…..গত সংখ্যার পর
২. স্ট্রাকচার বা কাঠামো
একটি ইমারতের কলাম, বিম, স্লাব- সবকিছু মিলেই গঠিত হয় স্ট্রাকচার। আর এই স্ট্রাকচারের স্থায়িত্বের ওপর নির্ভর করে ইমারতের স্থায়িত্ব। ফলে যেকোনো ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কাঁচামালের গুণাগুণ ও কর্মপদ্ধতির বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা দরকার। প্রতিটি স্ট্রাকচার নির্মাণকল্পে নির্দিষ্ট কিছু নিয়মনীতি আছে, যা অনুসরণ করে ডিজাইন, ড্রয়িং ও মালামালের স্পেসিফিকেশন তৈরি করা এবং তদনুযায়ী সব কাজ বাস্তবায়ন করা দরকার।
উল্লেখ্য, একটি স্ট্রাকচার গঠনের মূল উপাদান সিমেন্ট, কংক্রিট ও রড। রড দিয়ে বানানো হয় কংকাল আর সিমেন্ট-কংক্রিটের উপরিস্থ মাসল। এ দুইয়ের সমন্বয়ে নির্মিত স্ট্রাকচারটিই মজবুত একটি স্থাপনা হিসেবে নিজের অস্তিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে দিনের পর দিন। তাই কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজের বেলায় রডের ক্লিয়ার কভার ঠিক রাখা, নিñিদ্র শাটারিংয়ের ব্যবস্থা করা, সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার অনুপাত ঠিক রাখা, স্ল¬াম্প (কংক্রিট মেশানোর জন্য পরিমিত পানির ব্যবহার) ঠিক রাখা, নিয়মিত কিউরিং (কমপক্ষে ১৪ দিন) করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর তীক্ষè নজরদারির প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, এসব কাজে যেখানে যতটুকু ঘাটতি থাকবে, সেখানেই ততটুকু ক্ষতি হবে। তাই কাজের এই ধাপগুলোর প্রতিটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা কংক্রিটের কাংখিত শক্তি ও স্থায়িত্ব বৃদ্ধিতে বড় রকম অন্তরায় সৃষ্টি করে। একটি স্ট্রাকচারের বিভিন্ন মেম্বার যেমন- পাইল, পাইলক্যাপ, কলাম ফুটিং, কলাম, বিম, স্ল¬াবÑ সবকিছুরই ক্লিয়ার কভার ও স্লাম্প আলাদা আলাদা। এগুলো সাধারণত ড্রয়িংয়ে উল্লে¬খ করা থাকে, যা ভালোমতো দেখে নেওয়া জরুরি, প্রয়োজনে ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে বুঝেও নিতে হতে পারে।
মালামাল
ইমারত নির্মাণে ব্যবহৃতব্য প্রতিটি কাঁচামাল নির্বাচন করতে একজন অভিজ্ঞ প্রকৌশলীকে সরেজমিনে দেখানো ছাড়াও এর গুণাগুণ সম্পর্কে অধিক নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় কাংখিত ফল পাওয়া গেলেই তা কাজের উপযোগী বলে বিবেচিত হয়। তবে ভালো গুণাগুণসম্পন্ন মালামাল নির্বাচন করা হলেই ভালো স্ট্রাকচার নির্মাণ আশা করা যায় না, যদি কর্মপদ্ধতি ভালো না হয়। ফলে ভৌত কাজ বাস্তবায়নের নিয়মনীতিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা অপরিহার্য।
কংক্রিট
