• Home
  • স্থাপত্য
  • স্থাপত্যের নতুন অধ্যায় পাথরের বুকে স্টেডিয়াম
Stone Stedium

স্থাপত্যের নতুন অধ্যায় পাথরের বুকে স্টেডিয়াম

কল্পনা করুন, আপনি ফুটবলের কোনো মহোত্তম ম্যাচ দেখতে বসেছেন। কিন্তু আপনার চারপাশের গ্যালারি কোনো সাধারণ কংক্রিটের দেয়াল নয় একপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল পাহাড়ের গিরিখাত, আর অন্যপাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে আদিগন্ত বিস্তৃত এক মায়াবী শহর!

কিংবা ভাবুন এমন এক স্টেডিয়ামের কথা, যার ছাদটা তৈরি করা হয়েছে বিশালাকার পালের নৌকার মতো করে, যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবেই বইছে শীতল হাওয়া।

ধুর, সায়েন্স ফিকশন বা রূপকথা মনে হচ্ছে? মোটেও না। ফুটবল দুনিয়াকে এমন এক অবিশ্বাস্য ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পর্দার আড়ালে তুলি চালাচ্ছেন একদল স্থাপত্য-জাদুকর। তারা হলেন বিশ্বখ্যাত আর্কিটেকচারাল ফার্ম ‘পপুলাস’ (Populous)-এর স্থপতিরা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ওল্ড ট্রাফোর্ডের ভবিষ্যৎ রূপরেখা থেকে শুরু করে ২০৩৪ সালের সৌদি আরব বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক সব স্টেডিয়াম সবই তৈরি হচ্ছে এদের জাদুকরী ছোঁয়ায়।

মরুভূমির বুকে এক টুকরো রূপকথা: সৌদি আরব ২০৩৪

আপনি যদি কাতার বিশ্বকাপের স্টেডিয়ামগুলো দেখে চোখ কপালে তুলে থাকেন, তবে ২০৩৪ সালের সৌদি আরবের জন্য পপুলাসের পরিকল্পনা দেখলে আপনার নিঃশ্বাস আটকে যেতে বাধ্য! তাদের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে ডানা মেলছে:

Saudi Stedium
সৌদি আরবে স্টেডিয়াম নির্মাণের আগে খেলার মাঠ। ছবি: সংগৃহীত

চিত্রঃ রিয়াদের কিং সালমান স্টেডিয়ামে ২০৩৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হতে পারে (ছবি: গেটি ইমেজেস)

প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান স্টেডিয়াম (কিদ্দিয়া সিটি): ৪৫ হাজার ধারণক্ষমতার এই স্টেডিয়ামটি কোনো সমতল মাঠে নয়, বরং আস্ত একটা পাহাড়ের খাঁদ কেটে (Cliff side) তৈরি করা হচ্ছে। এর তিন দিকে থাকবে দর্শকদের বসার আসন, আর একদিক পুরোপুরি খোলা! সেই খোলা প্রান্ত দিয়ে খেলা দেখার পাশাপাশি উপভোগ করা যাবে প্রকৃতির অবর্ণনীয় সৌন্দর্য।

কিং সালমান স্টেডিয়াম (রিয়াদ): ৯২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই দানবীয় স্টেডিয়ামটি হতে যাচ্ছে ২০৩৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের মূল মঞ্চ।

আরামকো স্টেডিয়াম (আল খোবার): ৪৭ হাজার আসনের এই স্টেডিয়ামের ছাদটি দেখতে হবে পালের নৌকার মতো। শুধু ফুটবল নয়, এখানে থাকবে নান্দনিক সব শপিং মল। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এর স্থাপত্যশৈলী এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে প্রাকৃতিকভাবেই এখানে চমৎকার বাতাস চলাচল করতে পারে।

Aramko Stedium
আরামকো স্টেডিয়াম, আল খোবার। ছবি: সংগৃহীত

শুধু সৌদি নয়, কাঁপছে আফ্রিকাও!

