আনন্দময় ভ্রমণের অনন্য বাহন ট্রেন। যানজটমুক্ত ও ঝুঁকিবিহীন সাবলীল ভ্রমণের জন্য অনেকেই বেছে নেন রেলপথকে। তবে রেলভ্রমণ আকর্ষণীয় হলেও বিশ্বে এমন কিছু রেলপথ রয়েছে, যেগুলো অতিক্রম করছে অত্যন্ত বিপদসংকুল পথ। কখনো কখনো পথগুলো এতটাই ভয়ংকর যে জীবন বাজি রেখে ভ্রমণ করতে হয়। রেলপথ কখনো বয়ে চলেছে পাহাড়-পর্বত মাড়িয়ে, নদী-সমুদ্রের তলে আবার কখনো আগ্নেয়গিরির কোলঘেঁষে। ট্রেনগুলো যখন এসব পথ মাড়িয়ে যায় আত্মারাম তখন খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। বিশ্বের এমন কিছু ভয়ংকর রেলপথের কথকতা-
আসো মিনামি রুট, জাপান (Aso Minami route, Japan)
সবচেয়ে ভয়ংকর রেলরোড এটি, যেখানে রয়েছে জাপানের সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এটা কারোরই জানা নেই কখন এখানে আগ্নেয়গিরিটির অগ্ন্যুৎপাত ঘটবে। পর্যটকেরা বেশির ভাগ সময় ট্রেনে করে নভেম্বর মাসের প্রথমে আসে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের গরম লাভায় বনটির পুড়ে যাওয়া দেখতে।
জর্জটাউন লুপ রেলরোড, কলোরাডো (Georgetown Loop Railroad, Colorado)
ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলোরাডোর উত্তর-দক্ষিণ অংশ ছিল সিলভার খনিতে ভর্তি, তখন বাষ্পচালিত ট্রেনই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় ছিল ট্রেনটিকে ডেভিল গেট হাইব্রিজ পেরোতে হতো, যা লম্বায় ছিল ১০০ ফুট। যখন ট্রেনটি সেতুর ওপরে থাকে, তখন খুব মন্থর গতিতে এগোয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ট্রেনটি যেন আর বইতে পারছে না তার ভার।
চেন্নাই রামেশ্বরাম রুট, ভারত (Chennai-Rameswaram Route, India)
ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে রামেশ্বরাম দ্বীপে যেতে হলে অবশ্যই ট্রেনের সাহায্য নিতে হবে। যে পথে যাবে ট্রেনটি সেটি সত্যিই ভয়ংকর এক রেলপথ। ১৯১৪ সালে তৈরি এ রেলপথটি লম্বায় ১ দশমিক ৪ মাইল। তবে ভয়ের কারণ হচ্ছে, ট্রেনটি যখন সমুদ্র বরাবর চলে তখন সমুদ্রের বাতাসের প্রচণ্ড গতিবেগে ট্রেনটির লাইনচ্যুতি হতে পারে। এমন আশঙ্কা সব সময় থাকে এ পথে যাত্রারত যাত্রীদের মনে।
হোয়াইট পাস অ্যান্ড ইউকোন রুট, আলাস্কা (White Pass & Yukon Route, Alaska)
এটি নির্মিত ১৮৯৮ সালে। বাষ্পচালিত ট্রেনটি এখনো পর্যটকদের রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি করে। প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার দর্শনার্থী খাঁড়া উঁচু পাহাড় দেখতে এখানে ভিড় জমায়। খাঁড়া উঁচু পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় তিন হাজার মিটার, যা ২০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পথটি এমনভাবে নির্মিত, যা পুরপ্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে বিবেচ্য।
লিনটন অ্যান্ড লিনমাউথ ক্লিফ, যুক্তরাজ্য (Lynton & Lynmouth Cliff, United Kingdom)