স্থায়ী কোনো কাঠামো তৈরি করতে ইট/পাথরের খোয়া, বালু, সিমেন্ট ও পানির সংমিশ্রণে তৈরি (জমাট বাঁধানো) বস্তুই কংক্রিট নামে পরিচিত। যার দুটি রূপ- ১. সিমেন্ট কংক্রিট, সংক্ষেপে সিসি ও ২. রিইনফোর্সড সিমেন্ট কংক্রিট, সংক্ষেপে আরসিসি নামে পরিচিত। মূলত এই কংক্রিটের কাজের গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল একটি স্ট্রাকচারের স্থায়িত্ব। ফলে কংক্রিটের জন্য ব্যবহৃতব্য মালামালের গুণাগুণ, মেশানো ও জমাট বাঁধানো কাজের পদ্ধতিগুলো সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবার সম্যক ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কংক্রিট তৈরির কাজের জন্য সংগৃহীত মালামাল (খোয়া, বালু ও সিমেন্ট)-এর সঙ্গে কাদা-মাটি, খড়কুটা, কাগজ ইত্যাদি কোনো ধরনের বস্তু মিশ্রিত থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। দ্বিতীয়ত, নোংরা কিংবা লবণযুক্ত পানি কংক্রিট মেশানোর কাজে ব্যবহারযোগ্য নয়, শুধু খাবারের উপযোগী পানিই এ কাজে ব্যবহারের উপযোগী। এ ছাড়া ব্যবহারের আগেই জমাট বেঁধে গেছে এমন সিমেন্টও নির্মাণকাজে ব্যবহারের উপযোগী নয়।
প্রসঙ্গত উল্লে¬খ্য যে নির্মাণকাজের জন্য সংগৃহীত সিমেন্ট মজুদ করার বিষয়টাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সিমেন্ট বেশি দিন মজুদ রাখা ঠিক নয়। উপরন্তু সিমেন্ট মজুদ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, সিমেন্টের বস্তাগুলো যেন কোনো অবস্থাতেই নিচের মাটি কিংবা দেয়ালের সংস্পর্শে না আসে এবং বাইরের খোলা বাতাস ও বৃষ্টির পানি যেন বস্তার গায়ে না লাগে। সিমেন্টের স্টোর হতে হবে সুরক্ষিত, খোলা আকাশের নিচে, ভেজা কিংবা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় সিমেন্ট রাখা যাবে না। সিমেন্ট স্টোরের ফ্লোরে কাঠ, বাঁশ ও প্লে¬ইনশিট দিয়ে মাচা করে তার ওপর সিমেন্টের বস্তাগুলো রাখতে হবে এবং দেয়ালের গা থেকে অন্তত ছয় ইঞ্চি দূরে রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। সিমেন্ট ছাড়াও অন্যান্য মালামালের সুষ্ঠু সংরক্ষণের ওপর নজর দিতে হবে। সর্বোপরি, কংক্রিট মেশানো, ঢালা, কমপেকশন ও কিউরিংয়ের কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে যথেষ্ট নজরদারি করতে হবে।
শাটার
যেকোনো কাঠামো তৈরি করতে কংক্রিট জমানোর জন্য কাঠের কিংবা স্টিলের যেসব বাক্স ব্যবহার করা হয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ভাষায় সেগুলোরই নাম শাটার এবং এই শাটার তৈরির কাজকে বলা হয় শাটারিং। সব ধরনের কংক্রিটিংয়ের কাজেই শাটারিং একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর গুণাগুণের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল তৈরি করা কাঠামোর গুণগত মান ও স্থায়িত্ব। ফলে এই কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সম্পর্কে আমাদের অবগত হওয়া দরকার। প্রথমত, শাটারিংয়ের মালামাল মানসম্পন্ন হওয়া। দ্বিতীয়ত, কাজের মান ঠিক রাখা প্রয়োজন। মানসম্পন্ন মালামালের সমস্যা সাধরণত হয় না, সমস্যা হয় শাটারিংয়ের কাজের মান রক্ষা করা। ফলে, শাটারিংয়ের কাজের সময় ড্রয়িং মোতাবেক মাপ ঠিক রাখা, লাইন সোজা রাখা, লেভেল চেক করা, প্রয়োজনমাফিক সাপোর্ট (ঠেকনা) দেওয়া ও শাটার ওয়াটারপ্রুফ (নিñিদ্র) হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই এসব কাজের