কংক্রিটের রেসিন হলো দুটি ভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে সৃষ্ট বিশেষ ধরনের যৌগ, যা কংক্রিটে ফাটল নিরোধক হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন সময়ে কংক্রিটে যে ফাটল সৃষ্টি হয়, এতে সংকোচন বা নির্মাণ সংযোগ সৃষ্টি ও প্রসারণ সংযোগ স্থাপনে কংক্রিটে উচ্চচাপ সহনীয় বিশেষ ধরনের পলিমারের প্রয়োজন হয়। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত এই বিশেষ ধরনের পলিমার রেসিন নামে পরিচিত। বিশেষভাবে সৃষ্ট এই যৌগটি যথাযথ প্রসারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় এটি তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে কংক্রিটের চলাচলের সঙ্গে সংকুচিত কিংবা প্রসারিত হয়ে কংক্রিটের ব্লকগুলোর মধ্যে দৃঢ় বন্ধন তৈরি করে এর দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। রেসিন উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদানসমূহ বস্তুগত উচ্চ ঘুর্ণন ও প্রযুক্ত চাপবহনের জন্য অনেক বেশি কার্যকরী। এসব রেসিনের রসায়ন অত্যধিক গুণগতমানসম্পন্ন হওয়ায় এগুলো পানি ও তাপের বিপরীতে অনেক বেশি কার্যকরী।
যা যা থাকছে…
রেসিন প্রয়োগ পদ্ধতি
রেসিন এবং হার্ডডেনার (Hardener) ব্যবহারের ২৪ ঘণ্টা আগে ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৮০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে এটিকে সংরক্ষণ করতে হয়। কংক্রিটের যেসব স্থানে রেসিন প্রয়োগ করা হয়, ওই সব কংক্রিটের উপরিতল মজবুত, শুষ্ক ও ভালোভাবে পরিষ্কার থাকা চাই। কংক্রিটের উপরিতলে কোনো ধরনের তেল, গ্রিজ, চক, স্যাঁতসেঁতে ভাব ও কোনো ধরনের প্রতিরোধক প্রলেপ থাকলে তা আগে থেকে তুলে ফেলতে হয়। নতুন কোনো ধরনের কংক্রিট স্থাপন করলে তা সম্পূর্ণরূপে Cured হতে হয়। কংক্রিটের সংযোগ যতটা সম্ভব কার্যকরী তাপমাত্রার মধ্যম পর্যায়ে থাকলে কংক্রিটে রেসিন প্রয়োগ করতে হয়। তবে লক্ষ রাখতে হয় যেন কংক্রিটের সংযোগসমূহ অবশ্যই ৫৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অধিক তাপমাত্রা কংক্রিটের চারপাশের পরিবেশে থাকে। প্রসারণ সংযোগ (Expansion) যৌগ প্রস্তুতের জন্য হার্ডডেনারকে রেসিন ক্যানের মধ্য দিয়ে ছোট জিফি মিক্সার ব্লেডের সাহায্যে ২০০ আরসিএমএ বৈদ্যুতিক ড্রিলের মধ্যে প্রবেশ করাতে হয়। এরপর সম্পূর্ণ মিশ্রণটিকে তিন মিনিট ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হয়। রেসিন প্রয়োগের আগেই সব যন্ত্রপাতি খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিয়ে রেসিনের মিশ্রণকে যথাস্থানে প্রয়োগ করতে হয়।
রেসিনের সুবিধা
কংক্রিট দিয়ে নির্মাণকাজের পরে বিভিন্ন কারণে কংক্রিটের উপরিতল ও অন্যান্য স্থানে ফাটল দেখা দিতে পারে। এসব ফাটল বন্ধে রেসিন বিশেষভাবে প্রযোজ্য। তা ছাড়া প্রিকাস্ট ও প্রিস্ট্রেস্ট কংক্রিট ব্লক দিয়ে নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে সংকোচন ও প্রসারণ সংযোগ সৃষ্টির জন্য অধিক প্রসারণ সহনীয় রেসিন বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। এ ছাড়া আরও বিশেষ ধরনের যে যে সুবিধা রেসিন থেকে পাওয়া যায়। যেমন-
- রেসিনসমূহ কংক্রিট, ইটের গাঁথুনি, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, কাঠ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের নির্মাণসামগ্রীর মধ্যে সুদৃঢ় ও মজবুত বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে।
- রেসিনসমূহ তাপমাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তনেও এদের কার্যকারিতা ও গুণাগুণ ধরে রাখতে সক্ষম। রেসিনসমূহ ০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যেও তাদের কার্যকারিতা অটুট রাখতে পারে।
- এরা দীর্ঘস্থায়ী ও বিরূপ আবহাওয়া বা পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম।
