ইমারত নির্মাণ সংক্রান্ত নিয়মনীতি (পর্ব ৫)

….পূর্ব প্রকাশের পর

ব্রিক ওয়ার্কস বলতে সাধারণত ব্রিক ওয়ালকেই বোঝানো হয়, যা দুই ধরনের হয়ে থাকে, ১. লোড বিয়ারিং ওয়াল ২. নন-লোড বিয়ারিং ওয়াল। পুরোপুরি ব্রিক বা ইটের বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে লোড বিয়ারিং ওয়াল প্রযোজ্য, যেখানে আলাদা কোনো ফ্রেমিং থাকে না। ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে শুধু লিনটেল, সানশেড ও ছাদ বাদে পুরো বিল্ডিংয়ের কাজই ইটের গাঁথুনি দিয়ে করা হয়। ইদানীং অধিকাংশ বিল্ডিংই ফ্রেম-স্ট্রাকচার (কলাম-বিম-ছাদ) হওয়ায় লোড বিয়ারিং ওয়ালের প্রচলন নেই বললেই চলে। শহর-গ্রাম সর্বত্রই একই অবস্থা। অত্র ফ্রেম-স্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে শুধু রুম তৈরির লক্ষ্যে ভেতরের পার্টিশনে ৫ ইঞ্চি পুরু এবং বাইরের চারদিকে ৫ ইঞ্চি বা ১০ ইঞ্চি পুরু ব্রিক ওয়াল দেওয়া ছাড়া পুরো বিল্ডিংটির জন্য আরসিসি (রড, সিমেন্ট, বালু ও খোয়া মিশ্রিত ঢালাই) ঢালাই দিয়ে কলাম, বিম ও ছাদের সমন্বয়ে একটি ফ্রেম তৈরি করা হয়। প্রসঙ্গত, ব্রিক ওয়ালের প্রকৃতি লোড বিয়ারিং কিংবা নন-লোড বিয়ারিং যা-ই হোক, উভয় ক্ষেত্রেই কর্মপদ্ধতি এক। তাই সব ধরনের গাঁথুনির জন্য ইটের কোয়ালিটি প্রথম শ্রেণি হওয়া অত্যাবশ্যক এবং কাজ করার আগে ইটগুলো ভালোমতো ভিজিয়ে নেওয়া জরুরি। নইলে শুকনা ইট ভেজা মসলার (সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ) ওপর বসানোর সঙ্গে সঙ্গে মসলার পানি শোষণ করে নেয়। ফলে মসলা ঠিকমতো জমাট বাঁধতে না পারায় ইটের জয়েন্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওয়ালের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চারে বিঘ্ন ঘটে। সুতরাং ইট গাঁথুনির কাজে লাগানোর আগের দিন অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা আগে পানিতে ডুবিয়ে রেখে কাজ করার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে পানি থেকে উঠিয়ে রাখতে হবে, যাতে ইটের গাঁয়ের আলগা পানি ঝরে যেতে পারে।

এ ছাড়া ইটের গাঁথুনিতে অন্য যেসব ত্রুটি লক্ষ করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে গাঁথুনির মসলা সঠিকভাবে না মেশানো, ইটের হরিজন্টাল কিংবা ভার্টিক্যাল জয়েন্টে মসলার সমবিস্তার না হওয়া, জয়েন্টগুলোর বহির্গাত্র পর্যন্ত মসলা দিয়ে পূর্ণ না করা, গাঁথুনি শেষে ঠিকমতো কিউরিং না করা ইত্যাদি। এসব ত্রুটির কারণেও একইভাবে ওয়ালের প্রয়োজনীয় শক্তি সঞ্চারে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। তাই গাঁথুনির মসলা (সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ) সঠিক অনুপাতে (৫ ইঞ্চি পুরু দেয়ালের ক্ষেত্রে ১ ভাগ সিমেন্ট : ৪ ভাগ বালু এবং ১০ ইঞ্চি পুরু দেয়ালের ক্ষেত্রে ১ ভাগ সিমেন্ট : ৬ ভাগ বালু) ঠিকমতো মেশানো, সব জয়েন্টে মসলার সমবিস্তার হওয়া ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নজরদারি প্রয়োজন। সর্বোপরি, প্ল¬াস্টার ধরে রাখার শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইটের জয়েন্টগুলো দেয়ালের বহির্গাত্র থেকে ৩/৮ ইঞ্চি থেকে ১/২ ইঞ্চি পরিমাণ খালি রাখা দরকার। গাঁথুনি শেষ করার ১০ ঘণ্টা পর থেকে পরবর্তী সাত দিন (কমপক্ষে) নিয়মিত কিউরিং নিশ্চিত করা আবশ্যক। এতদ্সংক্রান্ত সব কাজ একজন অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার বা সুপারভাইজারের তদারকিতে হওয়া বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় ওয়ালের স্থায়িত্ব লোপ পেতে পারে, কমে যেতে পারে ইমারতের ব্যবহারিক কার্যকারিতা ও মেয়াদকাল।

