পুরোনো কোনো ভবনের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনই রেট্রোফিটিং, যা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে সক্ষম। আধুনিক বিল্ডিং কোড প্রচলনের আগে বিশেষত আশি-নব্বইয়ের দশকে ভবনের ভূমিকম্প বিপর্যয়রোধে প্রতিরোধমূলক স্টিল রড ও সেগুলোর যথাযথ ডিটেইলিং ছাড়াই ডিজাইন করা হতো। সেই সময়ে তৈরি পুরোনো ভবনগুলো আজও প্রাতিষ্ঠানিক বা আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভবনগুলো না ভেঙে ব্যবহারের উপযোগী রাখার উপায় হলো ভবনে রেট্রোফিটিং করানো; যাতে ভবনটি ভূমিকম্প সহনীয় হয়ে ওঠে। তাই এমন সব ভবন চিহ্নিত করে রেট্রোফিটিং পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন, যা অর্থনৈতিক দিক থেকে হবে দারুণ সাশ্রয়ী।
ভবনের কার্যকারিতায় রেট্রোফিটিং
প্রচলিত রেট্রোফিটিং কৌশল ভবনের কার্যকারিতায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা চিত্র-১ থেকে সহজেই প্রতীয়মান। চিত্রে দেখা যায়, প্রচলিত রেট্রোফিটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে ভবনের পারফরমেন্স পয়েন্ট (Performance Point) উন্নীত করা সম্ভব। পারফরমেন্স পয়েন্ট হলো ভূমিকম্পের Capacity Curve এবং Demand Curve-এর ছেদবিন্দু। রেট্রোফিটিং করার পর ভবনের পারফরমেন্স পয়েন্ট মূল ভবনের পারফরমেন্স পয়েন্ট অপেক্ষা অধিক উঁচুতে অবস্থিত, যা প্রমাণ করে সঠিক জায়গায় রেট্রোফিটিং করা হলে যেকোনো ভবনকে ভূমিকম্প প্রতিরোধে অধিকতর মজবুত ও দৃঢ় করে গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রথাগত রেট্রোফিটিং কৌশল
প্রথাগত রেট্রোফিটিং পদ্ধতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুরোনো কাঠামোর সঙ্গে নতুন কাঠামোগত উপাদান; যেমন- Shear Wall, Bracing ইত্যাদি সংযোজন অথবা বিম কলামের সাইজ মোটা করা। নিচের ছবিতে বহুল প্রচলিত কিছু রেট্রোফিটিং কৌশল এবং সেগুলোর কার্যকারিতা দেখানো হলো।
চিত্র-২ থেকে সহজেই দৃশ্যমান যে পোস্ট-কাস্ট শেয়ার ওয়াল (Shear Wall) এবং স্টিল ফ্রেম ব্রেসিং (Bracing) সবচেয়ে কার্যকর রেট্রোফিটিং কৌশল। যদিও স্টিল ফ্রেম ব্রেসিং ভবনকে ভূমিকম্প প্রতিরোধে অধিক Ductility প্রদান করে, তথাপি স্বল্প নির্মাণব্যয় ও বহুল পরিচিতির কারণে পোস্ট-কাস্ট কংক্রিট শেয়ার ওয়াল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রেট্রোফিটিং পদ্ধতি। অতিরিক্ত শেয়ার ওয়াল সংযোজনের ফলে একটি ভবনের ওপর প্রযুক্ত সম্ভাব্য মোট Lateral Load এর অধিকাংশ শেয়ার ওয়াল প্রতিরোধ করে। ফলে বিম কলামের ওপর স্বাভাবিকের চেয়ে কম স্ট্রেস (Stress) আরোপিত হয় এবং ভূমিকম্প বা ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভবনটি টিকে থাকার মতো মজবুত ও দৃঢ় হয়।
বিম কলামের ওপর অতিরিক্ত স্ট্রেস লাঘব করার আরেকটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি হলো কলাম জ্যাকেটিং। কলাম জ্যাকেটিংয়ের সাহায্যে কলামের চারপাশে অতিরিক্ত স্টিল রডসহ কংক্রিটিং করে কলামের আকৃতি মোটা করা হয়, যাতে কলাম ওভারলোড নেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় পরিসর লাভ করে। কংক্রিটের নতুন আবরণ লাগানোর সময় সাধারণত Expensive সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়, যা সম্প্রসারিত হয়ে পুরোনো কলামের চারদিকে সংযুক্ত হয়ে একটি অভিন্ন আকৃতি গঠন করে। এ ধরনের রেট্রোফিটিং কৌশল যথেষ্ট শ্রমসাধ্য এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে ততটা লাভজনকও নয়।
আধুনিক রেট্রোফিটিং কৌশল
