ভূমিধসের কারণ কি?

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিধস (Landslide) অন্যতম। ভূমিধস বলতে পাহাড়-পর্বতের গা থেকে মাটির চাকা বা পাথরের খণ্ড বিরাট আকারে খসে নিচে পড়াকে বোঝায়। অনেক সময় পাহাড়ের ওপর থেকে পানি ও মাটি মিশে কাদা আকারে বিপুল পরিমাণে নিচে নেমে এলে তাকেও এক ধরনের ভূমিধস বলা হয়। বিশেষত, পাহাড়ি ও অসমতল অঞ্চল কিংবা সমতল অঞ্চলে, যেখানে সংবেদনশীল কাদামাটির পরিমাণ বেশি, সেসব অঞ্চলে ঘরবাড়ি বা স্থাপনা ভূমিধসের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিধসের প্রধান কারণ ঢালু স্থানের অস্থিতিশীল অবস্থা।

ভূমিধসের সঙ্গে অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে অতি বৃষ্টিপাত ও ভূমিকম্প ভূমিধস সৃষ্টির প্রধান দুটি কারণ। যদিও মনুষ্যসৃষ্ট ঘটনা যেমন দুর্বল বা ভুল প্রকৌশল কাজের ডিজাইন, মাটির নিচে পানির স্তরে তারতম্য, গাছপালা কেটে ফেলা বা আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে ভূমিক্ষয়, অগ্ন্যুৎপাত, পর্বতের চূড়ায় বরফ গলার ফলে মাটি নরম হওয়া ইত্যাদি কারণেও ভূমিধস সৃষ্টি হতে পারে। ভূমিধস সৃষ্টির কারণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া এবং ভূমিধসের সময় মাটির স্তরের স্থানচ্যুতি অনেক ধরনের হয়ে থাকে। প্রধানত ভূমিধসের ঘটনাকে Shallow Landslide ও Deep-seated Landslide এই দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত মাটির স্তরের স্থানচ্যুতির ঘটনাকে Shallow Landslie বলা হয়, অতিবৃষ্টিই যার প্রধান কারণ। Deep-seated Landslide-এর ক্ষেত্রে মাটির স্তর পাঁচ মিটারের চেয়েও পুরু অংশজুড়ে আক্রান্ত হয় এবং অনেকটা বিশাল অঞ্চলের স্থানচ্যুতি ঘটে। সাধারণত বড় ধরনের ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এ রকম ঘটনার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে Shallow Landslide-এর ঘটনা বেশি ঘটে। ভূমিধসের সময় বড় বড় শিলা বা মাটির স্তরের স্থানচ্যুতির চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে যেসব ভাগে ভাগ করা হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অতি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্লাইড (Slide)। এ ধরনের ক্ষেত্রে শিলাখণ্ড বা মাটির বড় বড় অংশ ঢালু স্থানের ওপর দিয়ে ছিটকে বা উপড়ে পড়ে না, শুধু বড় অংশজুড়ে ঢালু স্থান বরাবর স্থানচ্যুতি ঘটে। এ ধরনের ভূমিধসকে জ্যামিতিক নকশায় প্রকাশ করা যায়, প্রায়ই মোর-কুলম্ব সূত্র দ্বারা এটি ব্যাখ্যা করা হয়।

  • Rotational Slide: এ ধরনের স্লাইডিংকে ‘King of slides’ বলা হয়। যখন শিলা বা মাটির স্তরের স্থানচ্যুতি চিত্রের মতো অর্ধবৃত্তাকার পথে ঘটে।
  • Translation Slide: এ ক্ষেত্রে শিলা বা মাটির স্তর উঁচু-নিচু ভঙ্গুর স্থানের ঢাল বরাবর অনেকটা বড় অঞ্চলজুড়ে স্থানচ্যুত হয়। শিলাস্তরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিচ্যুতি ঘটে।
  • Planner and Block Slide: সাধারণত যখন কোনো বড় শিলাব্লক সমতল ঢাল বরাবর স্থানচ্যুত হয়।

