পঞ্চগড় দেশের সর্ব উত্তরের জেলা। প্রাচীন বাংলার সাক্ষ্য বহনকারী, প্রায় ১ হাজার ৪০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের জেলাটির প্রকৃতি ও আবহাওয়া দেশের অন্য যেকোনো জেলা থেকে একেবারেই আলাদা। পাঁচ গড়ের সমাহার পঞ্চগড়। এই পাঁচ গড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বাংলার নানা নিদর্শন। এর মধ্যে অন্যতম ভিতরগড় দুর্গ।
ভিতরগড় মূলত প্রাচীন এক দুর্গনগর। দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড় শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে যার অবস্থান। আজ অবধি বাংলাদেশে যে কটি গড়ের সন্ধান মিলেছে, তার মধ্যে মহাস্থানগড় প্রাচীনতম দুর্গনগর হিসেবে বিবেচিত হলেও আয়তনের দিক থেকে ভিতরগড় দুর্গনগরই সর্ববৃহৎ। নির্মাণের সঠিক সময়কাল এখন অবধি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। তবে সম্পূর্ণ দুর্গটি একই সময়ে নির্মিত হয়নি। প্রাচীন এই দুর্গনগরের মাটির নিচে লুকিয়ে আছে এ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিগাথা। মাটি খুঁড়লেই বেরিয়ে আসছে দুর্লভ সব প্রাচীন স্থাপনা। ভিতরগড় দুর্গনগর শুধু প্রাচীন স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর অভ্যন্তরে রয়েছে প্রাচীন ১০টি দিঘি ও দুটি নদী। এর মধ্যে রয়েছে ৫৩ একর জমির ওপর অবস্থিত ঐতিহাসিক মহারাজা দিঘি। এর রয়েছে ইট বাঁধানো ১০টি ঘাট এবং ঘাটের উভয় পাশে ইট ও মাটি দিয়ে নির্মিত সুউচ্চ পাড়, যা নৈসর্গিক দৃশ্যের এক অসাধারণ নিদর্শন।
দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই ইতিহাস। ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে স্থাপিত ভিতরগড় দুর্গনগর ছিল সার্বভৌম প্রশাসনের অধীন। ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বাধীন এক নগর। এতে বাণিজ্য ও জনবসতি দুই-ই ছিল। বিশেষত বৌদ্ধ ও হিন্দুধর্মাবলম্বী ছিল এ নগরের বাসিন্দা। একই সঙ্গে এটি কেবল বহু অঞ্চলের বস্তুগত আদান-প্রদানই নয়, বরং বহুমুখী সংস্কৃতির মিলনকেন্দ্রও। এলাকাটির মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে বহু মূল্যবান প্রত্ন নিদর্শন। আবিষ্কৃৃত হয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় নেতাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ ও মন্দির। ভিতরগড়ের রাজবাড়ির পাশে কাচারি বলে পরিচিত উঁচু ঢিবি খননকালে এ মন্দিরটি আবিষ্কৃত হয়। তবে এখন পর্যন্ত কেবল স্মৃতিসৌধ ও মন্দিরের অংশবিশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় গোরস্থানের নিচের দিকে খননকাজ চালিয়ে একটি মন্দিরের ধবংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো এবং মনুমেন্টের পশ্চিমে ইটের গাঁথুনির ১৬টি স্তম্ভ পাওয়া গেছে। নির্মাণপদ্ধতি দেখে এগুলোকে গুপ্ত যুগের পরে সপ্তম শতক বা ১ হাজার ৪০০ বছর আগের তৈরি বলে ধারণা করা হয়।
