ধরুন, রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন- হঠাৎ চোখের সামনে একটা বিশাল হাঁস দাঁড়িয়ে! ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ওটা আসলে একটা বাড়ি। অথবা কল্পনা করুন, পাহাড়ের গায়ে বিশাল বিশাল পাথরের ফাঁকে গুঁজে বসানো একটা ঘর- যেন প্রকৃতিই তার দেয়াল বানিয়ে দিয়েছে। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এমন সব উদ্ভট আর চমকপ্রদ স্থাপত্য নিয়েই তৈরি হয়েছে Weird Buildings নামের একটি নতুন বই। লিখেছেন ইমোজেন ফোর্টেস, প্রকাশ করেছে হক্সটন মিনি প্রেস। চলুন, ঘুরে আসি পৃথিবীর সবচেয়ে অস্বাভাবিক কিছু বাড়ি থেকে।

নিউইয়র্কের সেই বিখ্যাত “হাঁস”
১৯৩১ সালে আমেরিকার লং আইল্যান্ডে বানানো হয় “দ্য বিগ ডাক” একটা বিশাল হাঁসের আকৃতির দোকান, যা মূলত হাঁসের মাংস আর ডিম বিক্রির জন্য। স্থপতি মার্টিন মাওরার, জর্জ রিভ আর কলিন্স ভাইদের এই সৃষ্টি এখন লং আইল্যান্ডের এক পরিচিত প্রতীক, আর স্থাপত্যের ইতিহাসে এটাকেই ধরা হয় “ডাক আর্কিটেকচার” নামের এক অদ্ভুত ধারার প্রথম উদাহরণ হিসেবে, যেখানে একটা ভবনের বাইরের আকৃতিই বলে দেয় ভেতরে কী বিক্রি হয়।

পাথরের ভাঁজে লুকানো বাড়ি: কাসা দো পেনেদো
“কাসা দো পেনেদো” মানে “পাথরের বাড়ি”। পর্তুগালের ফাফে শহরে ১৯৭৪ সালে স্থানীয় একটি পরিবার তৈরি করেন অদ্ভুত এ বাড়ি। যা চারটি বিশাল পাথরখণ্ডের মাঝখানে একেবারে গুঁজে বসানো। ছুটি কাটানোর জন্য বানানো এই বাড়িটি প্রকৃতির সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ই যেন নিজে থেকে একটা ঘর গড়ে তুলেছে। এখনো মালিকরা মাঝেমধ্যে এখানে বেড়াতে আসেন, আর সারা বছরই কৌতূহলী পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে।

আকাশে না উড়েও প্লেন-বাড়ি
লেবাননের মিজিয়ারা গ্রামে ১৯৭৫ সালে স্থপতি মাইকেল সুলাইমান তৈরি করেন এক অবাক করা বাড়ি-দেখতে হুবহু একটা এয়ারবাস A৩৮০ বিমানের মতো! দুই তলা এই বাড়িতে আছে দুই পাশে ৩০টি করে গোল জানালা (ঠিক প্লেনের মতো), দুই ডানায় বারান্দা, আর সামনে ছোট্ট একটা নাক-আকৃতির অংশ। প্লেনে না চড়েও যেন প্লেনের ভেতরে বাস করার অনুভূতি!

মরচে ধরা মহাকাশযান: স্টিল হাউজ
টেক্সাসের লেক র্যানসম ক্যানিয়নে একজন শিল্পী রবার্ট ব্রুনো নিজের হাতে বানাতে শুরু করেছিলেন এক ইস্পাতের বাড়ি—দেখতে অনেকটা মরচে ধরা স্পেসশিপের মতো। কিন্তু এই বাড়ি শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। প্রায় তিন দশক ধরে একা হাতে এই বাড়ি বানিয়ে যাওয়ার গল্পটাই এখন এটাকে করে তুলেছে এক অসমাপ্ত শিল্পকর্ম—যেন পৃথিবীতে ভুলে নেমে এসেছে একটা এলিয়েন যান।

ঝুড়ির আকৃতির অফিস: দ্য বাস্কেট বিল্ডিং
আমেরিকার ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৭ সালে তৈরি হয় লংঅ্যাবারগার কোম্পানির সাত তলা সদর দপ্তর। দেখতে হুবহু তাদেরই তৈরি জনপ্রিয় “মিডিয়াম মার্কেট বাস্কেট” ঝুড়ির ১৬০ গুণ বড় সংস্করণ। এটি নভেলটি বা “উদ্ভট” স্থাপত্যের অন্যতম বিখ্যাত উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। আর ঝুড়ির দুই হাতলে বসানো আছে বিশেষ হিটার, যাতে শীতে বরফ জমে না যায়।

পাহাড়ের কিনারায় ভাসমান “নৌকা”: কনিয়েচনির আর্ক
পোল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকা ব্রেনায় স্থপতি রবার্ট কনিয়েচনি নিজের জন্যই বানিয়েছেন এই আশ্চর্য বাড়ি। খাড়া পাহাড়ের ঢালে ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় পুরো বাড়িটাকে একটা সেতুর মতো করে ডিজাইন করা হয়েছে- মাত্র একটা কোণায় মাটি স্পর্শ করে, বাকিটা ঝুলে আছে ঢালের ওপর দিয়ে, যাতে বৃষ্টির পানি আর কাদা অনায়াসে নিচ দিয়ে বয়ে যেতে পারে। উল্টানো ছাদের নকশা আর ঢালু দেয়ালের কারণে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন একটা নৌকা মাঠের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে- এখান থেকে এর নাম “আর্ক”।

মাছের আকৃতির সরকারি দপ্তর
এটি এক ধরনের অনুকরণধর্মী স্থাপত্যের ক্লাসিক উদাহরণ যা একটি মাছের আকৃতিতে গড়া। আর এ আকৃতিতে ২০১২ সালে নির্মিত হয়েছে ভারতের হায়দরাবাদে ন্যাশনাল ফিশারিজ ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সদর দপ্তর। রাতে নীল-বেগুনি আলোয় পুরো ভবনটাকে দেখতে লাগে যেন শহরের বুকে সত্যিকার একটা মাছ সাঁতরে বেড়াচ্ছে।

চায়ের কেটলি আকৃতির পেট্রোল পাম্প
আমেরিকার ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত টিপট ডোম সার্ভিস স্টেশন—১৯২২ সালে বানানো, দেখতে হুবহু একটা বিশাল চায়ের কেটলি, যেটা একসময় দেশজুড়ে আলোচিত এক রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির (টিপট ডোম স্ক্যান্ডাল) দিকে ইঙ্গিত করেই বানানো হয়েছিল।

















