ম্যাটেরিয়ালস যখন অন্দরসজ্জার অনুষঙ্গ 

ইন্টেরিয়র ডিজাইন বা অন্দরসাজ বলতে সাধারণত আমরা বুঝি একটি স্বপ্নের মতো সাজানো-গোছানো বাড়ি। একটি বাড়িকে নান্দনিকভাবে সাজাতে নতুন নতুন নকশার খোঁজে আমরা যাই দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের কাছে। একটি সুন্দর অন্দরসজ্জার মূল অংশ হলো নানা ধরনের ম্যাটেরিয়ালস আর এর সঠিক উপস্থাপন। ম্যাটেরিয়ালস শুধু কিনলেই হলো না, ম্যাটেরিয়ালসের সঠিক ব্যবহার এবং কাজের ফিনিশিং নিপুণ না হলে বসবাসরত বাড়িটি আপনার কাছে বিরক্তির কারণও হয়ে উঠতে পারে। তাই নিজের স্বপ্নের আবাসনকে সাজানোর আগে জেনে নিন অন্দরসজ্জার ম্যাটেরিয়ালস সম্পর্কে।

আধুনিক জীবনে ইন্টেরিয়র নতুন এক সংযোজন। সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সবাই চায় তার স্বপ্নের অন্দরটি সুন্দরভাবে সাজাতে। অন্দরসজ্জার প্ল্যানিংয়ে একজন দক্ষ ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের প্রধান কাজ হলো ম্যাটেরিয়াল সিলেকশন। আর এই সিলেকশনের সময় স্থায়িত্ব, বাজেট, আরাম, নিরাপত্তা, নমনীয়তা, স্থিতিস্থাপকতা মতন বিষয়ের দিকে মনোযোগ রাখতে হয়। ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ব্যবহৃত অসংখ্যা ম্যাটেরিয়ালসের মধ্যে বেসিক কিছু ম্যাটেরিয়াসল প্রসঙ্গ এবারের আলোচ্য।

প্রাথমিক পর্যায়ে একটি নির্মিত স্থানকে সজ্জিত করতে আমাদের প্রয়োজন হয় হরেক রকমের টাইলস, মার্বেল, গ্রানাইট, ওয়ালপেপার, সিলিং, প্যানেলিং, পাথর কাঠ, গøাস, মেটাল, হার্ডওয়্যার, বোর্ড, লাইট প্রভৃতি। এই ম্যাটেরিয়াল সিলেকশনে গিয়ে একজন মানুষ মূলত খোঁজে পেশাদার একজন ডিজাইনারকে। এর কিছু যৌক্তিক কারণ অবশ্যই আছে। বেশির ভাগ সময়েই ব্যক্তির রুচিবোধ আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়ে বেশ কিছু ভুল সিদ্ধান্তে অর্থের অনিষ্ট ঘটে। কেননা কোন ম্যাটেরিয়ালসের ব্যবহার কোথায় হবে, এই টেকনিক্যাল বিষয়ে যাঁদের জ্ঞান আছে এবং যারা দক্ষ কেবলমাত্র তাঁরাই তা ভালো বলতে পারবে। বাজারে আমদানি করা ম্যাটেরিয়ালস অনেক সময় সহজলভ্য আবার কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় ম্যাটেরিয়ালস সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, প্রয়োজন শুধু সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনার।

টাইলস নির্বাচন

একটি গৃহের অন্দরসজ্জার অনেকটাই নির্ভর করে সুন্দর ও টেকসই টাইলস নির্বাচনে। টাইলসের ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের টেকসই রং ও সাইজ দেখে নির্বাচন করা উচিত। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো এগোচ্ছে। এক দশক আগেও দেশের টাইলসের বাজার ছিল আমদানি-নির্ভর। ভবনের মেঝে থেকে শুরু করে বাইরের অংশের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, ঘরের কোনো এক দেয়ালকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে টাইলসের ব্যবহার এখন চোখে পড়ার মতন।