ভিতরগড় দুর্গনগরের বাইরের বেষ্টনীর উত্তরাংশ, উত্তর-পশ্চিমাংশ এবং উত্তর-পূর্বাংশ বর্তমানে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত হওয়ায় ধারণা করা হয়, ষষ্ঠ শতকের শেষে কিংবা সপ্তম শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ভিতরগড় দুর্গ নির্মাণের সঙ্গে কামরূপের শূদ্রবংশীয় রাজা দেবেশ্বরের বংশজাত পৃথু (পৃথ্বী) রাজার নাম সম্পৃক্ত। পৃথু রাজা কে ছিলেন? কোথা থেকে এসেছিলেন? কারা এই ভিতরগড়ে বসবাস করত? ভিতরগড় নগরের উৎপত্তি কিংবা বিলুপ্তির কারণই বা কী ছিল? প্রশ্নগুলোর উত্তর সঠিকভাবে বলা সম্ভব না হলেও উৎখননের ফলে প্রাপ্ত নিদর্শনসমূহের আলোকে অনুমান করা যায়, ছয় শতকের শেষে কিংবা সাত শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। প্রাচীন বাণিজ্য সড়ক ও নদীপথের ওপর অবস্থিত হওয়ায় ভিতরগড় এলাকার অধিবাসীরা সম্ভবত নেপাল, ভুটান, সিকিম, আসাম, কোচবিহার, তিব্বত, চীন, বিহার এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল।
স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, ভিতরগড় ছিল পৃথু রাজার রাজধানী। স্থানীয় আধিবাসীদের কাছে যার পরিচিতি মহারাজা হিসেবে। ১৮০৯ সালে ভিতরগড় জরিপ করেন ফ্রান্সিস বুকানন। তাঁর মতে, পৃথু রাজার রাজত্ব ছিল তৎকালীন বৈকণ্ঠপুর পরগণার অর্ধেক ও বোদা চাকলার অর্ধেক অংশ নিয়ে। ছয় শতকের শেষদিকে এক পৃথু রাজা কামরূপে পরাজিত হয়ে ভিতরগড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। আবার তেরো শতকের কামরূপের ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্য এক পৃথু রাজার নাম। কেউ কেউ মনে করেন পৃথু রাজা ও রাজা তৃতীয় জল্পেশ অভিন্ন ব্যক্তি এবং আনুমানিক প্রথম শতকে তিনি ভিতরগড়ে রাজধানী স্থাপন করে এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। আবার অনেকে জলপাইগুড়ির জল্পেশে নয় শতকে নির্মিত শিবমন্দিরের নির্মাতা জল্পেশ্বর বা রাজা তৃতীয় জল্পেশকে নয় শতকের শাসক মনে করেন। বুকাননের ভিতরগড় জরিপকালে একজন স্থানীয় বৃদ্ধ জানান, ধর্মপালের রাজত্বের আগে পৃথু রাজা এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন। কোটালীপাড়ায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রা থেকে জানা যায়, অপর রাজার নাম পৃথুবালা। এই পৃথুবালা সম্ভবত সাত শতকের শেষার্ধে অথবা আট শতকের শুরুতেই সমতটের শাসক ছিলেন। অপর একটি সুত্র অনুযায়ী নয় বা দশ শতকে কম্বোজ বা তিব্বতীয়দের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য পালবংশীয় রাজারা ভিতরগড় দুর্গটি নির্মাণ করেন। দুর্গনগরটি চারটি দেয়ালে সুরক্ষিত। এর বাইরের দুটি গড় বা দেয়াল মাটি দিয়ে বানানো। ভেতরের দুটি দেয়াল ইটের তৈরি। এসব স্থাপনার গাঁথুনি মাটির বিনির্মাণ কৌশল বৌদ্ধদের প্রাচীন আবিষ্কৃত দুর্গের মতোই। প্রাচীরগুলো ১৩ থেকে ১৮ ফুট উঁচু এবং ৭ থেকে ১২ ফুট প্রশস্ত। সামনে আছে বিশাল এক দিঘি।
ড. বুকানন হেমিলটনই প্রথম পরিদর্শন করেছিলেন ভিতরগড়। তাঁর বর্ণনানুসারে মোট চারটি অভ্যন্তরীণ গড়ের সমন্বয়ে গঠিত ভিতরগড় দুর্গনগর। গড়গুলোর অবস্থান ছিল একটি অপরটির ভেতর। সবচেয়ে ভেতরের গড়ে নির্মিত হয়েছিল রাজা পৃথুর প্রাসাদ। তবে সেসব কীর্তি এখন দৃশ্যমান তো নয়ই, অনুধাবনযোগ্যও নয়। এখানে কোন ধর্ম বা সম্প্রদায়ের লোকজন বাস করতেন এবং তাঁদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবন কেমন ছিল, এ বিষয়ে এখনো তেমন কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করছেন, ভিতরগড় এলাকা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