ভূমিধস ভূমিক্ষয়ের একটা বড় কারণ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী অবক্ষয়, যা বছরে প্রায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০০০ টনও ছাড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকায় এটা বহুল প্রচলিত ঘটনা। এই অঞ্চলের ভূমিধস ঘটনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভূমিধস ঘটনার লিখিত নথিপত্র তেমনটি পাওয়া না গেলেও স্থানীয় বসবাসকারী লোকজনের জন্য এটা একটা স্থায়ী দুর্ভোগ। বিশেষ করে প্রতিবছরই বর্ষাকালে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট উভয় কারণেই পাহাড়ি অঞ্চলের ঢালে ভূমিধস ঘটে। বাংলাদেশ ঘন বসতিপূর্ণ দেশ হলেও জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে পাহাড়ি অঞ্চল একেবারে বিপরীত হওয়ার পেছনে বড় কারণ এই ভূমিধস, যা সেখানে বসবাস করতে অথবা অবকাঠামো গড়ে তুলতে নিরুৎসাহিত করে। এ ছাড়া গভীর অরণ্য এবং ঢালু অঞ্চলের বন্ধুর ভূ-প্রকৃতিও এর জন্য দায়ী। ভূমিধসের কারণে সবচেয়ে বড় যে সমস্যা সৃষ্টি হয় তা হলো সড়ক প্রতিবন্ধকতা। পার্বত্য জেলাগুলোতে এটা প্রতিনিয়তই ঘটছে। শহরকে যুক্তকারী প্রধান সড়কসমূহ প্রায় প্রতিবছর ভূমিধসের মুখোমুখি হচ্ছে, যা শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বহু ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো, বিশেষ করে খাড়া উঁচু ঢালের ওপর যেগুলো বিদ্যমান, সেগুলো ভূমিধসের কারণে ধসে পড়ে জানমালের ক্ষতি সাধন করে। বর্ষাকালে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের কারণে জানমালের ক্ষয়-ক্ষতির ঘটনা অসংখ্য। বাংলাদেশে স্মরণকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন, চট্টগ্রামে বৃষ্টিজনিত ভূমিধসে অন্তত ১২২ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রবল বর্ষণের ফলে পাহাড় থেকে মাটি ও কাদার ঢল পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বস্তি ও কাঁচা ঘরবাড়ির ওপর ধসে পড়লে বহু মানুষ চাপা পড়ে যায় এবং অনেকে নিখোঁজ হয়। বেশ কিছুদিন ধরে চলা টানা বর্ষণ এই ঘটনার মূল কারণ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাটহাজারীতে, যেখানে তিনটি পরিবার চার মিটার মাটির নিচে চাপা পড়ে। দোকানপাট, বিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ভয়াবহতম ভূমিধস। চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ, যা শহরের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ, তিন থেকে চার ফুট পানিতে আটকা পড়ে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয় এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানির ৯০ শতাংশ যে বন্দর থেকে আসে, সেই চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর বন্ধ হয়ে যায়। ১২ জুন ২০০৭ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৬৯৭ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

ভূমিধসের প্রকার, কারণ ও প্রকৃতি

বাংলাদেশে ভূমিধস সংঘটনের অতি পরিচিত প্রকৃতি ও প্রক্রিয়াদিসমূহ

১. পার্শ্বিক সহায়তা (Support) অপসারণ, যার মধ্যে রয়েছে-

  • পাহাড়ি নদী কর্তৃক পার্শ্বক্ষয়
  • পূর্ববতী ঢাল বিচলন, যেমন স্খলন (slum), যা নতুন ঢালের সৃষ্টি করে
  • মানুষ কর্তৃক ঢালের পরিবর্তন, যেমন পাহাড় কাটা, গর্ত করা বা খাল খনন ইত্যাদি।

২. ঢালে ওজন বৃদ্ধি, যার মধ্যে রয়েছে-

  • বৃষ্টির পানি জমা
  • গাছপালার বৃদ্ধি
  • কৃত্রিমভাবে শিলা বা গণ্ডশিলা নির্মাণ
  • ভবনাদি ও অন্যান্য কাঠামোর ভর
  • ছিদ্রযুক্ত পাইপ লাইন, পয়ঃপ্রণালী, খাল ও জলাধারের নিঃসরিত পানির ওজন;

৩. মাঝারি থেকে শক্তিশালী তীব্রতার ভূমিকম্প;

৪. ভূ-অভ্যন্তরস্থ প্রচণ্ড শক্তির কারণে পাহাড়সমূহের আঞ্চলিকভাবে একদিকে কাত হওয়া;

৫. ভূনিম্নস্থ সমর্থনের (underlying support) অপসারণ, যার মধ্যে রয়েছে-

  • উজানভাগের পাহাড়ি নদীর স্রোতের দ্বারা নদী খাতের ক্ষয় এবং নদী ও তরঙ্গের দ্বারা কর্তন
  • কর্দমশিলার স্ফীতি

৬. জুমচাষ।

প্রতিরোধ

ভূমিধস প্রতিরোধের প্রচলিত প্রকৌশল পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ভূ-পৃষ্ঠস্থ ও অন্তর্ভুক্ত পৃষ্ঠস্থ নিষ্কাশন, অসংহত ঢাল পদার্থ অপসারণ, ধারক প্রাচীর নির্মাণ অথবা এসবের একত্র সমাবেশ। এসব পদ্ধতির অনেক এখন বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস প্রতিরোধে কার্যকরী হচ্ছে সমন্বিত জীব প্রকৌশল ও পয়োনিয়ন্ত্রণ। পাহাড়ের ঢাল বেশ খাড়া, এ রকম খাড়া পাহাড়ের ঢাল সুস্থিত করতে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন। যেমন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বীজ ছিটিয়ে, জিও-জুট টেক্সটাইল দিয়ে এলাকাটি ঢেকে দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বাঁশের বল্লি পুঁতে ওই জিও-জুট টেক্সটাইলকে আরও সুদৃঢ় করা যেতে পারে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর পর্যবেক্ষণ (Monitoring) ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ভূমিধসের ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষজনের সচেতনতা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কার্যকরী ভূমিকা।

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া

প্রকাশকাল: বন্ধন ৬১তম সংখ্যা, মে ২০১৫

রামকৃষ্ণ মজুমদার
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top