পরিবেশবান্ধব ট্যানারিশিল্পের উত্থান

পরিবেশের প্রতি দায় কিংবা টেকসই উন্নয়ন যাই বলি না কেন, সম্প্রতি পরিবেশরক্ষায় সচেতনতা বেড়েছে বহুগুণ। প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অসচেতনতায় প্রকৃতি হারিয়েছে এর স্বাভাবিকতা। শিল্প-বিপ্লবের সূচনায় পরিবেশ বিপর্যয়ের এখনকার অবস্থা ছিল অচিন্তনীয়। অনুরূপভাবে বাংলাদেশে শিল্পের আগমন ও ক্রমবিকাশের সূচনায় পরিবেশরক্ষার বিষয়টি ছিল অবহেলিত, ক্ষেত্রবিশেষে অজ্ঞাত। আমরা যদি ৫০-৬০ বছর পেছনে ফিরে যাই তবে দেখা যাবে, বাংলাদেশে তখন উল্লেখযোগ্য শিল্পের আগমন ঘটেনি। সেই সময় পরিবেশ ছিল দূষণমুক্ত। সময়ের পালা বদলে, চাহিদার প্রয়োজনে দেশে এসেছে বহুমুখী শিল্প, যাতে পরিবেশ হয়েছে ভারাক্রান্ত। এসব শিল্পের মধ্যে উল্লেখের দাবিদার ট্যানারিশিল্প।

ট্যানারিশিল্পের উত্থান

বাংলাদেশে ট্যানারিশিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৪০ সালে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নানামুখী শিল্পের অগ্রদূত রণদা প্রসাদ সাহার হাত ধরে। প্রথম চামড়া শিল্পনগরী হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয় নারায়ণগঞ্জে। দেশে যেকোনো ধরনের শিল্পের আগমন দেশের অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। যেমন, ধরুন বাংলাদেশে গাড়ি নির্মাণশিল্পের আগমন ঘটলে নিঃসন্দেহে তা দেশের অর্থনীতিকে পুষ্ট করবে। যেকোনো দেশে একটি শিল্পের আগমনের সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকিও চলে আসে। তখন আমাদের করণীয় পরিবেশগত ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করা।

কিন্তু বাংলাদেশে ট্যানারিশিল্পের আগমন নির্লিপ্তভাবে বলা যায় পরিবেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। পরে ১৯৫০ সালে এ শিল্পকারখানা স্থানান্তর করা হয় পুরান ঢাকার হাজারীবাগে। বুড়িগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে এ দেশে গড়ে ওঠে অনেক ট্যানিং (ঞধহহরহম) প্রতিষ্ঠান, তখন এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল করপোরেশন ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ওপর। সত্যি কথা বলতে তাদের কেউই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে সততার সঙ্গে পালন করতে পারেনি। ১৯৮০ সালে সরকার এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে  ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হয়।

পরিবেশদূষণে ট্যানারিশিল্প

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত হাজারীবাগে গড়ে ওঠা ট্যানারিশিল্পের উচ্ছিষ্ট বর্জ্য, বিষাক্ত কেমিক্যাল, রং ক্ষতি করছে ওই এলাকাসহ তৎসংলগ্ন এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। এর ফলে প্রাণ হারাচ্ছে ঢাকার মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গা নদী। এখানে ট্যানারিশিল্পের উচ্ছিষ্ট বর্জ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পদার্থ (যেমন-ক্লোমিয়াম, সালফার) ফেলা হতো কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়া। হিউম্যান রাইট ওয়াচ-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, ট্যানারিশিল্পের প্রভাবে বুড়িগঙ্গার পানি প্রতিদিন ২১,০০০স৩ হারে দূষিত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে বিপন্ন হচ্ছে এখানে বসবাসরত জীববৈচিত্র্য। ভয়েজ নিউজ-এর মতে, এখানকার নিত্যকার ব্যাধি ডায়রিয়া হচ্ছে দূষিত পানির প্রভাবে। এ ছাড়া ট্যানারিশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি খুবই আশঙ্কাজনক। ঢাকাকে বসবাসের দ্বিতীয় অযোগ্য শহর হিসেবে চিহ্নিতকরণে ট্যানারিশিল্প রাখছে মুখ্য ভূমিকা।

ঢাকা ট্রিবিউন

ট্যানারিশিল্পের যাত্রা নতুন আঙ্গিকে

ট্যানারিশিল্পের কালো এ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে চলেছে বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকা থেকে। শিল্পের বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিবেশরক্ষার্থে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ সরকার ট্যানারিশিল্পকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়। তদনুযায়ী ঢাকার অদূরে সাভার থানার ধলেশ্বরী নদীর তীরঘেঁষে প্রায় ২০০ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত সমগ্র এলাকাকে ২৫৫টি প্লটে বিভক্ত করে ১৫৫টি ট্যানারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মাঝে বিতরণ করা হয়। সরকারের ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাভারমুখী করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। প্লট বরাদ্দ পাওয়া ট্যানারি কোম্পানির সিংহভাগ ইতিমধ্যে তাদের স্থানান্তর-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। খুশির খবর  হলো, এদের অনেকেই ইতিমধ্যে উৎপাদনে চলে এসেছে।