দেশে টাইলসের সবচেয়ে বড় বাজার ঢাকার হাতিরপুলে। সেখানে ছোট বড় কয়েক শ দোকানে খুচরা ও পাইকারি টাইলস বিক্রি হয়। এ ছাড়া মিরপুর, উত্তরা, গ্রিনরোড, যাত্রাবাড়ী, কুড়িল, বিশ্বরোড ও রামপুরা এলাকায় টাইলসের বাজার রয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও পরিবেশকের মাধ্যমে টাইলস বিক্রি হয়। টাইলস বিক্রি হয় প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ২৫০ টাকায় যা মূলত দেয়াল ও মেঝের টাইলস। তবে আমদানি করা টাইলস বিক্রি হয় প্রতি বর্গফুট ১৮০ থেকে ৪৫০ টাকায়। এর মধ্যে স্পেন বা ইতালি থেকে আমদানি করা টাইলসের দাম কিছুটা বেশি। তবে অত্যন্ত এক্সক্লুসিভ টাইলস আছে, যার দাম ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা প্রতি বর্গফুটে যা সাধারণত স্পেন কিংবা ইতালি থেকে আমদানিকৃত।

কাঠ নির্বাচন

স্বর্গরূপী ঘরকে সাজিয়ে তোলার জন্য আমরা নানা ধরনের প্রযুক্তি ও ম্যাটেরিয়ালের শরণাপন্ন হই। কাঠ এর মধ্যে বহুল প্রচলিত ও অন্যতম এক উপাদান। সাধারণত বাসার আসবাব, কেবিনেট, মেঝে, দরজা, প্যানেলিং, পার্টিশন বিভিন্ন কাজে কাঠের রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার।

কাঠের মেঝে

কাঠের মেঝে সাধারণত সলিড কাঠ ও কাঠের টেক্সচার দেওয়া টাইলস-এই দুই ধরনের হয়। কাঠের মেঝে তৈরির জন্য কাঠ সাধারণত বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়। জার্মানির ওক কাঠের ব্যবহার খুব বেশি। এ ছাড়া বাংলাদেশের কেরোসিন, সেগুন ও মেহগনিগাছের কাঠ দিয়ে কাঠের মেঝে তৈরি করা যায়। তবে সেগুন ও মেহগনি দিয়ে কাঠের মেঝে তৈরি করা বেশ ব্যয়সাপেক্ষ। বাজারে ২০ ও ১৪ মি.মি. পুরু দুই ধরনের কাঠের মেঝে বিক্রি করা হয়। ব্যতিক্রমভেদে যার দাম পড়ে প্রতি বর্গফুট ১৪০ থেকে ৪০০ টাকা। যেমন: স্ট্যান্ডার্ড সাইজ ১৫-১২ ফুটের একটি রুমের মেঝে কাঠ দিয়ে করতে খরচ পড়বে ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো। দেশের প্রায় প্রতিটি ইন্টেরিয়র হাউস ও কিছুসংখ্যাক পিভিসি সরঞ্জাম বিক্রির দোকানে কাঠের মেঝে পাওয়া যায়। ব্যয়সাপেক্ষ বলে অনেকের পক্ষে এটা বানানো সম্ভব হয় না। তাঁরা চাইলে কাঠের টেক্সার দেওয়া পিভিসি মেঝে ব্যবহার করতে পারে। বাজারে মালয়েশিয়া, চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা এসব পিভিসি ফ্লোর খুবই সহজলভ্য। যার দাম পড়বে ব্যতিক্রমভেদে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার মতো। এ ছাড়া আমদানি করা কাঠের ডিজাইনের টাইলসও ব্যবহার করা যেতে পারে। যার দাম পড়বে ১৮০ থেকে ২৮০ টাকা।

