মেলবোর্নের পথে পথে (পর্ব ৩)

স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশবান্ধব রেটিং সিস্টেম

বাংলাদেশে আমরা বিভিন্ন সময়ে স্থাপনাগুলোতে শক্তির ব্যবহার কিংবা পরিবেশবান্ধব হিসেবে কীভাবে গড়ে তোলা যায়, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি। সেক্ষেত্রে প্রধানত আমরা বাংলাদেশের নির্মাণ বিধিমালার ওপর নির্ভর করে থাকি, যেখানে একটি স্থাপনা থেকে আরেকটি স্থাপনার দূরত্ব থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে স্থাপনাগুলোকে কীভাবে স্থাপন করা সম্ভব, সেগুলো নিয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা থাকে। তা ছাড়া স্থাপনা তৈরির প্রাক্কালে এই বিষয়গুলো আমরা সাধারণত দেখে থাকি স্থাপনা থেকে সামনের রাস্তার দূরত্ব, ভেতর ও বাইরে খোলা জায়গার পরিমাণ, মোট জমির সঙ্গে স্থাপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আনুমানিক ব্যবহৃত জায়গার পরিমাণ কেমন ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের নির্মাণ বিধিমালার পাশাপাশি বিল্ডিং কোডে স্থাপত্য এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে এক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রকল্পগুলোর নির্মাণকৌশল এবং পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার সঙ্গে অন্যান্য উন্নত বিশ্বের নির্মাণকৌশল এবং পরিবেশের সঙ্গে স্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক দেখা যায়।

উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের কথা বলা যেতে পারে। এখানে স্বভাবত যেকোনো স্থাপনাকে প্রাথমিকভাবে ছয় মাত্রার রেটিং সিস্টেম অর্জন করতে হয়। এরপর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে রেটিং সিস্টেমের মান উন্নীত করতে হয়। যেমন, ছয় থেকে আট মাত্রার রেটিং সিস্টেম, সেখানে সর্বোচ্চ দশ মাত্রার রেটিং সিস্টেম পর্যন্ত আসা যায় বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে। এগুলো সাধারণত সরকারিভাবে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে, যাদের নিজস্ব একটি পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তৈরির কোড আছে। যে কোড সময়ে সময়ে জলবায়ু এবং পরিবেশের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তনশীল, যা নতুন কিংবা পুরোনো স্থাপনাটি বছরান্তে কত মাত্রায় শক্তি সাশ্রয় করবে তার একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে থাকে।

এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন ধরনের স্থাপনার জন্য বিল্ডিং কোড এবং সেই কোডগুলোকে সঠিক পর্যায়ে পর্যালোচনা করার জন্য বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সফটওয়্যার, অ্যাপস, ক্যালকুলেটরের উদ্ভাবন করেছে। আর সেসব প্রযুক্তির মান উন্নয়নের জন্য দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গবেষণাগার ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে বছরব্যাপী। এমনকি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এসব বিষয়কে খুব সহজ এবং সুন্দরভাবে জানার জন্য অনেক ধরনের ওয়েবসাইটও বিদ্যমান। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী থেকে শুরু করে একজন সাধারণ নাগরিক স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে কীভাবে পরিবেশবান্ধব করা যায় এবং পরে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, সেই সব বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে খুব সহজেই। এমন উদাহরণ এখন বিশ্বের উন্নত প্রায় প্রতিটি দেশেই বিদ্যমান। যেখানে সৌরশক্তিকে কীভাবে আবাসনে ব্যবহার করলে কিংবা স্থাপনা তৈরির উপকরণগুলো কীভাবে ব্যবহার করলে পরিবেশবান্ধব হবে অথবা পুরো স্থাপনাটি বছরান্তে কতটুকু শক্তি সাশ্রয় করতে পারবে, এসব বিষয়ে এখন প্রায় প্রতিটি উন্নত দেশই সচেতন নিজেদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে।

মেলবোর্নে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিলক্ষিত হয়, এখানে প্রতিটি স্থাপনায় শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয় বিভিন্ন ধরনের রেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে, নির্মাণের প্রাক্কালে। সেখানে ওই স্থাপনায় পানি ব্যবহারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বৃষ্টির পানি কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে কিংবা কতটুকু সংরক্ষণ করা হবে, কোন ধরনের ট্যাংক কিংবা অন্যান্য সিস্টেমের মাধ্যমে, সেই বিষয়টিকে নিশ্চিত করতে হয়। সেখানে মেলবোর্নের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টির পানি ব্যবহারের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মাসব্যাপী কিংবা বছরব্যাপী। এই নীতিমালা শুধু মেলবোর্নের জন্য প্রযোজ্য নয়, অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের জন্য প্রযোজ্য। সে ক্ষেত্রে কীভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে কিংবা কতটুকু সংরক্ষণ করা সম্ভব এবং সেই পানিকে পরবর্তীকালে কীভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা সম্ভব, স্থাপনাগুলোতে সেই সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি সঠিকভাবে সেগুলো পর্যালোচনা এবং বিশ্লেষণ করার জন্য নির্দিষ্ট ক্যালকুলেটর কিংবা ডিজাইন সিস্টেম ডেভেলপ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে যেকোনো নকশাবিদ কিংবা প্রকৌশলী কিংবা স্থাপনার মালিকেরা সহজেই স্থাপনায় পানি সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন।

