• Home
  • স্থাপত্য
  • স্থপতির চোখে বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিমের সমাধিসৌধ
Image

স্থপতির চোখে বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিমের সমাধিসৌধ

প্রিয় গানের দল ‘দোহার’-এর প্রয়াত শিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য বাউল শাহ আব্দুল করিমের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শাহ আব্দুল করিম কবে জন্মেছিলেন তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ, তিনি এখনো এতটাই প্রাসঙ্গিক। তাই বাউল শাহ আব্দুল করিমের সমাধি স্থাপনার রচয়িতা স্থপতি আদর ইউসুফ এর চিন্তা দর্শন নিয়েই এই রচনা।

ভাটিপুরুষ শাহ আব্দুল করিমের নির্যাসকে অনুসন্ধান করে সেটাকে স্থাপনার মাধ্যমে বলতে পারলেই স্থাপনা ও স্থপতির সার্থকতা। তাঁর গানের সুর নানাভাবে সাজিয়ে নানাজন গেয়ে থাকেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিল্পীর আপত্তি থাকে না। কারণ, তিনি বলতেন, বাউলরা গান লেখে বাণী প্রচারের জন্য।

বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিমের সমাধিসৌধ। ছবি:বাস্তুশিল্প

ফলে তার গানের কথা যতক্ষণ ঠিক আছে, ততক্ষণ তার সমস্যা নেই। যদিও বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের শব্দের আধিক্যে গানের কথা হারিয়ে গেল যখন, তখন তিনি আপত্তি করেছিলেন। এমনকি তিনি বলতেন, এই বাউলের কথা প্রচারের জন্য যদি বিশাল ময়দানে কেবল তিনটে লোকও আসে, তবুও তিনি মহানন্দে গান গাইবেন!

বাউল শাহ আব্দুল করিমের সব থেকে আকর্ষণীয় ব্যাপারটি ছিল, তিনি আধুনিক চিন্তার একজন মানুষ ছিলেন। আমরা সাধারণ বুদ্ধিতে জেনে থাকি যে বাউল মাত্রই ‘আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে’ অর্থাৎ লোকচক্ষুর অন্তরালে একান্তই ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত একজন মানুষ। জাগতিক অনেক বিষয়ই তাঁকে স্পর্শ করে না।

রাতের বেলা বাউলশিল্পী শাহ আব্দুল করিমের সমাধিসৌধ। ছবি:বাস্তুশিল্প

কিন্তু বাউল শাহ আব্দুল করিম বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। সে সময় তাঁকে পুলিশও ধরেছিল। দেহতত্ত্ব, অধ্যাত্মবাদের কথা যেমন বাউল আব্দুল করিম বলেছেন, আবার একই সঙ্গে অন্যায় দেখলে তিনি প্রতিবাদও করেছেন ঠিক লালনের মতোই। বাউলের কি দরকার আছে এমনটি লেখার-

সমাধিসৌধের ভিতরে স্থাপত্যের স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা। ছবি:বাস্তুশিল্প

ভক্তের অধীন হও চিরদিন- অর্থাৎ গুরুকে আমার কাছে এসে আমার অন্তরে থাকতে বলছি আমি। কারণ, মুর্শিদের কাছে আকুতি হলো-

সমাধিসৌধের ভিতরে স্থপতি গড়েছেন আলোছায়ার খেলা। ছবি:বাস্তুশিল্প

কাছের মানুষকে আমরা যে রকম করে আহ্লাদের সঙ্গে থাকতে বলতে পারি, সে রকম প্রেমের সঙ্গে গুরুকে যে বলতে পারেন তাঁর সততার দ্যুতি চোখে ঝলক লাগায় বৈকি! সহজ, সত্য, সমতা, বড়াইহীনতা-এই হলো শাহ আব্দুল করিমের নির্যাস। ব্যাপারগুলোকে স্থাপনায় আনতে পারার প্রচেষ্টা করাটা সাহসের এবং খুবই চিত্তাকর্ষক! একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে ধারণ করতে পারবে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করার মধ্যে আরেক সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য রোমাঞ্চকর ও পরম পাওয়া।

সরকারি প্রতিষ্ঠান সুরঙ্গন জেলা পরিষদের উদ্যোগে বাউল শাহ আব্দুল করিমের সমাধিক্ষেত্রে একটি স্থাপনা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘বাস্তুশিল্প’ নামক নকশাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান স্থপতি আদর ইউসুফ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পান প্রণব রায় চৌধুরী।