কাঠের আসবাব

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ বসতবাড়ির খুঁটি, কড়ি, বরগা, চৌকাঠ, দরজা, জানালা, দেয়াল, আসবাব ইত্যাদি কাঠ দিয়ে তৈরি করছে। আমাদের দেশে সাধারণত যেসব কাঠ ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে মেহগনি, বার্মাটিক, কাঁঠাল, চিটাগং সেগুন, চিটাগং শীলকড়ই, গামারি, শাল, গর্জন, টিক চ্যাম্বল  উন্নত মানের। কাঠ খুব সহজলভ্য, পুনর্বিক্রয়মূল্য, অধিক কাজে ব্যবহারযোগ্য, শব্দ নিয়ন্ত্রক, লোহার প্লেট লাগিয়ে একে বেশ শক্তপোক্ত করা যায়। এসব সুবিধার জন্য কাঠের ব্যবহার অধিক।

ঘরের আসবাব বা সুন্দর ফার্নিচার তৈরিতে মূলত মেহগনি, বার্মাটিক, কড়ই, চিটাগং সেগুন, কাঁঠাল, চ্যাম্বল কাঠ ব্যবহৃত হয়। ঘরের দরজার চৌকাঠ তৈরিতে সাধারণত মেহগনি, শিলকড়ই, টিক চ্যাম্বল, কড়ই, জাম, গজারি কাঠ ব্যবহৃত হয়। দরজার পাল্লার কাজে শাল, সেগুন, আকাশি, গামারি কাঠ ব্যবহৃত হয়। নির্মাণকাজে সাটারিং তৈরিতে মূলত কম দামি কাঠ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কাঠের রং, আঁশ, গন্ধ, ফাটল, ওজন ইত্যাদি বাহ্যিকভাবে ভালোভাবে দেখে ভালো কাঠ চিহিৃত করা হয়। কাঠের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য কাঠে সাধারণত পেইন্ট, বিটুমিন, প্রলেপ, ভার্নিশ, তেল, ক্রিয়োজট যথাযথভাবে লাগানো হয়। তা ছাড়া জার্মানি ও আমেরিকা থেকে আমদানি করা রেড ওক কিংবা বিচ কাঠ দিয়ে অত্যাধুনিক ডিজাইনের আসবাব বানাচ্ছে দেশের নামকরা ফার্নিচার হাউসগুলো। মালয়েশিয়ান ওক কাঠও ব্যবহার করা হচ্ছে আসবাব তৈরির ক্ষেত্রে। ঢাকার মিরপুরের স্টেডিয়াম মার্কেট, পান্থপথ, গুলশান, মিরপুর, ভাটারা, শাহজাহানপুর, সাঁতারকুল এসব জায়গায় আসবাবের অসংখ্যা দোকান আছে। এ ছাড়া নামকরা ব্র্যান্ডের ফার্নিচার হাউস আছে শহরজুড়ে।

বর্তমানে বার্মাটিকের প্রতি ঘনফুটের দাম ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। চিটাগং সেগুনের দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। আর মধুপুর ও যশোরের সেগুন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। একসেট ৬ সিটের ডাইনিং টেবিল সেগুন কাঠ দিয়ে করলে তার দাম পড়বে প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা কিন্তু ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায় দেখতে একই রকম কিন্তু নিম্নমানের কাঠের তৈরি ফার্নিচারও তৈরি করা যাবে। গামারি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা প্রতি ঘনফুট। আর মেহগনির দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা।

আমাদের দেশে কেরোসিন কাঠের অনেক আসবাব তৈরি হয়। পাইন-ট্রিক আমাদের দেশে কেরোসিন কাঠ নামে পরিচিত। মালয়েশিয়ান ওক উড দিয়ে আসবাব বানানো হয়। এসব কাঠ দেখতে সুন্দর ও পলিশ ছাড়াও ব্যবহারের উপযোগী।