ভিতরগড় দুর্গনগর খননকাজের দায়িত্বরত প্রত্নতাত্ত্বিক ড. শাহনাজ হুসনে জাহান ভারতের পুনায় অবস্থিত ডেকান পোস্ট গ্র্যাজুয়েট অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। তিনি এই মন্দির দুটির নির্মাণশৈলী, আকৃতি ও ইটের গঠন দেখে অষ্টম শতকের বলে ধারণা করেন। একটি মন্দিরের অবয়ব বেরিয়েছে দ্বিতীয় আবেষ্টনী দেয়ালের বাইরে খালপাড়া এলাকায়। সেটি ৯ মিটার দীর্ঘ ও ৯ মিটার চওড়া। দ্বিতীয় মন্দিরটি হচ্ছে ঢিবরীডাঙ্গা এলাকায়। এটির অবস্থান দ্বিতীয় আবেষ্টনী দেয়ালের বাইরে পরিখার পরপরই। এর দৈর্ঘ্য ২৫ মিটার ও প্রস্থ ২০ মিটার। এই দুটি স্থাপনায় ইটের কাজের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে পাথর। আসাম, কোচবিহার, ময়নামতি, পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত প্রত্নতত্ত্বের বিভিন্ন নমুনার সঙ্গে এখানে পাওয়া প্রত্নতত্ত্বের কোনো মিলই নেই। এ ছাড়া খননকাজের সময় ভিতরগড় দুর্গে মন্দির, প্রাসাদ ও ১২টি ইমারতের ভগ্নাবশেষ, মনসা, নারায়ণ ও পাথরের পাঁচটি মূর্তি এবং তামা ও স্বর্ণের অলংকার, মুদ্রা পাথরের সøাব, প্রাচীন ইট, প্রাচীন প্রস্তর, একটি প্রাচীন রাস্তার নিদর্শন পাওয়া গেছে।
ভিতরগড় দুর্গনগরের খননকাজে প্রথম অবস্থায় স্থানীয় জনগণের আপত্তি থাকলেও পরে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরাই। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রেজাউল করিমের মালিকানার জমিতেই এই মন্দিরটির সন্ধান মিলেছে। ড. শাহনাজ হুসনে জাহান সে জমিতে খননের অনুমতি চাইলে প্রথমে নাকচ করে দিলেও পরে তাঁরা স্বপ্রণোদিতভাবেই রাজি হয়ে সহযোগিতা করেছেন। খননকাজে দায়িত্বরত প্রত্নতাত্ত্বিক ড. শাহনাজ হুসনে জাহান খনন চলাকালীন জানান, ‘আমরা ভিতরগড় প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষা গবেষণা ও খনন শুরু করি ২০০৮ সালে। এই দুর্গনগরের ভেতর থেকে আমরা আটটি স্থাপনার সন্ধান পেয়েছি, যার মধ্যে চারটি ধর্মীয় স্থাপনা, বাকিগুলো নিয়ে এখন গবেষণা চলছে। এই দুর্গনগর কে বা কারা নির্মাণ করেছেন, কারা এই প্রাচীন সভ্যতায় প্রাচীন জনপদে বসবাস করেছেন এই পর্যন্ত তার কোনো সঠিক ইতিহাস উদ্্ঘাটিত হয়নি। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, তৎকালীন এ অঞ্চল পৃথু রাজার শাসনের অধীন ছিল। তিনি বসবাসের মাধ্যমে এখানেই রাজত্ব করেছিলেন।’ ভিতরগড় দুর্গনগরের আদি ঐতিহ্য উদ্্ঘাটনের পাশাপাশি ভিতরগড়কে পর্যটননগর হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালাবেন তিনি।