সিলেটের সুনামগঞ্জের ধল গ্রামে বাউল শাহ আব্দুল করিমের নিজ বাসভবনের উঠানে নির্মিত হয় এই সমাধিক্ষেত্র। সাধারণত কোনো বাড়ির উঠানে সমাধিক্ষেত্রের দেখা মেলে না। কিন্তু বাউল শাহ আব্দুল করিম কোনো সাধারণ মানুষ তো নন। তার স্ত্রীর নাম আফতাব-উন-নেসা। কিন্তু মরমি কবি আব্দুল করিম তাকে ডাকতেন সরলা নামে। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাকে সাধারণ নিয়মানুযায়ী কবরস্থানে নিয়ে গেলে আঞ্চলিক ধর্মান্ধরা তাড়িয়ে দেন।

তখন বাউল আব্দুল করিম নিজ বাড়ির উঠানে স্ত্রীকে চিরশায়িত করেন। ২০০৯ সালে তিনিও যখন দেহ রাখলেন, তখন স্ত্রীর পাশেই তাকে শায়িত করা হয়। যেহেতু একটি বাড়ির উঠানে এই সমাধিক্ষেত্র নির্মিত হবে, তাই বোঝাই যাচ্ছে যে স্থপতিকে জায়গার সংকুলান করতে ভালো বেগ পেতে হয়েছে। সমাধিক্ষেত্রের স্থাপনা সাধারণত বিশেষ ব্যক্তিকে মরণোত্তর শ্রদ্ধা ও স্মৃতি ধারণের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়।

তাই এই স্থাপনার মধ্যে একটি বিশালতার আভাস স্পষ্ট থাকে। অর্থাৎ যা আলাদা করে দেখতে হয় বা ভাবতে হয়, এমন একটি স্থাপনা। এক্ষেত্রে আমরা দিল্লিতে হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র বা আগ্রার তাজমহলের স্কেলটা আমরা একটু মনে করে দেখতে পারি।  

শাহ আব্দুল করিম সমাধি প্রকল্পের ক্ষেত্রে মূল সমস্যাটি হলো এর ছোট্ট পরিসর। এত অল্প জায়গায় সেই ‘মহান’ ভাব আনা স্থপতির জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। সমাধির চারপাশে ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। তাই ডিজাইনের সময় এই স্থানিক সংকটের মধ্য থেকে এমন একটি কাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য ছিল স্থপতির, যা আশপাশের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারে।

বাউল শাহ আব্দুল করিম মানুষের মধ্যেই থাকা একজন মানুষ। আড়ম্বরহীন কাটানো জীবনকে তুলে ধরতে চাওয়ার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো নির্মাণসামগ্রীর মধ্যেও সহজ ও স্বচ্ছতার আমেজ আনা। সমাধিক্ষেত্রের এলাকায় প্রস্তুতকৃত ইট দিয়েই এই স্থাপনাটি নির্মিত। এক্সপোজড ব্রিক অর্থাৎ, যা দিয়ে তৈরি তাকে উন্মুক্ত রাখার মধ্য দিয়ে স্বচ্ছতা ও সততার আমেজটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

শাহ আব্দুল করিম নিজে দেখতে একজন ছিমছাম মানুষ কিন্তু তার অন্তর স্বর্গীয়। স্থাপনাটিও বাহ্যিকভাবে সম্পূর্ণ বাহুল্যবিবর্জিত কিন্তু ভেতরে আধ্যাত্মিক আবহ। স্থাপনার ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বাহ্যিক জাগতিক ভাব থেকে সরে আসতেই হয়। নিঃসন্দেহে স্থাপনার ভেতরে শাহ আব্দুল করিমের দেহের উপস্থিতি সেই ভাব জাগরণের মূল কিন্তু সেই আমেজকে স্বর্গীয় করে তুলতে স্থপতি কিছু চমৎকার ডিজাইন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

যেরূপে সমাধিসৌধের ভিতরে উপর থেকে ঠিকরে আসে আলো। ছবি:বাস্তুশিল্প

শাহ আব্দুল করিমের তত্ত্বকে লালন করেই স্থাপনার ভেতরে আলোর উপস্থিতি বিশেষভাবে ভাবা হয়েছে। ৪০ ফুট বাই ৪০ ফুটের একটি বর্গের কেন্দ্রে শাহ আব্দুল করিম ও তার স্ত্রীর দেহাবশেষের ওপরে রয়েছে একটি সুবিশাল ডোম, যার ব্যাস ১৬ ফুট। এই ডোমটি ৯ ইঞ্চি ব্যবধানে দুইটি স্তরে বিস্তৃত এবং একেবারে ওপরে একটি গোলাকার রিং রয়েছে।