অন্যদিকে সূর্যের আলো ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে সেটিকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে কীভাবে গৃহস্থালি এবং স্থাপনায় ব্যবহার করা যায়, সে সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি স্থাপনায় দেখা যায় সৌরশক্তিকে ব্যবহার করার জন্য সোলার প্যানেলের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনা নির্মাণের সময় সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। তা ছাড়া সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে কতটুকু শক্তিকে শীতলীকরণ এবং ঘনীভবনের জন্য ব্যবহার করা যায়, সেগুলো নিরূপণের জন্য বিশেষ সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা আছে। যেখানে নির্দিষ্ট এলাকার জলবায়ুকে ব্যবহার করে সেই এলাকার সৌরশক্তি নিরূপণের নিমিত্তে প্রতিটি স্থাপনায় কীভাবে সেগুলো বিন্যাস করা হবে, যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের প্রাক্কালে সেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ এবং ডিজাইন প্রদান করতে হয়।

রেটিং সিস্টেমে আরেকটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ব্যবহার। অর্থাৎ একটি স্থাপনা পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলার জন্য সূর্যশক্তির ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হচ্ছে ওই স্থাপনায় নতুন কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে! যদি কোনো স্থাপনায় নতুন কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা ওই স্থাপনায় শক্তি সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, সেই কারণে ওই স্থাপনাটি রেটিং সিস্টেমের মান বৃদ্ধি পায়। এভাবে স্থাপনা নির্মাণে নতুন উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানোর বিষয়টিকে অনুপ্রেরণা দেওয়া হয়।

যদিও ইতিমধ্যে আমাদের দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষেত্রবিশেষে পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তৈরির বিভিন্ন ধরনের কোড এবং প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে কিংবা হচ্ছে, তবে মাঠপর্যায়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন যত দ্রুতগতিতে আমরা করতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তবে এই ধরনের পরিবেশবান্ধব স্থাপনা তৈরির কোড নিরূপণে প্রয়োজন আমাদের নিজস্ব গবেষণা। যেখানে আমাদের নিজস্ব জলবায়ু, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এই কোডগুলোকে সম্পর্কযুক্ত করতে হবে। কারণ, অন্যান্য দেশের কোডগুলো না বুঝে ব্যবহার করলে কিংবা অনুসরণ করলে সেখান থেকে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় লক্ষ্যে কখনোই পৌঁছাতে পারব না। এমনকি সেগুলো পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তা ছাড়া আমাদের দেশের এই ধরনের পরিবেশবান্ধব রেটিং সিস্টেম কিংবা কোড তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত সঠিক বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ছোট আকারে হলেও গবেষণা চালাতে হবে। কারণ, সঠিক পর্যালোচনা, দিকনির্দেশনা এবং গবেষণা ছাড়া আমরা যেমন সঠিক সমস্যা খুঁজে বের করতে পারব না টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্যে, ঠিক তেমনি সেই সমস্যার সমাধানও আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাবে অদূর ভবিষ্যতে।

প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৬তম সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০২১

Related Posts

অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. হাদিউজ্জামান এখনকার অবকাঠামো জলবায়ুসহিষ্ণু হতে হবে

দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথটি চলতি বছরের অক্টোবরে উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে স্বল্প খরচ ও ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকা…

অটোমেশন সিস্টেমে স্মার্ট হোম

আমরা সবাই স্বপ্ন দেখি চমৎকার এক আবাসের। বসবাসের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় একটি গৃহ আমাদের ধারণ করে। এই বসবাস ও…

ভবন ‘নির্মাণ’ এবং মান নিয়ন্ত্রণ (পর্ব-৭)

আজকের আলোচ্য বিষয় নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃতব্য স্টিলসামগ্রী (এমএস রড, অ্যাঙ্গেল ও ফ্ল্যাট বার)। এমএস রড একটি ভবন নির্মাণ…

মিথেনে নতুন বিপদ

গ্রামে প্রায়ই রাতের আঁধারে কৃষিখেত বা ডোবা-নালায় দেখা যায় হঠাৎ জ্বলে ওঠা আগুন, গোলা হয়ে উড়তে থাকে এক…