প্রসেস উড বা বোর্ড

কাঠের বিকল্প হিসেবে প্রসেস উডও বেশ কাজের। এই প্রসেস উডের মাঝে আছে পার্টিক্যাল বোর্ড। প্লাই উড, ভিনিয়ার বোর্ড, এমডিএফ বোর্ড ইত্যাদি। এসব বোর্ড সাধারণত কাঠের গুঁড়ার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডহেসিডের মিশ্রণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট চাপ ও তাপের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। আমাদের দেশে এই প্রসেস উডের ফার্নিচার বেশ চলছে। প্রসেস উডের সুবিধা হলো ঘুণে ধরে না। এ ছাড়া কাঠ ও প্লাস্টিকের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে ডব্লিউপিসি বোর্ড। এর মধ্যে রয়েছে ৭০ শতাংশ কাঠ ও ৩০ শতাংশ প্লাস্টিক। এ ছাড়া রয়েছে বার্মাটিক, সেগুন, কমার্শিয়াল, গর্জন, মেহগনি, মেলায়েশইল, পিভিসি ইত্যাদি বোর্ড। এসব বোর্ডের ওপরে কাঠের টেক্সারের মতো শিট বসানো হয়। যাকে পলিশ করা যায়। ফরমিকা বা শিট পেস্ট করে নতুনত্ব আনা হচ্ছে ফার্নিচার তৈরিতে। সাধারণত এসব বোর্ড ৮ ফুট বাই ৪ ফুট হয়।  ১২, ১৬, ১৮ ও ২৫ মি.মি. পুরুত্বের হয়ে থাকে মেলামাইন বোর্ডগুলো। ১২, ১৮ ও ২৫ মি. মি. হয়ে থাকে ভিনিয়ার বোর্ড। ১৮ মি. মি. পুরু হয়ে থাকে অ্যাক্রেলিক বোর্ড। ৬, ৮, ১০, ১২ মি.মি. হয়ে থাকে প্লাই বোর্ডগুলো। এ বোর্ডগুলো পিস হিসেবে কাটা থাকে। এগুলোর দাম ৮০০ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। প্রতি বর্গফুট হিসেবে মজুরি ও বোর্ডের দাম ধরা হয। ডিজাইন অনুযায়ী দামের তারতম্য হতে পারে।

জিপসাম বোর্ড

অন্দরে বিভিন্ন নকশা করতে আগে কাঠ বা চুন-সুরকির ব্যবহার করতে হতো। এখন জিপসাম ব্যবহার করা হচ্ছে এসব ক্ষেত্রে। জিপসাম আগে টুকরো আকারে আসত। এখন এটা ছাঁচের ভেতর ফেলে যেকোনো নকশা তৈরি করা যায়। এটি দীর্ঘস্থায়ী ও স্বল্পমূল্যে কাজ করা যায় বলে এর ব্যবহার এখন বেড়েছে। এটি এমনকি পানি ও আগুন প্রতিরোধীও। ঢাকার পশ্চিম হাজীপাড়া, রামপুরা, কারওয়ান বাজার, বাড্ডা, মহাখালী এলাকায় এসবের দোকান আছে। এগুলো প্রতি বর্গফুট ১৫০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত।

হার্ডওয়্যার

অন্দরসজ্জার কাজের সঙ্গে হার্ডওয়্যারসামগ্রীর ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে হার্ডওয়্যারসামগ্রীতেও। যেকোনো ফার্নিচার তৈরি করার পর তাকে পরিপূর্ণ রূপদান ও ব্যবহারের উপযোগী করতে হার্ডওয়্যারসামগ্রী ব্যবহার অপরিহার্য। যেমন- কবজা, হ্যান্ডেল, সিটকিনি, কল, লক, স্ক্রু, তারকাঁটা, চ্যানেল, পাইপ, স্কেল, করাত, বাটালি প্রভৃতি।

