত্য প্রকাশে সহায়ক। এ ছাড়া আমাদের দেশে টিকচাম্বল, চাপালিশ, তেলসু, মেহগনি, শিলকড়ই, কাঁঠাল, জাম ইত্যাদি কাঠ আসবাব কিংবা জানালা-দরজা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি কাঠের রং, আঁশ ও দামের পার্থক্য থাকায় যে যাঁর সামর্থ্য ও রুচি অনুযায়ী কাঠ ব্যবহার করে থাকেন। ইদানীং দেশীয় এসব কাঠের সংকট দেখা দেওয়ায় বিদেশ থেকে বিভিন্ন নামে নানা ধরনের সাইজড কাঠ ও বোর্ড আমদানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশেও তৈরি হচ্ছে অনেক প্রকার বোর্ড (কমার্শিয়াল, প্লেইন পারটেক্স, ভিনিয়ার্ড পারটেক্স, প্লাই উড, মেলামাইন, প্লাস্টিক উড, এমডিবি ইত্যাদি), যা দিয়ে কম খরচেই রুচিশীল আসবাবসহ নানা ধরনের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করা হচ্ছে। তবে বোর্ডের ওপর খোদাই করা কোনো নকশার কাজ (যা কাঠের কাজের নান্দনিকতা ও আভিজাত্য বৃদ্ধি করে) করা যায় না। তবে বর্তমানে বাজারে প্রাপ্ত বোর্ডগুলোর রয়েছে অন্য রকম নান্দনিকতা। এই কাঠের কাজ সব সময়ই নান্দনিকতা ও আভিজাত্যের প্রতীক। বদলাচ্ছে মানুষের রুচির। বেড়েছে তাঁদের শৌখিনতা, মননশীলতা ও আর্থিক সামর্থ্যরে। প্রতিটি মানুষ তাঁদের নিজ নিজ রুচি মোতাবেক কাঠের কাজ করে বাসাবাড়ি সাজান। ফলে কাজের নান্দনিকতা ও স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত মালামাল ও কাজের গুণগতমান অবশ্যই ভালো হওয়া প্রয়োজন।
স্যানিটারি অ্যান্ড প্লাম্বিং ওয়ার্কস
একটি ইমারত ব্যবহারযোগ্য করতে এর কাঠামো নির্মাণ অর্থাৎ আরসিসি ঢালাই ও ব্রিক ওয়ার্কস শেষে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালি তৈরি এবং লিফট ও জেনারেটর স্থাপনের ব্যবস্থাসমূহ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা ডিজাইন ও ড্রয়িং করা এবং তদনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করাও জরুরি। নির্মিত ইমারতটি ব্যবহারের উপোযোগী করে তুলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে উপরোল্লিখিত কাজগুলো একই সময়ে পাশাপাশি সমগতিতে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। উল্লেখিত কাজের মধ্যে পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাকে প্রকৌশল ভাষায় ‘স্যানিটারি অ্যান্ড প্লাম্বিং ওয়ার্কস’ বলা হয়। এই পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ইমারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রকার পাইপ লাইন বসানো হয়। অতীতে এসব পাইপ লাইন সারফেসের ওপর দৃশ্যমান অবস্থায় বসানো হতো, যেখানে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে সহজেই মেরামত করা সম্ভব ছিল। বর্তমানে এই পাইপ লাইনসমূহ দেয়ালের অভ্যন্তরে কনসিলড করে বসানো হয়। ফলে পরে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে তা মেরামত করা কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ কাজগুলো যথাযথভাবে করার জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি, মানসম্মত মালামাল ও কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করা আবশ্যক। পাশাপাশি নিশ্চিত করা দরকার নিবিড় তদারকি ব্যবস্থার।
পানির লাইন স্থাপনের সময় গরম পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হলে সেটা আগেই বিবেচনায় নিয়ে সে মোতাবেক ড্রয়িং করানো এবং কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। অতীতে পানির লাইনে জিআই পাইপ ব্যবহার করা হতো, সে ক্ষেত্রে গরম কিংবা ঠান্ডা পানির জন্য আলাদা কোনো পাইপ চিন্তা করা হতো না। কিন্তু এখন পানির লাইনের জন্য জিআই, পিভিসি ও ইউভিসি পাইপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে গরম-ঠান্ডা পানির হিসাব করেই পানির লাইন স্থাপন করতে হবে। কোথায় কোথায় গরম পানি থাকবে, সেভাবে লাইন বিভাজন ও স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া গরম পানির সরবারহের জন্য ‘গিজার’ (পানি গরম করার মেশিন) বসানোর স্থান নির্বাচন এবং অত্র স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পানির লাইনের কাজ করার সময় বিভিন্ন ফিটিংস যথাযথভাবে লাগাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে পানি লিক করার মতো কোনো সমস্যার উদ্ভব না হয়। ব্যবহৃতব্য কোনো ইমারতে পানির লাইনে লিক দেখা দিলে, প্রথমত ইমারতের রং ও প্লাস্টার অকালেই নষ্ট হয়ে যায় এবং ইমারতের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব বিনষ্ট হয়।