প্লাস্টার বা আস্তর

শোভাবর্ধন এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন হেতু ইমারতের স্থায়িত্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে ওয়েদারপ্রুফ কোট (পেইন্ট) ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরির জন্য ব্রিক অথবা আরসিসি ওয়ার্কের ওপর সিমেন্ট-বালুর মিশ্রণে যে বহির্রাবরণ দেওয়া হয়, তারই নাম প্লাস্টার বা আস্তর। প্লাস্টারের গুণাগুণের ওপর অনেকখানি নির্ভর করে একটি ইমারতের স্থায়িত্ব। কারণ, প্লাস্টার একদিকে যেমন ইমারতের শোভাবর্ধন করে, অন্যদিকে আবহাওয়াজনিত ক্ষয় রোধ করে। ফলে প্লাস্টার ও ওয়েদারপ্রুফ কোটের গুণাগুণ ও ফিনিশিং ঠিক রাখতে অত্র কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল ও কর্মপদ্ধতির গুণগত মানের দিকে লক্ষ রাখা খুবই জরুরি। প্রসঙ্গত উল্লে¬খ্য, প্ল¬াস্টারের বালু তুলনামূলকভাবে একটু দানাদার (এফএম ১.৫) হওয়া এবং কাদা-মাটি, খড়-কুটা, কাঠ-কয়লা, লবণ ইত্যাদি মুক্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বালু ব্যবহারের আগে চালনি দিয়ে চেলে নেওয়া ছাড়াও প্রয়োজনে পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া মসলা তৈরির সময় সিমেন্ট ও বালু শুকনা অবস্থায় নির্দিষ্ট অনুপাতে প্লে-ইনশিট অথবা শক্ত মেঝের ওপর বিছিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এই শুকনা মিশ্রণের রং যতক্ষণ পর্যন্ত সর্বত্র এক দেখা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মেশাতে হবে। তারপর অল্প অল্প করে পানি ঢেলে মিশিয়ে প্লাস্টারের উপযোগী করে কাজে লাগাতে হবে। প্লাস্টারের মসলা বেশি নরম কিংবা বেশি শক্ত অর্থাৎ শুকনা হওয়া যাবে না।

প্লাস্টারের ক্ষেত্র ব্রিক ওয়াল কিংবা আরসিসি যা-ই হোক না কেন, মসলা লাগানোর আগে অবশ্যই ওই স্থান পরিষ্কার করে (আলগা কাদা-মাটি, শেওলা ইত্যাদি থাকলে) ভালোমতো ভিজিয়ে নিতে হবে। এরপর প্রয়োজনে দেয়ালপৃষ্ঠে সিমেন্ট গ্রাউটিং (সিমেন্ট ও পানির পাতলা মিশ্রণের প্রলেপ দেওয়া) দিয়ে তার ওপর মসলা লাগাতে হবে। ফিনিশিং দেওয়ার ক্ষেত্রে যত দূর সম্ভব লেভেল ঠিক রাখতে হবে, নইলে রঙের কাজে অধিক মালামাল খরচ হবে এবং রঙের ফিনিশিং ভালো করা যাবে না। এ ছাড়া প্লাস্টারের কাজে আরও কতগুলো বিষয় দেখার আছে, যেমন- দেয়াল অতিরিক্ত ভেজানো যাবে না কিংবা মসলাও বেশি নরম করা যাবে না। কারণ, পানি একদিকে যেমন সিমেন্টের মিত্র, অপর দিকে শত্রুও। প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি কাজের গুণগতমান কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে প্ল¬াস্টারের মসলা বেশি নরম হলে কিংবা দেয়াল বেশি ভেজালে কাজের ফিনিশিং দিতে অসুবিধা হয়। এ ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি ফিনিশিং দেওয়ার জন্য মিস্ত্রিরা শুকনা মসলা ব্যবহার করে, যা কাজের জন্য ক্ষতিকারক। সর্বোপরি, প্ল¬াস্টারের ক্ষেত্রেও  ব্রিক ওয়ালের মতো ফিনিশিং দেওয়ার ১০ ঘণ্টা পর থেকে পরবর্তী সাত দিন পর্যন্ত নিয়মিত কিউরিং নিশ্চিত করতে হবে, নইলে প্লাস্টারের গুণগতমান লোপ পাবে।