ফার্নিচারের জন্য প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যারসামগ্রী দেশের প্রায় সব দোকানেই পাওয়া যায়। তবে অন্দরসজ্জার কাজ সুপরিকল্পিত, আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় এই কাজে ব্যবহার হওয়া হার্ডওয়্যারসামগ্রীও হতে হয় দৃষ্টিনন্দন। ঢাকা শহরসহ দেশের প্রায় সব শহরেই হার্ডওয়্যারসামগ্রী পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, বাড্ডা, পল্টন, কুড়িল প্রভৃতি স্থানে হার্ডওয়্যারসামগ্রী পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হার্ডওয়্যারসামগ্রীর মার্কেট কারওয়ান বাজারে।

নান্দনিক সিলিং

একটি ঘরের প্রতিটি অংশই হওয়া চাই নজরকাড়া। তাই এই আধুনিক ঘরের সাজসজ্জার সঙ্গে ছাদটি সুন্দরভাবে মানিয়ে নেওয়া জরুরি। মানানসই ছাদ যেমন বাড়িয়ে দিতে পারে ঘরের সৌন্দর্য, তেমনি বেমানান ছাদ মুহূর্তেই সব পরিশ্রম বৃথা করতে পারে। শুধু মাঝখানে না লাগিয়ে ঘরের চারদিকেও লাগাতে পারেন কৃত্রিম ছাদ। প্রতিটি রুমেই থাকতে পারে কৃত্রিম ছাদ। ফলস সিলিং হতে পারে কাঠ, জিপসাম, বোর্ড, সিএনসি কাটিং বোর্ড বা মেটালের। অফিসের ছাদ সজ্জায় সাধারণত জিপসাম ব্যবহার করা হয়। ঘরের ছাদে থাকতে পারে কাঠ বা পারটেক্সের ব্যবহার। এর সঙ্গে কাচ বা বেতের ডিজাইন বা সিএনসি বোর্ড এনে দিতে পারে নতুনত্ব। কৃত্রিম ছাদকে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তুলতে আলোকসজ্জার কোনো বিকল্প নেই। ফলস সিলিংয়ের খাজে বাহারি লাইট দিয়ে ঘরকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। হিডেন লাইট, স্পট লাইট, টিউব লাইট, ফলস লাইট, নকশা করা এই ফলসগুলো ছাদে আনে জৌলুশ। বিভিন্ন আঙ্গিকের এসব লাইট আলো আঁধারীর মাধ্যমে ঘরের আনে নাটকীয়তা। কয়েক রঙা আলো ঘরে আনতে পারে মায়াবী পরিবেশ। ঘরের মেঝেতে যদি মিরর পলিশড/রিফ্লেকটিং টাইলস থাকে, তবে আলো-আঁধারের এই খেলা আরও জমবে। ম্যাটেরিয়ালের তারতম্য ও ডিজাইন অনুযায়ী এর দামও বিভিন্ন রকমের হয়। জিপসামের সিলিং ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা প্রতি বর্গফুট। বোর্ডের হলে ৪৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে প্রতি বর্গফুট। ঢাকার সব ইন্টেরিয়র হাউস বোর্ডের দোকানগুলো ও ডিজাইনাররা ফলস সিলিংয়ের কাজ করে থাকে।