প্রচলিত রেট্রোফিটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে কলাম জ্যাকেটিং, শেয়ার ওয়াল সংযোজন এবং ব্রেসিং অন্যতম। এসব পদ্ধতির প্রয়োগ প্রায়ই প্রচণ্ড ধ্বংসযজ্ঞ, সুদীর্ঘ নির্মাণ সময়, পুনর্গঠন এবং বাসিন্দা স্থানান্তরসহ সব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমনকি অধিকাংশ সময় পরোক্ষ খরচ, পরিবেশ প্রতিকূল মনোভাব এবং প্রচলিত পদ্ধতি প্রয়োগসংক্রান্ত নানা জটিলতা ভবন মালিককে ভূমিকম্পজনিত রেট্রোফিটিং থেকে নিরস্ত রাখে। এক দশকেরও কম সময় ধরে বিশ্বজুড়ে ভবনের কাঠামোগত ও অকাঠামোগত বিপত্তি লাঘবের পদক্ষেপ হিসেবে অনেক উদ্যোগ দেখা গেছে। নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং উপাদানের উদ্ভাবন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোর প্রয়োগ রেট্রোফিটিং কৌশলে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আধুনিক অধিকাংশ বিল্ডিং কোড প্রচলিত প্রথা থেকে সরে এসে নমনীয় চাহিদাভিত্তিক কার্যক্ষমতাকে অনুমোদন ও উৎসাহ দিতে শুরু করেছে। রেট্রোফিটিং-সংক্রান্ত উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এসব নতুন কোড উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রেট্রোফিটিং প্রযুক্তির রকমফের
বেস আইসোলেশন (Base Isolation)
বেস আইসোলেশন প্রযুক্তি ভবনের ভিত্তি ও উপরিকাঠামোর সংযোগস্থলে নমনীয় Structural Element স্থাপন করে, যা ভবনকে ভূমিকম্পজনিত মাটির কম্পন থেকে আলাদা করে। এ ধরনের পৃথকীকরণ ব্যবস্থা নমনীয়তা আর শক্তি শোষণ করার ক্ষমতার সাহায্যে ভূমিকম্পের শক্তিকে উপরিকাঠামোতে পরিচালিত হওয়ার আগে শোষণ করে ক্ষয়ক্ষতি লাঘব করে। যার ফলে সম্পূর্ণ ভবনটি অতিরিক্ত শেয়ার ওয়াল, ব্রেসিং অথবা বিম কলাম জ্যাকেটিং ছাড়াই ভূমিকম্প সহনশীল হয়ে ওঠে। বেস আইসোলেশন পদ্ধতি ভবনের ভিত্তি পর্যায়ে ডিফরমেশন (Deformation) বাড়ালেও উপরিকাঠামোতে ডিফরমেশন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। তাই এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু ভবনের পতনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ছাড়াও ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে লাঘব করে। চিত্র-৫ থেকে বিষয়টি আরও ভালোভাবে স্পষ্ট হয়।
বেস আইসোলেশন পদ্ধতি সাধারণত ১০-১২ তলা উঁচু ভবনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। শুধু তা-ই নয়, উপরিকাঠামোর বৈশিষ্ট্য যেমন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা এবং Stiffness প্রভৃতি নানা বিষয় ভিত্তি পৃথককরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও প্রয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করে। ভবনটি যে এলাকায় অবস্থিত সে এলাকার মাটির ভূকম্পনজনিত নানা বৈশিষ্ট্য বেস আইসোলেশন-ব্যবস্থা ডিজাইনে বিবেচনায় আনা উচিত। কিন্তু সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো এ পদ্ধতি আংশিকভাবে কোনো ভবনে প্রয়োগ করা যায় না। তাই এটি প্রয়োগে ভবনের নির্মাণ খরচ স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ভূমিকম্পের রেট্রোফিটিংয়ের এই কৌশল উন্নত বিশ্বে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হলেও তা এখনো গবেষণাধীন।
কার্বন ফাইবার রেইনফোর্সড প্লাস্টিক