ট্যানারিশিল্প নব আঙ্গিকে

ট্যানারিশিল্পকে নতুনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে পরিবেশের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে। আগের ট্যানারিশিল্পে যেসব Inconsiderable Environmental Issue ছিল, সেগুলো বর্তমান ট্যানারিশিল্পে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। CETP (Central Effluent Treatent Plant)-এর মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বর্জ্যরে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। পুরো শিল্প এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে WTP (Water Treatment Plant) স্থাপন করা হয়েছে।

CETP-এর বৈশিষ্ট্য

CETP বা ইটিপি হলো শিল্প বর্জ্য পরিশোধনের অন্যতম জনপ্রিয় পদ্ধতি। যেখানে ধাপে ধাপে শিল্প বর্জ্য হতে ক্ষতিকর উপাদানগুলো দূর করা হয়। পরে তা পরিবেশে ছাড়া হয়। নতুন ট্যানারিশিল্পের বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ইটিপি স্থাপনের দায়িত্ব দেওয়া হয় চীনা প্রতিষ্ঠান JLEPCL DCL-কে ২০১২ সালে এ লক্ষ্যে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীনা প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শুরু করে। বর্তমানে CETP বা সিইটিপির নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পর্যায়ে। নির্মাণাধীন সিইপিটি মোট ছয়টি মডিউলের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতিটি মডিউল প্রতিদিন কমপক্ষে ৬২৫০m3 বর্জ্য পরিশোধনে সক্ষম। সে হিসাবে চারটি মডিউলের সাহায্যে প্রতিদিনের পরিশোধিত পানির পরিমাণ ২৫,০০০m3 যা ১৫৫টি ট্যানারি কোম্পানির বর্জ্য পরিশোধনে পুরোপুরি সক্ষম। পরিশোধিত পানি পরে ফেলা হবে পার্শ্ববর্তী ধলেশ্বরী নদীতে।

WTP-এর বৈশিষ্ট্য

শিল্প এলাকায় Drinking Water এবং Industrial use-এ পানি সরবরাহের জন্য WTP স্থাপন করা হয়েছে এটি বাস্তবায়নে কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করেছে Centre for Irrigation and Water Management এবং Rural Development Academy, Bogra-এর পানি সরবরাহ ক্ষমতা ৯৫০ Lakh Litter/h।

আশঙ্কার অবসান

নবনির্মিত ট্যানারি শিল্প এলাকায় পরিবেশ বিপর্যয়জনিত কোনো আশঙ্কা নেই বললেই চলে। যদিও কোনো রকমের পরিবেশ বিপর্যয়জনিত সমস্যার সৃষ্টি হয়। তবে তা সংশোধনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ, এটি গড়ে তোলা হয়েছে একক শিল্প এলাকায়। এ ছাড়া ট্যানারিশিল্প এলাকার অনাকাক্সিক্ষত সম্প্রসারণ যথেচ্ছা ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। এখন প্রশ্ন থাকতে পারে বুড়িগঙ্গার দশা ধলেশ্বরীকে ছুঁয়ে যাবে কি না। এ ক্ষেত্রে উত্তর হবে, না। কারণ, বুড়িগঙ্গায় ফেলা হতো অপরিশোধিত পানি। পক্ষান্তরে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হবে পরিশোধিত পানি।

বিজনেস ইন্সপেকশন

আন্তর্জাতিক বাজার বৃদ্ধি

অতীতের জরিপগুলো থেকে জানা যায়, বিশ্ব চামড়া বাজারে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ মাত্র ০.৫ শতাংশ। যা থেকে বার্ষিক আয় ৩.৫ বিলিয়ন। নতুন অবকাঠামোগত সুবিধা বিদেশি ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে আয় ৪.৫ বিলিয়ন উন্নীত করা সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যা সুসংবাদ বটে।

বাংলাদেশে ট্যানারি শিল্পের এই সুষ্ঠু আবাসন সম্ভব হয়েছে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবিদ পরিবেশসচেতন ব্যক্তিবর্গ ও পরিবেশ সংগঠনগুলোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। ধন্যবাদ তাঁদের, যাঁরা ট্যানারিশিল্প কর্তৃক পরিবেশদূষণের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের টনক নড়াতে পেরেছেন। দেখুন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন যখন ‘বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা’ দেখার জন্য এ দেশ সফর করেন। তখন গর্বে আমাদের বুক ফুলে ওঠে। কিন্তু যখন হিউম্যান রাইট ওয়াচ, ভয়েজ নিউজ-এর মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরে, তখন একটু কষ্ট হয়। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এ ধরনের Environmental Disaster ইস্যুতে আর শিরোনাম হবে না।

পৃথিবীকে যদি মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে পরিবেশ তার আত্মা। আত্মার প্রশান্তি যেমন মানবদেহের জন্য শান্তি আনে, তেমনি প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষার মাধ্যমে আমরা পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষের বসবাসকে প্রশান্তিময় করে তুলতে পারি।

প্রকাশকাল: বন্ধন, ৮০তম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৬।

মো. ওবায়েদ আলী
+ posts

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top