সুষ্ঠু তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নইলে মালামালের অপচয়সহ কংক্রিটের মান ও স্থায়িত্ব কমে যাবে বহুলাংশে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শাটারিং ঠিকমতো করা না হলে কংক্রিট ঢালাইয়ের সময় কাঠামোগত আকার নষ্ট হওয়া, মৌচাকের মতো ছিদ্রবহুল কংক্রিট দেখা দেওয়া, এমনকি সবসহ ভেঙে পড়ার মতো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। এ ছাড়া উল্লি¬খিত ত্রুটিযুক্ত কাঠামো তৈরি হলে শুধু কাজের মান আর স্থায়িত্বই কমবে না, পরে প্ল¬াস্টারের খরচও বেড়ে যাবে তুলনামূলকভাবে। সুতরাং আলোচিত বিষয়গুলো মাথায় রেখে শাটারিংয়ের মালামাল নির্বাচন এবং সুষ্ঠু পরিচালনার মাধ্যমে নিয়মমাফিক সব কাজ শেষ করা অত্যাবশ্যক। সর্বোপরি ঢালাইয়ের আগে শাটারিংয়ের মালামাল এবং কাজের গুণগত মানসহ সবকিছুই একজন অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা দেখানো জরুরি।
কর্মপদ্ধতি
কংক্রিট মেশানো
আমাদের দেশে সাধারণত দুভাবে কংক্রিট মেশানো হয়ে থাকে। মিক্সার মেশিনে এবং হাতে। কংক্রিটের পরিমাণ কম হলে সচরাচর হাতেই মেশানো হয় এবং কলাম ফুটিং ও কলাম ঢালাইয়ের ক্ষেত্রেই এমনটি ঘটে থাকে। এ ছাড়া বিম ও স্ল¬াব যেহেতু একসঙ্গে ঢালাই করা হয়, ফলে কংক্রিটের পরিমাণ বেশি হওয়ায় মিক্সার মেশিনের ব্যবহারই বহুল প্রচলিত। কিন্তু কলাম ফুটিং ও কলাম দুটোই ইমারতের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যার ওপর ভিত্তি করে পুরো কাঠামোটা দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এ ক্ষেত্রেও অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। এ ছাড়া ঢালাইয়ের গুণাগুণ রক্ষার্থে সব ধরনের কাজেই একই নিয়ম মেনে চলা উচিত। সম্ভব হলে সব কংক্রিটই মিক্সার মেশিনে মেশানো উত্তম। যা হোক, হাতে কংক্রিট মেশানোর ক্ষেত্রে পাকা মেঝে কিংবা প্লেইনশিট বিছিয়ে তার ওপর নির্দিষ্ট অনুপাতে প্রথমে খোয়া, তার ওপর বালু, তার ওপর সিমেন্ট সর্বত্র সমান পুরুত্বে বিছিয়ে নিয়ে আগে শুকনা অবস্থায় ভালোভাবে কোদাল বা বেলচা দিয়ে মিশিয়ে নিতে হবে, যাতে শুকনা মিশ্রণের সব জায়গায় একই রং পরিলক্ষিত হয়। এরপর অল্প অল্প করে পানি দিয়ে কংক্রিট মেশাতে হবে। কংক্রিট মেশাতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। পানি একাধারে যেমন কংক্রিট জমাট বাঁধা ও শক্তি সঞ্চারে সহায়ক, তেমনই এর উল্টোটাও করে থাকে। সর্বোপরি কংক্রিট সমভাবে মেশানো, সুষ্ঠুভাবে ঢালা ও ঠিকমতো কমপেকশন করার কাজগুলো নিশ্চিত করতে হবে। একটি ইমারতের বিম ও স্ল¬াব ঢালাইয়ের কাজটা সচরাচর একই সঙ্গে সম্পাদিত হয়, ফলে প্রতি তলায় বিম ও স্লাবের শাটারিং ও রড বাঁধার কাজ শেষ হলে কংক্রিট ঢালাইয়ের আগে ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা পরীক্ষা করানো বাঞ্ছনীয়। সম্ভব হলে ঢালাইয়ের কাজটাও ইঞ্জিনিয়ারের উপস্থিতিতে করা উচিত।
চলবে….
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৫তম সংখ্যা, সেপ্টেম্বর ২০১৫