ওয়াল পেপার/ওয়াল স্টিকার

স্বল্প শিল্পবোধ আর কিছু কৌশল প্রয়োগ করলেই নিজের গৃহটি হয়ে উঠতে পারে নান্দনিক। ঘরের দেয়ালে বা সিলিংয়ে মানানসই রং দিয়ে অনেকটাই নতুনত্ব আনা যায়। যেকোনো জায়গাকে করা যায় হাইলাইটেড। কিছু টাইলস হুট করে রঙের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটা আনতে পারে না। এটা সময়সাপেক্ষ একটা ব্যাপার। আর খরচটাও এ ক্ষেত্রে কম নয়। আধুনিক এই সময়ে রঙিন/নকশাময় একটা ওয়ালপেপার চট করেই বদলে দিতে পারে আপনার অন্দরমহলকে। দেয়াল অনুযায়ী সাধারণত দেয়ালের লুকে ভিন্নতা আনতে ওয়ালপেপার ব্যবহার করা হয়। ওয়ালপেপারের রং ও নকশা নির্ভর করে রুমের ডেকোরেশন, পুরো দেয়ালের রং, যে রুমটি ব্যবহার করবে তার বয়স ও রুচি অনুযায়ী। রুমের সর্বত্র কখনোই এক রকমভাবে বা ঢালাওভাবে ওয়ালপেপার লাগানো উচিত নয়। পুরো রুমটির রং খুব হালকা, সাদা বা বেইজ কালার রেখে যেকোনো একটা ওয়ালকে ফোকাস করার জন্য ওয়ালপেপার দিলে ভালো লাগে। যেমন লিভিং রুমে যখন ওয়ালপেপার লাগাব অবশ্যই তা যেন সোফা ও পর্দার সঙ্গে ম্যাচ করে তা খেয়াল রাখতে হবে। বেডরুমের ক্ষেত্রে বেডের মাথার দিকটায় হাইলাইট করতে ওয়ালপেপার দেওয়া যায়। ডিজাইন ওয়ালপেপারে সাধারণত যে ডিজাইনগুলো করা হয়, সেগুলোকে বলা হয় সারফেইজ প্রিন্টিং, গ্রাভিওর প্রিন্টিং সিল্ক, সিল্ক প্রিন্টিং, বোটানি প্রিন্টিং ও ডিজিটাল প্রিন্টিং। আমাদের দেশে বিভিন্ন সাইজের ওয়ালপেপার পাওয়া যায়। সাধারণত ৫৭ বর্গফুট ও ৭৫ বর্গফুটের পেঁচানো/রোল করা অবস্থায় ওয়ালপেপারগুলো বিক্রি হয়। পানি দিয়ে এসব ওয়ালপেপার ধোয়া যায়, তবে বেশি ঘষাঘষি না করাই ভাল। এসব রোল আমদানি করা ১ হাজার ৪০০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ওয়ালপেপার বসানোর জন্য প্রতি রোল ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ র্ক হয়। বনানী চেয়ারম্যানবাড়ী রোডের অনেক দোকানে এগুলো কিনতে পাওয়া যায়।

ওয়াল স্টিকারও অনন্য এক মাত্রা সংযোজন করেছে অন্দরসজ্জার অভিনবত্বে। খুব কম খরচে আমদানি করা এই স্টিকারগুলো অন্দরের দেয়ালকে করছে মোহিত ও সৃষ্টি করছে চাঞ্চল্য। এগুলো হয়ে থাকে বিভিন্ন ডিজাইনের। সাধারণত, অনলাইন শপগুলোতে অর্ডারের পাশাপাশি কিছু দোকানেও এগুলো সরবরাহ করে। ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে অসংখ্যা ডিজাইনের এ ধরনের সব স্টিকার পাওয়া যায়।

অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল

আধুনিক ভিউ আর সুরক্ষার জন্য বিল্ডিংয়ের এক্সিটের বিষয়ে অঈচ/অষপড় প্যানেল ব্যবহারের বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এর জনপ্রিয়তা এ দেশেও বাড়ছে। ১০০ শতাংশ মরিচা প্রতিরোধী হওয়ার ক্রমেই মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এই শিট কেবিনেটের জন্য বোর্ডের ওপর ব্যবহার করা হচ্ছে। যা ২-১ মি.মি. পুরুত্বের হয়ে থাকে। বিভিন্ন রং ও ডিজাইনের পাওয়া যাচ্ছে। অঁষধহফ, উঅখপফ, গধৎরহড়, ঘধযবব, গধীনড়হফ ইত্যাদি কোম্পানির শিট সহজলভ্য।

