ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় জুড়েই, মানব সমাজ জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে মানিয়ে নেয়ার চর্চা করে এসেছে। তবে সেই ধারণাটি বদলে যাচ্ছে শিগগিরই। আগামী শতাব্দীতে আমাদের কম মানুষ নিয়েই উন্নতি করতে শিখতে হবে।
বৃদ্ধির যুগের সমাপ্তি
সাম্প্রতিক সংবাদ শিরোনামগুলো জনসংখ্যাবিদদের দীর্ঘদিনের জানা বিষয়টিকে আরও শক্তিশালী করছে। মানবজাতি পা বাড়াচ্ছে এক অচেনা পথে। গত মাসে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে জাপানের জনসংখ্যা পাঁচ বছরে ত্রিশ লক্ষ কমেছে, যা দেশটির আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হ্রাস।
টোকিওর মতো মেগাসিটিগুলো বাড়তে থাকলেও, গ্রামীণ সম্প্রদায়গুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে জাপানের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১২৮ মিলিয়ন ছিল এবং উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন না হলে ২০৭০ সালের মধ্যে কমে ৮৭ মিলিয়নে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাপান একা নয়। দ্য ইকোনমিস্ট ভারতে জনসংখ্যা হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম দেশটির জন্য একটি বিশেষভাবে আশ্চর্যজনক পূর্বাভাস। প্রকৃতপক্ষে, অধিকাংশ উন্নত অর্থনীতি—এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশও—এই জনসংখ্যাগত গতিপথ অনুসরণ করছে।
কয়েক দশক ধরে, জনসংখ্যা বিস্ফোরণের ভয় মানব উন্নয়নের আলোচনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সরকার শ্রমের ঘাটতি, বয়স্ক জনসংখ্যা এবং কমে আসা কর নিয়ে যথেষ্টই উদ্বিগ্ন।
জনসংখ্যা হ্রাসের কারণ সম্পর্কিত এই আলোচনাগুলোতে একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে উপেক্ষিত হয়: নির্মিত পরিবেশ। সংবাদমাধ্যমগুলো মূলত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের উপরই বেশি মনোযোগ দেয়, যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সুস্পষ্ট; অথচ মানুষের আচরণ গঠনে পরিবেশগত উপাদানগুলোর ভূমিকা উপেক্ষা করা হয়।

সম্প্রসারণ থেকে অভিযোজন
জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও হ্রাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি জোনাস ও জোনাথন সল্কের ‘এ নিউ রিয়ালিটি’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, যা জীবগোষ্ঠী এবং তার পরিবেশের মধ্যকার মৌলিক সম্পর্ককে উন্মোচন করে।
সল্ক দম্পতি যুক্তি দেন যে, মানবজাতি ‘ক’ যুগের দ্রুত উত্থান এবং ‘খ’ যুগের ক্রমহ্রাসমান চাপের মধ্যবর্তী সন্ধিক্ষণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিবর্তন কেবল পরিমাণগত নয় এটি জীবনের অন্তর্নিহিত অবস্থারই একটি পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। সল্ক দম্পতি দ্বিতীয় যুগকে এমন একটি যুগ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যা সম্পদের সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং গ্রহের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শতভাগ সচেতন হবে।
সেই রূপকল্পে, স্থপতিরা একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন। ঠিক যেমন নির্মিত পরিবেশ আধুনিক অবকাঠামো, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আবাসন এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছেন তারা। একইভাবে এটি জনসংখ্যা হ্রাসের মোকাবিলায় সমাজকে পথ দেখাতেও রূপ দেবে।
ডিজাইনের অস্বস্তিকর দ্বন্দ্ব
আগামীর পথ খুব বেশি সহজ নয়। অবকাঠামোর ডিজাইনকে প্রায়শই মানবজাতির অবস্থার উন্নতির সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু যে কৌশলগুলো জীবনযাত্রার মান উন্নত করে, সেগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমাতেও অবদান রাখতে পারে।
এই টানাপোড়েনগুলো বুঝতে পারা আগামী শতাব্দীতে স্থপতি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড় করাতে পারে।
জীবনযাত্রার মানের স্ববিরোধিতা
স্বাস্থ্যকর ও অধিক উৎপাদনশীল জীবনের জন্য অবস্থার উন্নতি প্রায়শই নিম্ন প্রজনন হারের সাথে সম্পর্কিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বর্ধিত প্রবেশাধিকার সাধারণত জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমিয়ে দেয়।