- কম্পন (Vibration) ও হঠাৎ করে প্রযুক্ত চাপসমূহের (Impact Load) বিপরীতে ভালো প্রতিরোধকের কাজ করে।
রেসিনের ব্যবহার
কংক্রিটের নির্মাণকাজে যে স্থানে সংকোচন ও সম্প্রসারণ জোড়া থাকে, সেই সব স্থানের বন্ধকরণে (Sealing) রেসিন ব্যবহার করা হয়। তা ছাড়া কংক্রিটে কোনো ধরনের ক্ষতি হলে বা ভেঙে গেলে সংস্কারকাজে রেসিন ব্যবহার করা হয়।
কংক্রিট মেঝের উপরিভাগের সংস্কারকাজ
কম্পন, হঠাৎ বড় ধরনের কোনো চাপের সম্মুখীন হলে কংক্রিটের জন্য ক্ষতিকর কোনো ধরনের কেমিক্যালের সংস্পর্শে এলে কংক্রিটের মেঝের উপরিতল বিভিন্ন ধরনের ফাটল অথবা ক্ষতি সম্মুখীন হতে পারে। তা ছাড়া নির্মাণকাজের ত্রুটিজনিত কারণেও মূল কংক্রিটে সমস্যা থাকতে পারে। যে কারণেই হোক না কেন কংক্রিটের ফাটল ঠিক করার জন্য যেসব জায়গা নতুন রেসিন ফ্লোরের আওতায় আসবে, সেসব কংক্রিটের ফাটলকে প্রথমে ভেঙে আরও বড় করে নিতে হবে। অতঃপর ওসব স্থান থেকে আলগা কংক্রিটের টুকরোসমূহ সরিয়ে দিতে হবে। যাতে করে কংক্রিটের ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাটি সম্পূর্ণরূপে দৃশ্যমান হয় এবং সহজেই সংস্কারকাজের আওতায় আসে।
কংক্রিট মেঝের কাজের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি নির্ভর করে সংস্কারের ধরন ও পরিধির ওপর। কী ধরনের রেসিন মেঝেতে প্রয়োগ করা হবে, মেঝেটি ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিবেশ-পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে এর ওপর। নতুন সংস্কারকৃত মেঝে থেকে কী ধরনের কর্মক্ষমতা প্রয়োজন হবে, বর্তমানে কোন পরিবেশে রয়েছে এবং কাজের জন্য কী পরিমাণ সময় আছে, এর ওপর। সাধারণত সিমেন্ট মর্টার ও Epoxy রেসিন মর্টার দিয়ে শক্তিশালী ও মজবুতভাবে মেঝে সংস্কার করা যায়। বড় ও পাতলা ফ্লোরের ফাটলের জন্য সিমেন্ট মর্টারকে সংস্কারকাজে ব্যবহার করা হয়, যদি তা যথাযথ শক্তি অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে। আর যদি পর্যাপ্ত সময় হাতে না থাকে, তবে দ্রুত সময়ে যথাযথ শক্তি অর্জনকারী Epoxy রেসিন মর্টার ব্যবহার করে সংস্কারকাজ চালানো হয়। যদিও Epoxy রেসিন মর্টার অনেক বেশি ব্যয়বহুল, তদুপরি এর দ্বারা নির্মিত নতুন ফ্লোর সিস্টেম ২৪ ঘণ্টা পর থেকেই ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সাধারণ সিমেন্ট মর্টারের শুধু রেসিন ফ্লোর উপাদানের প্রলেপ প্রয়োগের জন্যই সাত দিনের মতো সময় লাগে। অতঃপর ৪৮ ঘণ্টা পর থেকে একে ব্যবহার করা যায়।
কংক্রিট মেঝের ফাটল সংস্কার
কংক্রিট মেঝেতে ফাটল নানা নির্মাণত্রুটির কারণে ঘটতে পারে, আবার বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় ভবনের বসে যাওয়া (Sehlement) অথবা সরে যাওয়া (Movement), মেশিনের দ্বারা সৃষ্ট কম্পন, অতিরিক্ত চাপ, অপর্যাপ্ত বা ভুল জোড়া প্রয়োগ, নকশাজনিত ত্রুটি প্রভৃতি কারণে কংক্রিটে ফাটল সৃষ্টি হয়ে থাকে।
সঠিক ও যথাযথভাবে কংক্রিটের ফাটল সংস্কার ও বন্ধ করার জন্য ফাটল সৃষ্টির সঠিক কারণ জানা একান্ত জরুরি। তা ছাড়া এই ফাটলের প্রভাবে ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের ফাটল সৃষ্টির আশঙ্কা আছে কি না তা নির্ণয়ও জরুরি। যেহেতু কংক্রিটের ফাটলের যথাযথ কারণ অনুসন্ধান একটি কারিগরি কাজ। তাই এর জন্য একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সাহায্য নেওয়াটাও অত্যন্ত জরুরি।
কংক্রিটের চলমান ফাটল সংস্কার
যদি কংক্রিট মেঝেতে সৃষ্ট ফাটলে আরও ফাটল সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে এসব ফাটলকে কংক্রিট Joint হিসেবে ধরে যথাযথ সংস্কারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য কংক্রিটের ফাটলকে বর্গাকারে কেটে নিয়ে রেসিন দিয়ে সম্পূর্ণ ফাটলকে বন্ধ করে দিতে হবে। এ কাজের জন্যে Sixaflex PRO-3WP খুব ভালো কাজ করে।