থ্রিডি প্যানেলিং

থ্রিডি সজ্জাসংক্রান্ত প্রাচীর প্যানেল যেকোনো আবাসিক বা বাণিজ্যিক প্রাচীর সজ্জা আলাদা একটি অনুভূতি ও সৌন্দর্য যোগ করতে পারে। এগুলো আমদানি করা হয় চীন থেকে। শিট ও কাঠের তৈরি টুকরো আকারে বাজারে পাওয়া যায়। থ্রিডি পানিরোধক কাঠ বৈশিষ্ট্য, প্রাচীর প্রকৃতি কাঠ দ্বারা তৈরি বøক বা প্লটস দ্বারা কাঠের তৈরি এসব প্যানেল খুব সহজে ভার্নিশ করে। গøু দিয়ে দেয়ালে পেস্ট করা হয়। এগুলো ৫ থেকে ৩৫ মি.মি. ঘনত্বের হয়ে থাকে। এগুলো প্রতি বর্গফুট ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আরেক প্রকার প্যানেল আছে, যা উদ্ভিদ ফাইবার থেকে প্রস্তুত। এগুলো পিস হিসাবে ৩০০🞨৩০০, ৫০০🞨৫০০, ৬০০🞨৮২৫ মি.মি. হয়ে থাকে। সহজ ও ফ্যাশনেবল ডিজাইনের অফহোয়াইট রঙের হয়। ওয়াল কাটিং বøকগুলো প্রাচীরে স্থাপনের পর যেকোনো এনামেল/প্লাস্টিক পেইন্ট করে ভিন্নতা আনা যায়। সাধারণত এগুলো চীন থেকে আমদানি করা হচ্ছে। এগুলো পানি নিরোধক, আর্দ্রতা নিরোধক, আগুন নিরোধক ও খুবই টেকসই। ডিজাইনভেদে সাধারণত প্রতি বর্গফুট ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে ইনস্টলেশন ও রঙের মজুরিও দিতে হবে। বনানী চেয়ারম্যানবাড়ীর অনেক ইন্টেরিয়র হাউসে এগুলো পাওয়া যায়।

দেয়ালের রং

দেয়ালের রং অন্দরমহলের সরাসরি বহিঃপ্রকাশ যা একজন মানুষের রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটায়। কারণ, রুমের কালার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার যা নিজের মনের ওপর প্রভাব ফেলে প্রতিনিয়ত। এই রং প্রভাব ফেলতে পারে মন-মেজাজ বা চিন্তা-চেতনায়, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাই কালার পছন্দ করতে হবে। সব সময় ট্রেন্ডকে মাথায় রেখে রং বাছাই না করলেও চলবে। কারণ, ট্রেন্ড আসবে এবং যাবে। ব্যক্তির পছন্দ ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী রং বেছে নিলে তা কার্যকরী হবে বেশি। এই রং মানসিকভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে। তাই রং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। ব্যক্তির পছন্দ, চাহিদা ও রুমের উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে রং বাছাই করতে হবে। যেমন: হালকা কালারগুলো অনেক বেশি বিস্তৃত ও শান্তিময় অনুভূতি দেয়। আবার বড় পরিসরে যদি গাঢ় কালার ব্যবহার করা যায়, তা দিতে পারে প্রগাঢ় অনুভূতি, এনে দিতে পারে উষ্ণতা মনের ভেতর। বার্জার, রক্সি, এশিয়ান ইত্যাদি কোম্পানি অনেক ধরনের রং সরবরাহ করে আসছে। প্রতিটি ইন্টেরিয়র হাউস বা রং বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে রঙের এক্সপার্ট থাকেন এবং ডিজাইনেবল প্যাটার্ন বা ছাচগুলো তাদের অভিজ্ঞ লোক দিয়ে কাজ করিয়ে থাকে।