ইস্পাতের চেয়ে অধিকতর শক্তিশালী এবং হালকা উন্নতমানের যৌগিক পদার্থ হচ্ছে কার্বন ফাইবার রেইনফোর্সড প্লাস্টিক বা সংক্ষেপে CFRP. ফাইবার রেইনফোর্সড প্লাস্টিক মূলত রজন মিশ্রণে (ইপোক্সি বা এস্টার) নিহিত সিনথেটিক ফাইবার পদার্থ, যেমন- ফাইবার কাচ, কার্বনতন্তু, এরামিড প্রভৃতি। পদার্থের মধ্যে প্রধান লোড বহন করার ক্ষমতা রয়েছে কেবল ফাইবারের, রজন শুধু এক ফাইবার থেকে আরেক ফাইবারে চাপ স্থানান্তর করে। CFRP-তে ফাইবারের বিন্যাস কার্যকারিতার ওপর ভিত্তি করে একমুখী বা বহুমুখী হতে পারে। কলাম জ্যাকেটিং ব্যয়বহুল বিধায় আজকাল উন্নত দেশগুলোতে দুর্বল কলামের ওপর CFRP-এর স্তর সম্পূর্ণ উচ্চতা জুড়ে মুড়ে দেওয়া হয়। এতে করে কলামের Flexural Strength, Ductility ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। সাধারণত CFRP প্লেট কোনো স্ট্রাকচারাল মেম্বারের Flexural Strength বৃদ্ধির জন্য টেনসান সাইডে অথবা Shear Strength বৃদ্ধির জন্য বিমের ওয়েবের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয়।
ফ্রাকশন ড্যামপার (Friction Damper)
কোনো কাঠামোয় ভূমিকম্পের ব্যাপকতা Stiffness-এর সমানুপাতিক এবং শক্তি শোষণ করার ক্ষমতার ব্যস্তানুপাতিক। তাই কাঠামোয় যদি সম্পূরক শক্তি শোষণ করার কোনো কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যা ভূমিকম্পের কম্পনকে শুষে নেবে, তবে ভূমিকম্প প্রতিরোধে সেই ভবনের নিরাপত্তা বেড়ে যাবে অনেক গুণ। এ ধরনের কৌশলকে ড্যামপার (Damper) বলা হয়। ফ্রাকশন ড্যামপার হচ্ছে শ্রেণীবদ্ধ স্টিল প্লেটের সমন্বয়ে একটি ড্যামপার, যা ভবনের ওপর আরোপিত ভূমিকম্পজনিত বলকে অভ্যন্তরীণ ঘর্ষণ দ্বারা প্রতিরোধ করে। এসব স্টিলের প্লেটগুলো উচ্চ ক্ষমতার স্টিল বোল্ট দ্বারা যুক্ত। বড় ধরনের ভূমিকম্পের সময় অন্যান্য বিম কলাম Yield করার আগেই এরা Yield করে, ফলে ভূমিকম্পের প্রভাব অনেকাংশে লাঘব হয়। এ ছাড়া বর্তমানে Fluid Viscous Damper, Active Mass Damper, Hybrid Mass Damper নামে নানা রকম শক শোষণ করার মেকানিজম নিয়ে গবেষণা চলছে।
এক্সটার্নাল প্রিস্ট্রেনিং (External Prestressing)
দুর্বল কলামকে শক্তিশালী করার অন্যতম পন্থা কলাম জ্যাকেটিং। কিন্তু কলাম জ্যাকেটিং কলামের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি কলামের Stiffness বৃদ্ধি করে। কলামের Stiffness বৃদ্ধি রেট্রোফিটিংয়ের কাজে বাঞ্ছনীয় নয়। কেননা, অনমনীয় বা Stiffened কলাম অধিকতর শক্তিশালী ভূমিকম্প বল দ্বারা আকৃষ্ট হয়, যা প্রতিরোধক্ষম। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হচ্ছে কলামকে CFRP দ্বারা মুড়ে দেওয়া। দ্বিতীয় আরেকটি বিকল্প হচ্ছে প্রিস্ট্রেন্ড তার (Cable) ব্যবহার করে কলামকে মুড়ে সক্রিয় চাপে রাখা। পরীক্ষামূলক এবং বিশ্লেষণধর্মী নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, তার ব্যবহার করে কলাম ক্রস-সেকশনকে চাপ প্রয়োগ করার এই পদ্ধতি স্বাভাবিকের তুলনায় কলামের Strength এবং Ductility উভয় গুণকে বাড়ায়। এর কারণ মূলত দুটি। প্রথমত, তার বা কেব্লের ব্যবহার কংক্রিটকে পার্শ্বিকভাবে আবদ্ধ করে রাখে, যার ফলে কলামের Strength বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, তার বা কেব্লের পার্শ্বিক চাপ সম্পূরক টাই বা Shear Reinforcement রূপে কাজ করে।
পরিশেষে বলা যায়, সঠিক রেট্রোফিটিং প্রক্রিয়া নির্বাচনে সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে ভবনটির Structural Capacity, Seismic Demand, ভবনটির কার্যনির্বাহী গুরুত্ব ইত্যাদি বেশ কিছু বিষয়ের ওপর। রেট্রোফিটিং সাম্প্রতিক একটি ধারণা এবং বর্তমানে এই প্রক্রিয়াটিকে অর্থনৈতিকভাবে আরও সাশ্রয়ী এবং সহজতর করার লক্ষ্যে প্রচুর গবেষণাকাজ পরিচালিত হচ্ছে। আশা করা যায়, এসব গবেষণায় উদ্ভূত নতুন প্রযুক্তি ও উন্নতমানের যৌগিক উপাদানের প্রয়োগ রেট্রোফিটিং কৌশলকে আরও সহজবোধ্য, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং যুগোপযোগী করে তুলবে।
- তন্ময় দাস
প্রকাশকাল: বন্ধন ৪৬ তম সংখ্যা, ফেবু্রুয়ারি ২০১৪