Image

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও ভয়াবহতা

সম্প্রতি নেপালে ঘটা প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি হয়েছে। এই উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশও রয়েছে ভূমিকম্পের চরম ঝুঁকিতে। ভূমিকম্প এমন এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা আগে থেকে কোনো রকম পূর্বাভাষই দেয় না। ফলে কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই ঘটে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি। ৮ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশ তথা ঢাকা ও দেশের অন্যান্য বড় শহরকে নিমেষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে পারে।

ভূমিকম্পের অতীত ইতিহাসে ফিরে তাকালে প্রথমেই ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের আসাম ভূমিকম্পের কথা মনে পড়ে। রিখটার স্কেলে ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৭। প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলে এই কম্পনের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। যাতে এখনকার বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট, রাজশাহী, নাটোর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ ভারতের গৌহাটি, কুচবিহার, আগরতলা, ধুবড়ির প্রায় সব ধরনের পাকা-আধা পাকা স্থাপনা ধ্বংস হয়। প্রাণহানি ঘটে ১ হাজার ৫৪২ জন মানুষের। তৎকালীন পাকা ঘরবাড়ির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এখনকার মতো পাকা বাড়ি ও বহুতল ভবন থাকলে প্রাণহানি ও ধ্বংসের মাত্রা কোন পর্যায়ে পৌঁছাত সহজেই তা অনুমেয়।

বাংলাদেশ ও তার আশপাশের ফল্টগুলোতে যেকোনো সময় ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ১৮৯৭ সালে আসামে যখন ভূমিকম্প হয়েছিল তখন ঢাকার আয়তন ছিল ২০ বর্গ কিলোমিটার আর জনসংখ্যা ছিল ৯০ হাজারের মতো। ভবনের সংখ্যা ছিল ১০০টি। সংগত কারণে তাই ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছিল কম। কিন্তু বর্তমান ঢাকা ৩০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের, যা প্রতিদিন বাড়ছে। জনসংখ্যা কমপক্ষে দেড় কোটি। আর এখনকার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ভূমিকম্প হলে রিখটার স্কেলে তা হবে ৯ মাত্রার মতো। ঢাকার রাজউকের আওতাধীন এলাকার শতকরা ৪০ ভাগ অঞ্চলের মাটি ভালো। এর তুলনায় খুলনার ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (কেডিএ) আওতাধীন অঞ্চলের মাটির মান ২০ শতাংশের কম। বাংলাদেশের সব শহরের মাটি কমবেশি এ রকমই। বাকিটা নরম মাটি। নরম মাটিতে তৈরি ভবনে ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি বেশি। ফলে বাংলাদেশে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা-খুলনাসহ সব শহরে বহুসংখ্যক ভবন ধ্বসে পড়বে। প্রাণহানি কী পরিমাণ হবে তা কল্পনারও বাইরে। ভূমিকম্পে যে ক্ষতি হবে তার চেয়ে বেশি হবে ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে। বিশেষ করে ঢাকায়। কারণ, ঢাকায় প্রতিটি বাসায় আছে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত গ্যাসের লাইন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই গ্যাস বন্ধ করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ভূমিকম্পের ফলে ভবনের যা ক্ষতি হওয়ার তা তো হবেই, মূল ক্ষতি হবে ভূমিকম্পনের পরে। ভূকম্পনের ফলে গ্যাসের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গ্যাস বের হবে, লাগবে আগুন। এই সর্বগ্রাসী আগুনে ধ্বংস হওয়া ভবন ছাড়াও ভূকম্পনে বেঁচে যাওয়া ভবনগুলো আগুনে পুড়ে ছারখার হবে। তাই সর্বগ্রাসী এই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে ভাবতে হবে এখনই।