ফ্লোর ফিনিশিং

নিচের তলার ক্ষেত্রে সিসি (সিমেন্ট কংক্রিট)/আরসিসি (রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট) ঢালাই করা ফ্লোর এবং অন্যান্য তলায় আরসিসি ছাদের ওপর বসবাসের উপযোগী করার জন্য যে কাজটি করা হয় তাকেই ফ্লোর ফিনিশিং বলা হয়। এই কাজটি সাধারণত আর্থিক সামর্থ্য ও ব্যক্তিগত রুচির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশে বিভিন্নভাবে ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজ করা হয়, যেমন-প্যাটেন্ট স্টোন (সিমেন্ট, বালু ও ছোট খোয়ার মিশ্রণে ১ ইঞ্চি থেকে ১.৫ ইঞ্চি পুরু ঢালাই) ঢালাইয়ের ওপর নিট সিমেন্ট ফিনিশিং, সিটু মোজাইক ফিনিশিং, মোজাইক টাইলস, সিরামিক টাইলস, মার্বেল কিংবা গ্রানাইট পাথর ইত্যাদি। ফ্লোর ফিনিশিংয়ের ধরন যা-ই হোক না কেন, কাজে ব্যবহৃতব্য মালামাল তথা কাজের গুণগতমান রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। ফ্লোর ফিনিশিংয়ের কাজ করার আগে ঢালাই করা ফ্লোরে জমে থাকা মসলা কিংবা আলগা ময়লা-মাটি পরিষ্কার করে ফ্লোর চিপিং করতে হবে এবং ধুলাবালু পরিষ্কারকরত পানি দিয়ে ওয়াশ করে নিতে হবে।

প্যাটেন্ট স্টোন

সিসি কিংবা আরসিসি ফ্লোরের ওপর ১ : ২ : ৪ (সিমেন্ট, বালু ও খোয়া) অনুপাতে ১ থেকে ১.৫ ইঞ্চি পুরু ঢালাই করে উপরিভাগে নিট সিমেন্ট ফিনিশিং দিয়ে তৈরি ফ্লোরকে প্যাটেন্ট স্টোন ফ্লোর বলা হয়। এই ঢালাইয়ের পুরুত্ব কম বিধায় খোয়ার সাইজ ছোট হওয়া জরুরি। প্যাটেন্ট স্টোন ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে খোয়ার সাইজ হতে হবে ৩/৮ ইঞ্চি ডাউন গ্রেডেড। এ ছাড়া অন্যান্য কাজের মতোই খোয়া, বালু, সিমেন্ট, পানিÑ সবই দূষণমুক্ত হতে হবে এবং কাজের পদ্ধতিও একইভাবে মেনে চলতে হবে। এ কাজে বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় হলো, ঢালাই শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে নিট সিমেন্ট ফিনিশিং দেওয়ার কাজটিও শেষ করতে হবে, নইলে ফিনিশিং দিতে কষ্ট হবে কিংবা ভালোমতো ফিনিশিং দেওয়া যাবে না। সুতরাং একই সঙ্গে বেশি এলাকা ঢালাই করা উচিত নয়। প্যাটেন্ট স্টোন ফ্লোরে অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ফিনিশিং দিতে না পারায়, পরে আলাদাভাবে সিমেন্ট-বালুর মসলা দিয়ে ফিনিশিং দেওয়া হয়, যা ব্যবহারকালে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই কাজটি পরিত্যাজ্য। ফিনিশিং দেওয়ার পরদিন থেকে কমপক্ষে সাত দিন পানি আটকিয়ে কিউরিং করতে হবে।

রিসার্চগেট

সিটু মোজাইক

১ : ১ অনুপাতে মার্বেল চিপস ও সিমেন্টের মিশ্রণে সিটু মোজাইক ঢালাইয়ের কাজ করা হয়, যা বেশ শ্রমসাধ্য ও ব্যয়বহুল। মোজাইকের কাজে হোয়াইট ও গ্রে দুই ধরনের সিমেন্টই ব্যবহার করা যায়। মার্বেল চিপসের ধরন ও কোয়ালিটির ভিন্নতা আছে, যা ব্যবহারকারীর রুচি এবং সামর্থ্যরে ওপর নির্ভরশীল। মোজাইকের পুরুত্ব খুবই কম (৩/৮ ইঞ্চি), তাই মোজাইক করতে সম্পূর্ণ এলাকাটিকে ছোট ছোট প্যানেলে ভাগ করে নিতে হয়। নইলে সারফেসে ফাটল দেখা দেয় এবং মোজাইকের স্থায়িত্ব কমে যায়। এই প্যানেল তৈরির জন্য সাধারণত গ্লাসের স্ট্রিপ ব্যবহার করা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্রাশ বা পিতলের স্ট্রিপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। প্যানেল তৈরির শেষে প্রথমে ১ ইঞ্চি পুরু প্যাটেন্ট স্টোন ঢালাই করে নিতে হবে, যার পৃষ্ঠদেশে কোনো প্রকার ফিনিশিং দেওয়া যাবে না। এই প্যাটেন্ট স্টোন ঢালাই শক্ত হওয়ার পর অন্তত তিন দিন কিউরিং করার পর মার্বেল চিপস ও সিমেন্টের মিশ্রণে মোজাইক ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতে হবে এবং কমপক্ষে ১৫ দিন পর্যন্ত কিউরিং করতে হবে। 

চলবে

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৭তম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৫

প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান পিইঞ্জ
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top