এখানে চলাচলরত ট্রেনে এই রেলপথ বরাবর গেলে যে কেউ হঠাৎই ঘাবড়ে যেতে পারে। কেননা এই রেলরোডের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ কথার সারাংশ। ট্রেনটি যে পথ দিয়ে যায়, সেখানে যেমন রয়েছে খাঁড়া উঁচু বা নিচু ঢাল, তেমনি আছে উঁচু পাহাড়, যা ৫০০ ফুটের মতো খাঁড়া। যার বিস্তৃতি দক্ষিণ-পশ্চিম শহরের পাড় অবধি।
ট্রিন এ লাস নুবেশ, আর্জেন্টিনা (Tren a las Nubes, Argentina)
যদি এই ট্রেনের সালটা (উত্তর আর্জেন্টিনা) এবং লা পলভোরিলার (চিলির সীমারেখা) মাঝে যোগাযোগের জন্য ১৯২১ সাল থেকেই রুটটি অনুমোদিত কিন্তু বাস্তবে রেলপথটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ১৯৪৮ সালে। বাস্তবায়িত হতে লেগেছে দীর্ঘ সময়। এটিতে ২১টি টানেল এবং ১৩টি রাস্তা পারাপারের জন্য রয়েছে সেতু। এর মধ্যে অনেকগুলো প্যাঁচানো আবার কোনোটা আঁকাবাঁকা রেখার মতো বয়ে গেছে বহুদূর।
কামব্রিস অ্যান্ড টলটেক সিনিক রেলরোড, নিউ মেক্সিকো (Cumbres & Toltec Scenic Railroad, New Mexico)
১৮৮০ সাল থেকেই রেলরোডটি যাত্রীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে আছে। ট্রেনটির যাত্রা শুরু হয় উত্তরের শহর চামা কার থেকে। সব সময় পুরোনো রেল ট্র্যাকের ফ্রেমের মধ্য দিয়ে ট্রেনটি যাতায়াত করে তার ভারসাম্য ঠিক রাখতে। এটি ৮০০ ফুট দীর্ঘ পার্ক টলটেকে যাতায়াত করে। কামব্রিস নামক আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের ১০ হাজার ১৫ ফুট ওপর থেকেও এখানে বাতাস ছুঁয়ে যায়।
আটেনিকুয়া ছো-টিজো ট্রেন, দক্ষিণ আফ্রিকা (Outeniqua Choo-Tjoe Train, South Africa)
১৯০৮ সালে যখন রেলওয়েটির উদ্বোধন করা হয়, তখনই একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কাঠ রেললাইনে পড়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। বর্তমানে রুটটি একদমই নিরাপদ। এখনো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে, যখন ট্রেনটি কাইমেন সেতুটির ওপর দিয়ে যাত্রা করে, যার অবস্থান ভারত মহাসাগরের ওপরে।
আরগো গেডে ট্রেন রেলরোড, ইন্দোনেশিয়া (Argo Gede Train Railroad, Indonesia)
জার্কাতা থেকে বেনডাং তিন ঘণ্টা রেলরোডের যাত্রাপথে দেখা যাবে পাহাড়ঘেরা সবুজাভ কমনীয়তার আশ্চর্য মিলন। বিশেষত যখন নদী আর উপত্যকাকে পেছনে ফেলে ট্রেন এগিয়ে যায়। সে সময় হতবুদ্ধি হতে হয় যখন কিকরুটাগ নামক উঁচু সেতু থেকে দৃষ্টি পড়ে সবুজঘেরা শান্ত মাঠের দিকে। ২০০২ সালে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেখানে কেউ হতাহত হয়নি।
কারান্ডা সেনিক রেলওয়ে, অস্ট্রেলিয়া (Kuranda Scenic Railway, Australia)
রেলপথটিতে যাত্রাপথে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার অবারিত সুযোগ রয়েছে, যা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এখানকার আবহাওয়ার রূপ গ্রীষ্মমণ্ডলীয়। রয়েছে বৃষ্টিভেজা গভীর অরণ্য। এমনটা অবশ্য ১৮০০ সাল থেকেই। এই রেলপথে যাত্রাকালে পানির ছিটেফোঁটা অনেক সময় ট্রেনের ভেতরে এসে পড়ে। এই রেলপথটির অপর পারের অবস্থান ব্যারন জর্জ ন্যাশনাল পার্কে।
প্রকাশকাল: বন্ধন ৬২তম সংখ্যা, জুন ২০১৫