চেক প্রজাতন্ত্রের ইহলাভা শহরে সম্প্রতি একটি নতুন ক্রীড়া স্থাপনা তৈরি হয়েছে, ইহলাভা মিউনিসিপ্যাল অ্যারেনা। এটি ডিজাইন করেছে স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান চিবিক + ক্রিস্তফ। ভবনটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এর জিগজ্যাগ আকৃতির লাল রঙের বাইরের অংশ। যা দেখতে অনেকটা হেজহগ বা সজারুর কাঁটার মতো।
এই অ্যারেনাটি মূলত স্থানীয় আইস হকি দলের জন্য বানানো হলেও, এটি এখন পুরো শহরের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাজেও ব্যবহৃত হবে। এখানে মোট ৫,৬৫০টি আসন আছে। এটি তৈরি হয়েছে একটি পুরনো আইস রিংকের জায়গায়, শহরের পুরনো কেন্দ্রের কাছেই। একটি স্থাপত্য প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই নকশাটি বাছাই করা হয়েছিল।

লাল ফ্যাসাড ও শহরের পরিচয়
অ্যারেনার সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ এর উজ্জ্বল লাল অ্যালুমিনিয়াম ফ্যাসাড। স্থপতিরা এটি এমনভাবে বানিয়েছেন যাতে শহরের একটি শক্তিশালী পরিচয় তৈরি হয়। স্টুডিওর মতে, লাল রঙটি শহরের প্রতীক-চিহ্নের সঙ্গে মেলে। আবার স্থানীয় হকি দলের রঙের সঙ্গেও মিলে যায়। ফ্যাসাডের জিগজ্যাগ নকশাকে সজারুর কাঁটার সঙ্গে তুলনা করা হয়। যা ইহলাভা শহরের পরিচিত প্রতীক।

চিবিক + ক্রিস্তফের প্রতিষ্ঠাতা ওন্দ্রেই চিবিক বলেন, তারা এমন একটি ভবন বানাতে চেয়েছিলেন যা দেখতে সহজ ও আমন্ত্রণজনক লাগবে। একইসঙ্গে বড় ভেন্যুর কারিগরি চাহিদাও পূরণ করবে। তার মতে, কোণাকৃতি ফ্যাসাড ও মুকুটের মতো চূড়া অ্যারেনাকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। এটি শহরের পুরনো স্কাইলাইনের সঙ্গেও মানানসই, আবার আধুনিকও লাগে।
শহরের কাউন্সিলর ডেভিড বেকে বলেন, হেজহগের মতো দেখতে এই লাল ফ্যাসাডের কারণে ইহলাভার মানুষ অ্যারেনাটির সঙ্গে গভীর মানসিক সংযোগ অনুভব করছেন।

নমনীয় নকশা ও বহুমুখী ব্যবহার
অ্যারেনাটি শুধু আইস হকির জন্য নয়, কনসার্ট আর সম্মেলনসহ নানা আয়োজনের জন্যও উপযোগী করে বানানো হয়েছে। এজন্য ভবনে রিট্র্যাক্টেবল স্ট্যান্ড ব্যবহার করা হয়েছে। যেগুলো প্রয়োজনে গুটিয়ে বা খুলে রাখা যায়। এতে হকি ম্যাচের সময় ৫,৬৫০ জনের আসনক্ষমতা বাড়িয়ে ৭,৪০০-এরও বেশি করা যায়।

চিবিক বলেন, অ্যারেনাটিকে তারা মূলত জনসাধারণের ভবন হিসেবেই ভেবেছিলেন, শুধু একটি ইভেন্ট ভেন্যু হিসেবে নয়। এটি শহরের পুরনো কেন্দ্রের প্রান্তে থাকলেও, একে আলাদা কোনো স্থাপনা না ভেবে শহরেরই একটি অংশ হিসেবে গড়া হয়েছে। তার মতে, খোলামেলা পরিবেশ, সহজ প্রবেশাধিকার আর প্রতিটি খুঁটিনাটিতে যত্নের কারণে অ্যারেনাটি মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার, সামাজিক মেলামেশা আর একসঙ্গে উদযাপনের মুহূর্ত সবকিছুতেই কাজে লাগবে।