এই কারণে ডোম থেকে ওপরের আলো, যাকে আমরা স্থাপত্যের ভাষায় বলি ‘স্বর্গীয় আলো’ আনা সম্ভব হয়েছে। এখান থেকে আলো এসে ভেতরের গোটা জায়গার পাশাপাশি হৃদয়কেও জুড়িয়ে দেয়। এই ডোমের চারপাশ দিয়ে রয়েছে ৫ ফুটের একটি প্রদক্ষিণ পথ। মেঝেতে ব্যবহার করা হয়েছে সাধারণ স্থানীয় টাইলস।

জায়গার সংকটের কারণে এই চারকোনা স্থাপনাটিকে শাহ আব্দুল করিমের দেহাবশেষের সঙ্গে সমান্তরালভাবে নয় বরং কৌণিকভাবে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। চার কোনায় চারটে খুঁটি, ওপরে চালা ছাদ আমাদের এই অঞ্চলের আবহমান কালের কাঠামো নির্মাণ পদ্ধতিকে মাথায় রেখেই এমনটি ভাবা হয়েছে।

চারটি কোণের একটি কোণ দিয়ে এই স্থাপনার মধ্যে প্রবেশ করা হয় আর বাকি তিন কোণে তিনটি ছোট আলোর কুয়ো তৈরি করা হয়েছে ওপরের আলো আনার জন্য। এই যে বারবার ওপরের আলো আনার চেষ্টা, এটিই স্থাপনাটিকে আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণে মহিমান্বিত করে তুলেছে।

চারপাশে সলিড দেয়ালের পরিবর্তে ইটের জালি ব্যবহার করা হয়েছে যেন বাতাস চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না হয়। কাঠামোর মাধ্যমে আলো-বাতাস নিশ্চিত হচ্ছে বলে ভেতরের নাটকীয় ঘটনাটি খুব সহজ বোধ হয়। স্থপতি আমাদের জলবায়ুকে এই স্থাপনায় গণনা করেছেন, এই ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাস্তুশিল্প-এর প্রধান স্থপতি আদর ইউসুফ

সেই সঙ্গে শাহ আব্দুল করিমের বিশালত্বকে ধরতে এই ছোট্ট জায়গায় ফ্ল্যাট ছাদের বদলে একটি ডোম বা গম্বুজ ভেবেছেন, যাতে করে স্পেসটা দম বন্ধকর না লাগে। এই একই ডোম থেকে আলো আসার ফলে স্থাপনার অভ্যন্তরীণ ভাব গতানুগতিক স্পেসের বিশালত্বকে ছাড়িয়ে যায়।

এই স্থাপনাটিই কেবল স্থির কিন্তু এর মধ্যে আলো-ছায়াটাই কেবল চলমান, বহমান ঠিক শাহ আব্দুল করিমের মতোই এমন এক আধার, যে সমস্ত প্রবাহটাই ধারণ করে আছে। এই সমাধিক্ষেত্রে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে একজন ভাবুক অন্ধকার থেকে প্রবেশ করেন আলোতে। নিমিত্ত তখন কেবলই বাউল শাহ আব্দুল করিম-

প্রকাশকাল: বন্ধন, ১২০তম সংখ্যা, এপ্রিল-আগস্ট ২০২০।

Related Posts

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির

বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে কেউ যদি একটি পুরো স্থাপনা ডিজাইন করে ফেলেন, তবে সেই গল্প সহজে ভোলার নয়।…

বিশ্বের প্রাচীনতম স্থাপনা: হাজার বছর টিকে থাকা স্থাপত্যের বিস্ময়

মানুষের স্থাপত্যচর্চার ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। আধুনিক শহর, সুউচ্চ ভবন কিংবা অত্যাধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তির অনেক আগে মানুষ…

রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প

অনেকের ধারণা, ভবনে বেশি রং ব্যবহার করলে ডিজাইনের গাম্ভীর্য আর বিশুদ্ধতা নষ্ট হয়। রং যেন কেবল সাজসজ্জা, স্থাপত্যের…

অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”

পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য দেখতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু সেই দৃশ্যকে যদি পায়ের নিচে জলের ওপর…

01~1
previous arrow
next arrow

Bandhan Cover

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

বাওয়ার দৃষ্টিতে স্বভূমি শ্রীলঙ্কার স্থাপত্য
বিয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে আকাশের নিচে নির্মিত হলো এক উন্মুক্ত মন্দির
Knap-of-Howar
রঙের ভাষায় ছয়টি ভবনের গল্প
অস্ট্রিয়ার আল্পসে জলের আয়না: স্নোহেটার “লেখ মাউন্টেন মিরর”
highrise
হাওর জীবন
ফর্ম, অর্ডার ও জীবন: বিংশ শতকের স্থাপত্যভাবনা
শ্রমিক