ভূমিকম্প ঠেকাতে পারব না আমরা। এটা হবেই। ২০১০ সালে চিলিতে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। কিন্তু সরকার ও জনগণের পূর্বপ্রস্তুতি, ভবন নির্মাণে কোড মানার কারণে ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছিল। প্রাণহানির সংখ্যাও ছিল কম, মাত্র ৫০০ জন। আর তাই এই অবশ্যম্ভাবী বিপদ থেকে রক্ষার জন্য দেশের সরকার ও জনগণকে সচেতনতার সঙ্গে ভবন নির্মাণ কোড মেনে চলতে হবে। রাজমিস্ত্রির পরামর্শে কোনোভাবেই ভবন নির্মাণ নয়। অভিজ্ঞ স্থপতি ও প্রকৌশলী দিয়ে প্ল্যান ডিজাইন করিয়ে অভিজ্ঞ নির্মাণ প্রকৌশলী দিয়ে ভবন নির্মাণ করতে হবে।

ফ্ল্যাট প্লেট স্ল্যাব নির্মাণ করা যাবে না। স্ট্রং কলাম, দুর্বল বিম পন্থা অবলম্বন করে ভবন নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া যথাযথভাবে মাটি পরীক্ষা করতে হবে। কাঠামো ডিজাইন (Structure Design) করার সময় কমপক্ষে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় করে ডিজাইন করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা শহরে গ্যাসের সংযোগগুলোতে স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রক (Automatic Regulator) লাগাতে হবে, যাতে ভূমিকম্প হওয়ামাত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

ভূমিকম্প হলে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত মানুষ উদ্ধার ও মৃত মানুষ অপসারণ ও কংক্রিটের বর্জ্য সরানো একটি অতি জরুরি কিন্তু কঠিন কাজ। আমাদের এ কাজে প্রস্তুতি কেমন তা রানা প্লাজাই প্রমাণ করে দিয়েছে। তাই সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানসমূহের মোটেও দেরি না করে উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যাপকভাবে সংগ্রহ করে রাখা ও সেগুলো ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী তৈরি করা অপরিহার্য। এটি কিন্তু সময়েরও দারি। তা না হলে আগামী প্রজন্মকে আমরা অরক্ষিত অবস্থায় রেখে যাওয়ার দায় এড়াতে পারব না কোনোভাবেই।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৬৪তম সংখ্যা, আগস্ট ২০১৫

Related Posts

বাংলাদেশে আবহাওয়া পরিবর্তনের চিত্র

জলবায়ুর পরিবর্তনের সংজ্ঞা বলার কিছু নেই। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে বাস্তব জীবন পর্যন্ত আধুনিক যুগে জলবায়ুর পরিবর্তন সবার চোখেই…

ভূগর্ভস্থ পানির অতিব্যবহারে ডুবে যাবার আশংকায় ঢাকার

এই রহস্যময় বিশ্বব্রক্ষান্ডে পৃথিবী নামক গ্রহে পানির উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এক অপার বিস্ময়। প্রতিটি প্রাণীর জীবনের অস্তিত্ব টিকে রাখার…

সিরিশের ঘষায় মসৃণ ডিজাইন

আকাশ ছোঁয়া ভবন। ভবনের গায়ে নানা রঙের কারুকার্য। চোখ জুড়ানো রঙের খেলা। এমন দৃশ্য কার না ভালো লাগে!…

অন্দরে শীতের উষ্ণ ছোঁয়া

শীত এলে প্রকৃতির সঙ্গে বদলে যায় আমাদের অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনাচরণ। অন্দরসজ্জা পাল্টে যায় সেই ছন্দের তালে। শীতে…

01~1
previous arrow
next arrow

CSRM

সর্বশেষ

Trending Posts

Gallery

কী কী থাকছে আকাশছোঁয়া শান্তা পিনাকলে
সমুদ্রবাণিজ্যের বর্জ্য থেকে অনন্যা এক স্থাপত্য
Home of Haor
Weather
Youth Park
Tower
শহর,সেতু আর সুরের টেনেসির আর্টস সেন্টার
Al Hamra
Teroshri Mosq