নির্মাণ উপকরণ ও ছাদের রানিং ট্র্যাক
অ্যারেনার স্ট্যান্ডগুলো লাল রঙ মেশানো কংক্রিট দিয়ে তৈরি। সঙ্গে আছে স্টিলের ছাদ-কাঠামো বা ট্রাস। ভবনের ছাদে আছে ২৩০ মিটার লম্বা একটি রানিং ট্র্যাক, যা সবার জন্য বিনামূল্যে খোলা। এখান থেকে শহরও দেখা যায়।
ভবনের বাইরে এমনভাবে জায়গা সাজানো হয়েছে যাতে মানুষ আশপাশের ভবনগুলোর মধ্য দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারে। এর মধ্যে আছে ছাদ-ঢাকা একটি আর্কেড আর অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো সিঁড়ি। ভেতরে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের জন্য পুরোপুরি চলাচল-উপযোগী একটি পথ আছে, যা বসার জায়গাগুলো ঘিরে রেখেছে।
চিবিক বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ভবন বানানো, যা শুধু খেলা বা কনসার্টের দিনেই নয়, প্রতিদিনই শহরের সঙ্গে মিশে থাকবে। তার ভাষায়, অ্যারেনাটি শহরেরই একটি অংশ, আলাদা কোনো দ্বীপ নয়।

অভ্যন্তরীণ খুঁটিনাটি ও সহযোগী স্থাপনা
অ্যারেনার শেষ ধাপের কাজে আছে কিছু বিশেষ উপাদান। চেক আসন প্রস্তুতকারক কোভোস্তালের সঙ্গে মিলে তৈরি করা হয়েছে কাস্টম ভাঁজযোগ্য আসন। যা শব্দ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
কংক্রিটের কাঠামোয় বসানো হয়েছে ত্রিভুজাকার আলো, যা বানিয়েছে চেক কাঁচশিল্প প্রতিষ্ঠান বোমা। এছাড়া আছে টেক-ফাব্রিকার তৈরি পাঁচটি আলোক-স্থাপনা, যেগুলোর নকশা করেছে চিবিক + ক্রিস্তফ নিজেই। ভবনের দিকনির্দেশনা বা ওয়েফাইন্ডিং সিস্টেমে ব্যবহার হয়েছে গ্রাফিক ডিজাইনার লুকাশ কিয়োনকার বানানো একটি বিশেষ ফন্ট, যা ফ্যাসাডের জিগজ্যাগ নকশা অনুসরণ করে।
মূল অ্যারেনা ছাড়াও চিবিক + ক্রিস্তফ আরও তিনটি ভবন বানিয়েছে, যেগুলো প্রশিক্ষণ ও কারিগরি কাজে ব্যবহার হয়। এর মধ্যে দুটি পুরনো ভবন সংস্কার করে তৈরি। আরেকটি একদম নতুন ছয়তলা রুপালি কিউব আকৃতির ভবন, যেখানে আছে একটি ফ্যান শপ, রেস্তোরাঁ, হোটেল, জিম আর একটি স্পোর্টস হল।

২০১০ সালে চিবিক ও মিখাল ক্রিস্তফ মিলে চিবিক + ক্রিস্তফ প্রতিষ্ঠা করেন। এর আগে তারা ভারতে একটি প্রি-স্কুল আর তিরানায় লাল কংক্রিটের একটি টাওয়ারের মতো প্রকল্পেও কাজ করেছেন। ইহলাভা মিউনিসিপ্যাল অ্যারেনা তাদের সাম্প্রতিক একটি উল্লেখযোগ্য কাজ, যেখানে ক্রীড়া স্থাপনার কারিগরি চাহিদা আর শহরের পরিচয়ের প্রতীকী দিক একসঙ্গে মিলেছে।
লাল রঙের জিগজ্যাগ ফ্যাসাড, ছাদের খোলা রানিং ট্র্যাক, আর শহরের সঙ্গে গভীর সংযোগ — এই তিনটি বিষয় মিলিয়েই অ্যারেনাটি শুধু একটি খেলার মাঠ নয়, বরং ইহলাভা শহরের দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র: ডিজেইন






















