আকাশে উড়বে যে গাড়ি

আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশের অন্যতম দুবাই। বিশাল সব অট্টালিকা, চোখ ধাঁধানো মল, রেস্টুরেন্ট, বিনোদনকেন্দ্র ও বিলাসবহুল গাড়ির নগর হিসেবে দুবাই এত দিন পরিচিত হলেও সম্প্রতি সেখান থেকে এমন এক ঘোষণা এসেছে, যা সবার কাছেই এখনো ফ্যান্টাসি বা স্বপ্নের মতো। শুধু ঘোষণাই নয়, তারা আকাশে উড়তে সক্ষম প্রোটোটাইপ হোভার-ট্যাক্সি লঞ্চ করে চমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। কয়েক মাসের মধ্যে দুবাইয়ের আকাশে উড়তে যাচ্ছে ড্রাইভারবিহীন উড়ন্ত ট্যাক্সি ক্যাব, যা যেকোনো যাত্রীই ব্যবহার করতে পারবে। এ ঘোষণার পর মানুষের বহুদিনের আরাধ্য স্বপ্নই যেন সত্যি হতে চলেছে।

দুবাইয়ের আরটিএ (RTA-Roads and Transport Authority) চীনা ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইহান (Ehang)-এর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে। তারা প্রথমবারের মতো অটোনোমাস এরিয়াল ভেইকল (AAV)  নির্মাণ করছে, যার ব্র্যান্ড নাম Ehang 184. যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রকল্পটির ওপর নিবিড় পরীক্ষা চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে এই উড়ুক্কু গাড়িতে কেবল একজন যাত্রীই সওয়ার হতে পারবে। এ নিয়ে অবশ্য প্রিয়জনকে নিয়ে যাঁরা আকাশে উড়তে চান, তাঁদের জন্য বার্তাটি আনন্দের পাশাপাশি কিছুটা মন খারাপেরও।

Ehang 184 যানটির যাত্রী আসনে টাচস্ক্রিন সংযুক্ত, ফরম অব ডটসে আরও চোখে পড়ে ‘ম্যাপ অব অল ডেসটিনেশনস’। এ যানে ইগনিশান কির কোনো দরকারই পড়ে না। এটির রয়েছে প্রিসেট রুটস এবং যাত্রীটি অনায়াসে নির্বাচন করতে পারে, তার পছন্দসই গন্তব্যস্থল। এরপর উড়ন্ত যানটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত হয় তার অপারেশনগুলোÑ আকাশে ওড়া, নির্বাচিত গন্তব্যস্থলের দিকে যাত্রা করা এবং শেষমেশ নির্দিষ্ট করে দেওয়া গন্তব্যের স্পটে অবতরণ। এ ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এ অপারেশনের সবকিছু পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করে।

উড়ন্ত যানটিতে রয়েছে আটটি প্রধান প্রপেলার, যার যেকোনো একটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়লে বাকি সাতটি দিয়ে অনায়াসে কাজ চালানো যায়। যানটির ৩০ মিনিটের পথ পেরোতে দরকার পড়ে দুই ঘণ্টার রিচার্জ। এতে কিছু প্রোগ্রাম কোর্স সেট করে দেওয়া হয়েছে; যেমন ধরুন- এটির গতিসীমা ও উচ্চতা। এটির গতিসীমা ও উচ্চতা যথাক্রমে প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) এবং ৩০০ মিটার (১,০০০ ফুট)। এর উড্ডয়ন ও অবতরণের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৬ মিটার এবং ল্যান্ডের গতি প্রতি সেকেন্ডে ৪ মিটার।

RTA-এর সহযোগী হিসেবে ছিল দুবাই সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি যখন AAV-কে ট্রায়াল বা পরীক্ষার জন্য দাঁড় করানো হয়েছিল আর সে সময় Etisalat ছিল নেটওয়ার্ক প্রদানকারী। একটি AAV এবং ভূগর্ভস্থ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে থাকে 4G ডেটা নেটওয়ার্ক। AAV ঝড় ব্যতীত সব ধরনের আবহাওয়ায় তার সাবলীল বিচরণ অব্যাহত রাখে। RTA-এর মতে, এ যানটিতে রয়েছে উচ্চমাত্রার নির্ভূল সেন্সর, যার সঙ্গে যুক্ত থাকে হালকা-ভুলপূর্ণ থ্রেশহোল্ড, যা প্রতিরোধ করে ভাইব্রেশন আর প্রবল তাপমাত্রা।

পিপল

RTA-এর ডিরেক্টর জেনারেল ও সভাপতি মাত্তার আল তায়ির Ehang 184 যানটির অটোনোমাস প্রযুক্তিকে সামনে এগিয়ে নিতে ৪টি চ্যালেঞ্জকে জয় করার ইচ্ছের কথা বলেছিলেন। সেগুলো হচ্ছে-

১. ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যার সঙ্গে সংযুক্ত ম্যাপ আপডেটস, রোড মার্কিং, ট্রাফিক লাইটস;

২. ট্রাফিক আইনশৃঙ্খলা;

৩. নিরাপদপূর্ণ এবং ড্রাইভারহীন গাড়িতে জনগণের সর্বসম্মতি ও

৪. প্রযুক্তিময় চাহিদা।

এসব চ্যালেঞ্জ ছাড়াও আরও কিছু চ্যালেঞ্জ যেমন- দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এর গতিবিধি, অন্যান্য যানের সঙ্গে ড্রাইভারবিহীন যানের সংগতি রক্ষা, সামাজিক অবকাঠামোগতভাবে দুবাইয়ের জনগণের নতুন নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনেকটাই অনীহা।

উড়ন্ত গাড়িটি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটে প্রদর্শিত হয়। RTA-এর প্রধান আশা করছেন আসছে গ্রীষ্মে এটির সফল উড্ডয়নের। এখন আমাদের কেবল অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা কবে নাগাদ Ehang 184 উড়ুক্কু যানটির উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণ হাজির হয়। যদিও একজন বাঙালি হিসেবে সেই ক্ষণটির প্রতীক্ষা আমাদের জন্য আরও দীর্ঘ, তা অবশ্যিই হাড়ে হাড়ে টের পাই আমরা। তবে গ্লোবালাইজেশনের এ যুগে সে ক্ষণ খুব বেশি যে হবে না, এ আশাবাদ ব্যক্ত করা যায় সহজেই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮৭তম সংখ্যা, জুলাই ২০১৭।

জাবের রহমান
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top