প্রথম পর্যায়ে কয়েক দফা খননে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ ছয়টি প্রাচীন স্থাপনা। তার প্রায় দুই মাসের খননে দুটি প্রাচীন মন্দিরসাদৃশ্য স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এই দুটি স্থাপনা অষ্টম শতকে প্রাচীন ভারতীয় বাস্তুশাস্ত্র অনুসরণ করে নির্মিত। ২০০৮ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমতি সাপেক্ষে এই দুর্গনগরে গবেষণা ও খননকাজ শুরু হয়। তখন নতুন করে বেরিয়ে আসে মন্দিরসাদৃশ্য প্রাচীন দুটি স্থাপনা। ভিতরগড় মহারাজা দিঘির দ্বিতীয় বেষ্টনীর দেয়ালের বাইরে ২৫ বর্গমিটার এলাকায় একটি এবং বেষ্টনী দেয়ালের ভেতরে ১৫ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে আরও একটি প্রাচীন মন্দিরসাদৃশ্য স্থাপনা আবিষ্কৃৃত হয়েছে। ভিতরগড় দুর্গনগর পূর্ণাঙ্গভাবে খনন করতে কত সময় প্রয়োজন এ ব্যাপারে খননকাজে নিয়োজিত কেউ ধারণা করতে পারছে না। এই দুটি স্থাপনার ধরন দেখে তাদের ধারণা হয়েছিল, এটি ধর্মীয় কোনো উপাসনালয়। মঠ বা মন্দিরও হতে পারে। অনিন্দ্য সুন্দর কারুকার্যখচিত এই স্থাপনা দুটি দেখতে কাছে ও দূরের দর্শনার্থীরা ভিড় করছে প্রতিদিনই।
ভিতরগড় দুর্গনগর মূলত চারটি বেষ্টনীর সমন্বয়ে গঠিত। এই বেষ্টনীসমূহ একটি অপরটির ভেতরে অবস্থিত। অভ্যন্তরীণ আবেষ্টনী বা প্রথম আবেষ্টনীর উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দেয়ালসমূহের পরিমাপ যথাক্রমে ৩৪০ মিটার, ৬৫০ মিটার, ৬১০ মিটার ও ৪৫০ মিটার। এই দেয়ালসমূহ সম্পূর্ণরূপে ইটের তৈরি। দেয়ালসমূহ বর্তমানে ২ দশমিক ৫৫ মিটার উঁচু এবং উপরিভাগে ২ মিটার প্রশস্ত। দেয়ালসমূহ সুদৃঢ় করার নিমিত্তে বাইরের দিকে দেয়ালের সঙ্গে আয়তাকৃতির বুরুজ সম্পৃক্ত রয়েছে। অভ্যন্তরীণ আবেষ্টনীতে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ ২৪ x ২৩ x৫ সেমি, ২৩ x ২২ x ৫ সেমি, ২২ x ২০x৫ সেমি এবং ২০ x ১৮ x ৪ সেমি। অভ্যন্তরীণ আবেষ্টনীর উত্তর-পূর্বাংশে সম্ভবত রাজবাড়ি ছিল। এই আবেষ্টনীর ভেতরে দুটি প্রাচীন দিঘি রয়েছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে এই অভ্যন্তরীণ আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে একটি ক্রুশাকৃতির মন্দির এবং উভয় দিকে (পূর্ব ও পশ্চিম) স্তম্ভবিশিষ্ট বারান্দাসংবলিত পিরামিডাকৃতির একটি স্তূপ বা মন্দির আবিষ্কৃৃত হয়েছে।
২৭ মি. x২২ মি. জায়গার ওপর ইট নির্মিত ক্রুশাকৃতির মন্দিরটির কেন্দ্রে রয়েছে ৯ মি. x ৯ মি. একটি কেন্দ্রীয় কক্ষ। এই কক্ষের চারদিকে রয়েছে চারটি কক্ষ। উত্তর দিকের কক্ষটির পরিমাপ ৬.৪০ মি. x ৫.৮০ মি. এবং পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের কক্ষ তিনটির পরিমাপ হলো ৪.২৮ মি. x ৩.৬০ মি.। মন্দিরে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ হলো ২২ x ২০ x ৫ সেমি এবং ২০ x ১৮ x ৪ সেমি। উৎখননকালে মন্দির স্থাপত্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন নকশাখচিত ইট ও ত্রিকোনাকৃতির পাথরের খণ্ড পাওয়া গেছে।