শহুরে সুযোগের স্ববিরোধিতা
শহরগুলো শিক্ষাগত, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সুযোগকে মানুষকে কেন্দ্রীভূত করে এবং সমাজের উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে এগুলো পরিবার গঠনকে বিলম্বিত করার প্রবণতাও দেখায়।
জাপানের টোকিও এই উভয়সঙ্কটের একটি উদাহরণ। তরুণ-তরুণীরা কর্মজীবন এবং সামাজিক সুযোগের সন্ধানে মহানগর কেন্দ্রগুলোতে পাড়ি জমায়, এবং প্রায়শই শিক্ষা ও পেশাগত উন্নতির জন্য বিবাহ ও সন্তান জন্মদান বিলম্বিত করে। শহরগুলোর জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতার অনেকটাই এই অভিবাসনের উপর নির্ভরশীল। এর মাধ্যমে তারা গ্রামীণ এলাকার অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে এবং বৃহত্তর জনতাত্ত্বিক সংকোচনে অবদান রাখে।

ঘনত্বের আপাত-বিরোধিতা
শহুরে ঘনত্ব প্রায়শই এর কার্যকারিতার জন্য প্রশংসিত হয়। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ভূমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে, পরিবহনজনিত দূষণ কমায় এবং অবকাঠামোগত খরচ হ্রাস করে।
তবুও, এই ঘনত্বের সাথে প্রায়শই আসে সীমিত বসবাসের জায়গা, আবাসন সংকট, উচ্চ মূল্য এবং দীর্ঘ যাতায়াত। এসমস্ত কারণগুলোই হ্রাসমান প্রজনন হারের সাথে সম্পর্কিত। শহরের ঘনবসতি নিজে কোনো সমস্যা নয়। আসল চ্যালেঞ্জ হলো এমন ঘনবসতি তৈরি করা যা পরিবারগুলোকে নিরুৎসাহিত না করে বরং সহায়তা করে।
সুসজ্জিত সুবিধার আপাত-বিরোধিতা
সুপরিকল্পিত পার্ক, হাঁটার উপযোগী এলাকা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং গণপরিসর শহরগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। কিন্তু এই আকর্ষণীয়তার প্রায়শই একটি মূল্য দিতে হয়।
সুসজ্জিত সুবিধাগুলো দিন দিন মানুষের চাহিদা বাড়ায়। সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি করে এবং আবাসন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পরিহাসের বিষয় হলো যে গুণগুলো কোনো স্থানকে আকর্ষণীয় করে তোলে, সেগুলোই আবার তরুণ বয়সী ও পরিবারগুলোর জন্য সেটিকে কম সহজলভ্য করে তুলতে পারে। অবকাঠামোর ভালো নকশা মূল্য তৈরি করে, কিন্তু সেই মূল্যই জনতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
টেকসই উন্নয়নের আপাত বৈপরীত্য
পরিবেশগত দায়িত্ব পালনের প্রচেষ্টা প্রায়শই আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর জনসংখ্যাতাত্ত্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হয়।
ছোট আকারের বাসস্থান, যৌথ অবকাঠামো এবং মাথাপিছু কম ভোগব্যয় পরিবেশগত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে। অথচ জনসংখ্যা হ্রাসের সম্মুখীন সরকারগুলো প্রায়শই বড় বাড়ি, আরও বেশি পার্কিং সুবিধা এবং পরিবার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে এমন নীতিমালার সন্ধান করে—যার সবই টেকসই উন্নয়নের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হতে পারে।
স্থাপত্যশিল্প ক্রমেই দুটি পরস্পরবিরোধী অগ্রাধিকারের মাঝে আটকে আছে। একটি হলো পরিবেশগত তত্ত্বাবধান এবং অপরটি জনসংখ্যা বৃদ্ধি।
জনসংখ্যা হ্রাসকে সাধারণত একটি সংকট হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সংকুচিত সম্প্রদায়গুলো কখনো অপ্রত্যাশিত সুবিধাও দিতে পারে। উন্নয়নের চাপ কমে গেলে তা পরিবেশগত পুনরুদ্ধারকে সহজতর করতে এবং সম্পদের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদ হিদেতোশি ওহনোর জাপানের জন্য তার ফাইবার সিটি প্রস্তাবনাটি সংকুচিত শহরগুলোর পরিকল্পনা ব্যর্থতা হিসেবে মনে করেন না। তিনি মনে করেন এটি উন্নত সবুজ অবকাঠামো এবং নতুন ধরনের নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে কল্পনা করে।
একই সাথে, জনসংখ্যা হ্রাস গণপরিবহন ব্যবস্থা, স্কুল, পরিষেবা এবং স্থানীয় অর্থনীতির উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো জনসংখ্যা হ্রাসকে পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যাবে না। বিবেচনা করতে হবে জীবনযাত্রার মান বজায় রেখে কীভাবে যুগোপযোগী নকশা করা যায়।
লেখক: ব্লেইন ব্রোনেল
সূত্র: স্থাপত্য বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আর্কিটেক্ট’ থেকে অনূদিত।



