বার্জারের ১৮.২ লিটার বালতিভর্তি প্লাস্টিক ইমালশন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬৫০ টাকা, এনামেল পেইন্ট প্রতি গ্যালন বিক্রি হচ্ছে ৯৬০ টাকা। অপর দিকে ১৮.২ লিটারের বালতিভর্তি ডিসটেম্পার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫৫০ টাকা। একই পরিমাণে জয়দারকেশ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। একই পরিমাপের ওয়াটার মিলার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮৫০ টাকা। ২০ কেজি ডিত্তরোসাম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা। এশিয়ান অনুরূপ ওজনের রং যথাক্রমে বিক্রি করছে ৩৩৫০, ২৬৫০, ৬৮০, ১৪৫৮, ৪৪০০, ২৮০০ ও ১১৫০ টাকায়। আরএকে বিক্রি করছে ৩০০০, ৯৫০, ৪২০০, ২৬০০ ও ১২০০ টাকায়। স্থান ও সময়ভেদে দামের তারতম্য হতে পারে। এ ছাড়া বাংলাদেশে আছে রক্সি পেইন্টস, অ্যাকুয়া পেইন্টস, নাভানা পেইন্টস, এফএমসি পেইন্টস, এলিট পেইন্ট, রোমানা পেইন্ট, উজালা পেইন্টস, এলাইট পেইন্ট ইত্যাদি। দেয়ালে রং করানোর সময় ডিজাইন অনুযায়ী এর মজুরি ৩৩-২০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

মার্বেল ও গ্রানাইট

মেঝে ও দেয়াল, কিচেন কাউন্টার সবখানে মার্বেল ও টাইলস ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে এগুলো আমদানি করা হয়। যেমন- ইন্ডিয়া, নরওয়ে, ইতালি, টার্কিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ। ইতালির মার্বেলকে বিভিন্ন আকৃতি দেওয়া যায়। অন্যান্য ব্র্যান্ডের তুলনায় ইতালি ও নরওয়ের মার্বেলের দাম একটু বেশি। ঢাকার হাতিরপুল, বাড্ডা, কুড়িল, মিরপুর, উত্তরা বিভিন্ন জায়গায় এই মার্বেল বা গ্রানাইটের দোকান আছে। ইন্ডিয়ান মার্বেল প্রতি বর্গফুটের দাম ১৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে অরোরা, যায়ালজ প্রিন, রোজালিয়া নাইট, মাসকারার, সিলভার নোভা ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়। এগুলোর দাম প্রতি বর্গফুট ৫০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। নরওয়ের মার্বেলের প্রতি বর্গফুটের দাম ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ইন্ডিয়ান নরমাল গ্রানাইটের প্রতি বর্গফুটের দাম ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা। হেভি গ্রানাইট ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। ইন্ডিয়ান গ্রানাইটের মধ্যে সিলভার পার্ল, সাফ হোয়াইট, জাফরানা, মার্সেল এস, কারারা সিলেট  বেশ পরিচিত। ইতালিয়ান ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে ব্ল্যাক পার্ল, ইমারেল্ড পার্ল, ব্লু পার্ল ইত্যাদি। প্রতি বর্গফুটের দাম পড়বে ৯৫০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। চায়না গ্রানাইট প্রতি বর্গফুটের দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। নরওয়ে গ্রানাইটের দাম প্রতি বর্গফুট ৯০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা।

ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন কোনো প্রোডাক্ট না। তাই এর নির্ধারিত কোনো মূল্য নেই। প্রতিটা ডিজাইনের অনেক ধরনের মূল্য হতে পারে। সেটা নির্ভর করে ম্যাটেরিয়ালস, রিকোয়ারমেন্ট, সাইজ ও ডিজাইন ওপর কাজের কোয়ালিটি অনুযায়ী তারতম্য হবে দামেরও। 

চিফ অপারেটিং অফিসার

ইকো ইনোভেটরস

সহযোগিতা ও কৃতজ্ঞতায়:

শাহরিন আজাদ তাসনুবা

সিইও অ্যান্ড হেড অব ডিজাইনিং

এস টি ডিজাইন অ্যান্ড কনসোর্টিয়াম লি.

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১০৫তম সংখ্যা, জানুয়ারী ২০১৯ 

ফারজানা গাজী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top