প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো শহর ঢাকা। বাংলাদেশের রাজধানী নামে পরিচিত এই শহরটির নামের পাশে যুক্ত হয়েছে মসজিদের শহর, রিকশার শহর কিংবা বসবাস অযোগ্য শহরের তকমা। দিনে দিনে এই শহরের ব্যাপ্তি বেড়েছে; পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জনসংখ্যা। উন্নয়নের নামে এই শহরে কাটাছেঁড়া কম হয়নি। নগরীর বুক চিরে বের হয়েছে ফ্লাইওভার, ইউলুপ কিংবা হালের মেট্রোরেল। তবে নাগরিক স্বস্তি দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে ঢাকা।
এ নগরীতে বৃষ্টি নামলে রাস্তাঘাট পানিতে ডোবে। গ্রীষ্ম এলেই শীতল পরশের জন্য ছায়া খুঁজে পাওয়া যায় না। আর শীতে ধুলোয় ধূসর হয়ে পড়ে সারা শহর। এবার ঢাকাকে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে দুই দশক মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে নাগরিক সেবা। বিশেষজ্ঞরা সংশোধিত নতুন সংশোধিত ড্যাপ-কে স্বাগত জানালেও কিছু অসঙ্গতি দূর করার তাগিদ দিয়েছেন। এগুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানী ঢাকা পরিকল্পিত, বাসযোগ্য ও আধুনিক নগরী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের স্বনামধন্য নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের প্রতিক্রিয়া ও পরামর্শের কথা এবারের বিশেষজ্ঞ মতে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও অনুলিখনে সাইফুল হক মিঠু
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন (নগর পরিকল্পনাবিদ), সভাপতি, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (আইএবি)
ড্যাপ নিয়ে যখন আমি কাজ করব, তখন ঢাকার আনুষঙ্গিক সবকিছু নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ। ঢাকাকে আমি যখন সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করব, তখন কিন্তু সারা বাংলাদেশের মানুষ এখানে আসবে। এই আসাটাকে যদি নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তবে প্রথমেই দ্রুতগতিশীল যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হবে। রেলওয়েকে আমরা যদি ব্যবহার করতে পারি ১০০-১৫০ কিলোমিটার স্পিডে, তাহলে ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসবে ও চলে যাবে। অর্থাৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকবে। আমাদের এই অবস্থায় যেতে হবে। নতুন সংশোধিত ড্যাপ বাস্তবায়নে রাজউকসহ অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় থাকতে হবে, নইলে নতুন এই নগর পরিকল্পনা মুখথুবড়ে পড়বে।
অধ্যাপক সামসুল হক (পরিবহন বিশেষজ্ঞ), পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
ভূমি ব্যবহার এবং পরিবহন অবশ্যই ইন্টিগ্রিটেড হওয়া উচিত। কেননা ভূমি ব্যবহার থেকেই ট্রাফিক জেনারেট করে। যখন ভূমি ব্যবহারের ঘনত্ব বাড়বে, ডিগ্রি অব মোটরাইজেশন হবে; বুঝতে হবে ট্রাফিক বাড়বে শহরে। শহরের পরিবহন ব্যবস্থাপনার ক্যাপাসিটির লোডটা নিতে হলে পরিবহনকে মাথায় রেখে ভূমি ব্যবহারে বিষয়টি ভাবা উচিত। ঢাকায় কিন্তু কম উন্নয়ন হয়নি, তিলোত্তমা ঢাকার নামে অনেক উঁচু উঁচু স্থাপনা হয়েছে। কিন্তু যখন রাস্তায় নামা হয় এর কোনো রিলাইবেলিটি নেই। আমরা রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকছি। কোনো একটা ভবন অনুমোদন দেওয়ার সময় বাসার সামনে কত ফুট রাস্তা আছে সেটা না দেখে অনুমোদন-প্রক্রিয়াটা শেষ করেন। কোনো ট্রাফিক ইম্প্যাক্ট বা অ্যাসেসমেন্ট করা হয় না। এটাতে হয়তো উন্নয়ন হবে কিন্তু মানুষজন চলতে পারবে না। কারণ, জেনারেটেড ট্রাফিক আসার জন্য তার যে সম্পূরক পরিবহনব্যবস্থা থাকার দরকার ছিল, সেটা কিন্তু নেই। এটার একটি ম্যানেজেবল সিস্টেম তৈরি করতে হবে। সংশোধিত ড্যাপ বাস্তবায়নে রাজউককে সক্ষম হতে হবে।
অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ (নগর পরিকল্পনাবিদ), সভাপতি, বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনায় মানুষের ভূমি পরিকল্পনা, পরিবহন, জলনিষ্কাশন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদনের, নাগরিক সেবার- প্রতিটা বিষয়ের সমন্বয় করে তার থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে একটা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ব্যাপ্তি অনেক বড়। এখানে মানবিক শহর, ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তমূলক নগরের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলোকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। ওয়ার্ডভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। নাগরিক পরিসেবার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলা হয়েছে। রাজউকের বর্তমানে যে জনবল কাঠামো আছে, সেটা নিয়ে এই সংশোধিত ড্যাপ বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়। এই বিষয়টাতে মনোযোগ দিতে হবে।
সংশোধিত ড্যাপ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কি ভাবছেন?