গল্পটা কিন্তু শুধু সৌদি আরবেই শেষ নয়। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপের জন্য মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় পপুলাস ডিজাইন করছে এক বিশাল স্টেডিয়াম, যার ধারণক্ষমতা হবে অবিশ্বাস্য—১,১৫,০০০! অন্যদিকে, পর্তুগালের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বেনফিকার বিখ্যাত ‘স্টেডিয়াম অফ লাইট’-এর রূপ পরিবর্তন করে দেওয়া হবে আগামী চার বছরের মধ্যে।

Arabic

বর্তমানের রাজপুত্র ও অতীতের গৌরব

পপুলাস কিন্তু রাতারাতি এই অবস্থানে আসেনি। বিশ্ব ফুটবলের আধুনিকতম স্টেডিয়ামগুলোর পেছনে রয়েছে এদেরই মস্তিস্ক। টটেনহ্যাম হটস্পারের যে স্টেডিয়ামটিকে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা বলা হয়, তার নকশাকার এই পপুলাসই। আর্সেনালের এমিরেটস স্টেডিয়াম, ২০১০ সালের জোহানেসবার্গ, ২০১৪ সালের নাটাল কিংবা ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ‘লুসাইল স্টেডিয়াম’ সবই তাদের সৃষ্টি।

এমনকি এবারের বিশ্বকাপে আমেরিকার কানসাস সিটিতে যে ‘ফ্যান ফেস্টিভ্যাল’ হতে যাচ্ছে, তার ডিজাইনও করেছে তারা। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ৬৫ ফুটের এক বিশাল হৃদয় আকৃতির (Love heart) প্রবেশদ্বার, যা ইতিমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের সেলফি তোলার মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ এই উৎসবে মাতবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

২০ বছরের ব্যবধান: কেন এই রূপান্তর?

কিন্তু হঠাৎ স্টেডিয়ামের ধারণা এভাবে বদলে যাচ্ছে কেন? পপুলাসের প্রধান নির্বাহী ব্রুস মিলার চমৎকার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আর্সেনালের এমিরেটস স্টেডিয়াম (যা ২০০৬ সালে খোলা হয়েছিল) নতুন করে সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন:

Football Stedium

ওই সময়ের তৈরি ভবন বা স্টেডিয়ামগুলোর এখন একটা পরিবর্তনের (Refresh) প্রয়োজন। কারণ, গত ২০ বছরে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। ফুটবল ভক্তরা এখন আর কেবল খেলা দেখতে আসেন না, তারা সারা বিশ্বে যা দেখছেন, স্টেডিয়ামে এসে ঠিক তেমনই এক অনন্য ও জাদুকরী অভিজ্ঞতা চান।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে শুরু করে আর্সেনাল, কিংবা দূর মরুভূমির বুক সবখানেই এখন নতুন যুগের হাওয়া। ফুটবলের সবুজ ঘাসের সাথে স্থাপত্যের এই মহাকাব্যিক ফিউশন দেখতে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। প্রস্তুত তো আপনি?

Related Posts

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম

শুধু দৃশ্যত নান্দনিকতাই নয়, স্থাপত্যের শিখরে রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জলবায়ুর সম্পৃক্ততা। আর এসবের পরিপূর্ণ সংমিশ্রণেই সম্ভব স্বতন্ত্র…

আধুনিক বাড়ির নকশায় গৃহস্থালি কাজ ও করিডরের বিবর্তন

একটি বাড়ির নকশায় করিডর বা চলাচলের পথকে সাধারণত খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বসার ঘর, শোবার ঘর,…

আধুনিক বাড়ির স্বপ্ন: মানুষকে স্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার সংকট

আধুনিক স্থাপত্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ, আরামদায়ক ও স্বাধীন করে তোলা। বিংশ শতাব্দীতে স্থপতি…

পরিবেশগত নৈতিকতার আলোকে স্থাপত্যের ১০টি প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থাপত্য কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা নান্দনিক নকশা তৈরির শিল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বায়তুর রউফ জামে মসজিদ স্থপতি মেরিনার অনন্য স্থাপত্যকর্ম
করিডোর
house
01
হাসপাতালে রোগী-কক্ষে ঘরোয়া আবহ দিচ্ছে কোয়ালুর নতুন ফার্নিচার
10
09
ফর্ম ফলোজ ফিকশন: ফাংশনের বাইরে ছয়টি ডিজাইনের অনুসন্ধান
প্রকৃতির দামও হিসাব করছে ভুটান: জিডিপির পাশে জিইপি