উপরিউক্ত মন্দিও থেকে ১২০ মিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি ইটের নির্মিত স্থাপত্যের ভিত্তি পাওয়া গেছে। এটি সম্ভবত স্তূপ বা মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই স্থাপত্যটির কেন্দ্রে রয়েছে ২ দশমিক ১৪ মিটার পুরু দেয়াল দিয়ে সৃষ্ট একটি বর্গক্ষেত্র, যার প্রতিটি বাহুর পরিমাপ ৬ দশমিক ২৫ মিটার। এই কেন্দ্রীয় বর্গক্ষেত্রটি চর্তুদিকে ৩ দশমিক ০৫ মিটার দূরত্বে ১৯ দশমিক ৮০ মিটার দীর্ঘ ও ১ দশমিক ৫৩ মিটার পুরু দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত। এ অংশটি আবার ২ দশমিক ৭৫ মিটার দূরত্বে ১ দশমিক ২৫ মিটার পুরু ও ২৭ দশমিক ৫০ মিটার দীর্ঘ দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত। এই তিনটি বর্গের দেয়ালের পুরুত্ব থেকে সহজেই অনুমেয় যে স্থাপত্যটি মূলত পিরামিডাকৃতির ছিল। এর বাইরের বর্গক্ষেত্রটির পূর্ব ও পশ্চিম বাহুর মধ্যবর্তী স্থানে ১৬টি স্তম্ভসংবলিত একটি করে আয়তাকৃতির বারান্দা (অভ্যন্তরীণ পরিমাপ ১০.৫ মি. x ৯.৫ মি.) সম্পৃক্ত ছিল। পূর্ব দিকের স্তম্ভবিশিষ্ট বারান্দার পূর্বে ৪.৭৫ মি. x ২.৫৫ মি. সংলগ্ন অংশটি সম্ভবত প্রবেশপথের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এখানে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ হলো ২৪ x ২৩ x ৫ সেমি, ২৩ x ২২ x ৫ সেমি, ২২ x ২০ x ৫ সেমি এবং ২০ x ১৮ x ৪ সেমি। উৎখননকালে এই স্থাপত্যের ভিত্তির নিচের স্তরে লাল ও ধূসর রঙের নকশাখচিত মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ এবং লোহা ও তামার তৈরি দ্রব্যাদি পাওয়া গেছে। মৃৎপাত্রের মধ্যে বেশির ভাগই থালা, বাটি, রান্নার হাঁড়ি, তাওয়া ও মাটির প্রদীপ। অভ্যন্তরীণ আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে একটি কালো পাথরে তৈরি মনসা মূর্তির ভগ্নাংশ (১০ দশমিক ৬ x ৮ দশমিক ২ সেমি) পাওয়া গেছে, যা বর্তমানে পঞ্চগড় মহিলা কলেজের রকস মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
প্রথম আবেষ্টনী এবং মহারাজার দিঘিসহ পাঁচটি প্রাচীন দিঘিকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে দ্বিতীয় আবেষ্টনী। ইটের নির্মিত এই দ্বিতীয় আবেষ্টনীর দেয়ালসমূহের পরিমাপ যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণে ১ দশমিক ৪ কিমি, পূর্বে ২ দশমিক ৮৬ কিমি এবং পশ্চিমে ৩ কিমি। ইটের নির্মিত দেয়ালসমূহ বর্তমানে ৩ দশমিক ৫ মিটার উঁচু এবং উপরিভাগে ২ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত। ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ ২২ x ২০ x ৫ সেমি এবং ২০ x ১৮ x ৪ সেমি। পশ্চিম দেয়ালটি শালমারা নদীর প্রবাহ অনুসরণ করে নদীর পূর্ব তীরে নির্মিত বলে প্রচুর আঁকাবাঁকা। প্রথম আবেষ্টনীর মতো দ্বিতীয় আবেষ্টনীর দেয়ালসমূহের বাইরেও আয়তাকৃতির বুরুজ সংযোজিত রয়েছে। দ্বিতীয় আবেষ্টনীর দেয়ালসমূহের বাইরে চতুর্দিকে ১৯ মিটার প্রশস্ত এবং ৪ দশমিক ৫ মিটার গভীর পরিখা রয়েছে। যার অনেকাংশেই বর্ষাকালে পানি থাকে। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, এই দ্বিতীয় আবেষ্টনীর উত্তরে কালদুয়ার এবং দক্ষিণে যমদুয়ার নামে দুটি প্রবেশদ্বার ছিল। দ্বিতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে পাঁচটি প্রাচীন দিঘি হলো- মহারাজার দিঘি, ফুলপুকুরী, কোদালধোয়া, মলানী দিঘি ও সিঙ্গারী দিঘি। তন্মধ্যে মহারাজার দিঘি সবচেয়ে বড়। এ দিঘিটি আয়তনে প্রায় ৫৩ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। দ্বিতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত মহারাজার দিঘির চতুর্দিক ইট ও মাটি নির্মিত ৬ মিটার উঁচু পাড় দিয়ে পরিবেষ্টিত। পাড়সহ দিঘির পরিমাপ উত্তরে ৩৭৬ দশমিক ৪৩ মিটার, দক্ষিণে ৩৬৭ দশমিক ২৪ মিটার এবং পূর্ব ও পশ্চিমে ৬৯১ দশমিক ৩১ মিটার। দিঘির গভীরতা প্রায় ৯ মিটার। দিঘিতে পূর্ব ও পশ্চিমে তিনটি করে এবং উত্তর ও দক্ষিণে দুটি করে মোট ১০টি ইট বাঁধানো ঘাট রয়েছে। মহারাজার দিঘির পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং দিঘির ভেতরে কোনো জলজ উদ্ভিদ নেই। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, পৃথু রাজা কিচক নামে অসাধু ও নিম্নবর্ণের জনগোষ্ঠী দ্বারা আক্রান্ত হলে নিজ পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষার্থে পরিবার-পরিজনসহ দিঘির জলে আত্মহত্যা করেন। তাঁর রক্ষীবাহিনীও তাঁকে অনুসরণ করে। এর ফলে অবসান ঘটে পৃথু রাজার রাজত্বের।
দ্বিতীয় আবেষ্টনীর চতুর্দিকে বাইরে নির্মিত হয়েছিল তৃতীয় আবেষ্টনী। তৃতীয় আবেষ্টনীর দেয়ালের পরিমাপ উত্তরে ২ দশমিক ৪৪ কিমি, পূর্বে ৫ দশমিক ২৭ কিমি, পশ্চিমে ৫ দশমিক ৩৭ কিমি এবং দক্ষিণে ৩ দশমিক ৭১ মিটার। আবেষ্টনী দেয়াল মাটি দিয়ে নির্মিত। তবে উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালের মধ্যবর্তী অংশ ইট দিয়ে নির্মিত। তৃতীয় আবেষ্টনীর দেয়াল বর্তমানে ৪ দশমিক ৯ মিটার উঁচু। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দেয়ালের বাইরে ২৯ মিটার প্রশস্ত ও ৪ দশমিক ৫ মিটার গভীর পরিখা রয়েছে এবং পশ্চিম দেয়ালের বাইরে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তালমা নদী। উল্লেখ্য, উত্তর দেয়ালের পশ্চিমাংশে তালমা নদীতে একটি বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহকে পশ্চিম দেয়ালের বাইরে দিয়ে পরিচালনা করা হয় এবং নদীর প্রাচীন প্রবাহটি, যা বর্তমানে শালমারা নদী নামে তৃতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে পশ্চিমাংশ দিয়ে এবং দ্বিতীয় আবেষ্টনীর পশ্চিম দেয়ালের বাইরে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তৃতীয় আবেষ্টনীর দক্ষিণ দেয়ালের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে দোমনী নামক স্থানে পুনরায় তালমা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। বীর বাঁধ ছাড়াও এই শালমারা নদীতে আরও দুটো পাথরের বাঁধ যথাক্রমে পাথরঘাটা ও দোমনী নামক স্থানে নির্মাণ করে ভিতরগড় দুর্গনগরের মধ্যে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তৃতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে উত্তরাংশে এবং দ্বিতীয় আবেষ্টনীর উত্তর দেয়াল থেকে ২৫০ মিটার উত্তরে আরও একটি ১ দশমিক ৬ কিমি দীর্ঘ ও ১ দশমিক ৪ মিটার উঁচু দেয়াল দেখা যায়। এই দেয়ালের উত্তরের পরিখা পশ্চিমে শালমারা নদীতে মিলিত হয়। এই দেয়ালটির মধ্যবর্তী অংশ ইট দিয়ে এবং বাকি অংশ মাটি দিয়ে নির্মিত। অনুরূপ দেয়াল ও দেয়ালসংলগ্ন পরিখা