কংক্রিটের ফ্লোরে স্থির বা নির্দিষ্ট ফাটল সংস্কার
যদি নির্মাণ প্রকৌশলী মনে করেন, ফাটল আর বাড়বে না এবং এর প্রভাবে আর কোনো ধরনের ফাটল সৃষ্টি হবে না। সে ক্ষেত্রে নতুন রেসিন ফ্লোর System প্রয়োগ করে কংক্রিটের ফাটলকে পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সংস্কারের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি ও নির্মাণসামগ্রী নির্ভর করে সৃষ্ট ফাটলের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর গভীরতার ওপর। এ জন্য কংক্রিটে সৃষ্ট ফাটলের আরও কিছু অংশ কেটে বা আলগা (ষড়ড়ংব) কংক্রিট সরিয়ে কংক্রিটের ফাটলের মধ্যে খুব মিহি Epoxy রেসিন মর্টার প্রবেশ করিয়ে এ ধরনের ফাটল বন্ধ করা যায়। এ ক্ষেত্রে Sikadur-31 এবং Sikadur-52 অনেক ভালো কাজ করে।
কংক্রিট মেঝের সংযোগ
কংক্রিট ফ্লোর সিস্টেমে একটি নির্দিষ্ট Span পরপর সংকোচন ও প্রসারণ Joint রাখার প্রয়োজন হয়। যেসব কংক্রিটের নির্মাণকাজে এ ধরনের জোড়া রাখার প্রয়োজন হয়, সেই সব ক্ষেত্রে রেসিন Joint Sealer হিসেবে খুব ভালো কাজ করে। যেহেতু রেসিন পলিমার অনেক বেশি নমনীয় ও প্রসারণ সহনীয় হওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বিরূপ পরিবেশেও এরা এদের কার্যকারিতা অটুট রাখতে সক্ষম।
যদি কোনো কারণে কংক্রিট মেঝের জোড়াসমূহ ভেঙে যায়, সে ক্ষেত্রে Joint Sealer-সমূহ কংক্রিটের মধ্যে থেকে কেটে বের করে ফেলতে হবে। কোনো ধরনের আলগা কংক্রিট থাকলে তা পরিষ্কার করে নতুন রেসিন প্রয়োগ করতে হবে। অধিক শক্তিশালী Epoxy রেসিন মর্টার এসব Joint Sealing-এর জন্য অনেক বেশি ভালো উপাদান।
কংক্রিটের ওপর যেকোনো ধরনের রেসিন মেঝেতে প্রয়োগের আগে কংক্রিটের উপরিভাগে দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান কোনো ধরনের ফাটল বা ক্ষত থাকলে অবশ্যই প্রথমে তার প্রতিকার করে অতঃপর রেসিন প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় রেসিন দিয়ে ফ্লোর Finishing করলে ওসব ফাটল অনেক বেশি মাত্রায় দৃশ্যমান হবে, যা সম্পূর্ণ কাজের মানকে নষ্ট করে দিতে পারে। রেসিন প্রয়োগের আগে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে কোনো ধরনের ফাটল, ক্ষত বা কোনো ধরনের দূষণজনিত ক্ষতির সৃষ্টি না হয়। শুধু তার পরেই রেসিনের প্রলেপ প্রয়োগ করতে হবে।
রেসিনের বহুমুখী কার্যকারিতা ও এটার অনেক বেশি সুবিধা থাকায় নির্মাণসামগ্রী হিসেবে রেসিনের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। যদিও এটা অনেক বেশি ব্যয়সাপেক্ষ তদুপরি এর দ্বারা নির্মাণকাজের মান অনেক বেশি ভালো ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এর চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
| উপাদানের ব্যবহারবিধি রং (Color) : লাল ও ধূসর।(Consistency) বাহ্যিক কোনো ধরনের প্রভাব ছাড়াই নিজে থেকেই নির্দিষ্ট আকার ধারণ করে (Self-leveling) এবং এটা যেকোনো ধরনের তরলের মতো করে ব্যবহার করা যায়। (Cure Time): ১. ৭৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় নেয়।২. ৫৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় নেয়। প্রসারণ (Elongation) : শতকরা ২০০ ভাগ (২০০ শতাংশ) ওজন অনুসারে মিশ্রণের অনুপাত : ১২ ভাগ রেসিনের সঙ্গে (Mixing Ratio by Weight) ১ ভাগ Hardener. (Hardener) : (Pachaging) (১) রেসিন: ০১ গ্যালন ক্যান ৬ পাউন্ড ৮ আউন্স ২.৯৫ কেজি। (২) Hardener: ০১ পিন্ট ক্যান ৮.৫ ঘন ইঞ্চি বা ২.৫ লিটার ব্যবহারের উপযোগী তরল দ্রবণ পাওয়া যায়। (Top Life) : ৪৫ মিনিট।ব্যবহারের উপযোগী তাপমাত্রা : ০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। |
প্রকাশকাল: বন্ধন ৫৬তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৪