দ্বিতীয়ত, কনসিলড লাইনের লিক সারানো কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল কাজ, যা এড়িয়ে চলার লক্ষ্যে পূর্বাহ্নেই সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। কনসিলড লাইনের লিক সারাতে টালি ভেঙে পাইপ রুলতে হয়। এতে মেরামত করার পর টালির রং মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো সময় আদৌ মেলানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ব্যবহৃত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সঠিকভাবে স্থাপন করা না হলে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন- লাইন জ্যাম হয়ে নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা ময়লা পানি ওভার ফ্লো হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থায় বিশেষ করে নিষ্কাশন লাইনের কাজে সার্বিক সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক।
বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন
নির্মিত ইমারত ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রাথমিক ও প্রধান কাজ বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা। লাইট-ফ্যানসহ সাংসারিক ব্যবহারের সব ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জাম চালানো বিদ্যুৎ সবরাহের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ছাড়া পানি সরবরাহও সম্ভব নয়। ফলে, একটি ইমারত নির্মাণ-পরবর্তী বিদ্যুতের মেইন সংযোগ থেকে শুরু করে ইমারতের অভ্যন্তরে সর্বত্র বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে, পানি সরবরাহের লাইনের মতো একইভাবে বিভিন্ন কক্ষ এবং কাক্সিক্ষত স্থানসমূহে বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করা জরুরি। এসব লাইন সারফেসড ও কনসিলড দুভাবেই করা যেতে পারে। কনসিলড লাইন স্থাপনের জন্য প্রথমে দেয়াল কেটে পাইপ বসাতে হয়। এরপর প্লাস্টার ও রঙের ফাইনাল কোট দেওয়ার আগে বৈদ্যুতিক তার টেনে (ওয়ারিং করে) বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে অন্যান্য ফিটিংস-ফিক্সারস লাগাতে হয়। বিদ্যুতের লাইন ওয়ারিং করার সময় কোন পয়েন্টে কী অ্যাপারেটাস ব্যবহার করা হবে এবং এর সম্ভাব্য লোড কী হতে পারে তা বিবেচনা করে ইলেকট্রিক তার এবং সুইচ-সকেটসমূহ বসাতে হয়। নইলে ব্যবহারকালীন লাইন জ্বলে (পুড়ে) যাওয়া এমনকি ব্যবহৃত অ্যাপারেটাসটিও জ্বলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যেমন-যে পয়েন্টে লাইট/ফ্যান চালানো যায়, সে পয়েন্টে ফ্রিজ/এসি/গিজার/আইরন/ওভেন চালানো যায় না। সুতরাং ইলেকট্রিক ওয়ারিং করার আগে অবশ্য অভিজ্ঞ একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা ডিজাইন এবং ড্রয়িং করিয়ে তদনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির তার ও সুইচ-সকেট পাওয়া যায়, যার গুণগতমান এবং দামের পার্থক্য অনেক। ফলে প্রয়োজন ও সামর্থ্যরে সঙ্গে সংগতি রেখে এসব জিনিস কিনতে হবে।
গ্যাস সংযোগ
অত্র কাজটিও পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের মতো একই প্রক্রিয়ায় করা হয়। ইমারত নির্মাণকালীন গ্যাসসংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ পাইপ লাইন পূর্বাহ্নেই স্থাপন করা হয়। নির্মাণসংশ্লিষ্ট সব কাজ শেষে গ্যাসের মেইন লাইনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে চুলায় সংযোগ দেওয়া হয়। গ্যাসের সংযোগ দেওয়ার সময় প্রতিটি পয়েন্ট ভালোমতো চেক করা জরুরি। কারণ, চুলা ব্যবহারকালে কোথাও কোনো লিক দেখা দিলে তা থেকে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বাজারে দুই ধরনের চুলা পাওয়া যায়, অটো ফায়ার ও ম্যানুয়াল। অটো ফায়ার চুলা জ্বালাতে বাইরে থেকে কোনো আগুন দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু ম্যানুয়াল চুলা জ্বালানোর জন্য ম্যাচ (দিয়াশলায়) কিংবা লাইটার ব্যবহার করতে হয়। ম্যাচ দিয়ে চুলা জ্বালাতে সার্বিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
ফিটিংস-ফিক্সারস
ফিটিংস-ফিক্সারস বলতে হার্ডওয়্যার, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক্যাল সব ধরনের মালামাল যেমনÑ কব্জা, সিটকিনি, হ্যান্ডেল, তালা, সিকিউরিটি চেইন, পানির কল, শাওয়ার রোজ, পুশ শাওয়ার, লুকিং গ্লাস, গ্লাস শেলফ, টাওয়াল রেইল, সুইস, সকেট, লাইট, ফ্যান ইত্যাদি সরঞ্জামকে বোঝায়। বাজারে নানা কোম্পানির বিভিন্ন মান ও দামের মালামাল বিদ্যমান। ফলে এসব মালামাল কেনা ও লাগানোর জন্য অভিজ্ঞ লোকের বিকল্প নেই। খেয়াল রাখতে হবে, সব ফিটিংস-ফিক্সারসের ব্যবহারের উপযোগিতা এবং স্থায়িত্বতা নির্ভর করে এর গুণগত মানের ওপর।
চলবে….
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০১৬