তৃতীয় আবেষ্টনীর দক্ষিণাংশেও দেখা যায়, যা ১ দশমিক ৪ কিমি দীর্ঘ। তৃতীয় আবেষ্টনীর অভ্যন্তরে বাঘপুকুরী, ঝলঝলি ও মলানী নামে তিনটি প্রাচীন দিঘি রয়েছে। তৃতীয় আবেষ্টনীর দক্ষিণ দেয়ালের প্রায় মধ্যবর্তী অংশে চতুর্দিকে ইটের নির্মিত দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত ভেতরের দিকে ১৭০ মি. x ১৭০ মি. একটি বর্গক্ষেত্র রয়েছে, যার ভেতরে ৪০ মি. x ৪০ মি. একটি প্রাচীন ঢিবির ওপরে বিক্ষিপ্তভাবে ইটের টুকরো দেখা যায়।
তৃতীয় আবেষ্টনী থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরত্বে চতুর্থ আবেষ্টনী নির্মিত হয়েছিল। আবেষ্টনীর দেয়াল সম্পূর্ণরূপে মাটি দিয়ে নির্মিত। উত্তরে ৩ দশমিক ০৮ কিমি, পূর্ব ও পশ্চিমে ৫ দশমিক ৭০ কিমি এবং দক্ষিণে ৪ দশমিক ০৮ কিমি। বহির্দিক ১৫ মিটার প্রশস্ত পরিখা দিয়ে পরিবেষ্টিত। দেয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে নির্মিত একটি ছোট দুর্গ ধুমগড় নামে পরিচিত। দেয়ালের পরিমাপ পূর্ব ও পশ্চিমে ২১০ মিটার, উত্তরে ৬১০ মিটার এবং দক্ষিণে ৫২০ মিটার। এই দেয়াল ১৫ মিটার প্রশস্ত পরিখা দিয়ে পরিবেষ্টিত।
বাংলার ইতিহাসে পৃথু রাজা কিংবা তাঁর রাজ্য ভিতরগড় সম্বন্ধে খুব কমই উল্লেখ আছে। ষোলো শতকে সম্ভবত ভিতরগড় ছিল কামতা-কোচ রাজ্যের অংশ, যা বিশ্বসিংহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এর আগে ১৪৫৮ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন শাহ কর্তৃক কামরূপ রাজ্য অধিকৃত হলে সম্ভবত এ অঞ্চল সুলতানি বাংলার অন্তর্গত হয়। আরও আগে ১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মুঘিসউদ্দীন কর্তৃক কামরূপ অভিযানের সময়ে এ অঞ্চল বোড়ো, কোচ ও মেচ গোষ্ঠীর বারো ভূঁইয়াদের শাসনের অন্তর্গত ছিল। বানগড় স্তম্ভলিপি ও ইরদা তাম্রলিপিতে বর্ণিত দশম শতকে আগত কম্বোজগণ যখন স্বল্প সময়ের জন্য গৌড়ে রাজত্ব করেন, তখন সম্ভবত ভিতরগড় তাঁদের রাজত্বের অংশ ছিল। আর চার শতকের আগে ভিতরগড় ছিল সম্ভবত প্রাগয্যোতিশপুরের অংশ। ভিতরগড় প্রত্নস্থলকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে সরকারের প্রতি স্বীকৃতিদানের দাবি অনেকের। অপার সম্ভাবনাময় এই ভিতরগড় দুর্গনগর শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ইতিহাস নির্মাণে প্রয়োজনীয় ঐতিহাসিক উৎস সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্ববহ। পর্যটনশিল্পের জন্য ভিতরগড় প্রত্নস্থল হতে পারে বাংলাদেশের প্রত্ন নিদর্শনের বিশাল এক ভান্ডার।
প্রত্নতাত্ত্বিক ডব্লিউ হান্টার তাঁর ‘দি অ্যাকাউন্টস অব বেঙ্গল’ বইয়েও ভিতরগড় দুর্গনগরের কথা উল্লেখ করেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দিলীপ কুমার চক্রবর্তী তাঁর ‘অ্যানশিয়েন্ট বাংলাদেশ’ গ্রন্থেও ভিতরগড় দুর্গনগরকে প্রাক্ মধ্যযুগ থেকে মধ্যযুগীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা ও সদিচ্ছায় দুর্গনগরটি রক্ষা পেলে দেশীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য হবে দারুণ সমৃদ্ধ।
প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