স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, সাবেক প্রধান স্থপতি, স্থাপত্য অধিদপ্তর
সংশোধিত ড্যাপে নতুন অনেক জিনিস এসেছে। আবার কিছু বৈরিতাও এসেছে। কিছু জায়গায় যদি পরিমার্জন করা হয়, তাহলে এর সুফল নগরবাসী দেখতে পাবে। ড্যাপে ডেনসিটি জোনিং-এর কথা বলা হয়েছে। এটা পজিটিভ বিষয় কিন্তু সেখানে আরও অনেক কাজ করার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি। খাল বের করে আনার কথা বলা হয়েছে, যেটা অত্যন্ত ভালো। এ ছাড়া ওয়ার্ডভিত্তিক স্কুলের বিষয়টি এসেছে। আমরা বলেছি, স্কুল করার জায়গা স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বের করে দেবেন সরকারকে। হাসপাতালের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোথায় হাসপাতাল করব, সেটা যদি ড্যাপে চিহ্নিত না করা যায়, তাহলে সেটা কিন্তু কাজ করবে না।
ড্যাপে কতগুলো বিষয়ে আইনের ব্যত্যয় আছে। যেমন ড্যাপের যে প্রস্তাব আছে জলাধার নিয়ে, সেটা যদি বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে জলাধার আইনের একটা পরিবর্তন আনতে হয়। এখন পরিবর্তন আনলে নগরবাসীর জন্য উপকার হবে না ক্ষতি হবে, সেই বিশ্লেষণটা জরুরি। আইনের সঙ্গে যদি ড্যাপ সমর্থক হয়, তাহলে কাজ করা খুব সহজ আর তা না হলে বিষয়গুলো জটিল ও সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব, নগর পরিকল্পনাবিদ
আমাদের যেকোনো উত্তরণের প্রথম ধাপ হচ্ছে আগের যেসব পরিকল্পনা বা ধারণা, সেগুলো কেন বাস্তবায়ন হয়নি, কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, তার ভালো-মন্দ- সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া। হঠাৎ করেই নতুন পরিকল্পনা হয় না। কাঠামোগত পরিকল্পনা ও অনুমোদনের আগে বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এই ড্যাপে অনেক নতুন কিছু যুক্ত হয়েছে, যা অনেক বেশি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
প্রস্তাবিত ড্যাপে ভূমি ব্যবহারে আমরা জোনিং করতে দেখি। তার মধ্যে আবাসিক, কৃষি, বনাঞ্চল, ৪ ধরনের মিশ্র এলাকা ও খোলা জায়গা, বাণিজ্যিক এলাকা এবং ভারী ও দূষণ শিল্প এলাকাকে আলাদা করে চিহ্নিত করা হলেও তার মধ্যে স্পষ্টভাবে জলাভূমি ও প্লাবনভূমির উপস্থিতি দেখি না। এটা কিন্তু আগের ড্যাপ ও অন্যান্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভবিষ্যতের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলকে চিহ্নিত করার কাজ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করি। জলাশয় ভরাটকারী সংস্থার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো রকম পদক্ষেপ এতে নেই। এই সময়ে জলাবদ্ধতা ও জলাধার সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। স্কুলভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক, জলাশয়ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা কী করে করব, সেই ধরনের সুস্পষ্টকরণ এই বিশদ অঞ্চল পরিককল্পনায় নেই। সড়ককে গণপরিসর হিসেবে চিহ্নিত করে এটিকে প্রশস্ত করার বিষয়টি বরাবরই এসেছে। তবে এবার বিষয়টিকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে, এটা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
যখন ঢাকার পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিকল্পনার একটা সম্পর্ক আছে, তখন আগামী ২০ বছরে ঢাকা কোথায় যাবে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কোথায় হবে, সেই বিষয়টিও জড়িত। বিশেষ করে পদ্মা সেতু হচ্ছে, বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন এলাকাকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে জনসংখ্যার চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি, পদ্মা সেতুর জন্য ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত পুরো এলাকা বিভিন্ন রকমের সাইনবোর্ড দিয়ে ভরে গেছে। এখন আমরা মনে করছি, ঢাকাকে মাওয়া পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব। পুরো এলাকাকে হাইপার মেগাসিটি করব। বিশেষ অঞ্চল পরিকল্পনায় এই বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। আমরা দেখেছি, এই পরিকল্পনায় মানবিক শহর তৈরির কথা বলা হয়েছে। ড্যাপে হাঁটার পথ, নতুন রাস্তা, জলাধার বৃদ্ধি, জনসংখ্যার নিয়ন্ত্রণ, ভূমির মিশ্র ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের গর্ভনেন্সের সমস্যাটা অত্যন্ত বেশি। সেক্ষেত্রে এই ধরনের বিষয়গুলো শেষ পর্যন্ত কতটুকু কার্যকর হতে পারবে, সেটা নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। এসব প্রস্তাব কেবল ড্যাপে থাকলে হবে না। তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থের সংযোগ ও সরকারের সদিচ্ছা।
প্রকাশকালঃ বন্ধন, ১২৫তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১